অর্থনীতি নিয়ে ইবনে খালদুনের ভাবনা | সাজ্জাদ হোসাইন খাঁন
মানব ইতিহাসে ইবনে খালদুন এক অনন্য স্থানের অধিকারী। ইতিহাস ও সমাজতত্ত্বে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। কেবল ইতিহাস বা সমাজবিজ্ঞান নয়, জ্ঞানের অন্যান্য শাখাতেও তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টির ছাপ স্পষ্ট। তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি ‘আল-মুকাদ্দিমা’য় তিনি জ্ঞানের বিচিত্র জগত নিয়ে আলোচনা করেছেন—ইতিহাস, মনস্তত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান, ভূগোল, রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং রাজনৈতিক অর্থনীতি। তাঁর অর্থনৈতিক চিন্তা ও দর্শন এতটাই প্রভাবশালী ছিল যে, তা তৎকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে এক শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিল। যদিও জীবদ্দশায় তিনি খুব একটা জনপ্রিয়তা পাননি এবং সমসাময়িককালে তাঁর চিন্তাধারা ও দর্শন ব্যাপক প্রসার লাভ করেনি, কিন্তু তিনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন থেকে গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলেন। বর্তমান যুগে যখন আমরা ইবনে খালদুনের চিন্তাধারা ও কর্মপন্থা নিয়ে গবেষণা করি, তখন এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে—তিনি ছিলেন আধুনিক অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর লেখনী মানুষের চিন্তাজগতে বিচক্ষণতা সৃষ্টিতে আজও সক্ষম।
অ্যাডাম স্মিথের বহু আগেই ইবনে খালদুন ‘আল-মুকাদ্দিমা’ রচনা করেন, যেখানে তিনি উৎপাদনকে সম্পদের একমাত্র উৎস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও ইতিহাসবিদ জোসেফ জে. স্পেংলার (J. J. Spengler) বলেন, “ইবনে খালদুন নিঃসন্দেহে একজন মহান অর্থনীতিবিদ এবং ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তাধারার অন্যতম প্রবক্তা।”
ইবনে খালদুন বিশ্বাস করতেন, একটি দেশের সমৃদ্ধি নির্ভর করে তার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ওপর। তিনি ভাগ্যের প্রথাগত ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন না; বরং দারিদ্র্য দূরীকরণে শ্রম নিয়োগ ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পরামর্শ দিতেন। এই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় তিনি ‘শ্রমবিভাজন’ বা Division of Labor-কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। তাঁর মতে, ব্যবসার লাভ ও শ্রমের মজুরি নির্ভর করে উৎপাদনশীলতার ওপর। তিনি ‘আল-মুকাদ্দিমা’য় বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে পণ্যের দাম পরিবর্তনের যৌক্তিক বিশ্লেষণও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, উৎপাদন বাড়াতে হলে বাড়তি শ্রম নিয়োগ করতে হয়, ফলে মজুরিও বৃদ্ধি পায়। ইবনে খালদুন সোনা বা রুপাকে শুধুই ধাতু বা বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতেন। মাটির নিচে গচ্ছিত সম্পদ থেকে প্রাপ্ত আয়কে তিনি ‘স্বাভাবিক জীবিকা’ মনে করতেন না। এমনকি চাকরিকেও তিনি স্বাভাবিক জীবিকা হিসেবে স্বীকৃতি দেননি। কারণ, তাঁর মতে সম্পদ হলো কেবল তা-ই, যা উৎপাদনের মাধ্যমে অর্জিত হয়।
অর্থনৈতিক চিন্তাসমূহ ও বাজার ব্যবস্থা
