বাউল সম্প্রদায় ও মুসলমান সমাজের দ্বৈরথ : চলতি পাঠের প্রতি-পাঠ | ইসমাইল হোসেন শেখ
ধর্ম ও শিল্প নিয়ে সাধারণ মানুষের চিন্তাধারা ও বোঝাপড়াকে মধ্যযুগীয় ও উগ্র বলে সাব্যস্ত করার প্রবণতা বাংলাদেশের মূলধারার বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী ও রাজনীতিবিদদের মাঝে বিদ্যমান আছে। সাধারণ মানুষের কাণ্ডজ্ঞান নিয়ে তাঁদের এই অভিযোগটি সম্প্রতি ফের প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে বাউল আবুল হোসেন সরকারের গ্রেপ্তারের পর। এই প্রেক্ষিতে তারা গণপরিসরে সাধারণ মানুষের কাণ্ডজ্ঞানের চর্চা ও প্রয়োগকে অতিসরলায়িত করে ব্যাখ্যা করছেন। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপারটিকে ‘ধর্মীয় জাতিবাদ’ (মৌলবাদ) বনাম ‘লোকায়ত দর্শন’ (বাউল) দ্বন্দ্ব হিসেবে দাঁড় করানোর একটি জোর প্রচেষ্টাও লক্ষ করা যাচ্ছে।১ অথচ মূল সমস্যাটি অত্যন্ত জটিল, বহুস্তরবিশিষ্ট এবং দীর্ঘদিনের পুরোনো।
সমস্যাটির বয়স অনেক হলেও হঠাৎ কেন তা নতুন এক ঘটনা হিসেবে সমাজে হাজির হয়েছে, তার একটি সম্ভাব্য সূত্র পাওয়া যেতে পারে সাম্প্রতিক সময়ের একটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে। কিছুদিন আগেই লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসকে জাতীয়ভাবে ‘ক’ শ্রেণীভুক্ত দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত থেকে মোটাদাগে তিনটি অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব। প্রথমত, লালন সাঁই তথা ফকির-বাউলদের লোকায়ত জীবনাচরণ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের জন্য একটি জাতীয় সাংস্কৃতিক পরিচয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।২ দ্বিতীয়ত, তাদের গান তথা সংস্কৃতি গণসম্মতি উৎপাদনের একটি কলে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তৃতীয়ত, সমাজের প্রান্তিক একটি সম্প্রদায়ের জীবনাচরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পরিচয়ে, শিল্পের মোড়কে হাজির হয়েছে। অনুসিদ্ধান্তগুলো প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রের সাথে সমাজের স্বাভাবিক বোঝাপড়ার মাঝে সৃষ্ট একটি সার্বিক সামাজিক সংকটের নির্দেশক। তাই যেকোনো একটি অনুসিদ্ধান্তের সূত্রে কোনো আলোচনা বিশদ করলে, অবধারিত রূপে অন্য দু’টিও সামনে চলে আসবে।
