মেন্যু
Menu

যুগস্রষ্টা আব্বাসউদ্দীন | আবুল আসাদ

২৯ ডিসেম্বর, ২০২৪

আর্নল্ড টয়েনবি তার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এক লেখায় বলেছেন, মৌলিক সৃষ্টির কোনও কিছুই মানুষের নয়, ঈশ্বরের। সবই ঈশ্বরের দান, মানুষ নিমিত্ত মাত্র। এর অর্থ হলো, সময়ের প্রয়োজন আল্লাহ তাঁর পরিকল্পনা অনুসারে পূরণ করে আসছেন। এই প্রাকৃতিক বিধান এই পৃথিবীতে মানুষের আগমন নির্গমনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ক্ষণজন্মা যাঁরা, তারা আল্লাহর ইচ্ছারই ফল। সময়ের অন্ধকারে মানুষের জন্য, একটা জাতির জন্য তারা আলোকবর্তিকা হয়ে আসেন। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বাঙালি মুসলমানদের জীবনে যে অন্ধকারের সূত্রপাত হয়, তা আরও গভীর ও বিপদসঙ্কুল হয়ে ওঠে উনিশ শতকের শেষ এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধে। এই সময় হিন্দুদের জাতীয় উত্থান এক আগ্রাসী রূপ নিয়ে সামনে আসে। যা মুসলমানদের স্বতন্ত্র জাতীয় অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তোলে। বঙ্কিমের আনন্দমঠ, দুর্গেশ নন্দিনী, বন্দে মাতরম, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, মুকুন্দ দাশের গান এবং অরবিন্দ-শামা প্রসাদদের রাজনীতি হিন্দুদের জন্য ছিল বোধন সঙ্গীত। এই সময় দরিদ্র অশিক্ষিত, অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত মুসলিম সমাজের জন্য ত্রাতা হয়ে আসেন রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে নবাব আবদুল লতিফ, নবাব সলিমুল্লা, নবাব নোয়াব আলী চৌধুরী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী, আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রমুখ। কাব্য কবিতার ক্ষেত্রে আসেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ইসমাঈল হোসেন সিরাজী, খেলার ক্ষেত্রে অভ্যুদয় ঘটে কলকাতার মোহামেডান স্পর্টিং ক্লাব এবং গানের ভুবনে শত শত বছরের মৌনতার অর্গল ভেঙে মুসলমানদের মনের দুয়ারে এসে হাজির হয় আব্বাসউদ্দীনের গানের সঞ্জীবনী কণ্ঠ। বাংলার মুসলমানদের জন্য ছিল এ এক অশ্রুতপূর্ব আবাহন এবং তাদের মন-মননের সরব সুন্দর বেনজির এক প্রতিধ্বনি। এমন ক্ষণজন্মারা আল্লাহর ইচ্ছায় আবির্ভূত হন।

আব্বাসউদ্দীনের গান প্রথম যখন শুনি তখন আমি প্রাথমিক স্কুলের ছাত্র। তার গান শোনার আগে মেয়েলি গীতের সাথে আমার পরিচয় ছিল। রাতের বেলা বড়মার কাছে শুয়ে মেয়েলি গীত শুনতাম। রাতের নিঃশব্দ নীরবতার মধ্যে মর্মস্পর্শী সুর আমাকে যেন এক স্বপ্নের জগতে নিয়ে যেত। সেই সুর এখনও আমার কানে বাজে। তারপর ভাওয়াইয়া গান- ‘ও কি গাড়িয়াল ভাই, ফাঁন্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে’ প্রভৃতি কয়েকটি গান শুনলাম কলের গানের মাধ্যমে আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে। আমার জন্য সে ছিল এক স্মৃতিময় রাত।