ইবনে খালদুন সম্পদের সহজ প্রবাহ বা সঞ্চালনের পরামর্শ দেন এবং বাজারের প্রতিবন্ধকতা কমিয়ে তা যতটা সম্ভব উন্মুক্ত রাখার কথা বলেন। তিনি শ্রম নিয়োগের ওপর প্রচুর জোর দিয়েছেন। শ্রমের উৎপাদনশীলতা (অল্প শ্রমে অধিক ফলন) বৃদ্ধির মাধ্যমে সমাজের উন্নতি সম্ভব বলে তিনি মনে করতেন। তাঁর মতে, শ্রম ব্যতীত সম্পদের নিজস্ব কোনো মূল্য নেই; অর্থাৎ সম্পদের মূল্য শ্রম থেকেই আহরিত (Derived) হয়। এই ধারণা পরবর্তীতে কার্ল মার্ক্সের দর্শনেও পরিলক্ষিত হয়।
তিনি দেখিয়েছেন যে, সমাজে যখন শ্রমবিভাজন ঘটে এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বিশেষায়িত কাজের মাধ্যমে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা গড়ে তোলে, তখন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং সমাজ উন্নত হয়। এই ধারণাটি পরবর্তীতে অ্যাডাম স্মিথ তাঁর ‘শ্রমবিভাজন’ তত্ত্বে প্রতিফলন ঘটান। স্মিথ দেখিয়েছিলেন যে, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং শ্রমবিভাজনের ফলে পারস্পরিক আন্তঃনির্ভরতা তৈরি হয়, যা বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে। যখন কেউ তার প্রয়োজনের চেয়ে বেশি উৎপাদন করে, তখন সেই অতিরিক্ত পণ্য বাজারে বিক্রি হয় এবং সমাজে ‘উদ্বৃত্ত’ তৈরি হয়—যা সমাজ উন্নয়নের চালিকাশক্তি। এই অতিরিক্ত উৎপাদন বাজারের ঘাটতি পূরণ করে এবং ভোগের ভারসাম্য রক্ষা করে।
কর ব্যবস্থা ও ল্যাফার কার্ভ (Laffer Curve)
ইবনে খালদুনের মতে, উচ্চ করহার মানুষের শ্রমের স্পৃহা নষ্ট করে দেয়, ফলে উৎপাদনশীলতা কমে যায়। তাই তিনি সরকারের কর কমিয়ে ফেলার পক্ষে মত দেন। মানুষ মূলত মুনাফা বৃদ্ধির জন্যই উৎপাদন করে। করহার কম থাকলে তাদের লাভের পরিমাণ বেশি থাকে, ফলে তারা উৎপাদন কাজে নিজেকে আরও বেশি নিয়োজিত করে। এই ধারণাটি পরবর্তীতে ‘মানুষ যুক্তিবাদী’ (Human beings are rational) তত্ত্বে রূপ নেয়। অ্যাডাম স্মিথও যুক্তি দিয়েছিলেন যে, মানুষকে তাদের ইচ্ছামতো পণ্য উৎপাদন ও বিনিময়ের স্বাধীনতা (মুক্ত বাণিজ্য) দিলে এবং দেশীয় ও বিদেশী প্রতিযোগিতার জন্য বাজার উন্মুক্ত (Open Market) রাখলে, মানুষের স্বাভাবিক স্বার্থই সমৃদ্ধি বয়ে আনবে। স্মিথ বিশ্বাস করতেন, মানুষ যখন তার ব্যক্তিগত স্বার্থ পূরণ করে, তা চূড়ান্তভাবে সমাজের সামগ্রিক জনস্বার্থকেই উৎসাহিত করে।
ইবনে খালদুনের ‘নিম্ন করহার উৎপাদনশীলতা বাড়ায় ও ব্যয় কমায়’—এই তত্ত্বটিই আধুনিক অর্থনীতিতে ‘ল্যাফার কার্ভ’ (Laffer Curve)-এ দেখা যায়। ইবনে খালদুন যখন অর্থনীতির এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অর্থনীতির চর্চা শুরু হয়নি। তিনি রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন দায়িত্ব পালন এবং ক্ষমতার উত্থান-পতনের সাক্ষী হিসেবে উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বিচরণ করেছিলেন। সেই লব্ধ অভিজ্ঞতার এক অপূর্ব সমন্বয় তিনি ঘটিয়েছেন ‘আল-মুকাদ্দিমা’য়।
বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ শৃঙ্খল