সংকট সন্ধানের জন্য মোক্ষম চাবিকাঠি হতে পারে তৃতীয় অনুসিদ্ধান্তটি-প্রতিষ্ঠিত শিল্প সংক্রান্ত বোঝাপড়ার সাথে বাউলদের শিল্পবোধের দূরত্ব। বাউলগানের শিল্পচেতনাকে ঠিক কোথায় স্থাপন করা যেতে পারে, তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বরাতে নির্ধারণ করা সম্ভব। তিনি তৎকালীন বাউলগানের শিল্পমূল্য বিচার করতে গিয়ে জানাচ্ছেন :
অধিকাংশ আধুনিক বাউলের গানের অমূল্যতা চলে গেছে, তা চলতি হাটের শস্তা দামের জিনিস হয়ে পথে পথে বিকোচ্চে। তা অনেক স্থলে বাঁধি বোলের পুনরাবৃত্তি এবং হাস্যকর উপমা তুলনার দ্বারা আকীর্ণ—তার অনেকগুলোই মৃত্যুভয়ের শাসনে মানুষকে বৈরাগীদলে টানবার প্রচারকগিরি।৩
একই রচনায় তিনি বাউলকে ‘অপন্ডিত’ এবং তার সুরকে ‘গেঁয়ো’ বলে চিহ্নিত করে পরবর্তীতে বলেছেন-‘তবু তার ঐতিহাসিক মূল্য আছে। অর্থাৎ, এর থেকে স্বদেশের চিত্তের একটা ঐতিহাসিক পরিচয় পাওয়া যায়’। উপরন্তু ইতিহাসের যে প্রেক্ষাপটে এই পরিচয় তৈরি হচ্ছে, তাও তিনি নির্ণয় করেছেন। তাঁর মতে, সেটি তৈরি হয়েছে ভারতবর্ষে ‘মুসলমান অভ্যাগমের আঘাতে’—তৎকালীন প্রতিষ্ঠিত মতবাদ অনুসারে যে সময় হতে বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ বা মধ্যযুগের শুরুয়াত।
ঐ প্রবন্ধে তিনি বাউলগানের আরও একটি বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেছেন-সমন্বয়বাদী প্রকল্প। তিনি বলেছেন-‘এই গানের ভাষায় ও সুরে হিন্দু মুসলমানের কন্ঠ মিলেচে, কোরান পুরাণে ঝগড়া বাঁধেনি’। রবীন্দ্রনাথ কথিত এই মিলন কি, তার দু’টি নমুনা পেশ করি :
০১
কাশী কি মক্কায় যাবি রে মন, চল রে যাই।
দোটানাতে ঘুরলে পথে সন্ধ্যে বেলায় উপায় নাই।।
০২
কেউ মালা, কেউ তছবি গলায়,
তাইতে কি জাত ভিন্ন বলায়...
এই সমন্বয়বাদী প্রকল্প, বলার অপেক্ষা রাখে না, তৎকালীন সমাজে চলমান সংকটের প্রতিক্রিয়ামাত্র। যে সংকটের সমাধান হিসেবে এই প্রকল্প হাজির হয়েছে, তার আলামত কেবল বাউলগানেই এসেছে—এমন নয়; মধ্যযুগের কবিগানে, কাব্যে ধর্মবিষয়ক প্রশ্নের অজস্র নমুনা হাজির আছে। মুসলমান কবিরা যেমন আত্মপক্ষ সমর্থনে অপরপক্ষ নিয়ে প্রশ্ন করেছেন, সনাতন ধর্মাবলম্বী কবিরাও একই প্রশ্ন করেছেন এবং সেটা সনাতন ধর্মের পক্ষ সমর্থনে। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের অন্নদামঙ্গল। সুতরাং, আজকে বাউলদের গানে ও ভনিতায় খোদা বিষয়ক যে প্রশ্নগুলো আসে, তা মূলত সমাজের সমস্যা সম্পর্কে তাঁদের পাড় মধ্যযুগীয় বোঝাপড়ার ফলাফল হিসেবেই হাজির হয়। কেন ধর্ম বিষয়ে সমাজের সাথে তাদের বোঝাপড়া মধ্যযুগে থেকে গেছে, তা হয়তো ভিন্ন একটি আলোচনার বিষয় হতে পারে।