শুনলাম আমাদের স্কুলের শিক্ষকের বাড়িতে আজ কলের গান আসবে। তার বাড়ি আমাদের গ্রামেই। খাওয়া- দাওয়া, নামাজ, কাজ-কর্মের পর রাত নয়টায় কলের গান শুরু হওয়ার কথা। কার সাথে যাবো এটা ঠিক করতেই আমার যাওয়া দেরি হয়ে গেল। আব্বা-আম্মার গান শুনতে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আমি যে যাচ্ছি তা আধা সম্মতি আধা অসম্মতির মধ্যে। আব্বাসউদ্দীন নামের একজন মুসলিম কণ্ঠশিল্পীর গান বলেই হয়তো এই আধা সম্মতিটুকু মিলেছে। আমাদের বাড়িতে আশ্রিত একজন লোক ছিলেন। বয়স্ক মানুষ। তার সাথে যাওয়াই ঠিক হলো। তিনি হারিকেন নিয়ে আগে আগে চললেন আর আমি ও আমার এক বছরের বড় ভাই পিছনে। তখনকার গ্রামে রাত নয়টা অনেক রাত। অধিকাংশ মানুষই তখন ঘুমিয়ে পড়ে। হারিকেন ও মাটির বাতির আলো সব নিভে যায়। নিঃশব্দ হয়ে যায় চারিদিক। অন্ধকারের কালো চাদরে ঢেকে যায় গ্রাম। এক ছোট মাঠের চারদিক ঘিরে আমাদের গ্রামটি।

এই মাঠের ওপারে অন্য পাড়ায় আমার সেই মাস্টার সাহেবের বাড়ি। বাড়িটি আমাদের স্কুলের পিছনে। স্কুল পেরিয়ে তার বাড়িতে যেতে হয়। আমরা দূরে থেকেই কলের গানের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। স্কুলের মাঠে পৌঁছার পর গানের কথাগুলো খুব সুস্পষ্টভাবে আমরা শুনতে পেলাম। শোনা যাচ্ছিল ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই’ গানটা। এই গানটা এই প্রথম আমি শুনি তার কণ্ঠে। সেই মুহূর্তে অদ্ভুত এক অনুভূতি হয়েছিল আমার। চারদিক অন্ধকার, অন্ধকার মাঠের চারদিকে আমাদের গ্রামটা যেন এক কালো দেওয়াল। জমাট অন্ধকার আমাদের হারিকেনের আলোটিকে চারদিক থেকে এসে যেন চেপে ধরেছে। এই পরিবেশে স্বপ্নের মতো লাগছে গানের মর্মস্পর্শী সুর। মনে হচ্ছিল অন্ধকার পাড়ি দিয়ে কোনও অদৃশ্যলোক থেকে ভেসে আসছিল গানের কথাগুলো। আমরা যখন মাস্টার সাহেবের বাড়ি পৌঁছলাম তখন তার বৈঠকখানা, বারান্দা ও উঠানে তিলধারণের স্থান নেই। বারান্দা ও উঠানে মানুষকে মজলিসের দৌড়বিছানাসহ বিভিন্ন ধরনের বিছানা পেতে বসতে দেয়া হয়েছে। উঠানের মাঝখানে টাঙানো একটা হেচাক বাতি অন্ধকারের সাথে লড়াই করছে। পিন পতন নীরবতা। সন্মোহিতের মতো সবার দৃষ্টি এবং মনোযোগ কলের গানের দিকে। প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত এই অনুষ্ঠান চলে। শেষ দিকে সিরাজউদ্দৌলার নাটকও আমরা শুনেছি। শেষ সময় পর্যন্ত সব মানুষই এই গানের অনুষ্ঠান শুনেছিল, একজনও ওঠেনি। মধ্যরাতে বাড়িতে ফিরে এসেছিলাম। সমগ্র এই অনুষ্ঠানটি ছিল আমার কাছে স্বপ্নের মতো। গানের কতগুলো কথা যেমন, ‘চিলমারীর বন্দর, ধরলা নদীর তীর’ ইত্যাদি এখনও আমার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়।