তাঁর মতে, পণ্যের অন্যায্য মূল্যের দ্বারা বাজার নষ্ট করা হয়। যদি কোনো পণ্যের মূল্য স্থায়ীভাবে খুব সস্তা হয়ে যায়, তবে উৎপাদনকারীর অবস্থা বিপর্যস্ত হয়। ফলে পণ্য উৎপাদন ও সংশ্লিষ্ট কাজে জড়িত সকলের মধ্যে অনীহা তৈরি হয়। তারা তখন আর মুনাফা বা পুঁজি বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখে না। এভাবে পেশাজীবীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দারিদ্র্যের সম্মুখীন হয়। এই প্রক্রিয়ায় উৎপাদন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত পণ্য প্রস্তুতকরণ—পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইনে (Supply Chain) যারা জড়িত, সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে, যাদেরকে (যেমন সামরিক সদস্য) শস্য বা পণ্যের মাধ্যমে বেতন প্রদান করা হয়, পণ্যের দাম কমে গেলে তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার পণ্যের মূল্য স্থায়ীভাবে কমে গেলে সমাজে সেই পণ্যের সংকট দেখা দেয়, কারণ কেউ আর তা উৎপাদন করতে চায় না।
স্থানভেদে একই পণ্যের ভিন্ন ভিন্ন দাম হতে পারে। যে বাজারে পণ্যের দাম কম, সেই বাজারের বিক্রেতারা বেশি দামের আশায় অন্য বাজারে পণ্য নিয়ে যায়। ইবনে খালদুনের এই আলোচনা আধুনিক সাপ্লাই চেইন ও আরবিট্রেজ (Arbitrage) ধারণাকে সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করে। তিনি পণ্যের যথার্থ মূল্য পাওয়ার জন্য অন্য বাজারে পণ্য বাজারজাত করার পরামর্শ দেন। পণ্যের দাম কমে গেলে উৎপাদনকারীরা যখন অন্য বাজারে চলে যায়, তখন নিজ বাজারে পণ্যের সংকট দেখা দেয় এবং দাম বেড়ে যায়। এটি অনেকটা অ্যাডাম স্মিথের ‘অদৃশ্য হাত’ (Invisible Hand) বা বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মতোই কাজ করে। তবে ইবনে খালদুনের মতে, যেসব পণ্য মানুষের জন্য অত্যাবশ্যক (যেমন খাদ্যদ্রব্য), সেগুলোর মূল্য কম থাকাই সকলের জন্য মঙ্গলজনক।
রাষ্ট্রের ভূমিকা ও করনীতি
মুনাফাবৃদ্ধিকে তিনি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি কর বা ট্যাক্স স্বল্প রাখার পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, উচ্চ কর উৎপাদনশীলতার পথে বাধা সৃষ্টি করে এবং ব্যবসায় মুনাফা হ্রাস করে। ফলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয় না। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্র অনেক সময় বিলাসিতা বা উচ্চাভিলাষের কারণে উচ্চ কর ধার্য করে, যার বোঝা জনগণকে বহন করতে হয়। কর যত বেশি হবে, সরকারের ব্যয়ও তত বাড়বে। ফলে সরকারের মধ্যে অধিক রাজস্ব আদায়ের প্রবণতা দেখা দেবে, যা মানুষের আয় কমাবে এবং বেকারত্ব বাড়াবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, অবকাঠামো নির্মাণ এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। কারণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ধ্বংস করে। রাষ্ট্র যখন ক্রেতার ভূমিকা পালন করে, তখন দেশে উন্নয়নমূলক কাজ বাড়ে, উৎপাদন প্রক্রিয়া গতিশীল হয় এবং বাজারে স্থিতিশীলতা আসে। অন্যদিকে সরকার কেনাকাটা বন্ধ করে দিলে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়।
আয় ও সম্পদের সংজ্ঞায়ন
মানুষ স্বভাবতই তার জীবনে এমন বিষয়বস্তুর মুখাপেক্ষী হয় যা তার প্রয়োজন মেটায়। মূলত আল্লাহ মানুষের জন্যই পৃথিবীর সব কিছু সৃষ্টি করেছেন—”আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে আমি তোমাদের জন্য বশীভূত করে দিয়েছি।” আল্লাহ মানুষের জন্য চন্দ্র-সূর্য, সাগর, নৌযান এবং জীবকুলসহ অনেক কিছুকে বশীভূত করেছেন। মানুষের উপায় অবলম্বন ও জীবিকা উপার্জনের জন্যই তিনি এসব নিয়ামত দান করেছেন। আল্লাহ বলেন, “তোমরা আল্লাহর কাছে খাদ্য অন্বেষণ করো” (২৯:২৭)।