এই বিন্দুতে এসে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘আধুনিক বাউল’ হিসেবে যাদের বর্গায়িত করেছেন, তাদেরকে শনাক্ত না করেই এগিয়ে গেলে তাঁর প্রতি কিঞ্চিৎ অবিচার করা হবে। তিনি রচনাটির শুরুতে জানাচ্ছেন-‘আমার মনে আছে, তখন আমার নবীন বয়স—শিলাইদহ অঞ্চলেরই এক বাউল কলকাতায় একতারা বাজিয়ে গেয়েছিল’। রবীন্দ্রনাথের সূত্রে দু’টি উপসংহারে পৌঁছানো যায়। প্রথমত, বাউলদের একটি দল তখন তৈরি হয়ে গিয়েছে, যাদের সমাজের অভ্যন্তরে, এমনকি কলকাতার মত শহরেও যাতায়াত ছিল। সে সময় তারা জমিদার তথা সমাজের বিত্তশালী শ্রেণীর প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতাও পেত। দ্বিতীয়ত, রবীন্দ্রনাথের এই ‘আধুনিক বাউল’ মূলত পেশাদার বাউল গায়কগোষ্ঠী-অন্য কথায়, ভবঘুরে গায়ক৪- যারা পথে পথে ঘুরে ঘুরে গান গাইত অর্থের বিনিময়ে।
সমাজের সাথে বাউলদের এই লেনদেন ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছে, তা হয়ত আরও তথ্য-উপাত্ত, দলিল-দস্তাবেজের সাহায্য ছাড়া নির্ধারণ করা অসম্ভব। কিন্তু এখানে আমরা রবীন্দ্রনাথের ভাষ্যে এতটুকু নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, বিগত অন্তত দেড় শতাধিক বৎসর আগেও সমাজের বিত্তশালী শ্রেণির সাথে পেশাদার বাউলদের একটি বিনিময়ের সম্পর্ক জারি ছিল। যে ক্ষমতাবলয়ের নিকট থেকে এতকাল সে আনুকূল্য লাভ করেছে, এখনো করে, নিশ্চয় তাকে অস্বস্তিকর প্রশ্ন করে চটানোর অর্থ হয় না। ফলে আমরা তাদের গানে জমিদার শ্রেণীকে আক্রমণ বা নূন্যতম সম্বোধন করে লেখা কোনো শব্দেরও আলামত পাই না। একটা নীল বিদ্রোহ গেছে, ৫৭’র স্বাধীনতা সংগ্রাম গেছে-এতসব রাজনৈতিক ঘনঘটায় ন্যূনতম প্রতিক্রিয়ার হদিস বাউল গানে পাওয়া যায় না। এই সমস্যাটি আরও বিশদে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে, যদি আমরা লালনের আঁখড়ায় আশ্রয় গ্রহণের পরবর্তী কাঙাল হরিনাথের গানসমূহ বিবেচনা করি।
অনেকে তাদের পক্ষে সাফাই গেয়ে দাবি করতে পারে, তৎকালীন সময়ে কেবল দেহ ব্যতীত সবকিছুর উপনিবেশায়ন ঘটে গিয়েছিল। এ কারণে বাউলদের পক্ষে দেহতত্ত্ব ব্যতীত আর কোনো কিছুর চর্চা সম্ভবপর ছিল না। কিন্তু এই দাবি অসার, কারণ বাউলরা দেহের বাইরে ঐ সময়ের সমাজকেও সম্বোধন করেছিল। জাত-পাত নির্ভর সমাজকে টিটকারি মেরে গান বাধা ও গাওয়া তাদের সাহসেরই প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু এই সাহসের চরিত্র কি? যে সমাজের জাত-পাতকে তারা তাচ্ছিল্য করতে পেরেছে, তার চূড়ান্ত ক্ষমতাবলয়কে নাম ধরেও ডাকতে পারেনি কেন?