প্রায় ষাট বছর আগে আমার গ্রামের এই যে আব্বাসউদ্দীনের কলের গানের অনুষ্ঠান, তেমন অনুষ্ঠান বাংলার গ্রাম-গঞ্জে হাজারো সংখ্যায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি সত্যিই ছিলেন জাগরণের জনশিল্পী। তিনি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে গিয়েছেন। হাজারো লোকের সামনে গান গেয়েছেন। তার গানের লাখ লাখ রেকর্ড ছড়িয়ে পড়েছে পল্লীর আনাচে কানাচে। মানুষ মুগ্ধ হয়ে শুনেছে তার গান। আব্বাসউদ্দীনের গান শুধু গানই ছিল না, দুর্বল, বিপর্যস্ত, ঘুমন্ত মুসলমানদের জন্য ছিল জাগরণের সঙ্গীত। বাংলাদেশের আরেক জন বিখ্যাত কবি ও গীতিকার আজীজুর রহমান আব্বাসউদ্দীনের অবদান সম্পর্কে বলতে গিয়ে লিখেছেন, “বাংলার মুসলিম নবজাগরণের এই উন্মেষ সূচিত হয় প্রথমত আব্বাসউদ্দীনের ইসলামি গানে, দ্বিতীয়ত মোহামেডান স্পর্টিং ক্লাব এর পরপর লীগ ও আইএফএ শীল্ড বিজয়ে। তৃতীয়ত মুসলিম কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা কর্তৃক ঊনিশশত আটাশ সালের প্রজাস্বত্ব আইনের সংশোধনীর মাধ্যমে জমিদারের ল্যান্ডলর্ড ফি রদ এবং ঋণ সালিশী আইনের প্রয়োগে মহাজনের উদ্যত ছোবল থেকে চাষী প্রজাদের রক্ষা করা।” এই কথা আরও সুন্দর আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, অবিভক্ত বাংলা ও বাংলাদেশের প্রতিথযশা রাজনীতিক, ইসলামি চিন্তাবিদ এবং বাংলাদেশের স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দিন ওমরের পিতা মরহুম আবুল হাশেম। তিনি বলেছেন, “ইংরেজ যখন বাংলা তথা ভারতের মুসলিম সমাজকে ন্যায়নীতি বর্জিত ছল-চাতুরী ও পাশবিক শক্তির দ্বারা সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত করে ভারতে বৃটিশ শাসনকে দৃঢ়তর করার আশায় হিন্দু সমাজের পৃষ্ঠপোষকতা করতে থাকে, তখন বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে হিন্দুদেরই একক নেতৃত্ব কায়েম হয়। কিন্তু বর্ণাশ্রম-সম্পৃক্ত হিন্দু-অভিজাত শ্রেণী তাদের সাহিত্য ও সঙ্গীতে স্থান দেন কেবল মাত্র সমাজের উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে, কোটি কোটি বাঙালী জনসাধারণ ছিলেন সাহিত্য-সঙ্গীতে উপেক্ষিত। এটা অত্যন্ত গৌরবের বিষয় যে, যে তিনজন বাঙালী বিশেষভাবে সাহিত্য ও সঙ্গীতে বাংলার জনসাধারণকে সম্মানের আসন দান করেন, তারা তিনজনই বাঙালী মুসলিম। একজন সর্বহারা কবি নজরুল ইসলাম এবং অপর দু’জন পল্লী কবি জসীমউদ্দীন ও লোক-সঙ্গীতাচার্য আব্বাসউদ্দীন আহমদ। আবাসউদ্দীনের সুকণ্ঠ বাংলার লোক সঙ্গীতকে শুধু বাংলায় নয়, সারা বিশ্বে সম্মানের অধিকারী করেছে। মরহুম আব্বাসউদ্দীনের সাথে আমার প্রথম পরিচয় মুসলিম লীগের মঞ্চে। মুসলিম লীগের পাকিস্তান সংগ্রামকালে কতগুলো বিরাট জন-সমাবেশের আয়োজন হয়, সেগুলোর প্রত্যেকটিতেই আব্বাসউদ্দীন উপস্থিত থাকতেন। আব্বাসউদ্দীন ছিলেন শিক্ষিত এবং মুসলিম আদর্শে গভীরভাবে বিশ্বাসী। সুতরাং মুসলিম লীগের জনসভায় তার সঙ্গীত পরিবেশনের বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তা কেবল সমবেত জনসাধারণের চিত্ত-বিনোদনই করতো না, তাদেরকে মুসলমানের স্বতন্ত্র জীবনাদর্শেও গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ করত। প্রসঙ্গক্রমে আমার স্মরণ হয় রংপুরের একটি ঐতিহাসিক জনসভার কথা। সে সভায় আমি ছিলাম প্রধান বক্তা এবং আব্বাসউদ্দীন ছিলেন প্রধান গায়ক। আমার দীর্ঘ ভাষণে আমি স্বতন্ত্র স্বাধীন মুসলিম দেশের যে যে দিক আলোচনা করেছিলাম, তার প্রত্যেকটির পরিপোষক রূপে আব্বাসউদ্দীন একের পর এক গান পরিবেশন করেছিলেন। এতে সভাস্থলে যে উন্মাদনার সৃষ্টি হয় তা সত্যই অবিস্মরণীয়। সুতরাং স্বাধীনতার আন্দোলনে বক্তার বক্তৃতা অপেক্ষা আব্বাসউদ্দীনের সঙ্গীতের মূল্য মোটেই কম ছিল না।”