অর্থনীতিবিদরা উপার্জনকে আয়ের প্রবাহ (Flow of Income) বলেছেন, যা বেতন, মজুরি বা মুনাফা হিসেবে একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর আসে এবং মানুষ তা প্রাত্যহিক জীবিকা নির্বাহে খরচ করে। অন্যদিকে সম্পদ (Wealth/Stock) বলতে উপার্জনের সেই অংশকে বোঝায় যা মানুষ খরচ না করে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করে। আয় ও সম্পদের মধ্যে একটি চক্রাকার সম্পর্ক বিদ্যমান। ব্যয়ের অতিরিক্ত আয়ই সম্পদ, আবার সম্পদ নিজেই আয় উপার্জনে ব্যবহৃত হতে পারে।
ইবনে খালদুন বলেন, মানুষের প্রচেষ্টার দ্বারা উপার্জিত সামগ্রী যদি তার প্রয়োজন ও অভাব পূরণের পরিমাণ অনুযায়ী হয়, তবে তাকে বলা হয় ‘জীবিকা’ (রিজিক); তা থেকে বেশি হলে তাকে ‘বিলাসী পণ্য’ বা ‘পুঁজি’ বলা হয়। যখন সেই অর্জিত বস্তু ব্যক্তিকে পুনরায় উপকৃত করে বা ভবিষ্যতে সুবিধা দেয়, তখন তাকে ‘সম্পদ’ (Wealth) বলা হয়। রাসুল (সা.)-এর একটি হাদিসে বলা হয়েছে, “তোমার সম্পদের ঐ অংশই তোমার, যা তুমি খেয়ে শেষ করেছ, পরিধান করে জীর্ণ করেছ এবং দান করেছ।” যদি ঐসব সামগ্রী ব্যক্তির অভাব পূরণে কাজে না আসে, তবে ইবনে খালদুনের মতে তা সম্পদ নয়, কেবলই অর্জন (Acquisition)। উপার্জনের জন্য ইচ্ছা ও প্রচেষ্টা থাকতে হবে। সম্পদের জন্যও শ্রম নিয়োগের প্রয়োজন হয়। সম্পদ সঞ্চয় করতে করতে এমন পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব, যেখানে আয় উপার্জন করতে আর শ্রমের প্রয়োজন হয় না; অর্জিত সম্পদ নিজেই আয় উপার্জন করে।
ইবনে খালদুন সম্পদ বলতে সেইসব উপকরণকে বুঝিয়েছেন যা কল্যাণ নিশ্চিত করে। অবৈধ বা অকল্যাণকর পথে অর্জিত কিছুকে তিনি সম্পদ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেননি, যদিও তাতে শ্রম ব্যয়িত হয়। এখানেই বর্তমান সেক্যুলার অর্থনীতিবিদদের সাথে ইবনে খালদুনের দ্বিমত। ইসলাম অর্থনীতিকে সংজ্ঞায়িত করে কল্যাণকে (Falah) সামনে রেখে। যখন শ্রম বিলুপ্ত হয়, তখন আল্লাহও উপার্জনের দ্বার রুদ্ধ করে দেন। শ্রমের ধরন বদলাতে পারে, কিন্তু জীবিকার জন্য মানুষকে শ্রম নিয়োগ করতেই হবে। কারণ আল্লাহ নিজেই কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের মতো উপায়-উপকরণ অবলম্বন করে জীবিকা উপার্জন করতে বলেছেন।
চাকরি বনাম ব্যবসা
চাকরিকে ইবনে খালদুন ‘স্বাভাবিক জীবিকা’ নয় বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, শাসক তার বিভাগগুলো পরিচালনা করার জন্য জনবল নিয়োগ দেয়। এসব চাকরির সবটুকুই শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর অংশ। এই পদধারীরা শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা ভোগ করে, কারণ শাসক নিজেই তাদের শক্তির উৎস।
ইবনে খালদুনের মতে, অধিকাংশ ধনাঢ্য ব্যক্তি নিজ হাতে কাজ করতে ঘৃণা করে অথবা তারা তা করার যোগ্যতা রাখে না। কারণ প্রাচুর্য ও বিলাসের মধ্যে বড় হওয়ায় তারা কর্মক্ষমতা হারিয়েছে। তাই তারা অন্যকে নিয়োগ দেয় এবং সম্পদ থেকে তার পারিশ্রমিক দেয়। কিন্তু মানুষের স্বাভাবিক পৌরুষের জন্য এ অবস্থা প্রশংসনীয় নয়। কারণ, অন্যের ওপর নির্ভর করা এক প্রকার অক্ষমতা। এটি একদিকে যেমন ব্যয় বৃদ্ধি করে, অন্যদিকে পরনির্ভরশীলতার দিকে ইঙ্গিত করে।