সময়ের ফেরে সমাজের বিবর্তন ঘটেছে, উপনিবেশ পেরিয়ে জাতিরাষ্ট্র কায়েম হয়েছে। সেই রাষ্ট্রের শেকড় সমাজের আবরণ ভেদ করে মানুষের শরীর অবধি পৌঁছে গেছে, কিন্তু এই দীর্ঘ সফরের ছাপ বাউলদের জ্ঞানকাঠামো বা তত্ত্বচর্চায় বিন্দুমাত্র প্রতিফলিত হয়নি। দেখা যাচ্ছে, ‘উপনিবেশবিযুক্ত দেহ’ শীর্ষক তত্ত্ব দিয়ে বাউলদের রাজনৈতিক উন্নাসিকতা ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। বিষয়টি অত সরল নয়, বরং জটিলতর। হারামণি গ্রন্থের সম্পাদক মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন বাউলদের ব্যাপারে জানাচ্ছেন :
যখন নতুন দুই দল এক স্থানে সমাগত হয়, তখন তাহারা নিজেদের দলের গুরুকে বড় প্রমাণ করিবার জন্য গানের উপরে পরস্পর পরস্পরের প্রতি দুর্ব্বোধ্য প্রশ্ন ও হিঁয়ালীচ্ছলে আক্রমণ করে। যাহারা ঐ গানের জওয়াব দিতে পারে, তাহাদের সঙ্গে আবার গানের পাল্লা হয়।
দেখা যাচ্ছে, বাউলদের জ্ঞানকাঠামো তাদের নিজেদেরই বিভিন্ন গোষ্ঠীর মাঝে বিদ্যমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ প্রভাবশালী ধর্মমত ও ঐতিহ্যের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তো ছিলই। প্রভাবশালী ধর্মমতের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজেকে টিকিয়ে রাখা বা তার সাথে সুরাহায় পৌঁছানোর জন্য ক্ষমতাবলয়ের শরণাপন্ন হওয়া ব্যতীত এই পেশাদার গায়কগোষ্ঠীর কাছে আর কোনো পথ ছিল কি? ফলে ঐতিহাসিকভাবে তাদের চর্চার সীমানা নির্ধারণ করতে হয়েছে কেন্দ্রস্থিত রাজনীতি ও ক্ষমতা থেকে দূরবর্তী অঞ্চলে, স্থানীয় ক্ষমতার ছায়ায় ও আনুকূল্যে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখি, ক্ষমতার সাথে তাদের এই সম্পর্ক সময়ের পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতা যে মতাদর্শ ধারণ করে, তারা নিজেরা কি একই মতাদর্শ ধারণ করে? বিশেষত যখন তারা সেই ক্ষমতাবলয়ের সাহচর্যে অবস্থান করে? অনেকে প্রশ্নটি ঘুরিয়ে এমন ভাবে করতে চান, যেখানে বিনিময়ের বিষয়টি একপাক্ষিক হিসেবে হাজির হয়। যেমন ফরহাদ মজহার বলেন :
রাজনৈতিক দলগুলোও বাউলদের ওপর ভর করে। এটা সত্য, আবুল সরকারসহ অধিকাংশ বাউলই কমবেশি আওয়ামী লীগপন্থি। কারণ ধর্মান্ধ গোষ্ঠী সবসময়ই বাউলদের বিরোধিতা করেছে। যতদিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল, ততদিন তারা বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে…। তিনি আওয়ামী লীগের পক্ষ হয়ে নৌকার জন্য ডাক দিচ্ছিলেন।৫
পূর্বতন ধারাবাহিকতায় বর্তমান পরিস্থিতে যাদের ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, পেশাদার বাউলরা তাদের সভাতেও মনোরঞ্জন করতে যাচ্ছেন। আবুল সরকার নিজেও সম্প্রতি প্রকাশ্যে ধানের শীষে ভোট চেয়েছেন। অতএব এতখানি নিশ্চিন্তে বলা যায় যে, কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস আছে বলেই যে বাউলরা রাজনৈতিক সভায় হাজিরা দেন—এমন নয়। বরং, সেখানে ক্ষমতাবলয়ের উপকেন্দ্র দেখা দিয়েছে বলেই তারা সেখানে যান। সম্পর্কটিকে যতটা একপেশেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তেমন