মরহুম আব্বাসউদ্দীনের গান শুধু আমাদেরকে একটা স্বাধীন দেশই দেয়নি, নজরুলের গান এবং আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠ মুসলিম মানসে বৈপ্লবিক পরিবর্তনও এনেছে। তিনি বাংলার মুসলমানদের মন-মননকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তার গানগুলো ছিল তার হৃদয়ের এই উপলব্ধিজাত ফসল। তাই তার গান সহজেই মানুষের হৃদয়ে স্পর্শ করত। শুধু তাই নয় গানের বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রেও বাংলার মুসলমানদের হৃদয়ের একান্ত চাহিদা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। আব্বাসউদ্দীন তার গানের ক্ষেত্রে বাংলার মুসলমানদের লোকজ, আবেগ ও আদর্শ উভয়কেই সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বাংলার গ্রামে-গঞ্জে, পথ-প্রান্তরে পড়ে থাকা মানুষের হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি লোকজ গানগুলোকে তিনি সংগ্রহ করেন। এবং সেই গানগুলোকে মায়াময় লোকজ সুরে তার সম্মোহনী কণ্ঠে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। মানুষ তাদের হৃদয়ের প্রতিধ্বনি এই গানগুলোকে আবার হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করেছিল। ‘ও কি ও কাজল ভোমরারে’ কিংবা ‘এত রাতে কেন ডাক দিলি’ আব্বাসউদ্দীনের এই মর্মস্পর্শী গানগুলোর মধ্যে বাংলার মানুষ নিজেদের জীবনকেই নতুনভাবে খুঁজে পেয়েছে। এরপরও মানুষের মনে অতৃপ্তির একটা তৃষ্ণা ছিল। অসম্পূর্ণতার একটা বেদনা ছিল। প্রতিবেশী হিন্দু সমাজে ধর্মীয় সঙ্গীত বা জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে ভজন, শ্যামা সঙ্গীত প্রভৃতির প্রচলন ছিল এবং সেগুলো ছিল হিন্দু সমাজে খুবই জনপ্রিয়। মুসলিম সমাজেও ধর্মীয় সঙ্গীত হিসাবে গজলের ছিটাফোটা অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু সেগুলো যেমন সুলিখিত ছিল না, সুপরিকল্পিত ও সুনির্বাচিত বিষয়ের উপরও ছিল না এবং উপযুক্ত সুর ও উপযুক্ত কণ্ঠেরও অনুপস্থিতি ছিল। জনমনের হৃদয়ের মানুষ আব্বাসউদ্দীন এই অভাবের বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামের কলম এবং আব্বাসউদ্দীনের কন্ঠ এই অভাব পূরণে এগিয়ে আসে। সৃষ্টি হয় মুসলিম-মানস এবং দেশকে আলোড়িত উদ্বেলিত করার নতুন ইতিহাস।

