বাঙালি জাতীয়তাবাদের জালে কি বাংলাদেশ আবদ্ধ? | নাজমুল রেজা
একাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশে সবচেয়ে ওয়েল ডিজাইন্ড সফিস্টিকেইটেড পলিটিক্যাল ন্যারেটিভ হইলো— বাঙালি জাতীয়তাবাদের। ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ একটা বড়ো জনরা। এখানে— রাজনীতি, সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাসের বয়ান— সবকিছুই এক্সিস্ট করে। ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ হিস্ট্রিকে পারফেক্টলি ম্যানুপুলেট করেছে। একঝাঁক ইতিহাসবিদ লম্বা সময় ধরে এই বয়ান উৎপাদন করেছে। আপনি যদি বাঙালি জাতীয়তাবাদী হোন— তাহলে মনে হবে সম্রাট আকবরের শাসনামলেই এর বীজ বপিত হয়েছিলো। ক্ল্যাসিক এগজাম্পল আপনি পেয়ে যাবেন। রাজনীতি যেহেতু শত্রু-মিত্র নির্মাণের খেলা, ফলে হিস্ট্রিতে আপনার আকবরের এন্টি-থিসিস দরকার। সেটাও আপনি পেয়ে যাবেন। সম্রাট আওরঙ্গজেব হইলো সেই শত্রু, যেনবা, আওরঙ্গজেব-ই ‘ধর্মীয় উন্মাদনা’র প্রতীক। আর আকবর কিংবা বাঙালি জাতীয়তাবাদ হইলো সেই মেসিয়াহ, যে ‘ধর্মীয় উন্মাদনা’ থেকে মুক্তি দিবে, আধুনিকতা দেবে, মুক্তি দেবে।
বাঙালি জাতীয়তাবাদী হলে— আপনার মনে হবে, ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম মানেই সূর্যসেন, প্রীতিলতা, ক্ষুধিরাম। রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম, শরৎচন্দ্র, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহসহ আরো লম্বা লিটারেচারের ট্রাডিশান। ইয়ং বেঙ্গল, রেনেঁসা আন্দোলন, শিখা গোষ্ঠী থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, বর্তমান বাংলাদেশ। আর্ট-কালচার, জয়নুল আবেদিন থেকে সুলতান, লালন, মানবতাবাদ, পপ লিটারেচারের জাফর ইকবাল থেকে হাল আমলের প্রথম আলো— মনে হবে একটা কমপ্লিট প্যাকেজ। গান্ধীকে মনে হবে ঘরের লোক আর জিন্নাহ, ইকবালকে মনে হবে শত্রু।
আওয়ামী লীগ হইলো— এই হোল বাঙালি জাতীয়তাবাদী স্মৃতি, কল্পনা, বিনির্মাণের রাজনৈতিক মূখপাত্র। চব্বিশের গণ-আন্দোলন, গণঅভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী কল্পনার একটা অর্গান, রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের পতন হইছে। আওয়ামী লীগের এই যে কল্পনা, বাঙালি জাতীয়তাবাদী কল্পনার ধর্ম-রাজনৈতিক ইনহেরেন্ট আইডোলোজি ও কল্পনা যেখানে গিয়ে শেষ হয় তা হলো — ‘হিন্দুত্ববাদ ও ইসলামঘৃণা’। আওয়ামী লীগ বিগত পনেরো বছরে এই হিন্দুত্ববাদী কল্পনা ও ইসলামঘৃণাই প্রডিউস করেছে। যার পরিণতিতে শাহবাগ হইছে। আবরার-আবু সাঈদদের জীবন দিতে হইছে।
সুদীর্ঘ এই সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যেই ডালপালা তৈরি হইছে, যার অনেক কিছুকেই যেনো মনে হবে— সুশীল ও প্রগতিশীল, তার কোনো কিছুকেই এখনো পরাজিত করা যায়নাই। পরাজিত করা আসলে সহজ কাজ-ও নয়। আওয়ামী লীগের যারা প্রতিপক্ষ, তারা রাজনৈতিক দল হিসাবে হয়তো আওয়ামী লীগকে ফাইট করেছে। কিন্তু— যেই স্মৃতি, কল্পনা, ইতিহাস ও আদর্শ আওয়ামী লীগ ফেসিলিটেইট করেছে, সেটাকে জবাব দেওয়ার মতো পাল্টা স্মৃতি, কল্পনা, ইতিহাস ও আদর্শ তৈরি হয়নাই। অথচ, সেটাই ছিলো সবচেয়ে জরুরি কাজ।
ফলে দেখবেন, যেই দিল্লির দাসত্ব ও ইসলামঘৃণার বিরুদ্ধে চব্বিশের অভ্যূত্থান ছিলো— সেটা ক্রমেই নাই হয়ে যাচ্ছে। কারণ ইতিহাসের বিনির্মাণ নাই, স্মৃতি, সাহিত্য ও কল্পনা নাই। ফলে, নিজেকে ভুলে যাওয়া আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষরা ঘুরে ফিরে আওয়ামী লীগেরই বয়ান ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদে’র জালে আটকা পড়ছেন। অভ্যূত্থান পরবর্তী সময়ে এর চেয়ে হতাশার আর কিছুই নাই। এখন যেটা দরকার, সেটা হলো, বাঙালি জাতীয়তাবাদকে এর পুরো ন্যারাটিভসহ ইনকার করা। ঠুনকো দলীয় বিবাদ এড়িয়ে আমাদের আদি ও আসল ইতিহাস, স্মৃতি ও সাহিত্য ফিরিয়ে আনা। নতুন সভ্যতা বিনির্মাণে নিজেদের শরিকানা নিশ্চিত করা। অন্যথায়, বাঙালি জাতীয়তাবাদ দরকার হলে আবার আরেকটা নতুন আওয়ামী লীগ বানাবে। ভারতীয় আধিপত্যবাদ আর ইসলামঘৃণার নতুন উইন্ডো নির্মাণ করবে। মোসলমানি চিহ্ন ও অস্তিত্বকে নতুন নতুন উপায়ে ক্রিমিনালাইজ করবে।