ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি : প্রতিরোধ-চিহ্নের পণ্যায়ন ও ‘পুঁজিকরণ’ | ফারিয়া জান্নাতুল সিহিন্তা
Capitalism maintains dominance not merely through economic coercion, but by shaping the cultural and ideological consensus to legitimize its power as ‘common sense’.
- Antonio Gramsci
ইতালিয়ান মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামসির প্রভাবশালী ধারণাগুলোর মধ্যে ‘সাংস্কৃতিক কতৃত্ব’ বা Cultural Hegemony অন্যতম। এই কালজয়ী তত্ত্ব এস্তেমাল করার মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদী কাঠামোর গূঢ় হাকিকত ঠাওর করা সম্ভব। আজকের দিনে এটা সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের বিষয়ে পরিণত হয়েছে যে, পুঁজিবাদ কেবল বর্ধিত উৎপাদন ও ব্যাপক মুনাফা লাভের প্রক্রিয়া নয়, কেবল মুনাফার জন্যে পুঁজি কাজও করে না। বরং, চূড়ান্ত বিবেচনায় এটি একটি সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা। গ্রামসি বলছেন- পুঁজির আওতায় কেবল অর্থনৈতিক আধিপত্য ও জবরদস্তির মাধ্যমেই নয়, বরং মানুষের বিশ্বাস, বুদ্ধিবৃত্তি, মূল্যবোধ নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও শাসক শ্রেণি তার শাসন ও শোষণ জারি রাখে। এ প্রক্রিয়ায় পুঁজি ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়, একে একে নির্মাণ করতে থাকে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, চাহিদা ও স্বপ্ন। এক সময় পুঁজি প্রস্তাবিত অনুমান ও সিদ্ধান্ত প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়ে পড়ে, পুঁজি হয়ে ওঠে আম জনতার common sense বা সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান। এই কমন সেন্সের মুখোশ পরেই সে মানবজাতির বর্তমান ও ভবিষ্যত নির্ধারণ করে দেয়। মানুষ কী খাবে, কী পরবে, কী ভাববে—সবকিছুই হয়ে ওঠে পুঁজির কাঠামোগত পরীক্ষা-নীরিক্ষার অংশ।
বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বিপনন-প্রক্রিয়ায় নজর দিলেই পুঁজির এই সর্বগ্রাসী নিয়ন্ত্রণ টের পাওয়া যায়। কোম্পানিগুলো শুধু পণ্য বিক্রি করে না; তারা জীবনযাপনের ধারা, আদর্শ, এমনকি উদ্দেশ্যও নির্ধারণ করে দেয়। পুরোদস্তুর পণ্যায়িত এ ব্যবস্থায় মানুষের খাদ্য, পোশাক, বিনোদন, চিন্তা পুঁজির হাতের মুঠোয় বন্দী। ফলে গ্রামসির সূত্র মেনে বলা যায়- পুঁজি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষমতার বন্দোবস্ত নয়; এটি পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের শক্তিশালী হাতিয়ার, গোটা বিশ্বকে যা এক সুতোয় বেঁধে রাখতে তৎপর। খোদ পুঁজি যখন বাকি পৃথিবীর উপর পশ্চিমা দাবানো ক্ষমতার জ্বালানী, তখন বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মানুষের কর্মতৎপরতা এর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া