সেই সময় এক ঈদের আগে একটি রেকর্ডে খালি অপর পৃষ্ঠার জন্য একটা গানের প্রয়োজন ছিল। এ রেকর্ডে অন্য পৃষ্ঠায় ছিল নজরুলের এক কাওয়ালী গান। সেই রেকর্ডের অপর পৃষ্ঠার জন্য ঈদকে সামনে রেখে লিখলেন বাংলা একটা ইসলামি গান: ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ’ গানটি নতুন এক যুগের উদ্বোধন করলো। রেকর্ডটি বাজারে ছাড়ার সাথে সাথে অসম্ভব জনপ্রিয়তা নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ল। যে সব পরিবারে গান কখনো প্রবেশ করতে পারেনি, সে সব পরিবারও অসম্ভব আবেগ ও আনন্দ নিয়ে গানটিকে স্বাগত জানালো। এই সময়ের একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়। ১৯৩০ সালের গোল টেবিল বৈঠকে যাবার আগে শের-এ বাংলা এ কে ফজলুল হক একটা মিলাদের আয়োজন করেছিলেন। সেই মিলাদে আব্বাসউদ্দীনকে তিনি দাওয়াত করেছিলেন। এই মিলাদে বড় বড় কয়েকজন মওলানাও এসেছিলেন। মিলাদ শেষে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক আব্বাসউদ্দীনকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘আব্বাস তুমি গান গাও’। আব্বাসউদ্দীন সামনে হারমোনিয়াম নিয়ে বসলেন। শেরে বাংলার এই উদ্যেগে খুবই অস্বস্থিবোধ করেছিলেন কয়েকজন আলেম। এটা লক্ষ্য করে শেরে বাংলা বিনীতভাবেই বললেন, ‘গান শুনতে যাদের আপত্তি আছে তারা যেতে পারেন। আমরা হারমোনিয়ামে আব্বাসের মিলাদ পড়া শুনবো’। কয়েকজন আলেম ঘর থেকে বেরিয়ে দরজায় গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়ালেন। এদিকে আব্বাসউদ্দীনের গান শুরু হয়ে গেছে। তার মন মাতানো কন্ঠে একের পর এক ধ্বনিত হতে লাগল : ‘আল্লাহ আমার প্রভু আমার নাহি নাহি ভয়’, ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’ ইত্যাদি গান। একটু শুনেই আলেম কয়েকজন প্রসন্ন মুখে ঘরে ফিরে এসে তাদের আসনে বসে পড়লেন। বাংলার মুসলিম সাংবাদিকতার জনক মওলানা আকরম খাঁ আব্বাসউদ্দীনের গান শুনে মন্তব্য করেছিলেন, ‘এই রস দিয়ে আমাদের নিরস সমাজকে জাগাতে হবে’। সত্যিই নতুন চেতনায়, নতুন আবেগে, নতুন লক্ষ্যে সমাজকে জাতিকে জাগিয়ে তোলার মতো প্রাণ মাতানো ইসলামি গান লিখেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম আর আব্বাসউদ্দীন মধুর কণ্ঠে তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে মানুষের হৃদয় কোঠরে।

কবি নজরুলের লেখা ও আব্বাসউদ্দীনের গাওয়া গান- ‘বাজিছে দামামা বাধরে আমামা শীর উঁচু করি মুসলমান, দিকে দিকে পুন জ্বলিয়া উঠেছে দ্বীন ইসলামী লাল মশাল, ধর্মের পথে শহীদ যাহারা আমরা সেই সে জাতি, খয়বর জয়ী আলী হায়দার জাগ জাগ আরেকবার, তৌফিক দাও খোদা ইসলামে মুসলিম জাহা পুন হোক আবাদ’ ইত্যাদি। মুসলিম সমাজে সেদিন জাগরণের আগুন জ্বালিয়েছিল। দেশের গ্রাম-গঞ্জের হাজারো অনুষ্ঠানে আব্বাসউদ্দীনের উপস্থিতি এবং তার গাওয়া গান মানুষের মধ্যে যে উৎসাহ উদ্দীপনা জাগাত তা ছিল অবিস্মরণীয়। মরহুম আব্বাসউদ্দীন নিজেই এ সম্পর্কে বলেছেন, “প্রতি গানের শেষে সভার প্রতিটি লোক আমার সাথে হাত মিলাতেন। কণ্ঠে তাদের আল্লার বাণী, চোখে তাদের ভবিষ্যতের আলো। সমাজের এই ধরনের কাজ গান দিয়েই কার্যকর হবে বুঝলাম। তাই বাংলার মুসলিম সমাজের যেখান থেকে আহবান এসেছে অপেক্ষা না করে শারীরিক শত কষ্টকে উপেক্ষা করেও ছুটতাম, সাড়া দিতাম তাদের আহ্বানে।”