তদুপরি, যোগ্য ও বিশ্বস্ত চাকর পাওয়া কঠিন। চাকর বা কর্মচারী সাধারণত চার প্রকার হতে পারে। হয় সে দক্ষ ও বিশ্বস্ত; নয়ত এর বিপরীত। অথবা সে দক্ষ কিন্তু বিশ্বস্ত নয়; কিংবা বিশ্বস্ত কিন্তু দক্ষ নয়। এর মধ্যে যে দক্ষ ও বিশ্বস্ত, তাকে সাধারণ অবস্থায় পাওয়া কঠিন। কারণ সে তার যোগ্যতার কারণে সাধারণ সাহচর্যকে হেয় জ্ঞান করবে এবং নিজের জন্য বেশি মূল্য বা মর্যাদা দাবি করবে। সুতরাং, যারা বিশাল জাঁকজমকের অধিকারী, তেমন আমির-উমরাহগণ ছাড়া অন্য কেউ তাকে প্রতিপালন করতে সক্ষম হবে না।
ইবনে খালদুন মূলত ব্যবসার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। অন্যের অধীনে কাজ করলে আত্মসম্মানে আঘাত লাগতে পারে বা মানুষকে পরমুখাপেক্ষী করে দিতে পারে। তিনি স্বাধীন ব্যবসার প্রতি জোর দিয়েছেন। কারণ আল্লাহ মানুষের রিজিকের অধিকাংশ (দশ ভাগের নয় ভাগ) রেখেছেন ব্যবসায় এবং তাতে বরকত দিয়েছেন। সামাজিক আয় ও সম্পদ বৃদ্ধিতে ব্যবসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি মাটির নিচে প্রোথিত গুপ্তধন বা সম্পদ লাভের চিন্তাকে স্বাভাবিক জীবিকা নয় বলে মত দিয়েছেন। কারণ, গচ্ছিত সম্পদ মানুষকে পরিশ্রমবিমুখ ও অলস করে দেয়।
পদমর্যাদা ও সম্পদের সম্পর্ক
খালদুন বলেন, আমরা পদমর্যাদাহীন সম্পদশালী ব্যক্তির চেয়ে পদমর্যাদার অধিকারী ব্যক্তিদের জীবনে বেশি সচ্ছলতা ও প্রতিপত্তি দেখতে পাই। কারণ, পদমর্যাদার অধিকারী ব্যক্তিকে মানুষ মান্য করে এবং তার নৈকট্য লাভের আশায় শ্রম দিতে কুণ্ঠিত হয় না। ফলে মানুষের শ্রমের ফসল পদমর্যাদা অধিকারী ব্যক্তির উপার্জন হিসেবে গণ্য হয়। যেসব কাজ সাধারণত অর্থের বিনিময়ে করাতে হয়, পদমর্যাদাবান ব্যক্তিরা তা অনেক সময় বিনা মজুরিতেই পান। এভাবে পরিশ্রমলব্ধ অর্থ ও ব্যয়ের মধ্যে একটি উদ্বৃত্ত বা Surplus তৈরি হয়, যা তাদের সম্পদ ও ঐশ্বর্য বাড়িয়ে দেয়। ইবনে খালদুনের মতে, পদমর্যাদা বা ‘জাহ’ (Jah) হলো এমন এক শক্তি, যা মানুষকে অন্যদের নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা দেয়।
অন্যদিকে, পদমর্যাদাহীন ব্যক্তি যদি সম্পদশালীও হন, তবুও তার সচ্ছলতা হয় তার নিজস্ব পরিশ্রমের অনুপাতে। অধিকাংশ সাধারণ ব্যবসায়ী এই পর্যায়ের। এজন্যই দেখা যায়, পদমর্যাদার অধিকারীরা ব্যবসায়ীদের চেয়ে বেশি সচ্ছল। অনেক ধর্মশাস্ত্রবিদ বা সাধু ব্যক্তিকে দেখা যায়, যাদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ার পর মানুষ তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। ফলে দ্রুতই তাদের সচ্ছলতা বাড়ে। মানুষ তাদের জন্য কাজ করে দিচ্ছে, অথচ তারা হয়তো ঘরে বসেই আছেন। যারা অর্থনীতির এই গূঢ় রহস্য বোঝেন না, তারা এদের প্রাচুর্য দেখে বিস্মিত হন।
পদমর্যাদা যেহেতু ঊর্ধ্বতন কর্তৃক অধস্তনদের মধ্যে বণ্টিত হয়, তাই সৌভাগ্যের প্রত্যাশীরা তোষামোদ করার প্রয়োজন অনুভব করে। এভাবেই মানুষ অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে এবং ব্যক্তিত্ব লোপ পায়। কিন্তু জ্ঞানীরা তোষামোদকে অপমান ও নির্বুদ্ধিতা মনে করেন এবং চাটুকারিতা থেকে নিজেকে বিরত রাখেন।
তথ্যঋণ
১. আল মুকাদ্দিমা - ইবনে খালদুন; অনুবাদ: গোলাম সামদানী কোরায়াশী।
২. Ibn Khaldun’s Theory Of Taxation and Its Relevance (Abdul Azim Islahi) - Turkish Journal of Islamic Economics, Vol. 2, No. 2, August 2015, pp. 1-19.