একমুখী সম্পর্ক দেড় শতাধিক বৎসর যাবৎ টিকে থাকা সম্ভব নয়। পেশাদার বাউলদের তরফ থেকে দেখলে, উপনিবেশ আমলের বিত্তশালী শ্রেণীদের প্রতিস্থাপন করেছে আধুনিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দল ও তার স্থানীয় নেতৃত্ব। একারণে পেশাদার বাউলদের গানে যেমন উপনিবেশ আমলের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের আলামত নেই, বর্তমান সময়েও তার গন্তব্য ক্ষমতার পক্ষে। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্র যখন নড়বড়ে হয়ে যায়, সাধারণ মানুষের ভেতর ক্ষমতাশালী শ্রেণীর প্রতি একটি বৈধ ক্ষোভের জন্ম হয়, তাদের মধ্যে কোনো হেলদোল দেখা যায় না। উল্টো তারা নতুন ক্ষমতাবলয়ের অনুকম্পা প্রার্থনা করে এবং যথারীতি ক্ষমতার বদলে জাত-পাত ও আল্লাহ-রাসূল মোকাবেলায় মন দেয়। সাধারণ মানুষ পেশাদার বাউলদের এই অযাচিত বিপ্লব ভালোভাবে নেয় না, ক্ষমতার সাথে তাদের আঁতাতকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আর ঠিক তখনই সেটাকে বাউলবিরোধিতা বলে শনাক্ত করা হয়, জনতাকে দেওয়া হয় ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীর তকমা।
পেশাদার বাউলদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথ আরও জানাচ্ছেন-‘যেসব বাউলের গান যেখানে-সেখানে পাওয়া যায়, কি সাধনার কি সাহিত্যের দিক থেকে তার দাম বেশী নয়’। এখানে পেশাদার বাউলের আরও একটি বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা যায়-তাদের গানে সাধনার আলামত খুবই কম। অর্থাৎ, জ্ঞানকাঠামোর উপর এই বাউলদের তেমন দখল নেই, তন্ত্রের চর্চাও তাদের মূল উদ্দেশ্য নয়। এর বিপরীতে নিশ্চয়ই আরও একটি শ্রেণী থাকতে হবে, যাদের গান যেখানে-সেখানে পাওয়া যায় না। তাদের খ্যাতি কম, কিন্তু চিন্তা ও চর্চায় সাধনার দিকটি বেশি। এই শ্রেণীর বৈশিষ্ট্য কি হতে পারে? অবশ্যই তারা পথে পথে ঘুরে গান করেন না, তাদের পৃষ্ঠপোষক নেই এবং সমাজের অভ্যন্তরে তাদের যাতায়াত সীমিত। তন্ত্রের চর্চা বা ফকিরিই তাদের মূল উদ্দেশ্য; ক্ষমতাবলয়ের সাথে তাদের তেমন কোনো লেনদেন পূর্বকালে ছিল না, এখনো নেই।
বিত্তশালী শ্রেণীর সমালোচনা করা ফকিরদের জন্য অবশ্য একেবারেই পরিণামহীন একটা কাজ। কারণ, ক্ষমতা-বিরোধিতা তন্ত্র সাধনায় কতটাই-বা অবদান রাখতে পারে! ক্ষমতাবলয়ের সমালোচনা বা কোনো ধরনের রাজনৈতিক চর্চা সাধকদের মাঝে আদৌ কোনোকালে ছিল কিনা, তা জানার একমাত্র উপায় তাদের প্রতিনিধিদল। অর্থাৎ, ঐ গায়কগোষ্ঠী যারা ঘুরে ঘুরে গান করত। কিন্তু পেশাদার বাউলদের সামগ্রিক গায়ন-ঐতিহ্যে তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। যদি ফকিরদের মধ্যে কেও ক্ষমতা-বিরোধী থেকেও থাকেন, পেশাদার বাউলগোষ্ঠী ক্ষমতাবলয়ের আনুকূল্য হারাবে বলে প্রান্ত থেকে তা কেন্দ্র অবধি বয়ে আনেনি। অন্তত পেশাদার বাউলদের কাজকর্মে সেই রাজনীতি সচেতনতার কোনো প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না।
এখানে আরও একটি ব্যাপার বিবেচনায় আনা জরুরি। বাউল নিজেকে সমাজের কোথায় স্থাপন করে? অন্য কথায়, সে কাকে অপর বা শত্রু ভাবে? লালনের জনপ্রিয় গানে তার হদিস নেওয়া যাক :
সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে।
লালন কয়, জাতের কী রূপ, দেখলাম না এ নজরে।।
দেখা যাচ্ছে, ‘সব লোক’ তথা গোটা সমাজই তাঁর অপর। একটু স্পষ্ট করে বললে, সে নিজেকে সমাজের বাইরে বা প্রান্তে স্থাপন করেছে। অবশ্য এটা নতুন কোনো তথ্য নয়, এই দাবির পক্ষে অসংখ্য লেখাজোঁকা ও গবেষণা আছে। আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, লালন তাঁর জীবনাচরণের অনুষঙ্গকে কোথাও গান তথা শিল্প বলে দাবি করেন না, বরং বরাবরই সাধনা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কখনো বলেন—‘ও, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। কখনো-বা বলেন :
কিরূপ সাধনের বলে অধরা ধরা যায়।
নিগূঢ় সন্ধান জেনে শুনে সাধন করতে হয়।।
লালন গবেষকগণও সাধন-ভজনসহ নানান সংজ্ঞা দিয়ে তাঁর চর্চাকে চিহ্নিত করার প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু যখন এই চর্চাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করা হচ্ছে, তখন সেটাকে শিল্প হিসেবেই পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। দেখা যাচ্ছে, এখানে প্রথম অনুসিদ্ধান্তেরই আংশিক পুনরুক্তি ঘটে গিয়েছে। একে পূর্ণ করে বিগত কয়েক নোক্তার সাথে সমন্বয় করে দেখলে দু’টি সংকট শনাক্ত করা যায়-এক. একটি আধুনিক সমাজের উপর অপেক্ষাকৃত পশ্চাৎপদ বিচারকাঠামো তথা মধ্যযুগীয় বোঝাপড়াকে শিল্প হিসেবে আরোপ করা হচ্ছে এবং দুই. একটি প্রান্তীয় সম্প্রদায়ের জীবনাচরণের অনুষঙ্গ গোটা সমাজের সাংস্কৃতিক পরিচয় হিসেবে আরোপিত হচ্ছে।
এভাবে ক্ষমতা কাঠামো যদি একটি আচারকে জাতীয় সাংস্কৃতিক উপাদান বলে সাব্যস্ত করে এবং সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের উপর তা চাপিয়ে দেয়, তখন তারা আপত্তি তুলতে পারে। মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা কাঠামোর সাথে আধুনিক সমাজের বোঝাপড়ায় ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ কোনো নিরীহ বস্তু নয়। বরং এটি এমন একটি ব্যাপার, যাকে মানুষ সহসাই প্রশ্ন বা অস্বীকার করতে পারবে না। গণমাধ্যম ও শহুরে বানিজ্যিক শিল্পীদলের মাধ্যমে বাউলদের কন্ঠাচারের অনুষঙ্গকে দীর্ঘদিন যাবৎ সমাজের ভেতরে অনুপ্রবেশ করানোর চেষ্টা চালানো হয়েছে। এর মাধ্যমে বাউলদের প্রতিনিধিত্বশীল গায়কগোষ্ঠীও দীর্ঘদিন ধরে শহরের মূলধারার সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্পর্শে থেকেছে, ক্ষমতাবলয়ের সাহচর্য পেয়েছে। তবে এ পর্যায়ে রাষ্ট্র যখন অনুষঙ্গটিকে জাতীয় সম্পদের স্বীকৃতি দিয়ে আত্মসাৎ করেছে, তখন সেটিও ক্ষমতা কাঠামোর একটি অংশে পরিণত হয়েছে। কারণ, রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে তার পৃষ্ঠপোষকতার দায়িত্ব নিয়েছে। এবার সমাজের বৈধ প্রশ্ন-এই পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে সে কার পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করবে? ভুলে গেলে চলবে না, বিবিধ বিরোধের মধ্য দিয়ে সে শত শত বছর যাবৎ প্রান্তে বসবাস করে আসছে এবং বিত্তশালী শ্রেণীর মধ্যস্ততা ব্যতীত সমাজের সাথে কলহ মেটাতে পারেনি।
এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি প্রশ্ন আলোচনা করা জরুরি-ক্ষমতা কাঠামো কেন তাকে স্বীকৃতি দিতে এত আগ্রহী? শিল্পের উপকার করার মতো নিরপরাধ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে সে এই কাজ করছে না। বরং সে জানে, বাউলের জ্ঞানকাঠামো ক্ষমতাকে ঘাটায় না। তাছাড়া এই নিরীহ ও আপোসকামী চর্চা আধুনিক রাষ্ট্রের কোনো কলকব্জাই ভাঙার ক্ষমতা রাখে না। রাষ্ট্র বোঝে, লোকায়ত ফকিরি বা বাউল দর্শন তার যোগ্য প্রতিপক্ষ তো নয়-ই, বরং অনেকাংশে মিত্রই বটে। কারণ, তার তন্ত্রচর্চায় অপরাধ, বিচার, অধিকার—এসব রাজনৈতিক ধারণা প্রায় অনুপস্থিত। তার জ্ঞানকাঠামো গড়ে উঠেছে এমন এক যুগে, যখন সমাজ শাসিত হতো ধর্মীয় চেতনা দিয়ে, সমাজের গতিবিধি মোটাদাগে নির্ধারণ করে দিত ধর্ম সংস্কারকেরা। তাই সে যখন ধর্মবিষয়ক কোনো প্রশ্ন মোকাবেলা করে, সে রীতিমতো ধর্মতত্ত্বের জটিল বিষয় পর্যন্ত নিয়ে নড়াচড়া করতে পারে। কিন্তু বর্তমান জমানায় যখনই রাষ্ট্র বিষয়ক প্রশ্ন সামনে আসে, সে তাতে প্রবেশ করা তো দূরের কথা, দাঁতই বসাতে পারে না। তার জ্ঞানকাঠামোতে না আছে ব্যক্তিমালিকানার ধারণা, না আছে সামাজিক চুক্তির চিহ্ন, না আছে অর্থনৈতিক বোঝাপড়া। ক্ষমতা কাঠামো জানে, প্রশ্ন যতক্ষণ কেবল খোদা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ আছে, ততক্ষণ সে-ও নিরাপদ। সুতরাং, তার উপর দমন নীতি গ্রহণ না করে পৃষ্ঠপোষকতা দান করাই মোক্ষম।
এদিক থেকে বলা যায়, বাউল সম্প্রদায়ের জ্ঞানকাঠামো দিয়ে সমাজের মতো জটিল এবং রাষ্ট্রের মত আধুনিক ধারণার সাথে কোনো বোঝাপড়ায় পৌঁছানো সম্ভব না। সমাজের সাথে তার অনেক পুরানো, অমীমাংসিত বিবাদ রয়ে গেছে; কিন্তু সমাজ ইতোমধ্যে পুরানো কাঠামো ফেলে দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ায় বিবর্তিত হয়েছে। আবার মধ্যযুগে বাউল থাকত সমাজের প্রান্তে, ফলে তাকে সমাজ নিয়ে সেভাবে ভাবতে হয়নি। সমাজ-বিবর্তনের পরিণাম খুব অল্পই তার সাধনা অবধি পৌঁছেছে। তার জ্ঞানকাঠামোও সে এমন করে নির্মাণ করেছে, কারণ সে সমাজের কাছ থেকে খুবই সীমিত সংখ্যক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে-বেশিরভাগই মূলত জাত-পাত সংক্রান্ত প্রশ্ন। কিন্তু এসকল বিবাদের নিষ্পত্তি না করেই যখন সে ক্ষমতা কাঠামোর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে, তখন সমাজের সাথে তার নিত্য-নতুন কলহ বাঁধে।
শত শত বছর যে ফকির-বাউল সমাজের প্রান্তে বসবাস করেছে, আজ রাষ্ট্র তাকে সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সমাজের সাথে সংলাপে না গিয়ে, বিবাদ না মিটিয়ে বাউলদের এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠা এক ধরনের উলম্ফন—যাকে বলে ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া। এই স্বীকৃতির বিনিময়ে সে যে কখনো ক্ষমতার মুখপাত্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে না, এমনটা মনে করার কারণ নেই। এটা খুবই স্বাভাবিক যে, নতুন বাস্তবতায় সমাজস্থ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ রাষ্ট্রের স্নেহধন্য বাউলদের যথেচ্ছাচার মানবে না। এও স্বাভাবিক যে, রাষ্ট্র তাদের সামাজিক প্রতিক্রিয়ার উপর হস্তক্ষেপ করবে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদকে আইনি নিরাপত্তা প্রদান করবে।
উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়, সমাজের সাধারণ মানুষের ধর্ম ও শিল্প সংক্রান্ত কাণ্ডজ্ঞান এবং এ বিষয়ে বর্তমান সময়ের স্পন্দনের যে কম্পাঙ্ক—তাদের মাঝে নূন্যতম কোনো পার্থক্য নেই। অবস্থাদৃষ্টে আরও প্রতীয়মান হচ্ছে, সাম্প্রতিক সংঘর্ষটিকে ধর্মীয় জাতিবাদ বনাম লোকায়ত দর্শনের দ্বন্দ্ব হিসেবে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ এবং এই চিহ্নায়নের ভিত্তিতে জনসাধারণের প্রতিক্রিয়াকে উগ্র দাবি করাও নিতান্ত বাতুলতা। অথচ বাউলদরদী সেক্যুলার সমাজ কেবল এতটুকু প্রশ্ন উঠিয়েই ক্ষান্তি দিতে পারত যে, জনসাধারণ তার বোঝাপড়া তৈরির প্রক্রিয়া উন্মুক্তরূপে প্রদর্শনের বৈধতা কোথা থেকে পায়।
উত্তর তালাশ করলে দেখি-এই বৈধতা তারা সেই আজাদির রুহ থেকেই পায়, যেখান থেকে তারা গণপরিসরে প্রশ্নটি উত্থাপন করার বৈধতা পায়। কারণ এই প্রশ্ন তাদের জন্য কাণ্ডজ্ঞানের সম্মিলিত চর্চার একটি উছিলা মাত্র। এই একই কাণ্ডজ্ঞানের চর্চা দিয়ে জনসাধারণ সমাজ ও বাউল সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিবাদকে চিহ্নিত করেছে। এ কারণে জনসাধারণের পরিবেশন করা এই উন্মুক্ত প্রদর্শনী তাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন হিসেবেই হাজির হয়েছে, যার সাথে তারা দীর্ঘদিন যাবৎ ক্ষমতার হস্তক্ষেপ ব্যতীত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় কোনো ধরণের মধ্যস্ততায় পৌঁছতে পারছে না। ফলস্বরূপ, বারংবার তারা প্রশ্নটিকে রাষ্ট্রের বেঁধে দেয়া ছক দিয়ে আটক করতে চায়। এখানে কেবল এতটুকু প্রত্যাশাই ব্যক্ত করা যায়, একদিন তারা সমাজবিরোধী ও ক্ষমতালেহী প্রক্রিয়া থেকে মুক্ত হয়ে কোনো কৃত্রিম ছকের সাহায্য ছাড়াই প্রশ্নটির সাথে সহজাত বোঝাপড়ায় পৌঁছাতে সক্ষম হবে।
হদিস
১. (ফরহাদ মজহার ও সৈয়দ জামিল আহমেদের বক্তব্যাংশ) আরাফাত সেতু, ‘বাউলদের উপর হামলার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে’, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, নভেম্বর ২৭, ২০২৫।
২. ফরিদা আখতার, ‘লালনের গানের মানবতার বাণী আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক’, তথ্য অধিদপ্তর, তথ্যবিবরণী নম্বর: ১৩৩৭, অক্টোবর ১৮, ২০২৫।
৩. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, (মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন সম্পাদিত) হারামণি’র ভূমিকা, ১৯৩০।
৪. মাসাহিকো তোগাওয়া, লালন সাঁইয়ের রেখে যাওয়া অনুত্তরিত প্রশ্ন, প্রথম আলো, অক্টোবর ১৯, ২০২৫।
৫. ফরহাদ মজহার, সেক্যুলার জাতিবাদ যেমন ফ্যাসিবাদ, তেমন ধর্মীয় জাতিবাদও ফ্যাসিবাদ, সমকাল, ডিসেম্বর ৬, ২০২৫।