আব্বাসউদ্দীনের জাতীয় জাগরণমূলক ইসলামি গান বাংলার অশিক্ষা-কুশিক্ষায় জর্জরিত, দরিদ্র, শাসক এবং শাসকদের আশ্রিত জমিদারদের উৎপীড়নে বিপর্যস্ত মুসলমানদের মধ্যে স্বাতন্ত্র্য ও সচেতনতার প্রাণ বন্যার সৃষ্টি করেছিল। যা বাংলার মুসলমানদের হাতে তুলে দেয় স্বতন্ত্র আবাস ভূমি।

বাংলার মানুষের জন্য লোকজ গান ও ইসলামি গান ছাড়াও বাংলার দরিদ্র চাষী, মজুরের অধিকারের গানও তিনি গেয়েছেন। তার গান:

ওঠরে চাষী জগৎবাসী ধর কষে লাঙল,

ওরে ভাই, আমরা ছিলাম পরম সুখী ছিলাম দেশের প্রাণ,

গলায় গলায় গান ছিল ভাই গোলায় গোলায় ধান,

আজ কোথায় বা সে গান গেল ভাই কোথায় সে কৃষাণ,

ও ভাই মোদের রক্ত জল হয়ে আজ ভরতেছে বোতল’।

অথবা—

আজি জাগরে কৃষাণ সব তো গেছে

কিসের বা তোর ভয়

এই ক্ষুধার জোরেই করব এবার

সুধার জগৎ জয়,

ঐ দিগ্বিজয়ী দস্যু রাজার হয়কে করবো নয়

ওরে দেখবে এবার সভ্য জগৎ

চাষার কত বল। 

আব্বাসউদ্দীনের জাদুকরি সুরে এই গানগুলো বাংলার দরিদ্র চাষী মজুরদেরকে নতুন পরিচয়ে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ইতিহাসের এক অন্ধকার সময়ে দুর্দশাগ্রস্ত এক জাতির জন্যে এক গুরুত্বপূর্ণ মিশনে আল্লাহ পাঠিয়েছিলেন তাঁকে। সুনামধন্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব লায়লা আর্জুমান্দ বানুর কথায়, “হিন্দু সমাজে যখন মুসলিম শিল্পীরা ছিলেন অস্পৃশ্য, তখন বাংলার সঙ্গীত জগতে এক নতুন দিগন্তের সৃষ্টি হল। এ নব দিগন্তের স্রষ্টা হলেন অমর কণ্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ। নজরুল ইসলাম এলেন মুসলিম বাংলার তমসাবৃত আকাশে ধুমকেতুর রূপ নিয়ে, কাল বৈশাখীর ঝড় তুলে। আব্বাসউদ্দীন এলেন সুরের রং মশাল নিয়ে।….  আব্বাস আমাদের সঙ্গীত জগতের একটি যুগ। সঙ্গীত ইতিহাসের এক পরিপূর্ণ অধ্যায়”।

সব মিলিয়ে আব্বাসউদ্দীন আহমদ সে সময়ের মুসলিম সমাজের এক সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন একজন কণ্ঠশিলী, তার সাথে কবিও। তিনি কণ্ঠশিল্পী ছিলেন তার সাথে ছিলেন সমাজ সংস্কারকও। একজন কণ্ঠশিল্পী তিনি, তার সাথে ছিলেন রাজনীতিকও। সে সময়ে জাতির মহাসংকটে একজন সমাজ সংস্কারক যা করেছেন, একজন রাজনীতিক যা করেছেন, আব্বাসউদ্দীন আহমদের গান তাই করেছে। অবশ্যই তিনি যৌক্তিক কারণে একজন যুগস্রষ্টা।

 

হদিস : প্রেক্ষণ (জুলাই - সেপ্টেম্বর, ২০১২)