স্বাভাবিক। এমতাবস্থায় প্রতিটি ব্যক্তিই আসলে পুঁজির খদ্দের, পুঁজির জন্যেই সে কর্মরত। এমনকি সে যদি সচেতনভাবে কোনো বিশেষ আন্দোলন বা রাজনৈতিক তৎপরতায় সংহতি জানায়, সেটা পুঁজি-বহির্ভূত ঘটনা—এমন কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। অনেকক্ষেত্রেই তা পুঁজির বৃহত্তর কাঠামো বা পরিসরে এক ধরনের ‘সহনীয় উত্তেজনা’। এমনকি ব্যক্তি বিশেষের রাজনৈতিক অভিব্যক্তি যদি খোদ পুঁজি দ্বারাই প্রাণিত হয়, তাহলেও অবাক হওয়ার খুব বেশি কারণ নেই।
এ ধরণের বৈশ্বিক পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একজন মানুষ যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়ায়, ইজরায়েলকে নিজের শত্রু বলে গণ্য করে, তখন ব্যাপারটিকে আর নিরীহ ভঙ্গিতে দেখার সুযোগ থাকে না। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় এমন প্রতিবাদ-প্রতিরোধ নিঃসন্দেহে বাড়তি কৌতুহলের জন্ম দেয়। মনে রাখা ভালো, বেশিরভাগ লোকই ফিলিস্তিনের খবর পায় পুঁজি নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমা মিডিয়ার কয়েক স্তর ছাঁকনি পেড়িয়ে। এ সম্পর্কিত খবরাখবর নির্মাণ, পরিবেশন ও বিলিবণ্টনে যে অবধারিত ‘কল্পনা’ তৈরি হয়, সিংহভাগ পাঠকের পক্ষে তা শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।
ফিলিস্তিনের ‘সত্য’ মিডিয়ায় উপস্থাপিত হয় ‘কনটেন্ট’ আকারে। আরও আশঙ্কার বিষয় এই যে, সত্য ও খবরের মধ্যবর্তী যে দূরত্ব, ফিলিস্তিন ইস্যুতে সেটাই একমাত্র ঝুঁকি নয়। পশ্চিমা মিডিয়া যারপরনাই মতাদর্শিকভাবে ফিলিস্তিনবিরোধী, ইজরায়েলের প্রতি তার পক্ষপাত প্রকাশ্য এবং সর্বজনবিদিত। ফলে সাধারণ জনতা যখন প্রচলিত পশ্চিমা মিডিয়া থেকে ফিলিস্তিনের খবর নেয়, তাকে ক্রমাগত ব্যাখ্যা, তর্ক ও দ্বিমত করেই এগোতে হয়, অন্তত যদি সে নিরপেক্ষ বা মজলুমের পক্ষে থাকতে চায়। কিন্তু এক ঝাঁক মিডিয়ার ধারাবাহিক মিথ্যার বিপরীতে সে কতটাই-বা সত্যের হদিস পায়!
ফিলিস্তিন সম্পর্কে বাকি রাজনৈতিক বিশ্বের ধারণা পশ্চিমা মিডিয়ার মাধ্যমেই গঠিত হয়। অথচ পশ্চিমা মিডিয়া মূলত ইসরায়েলপন্থী কর্পোরেট মালিকানায় পরিচালিত। সিএনএন, বিবিসি, নিউইয়র্ক টাইমসের মতো মিডিয়া হাউজগুলো ফিলিস্তিনিদের একটু-আধটু ভিক্টিম হিসেবে দেখালেও, তাদের কভারেজে ইসরায়েলের অপরাধগুলো নিষ্ঠার সাথে স্বাভাবিকীকরণ করা হয়। ‘Right to Self-defence’, ‘Human Shield’ প্রভৃতি বয়ান নির্মাণের মাধ্যেমে তারা ইসরায়েলি হামলার বৈধতা উৎপাদন করে।
ফিলিস্তিনের সাথে একাত্মতা প্রকাশকারী বেশিরভাগ ব্যক্তি এই জায়নবাদী মিডিয়ারই শিকার। ফিলিস্তিনের বেদনাবিধুর যে ছবি সে দেখে, সেই ইমেজ পশ্চিমা লেন্স দিয়ে তোলা। ইসরায়েলের যে নৃশংসতা সম্পর্কে সে জানে, সেই তথ্য আসে পশ্চিমা নিউজ এজেন্সিগুলোর ‘Biased Reporting’ থেকে। ফলে, ফিলিস্তিনের প্রতি তার সমর্থনও মিডিয়া-নির্মিত রিয়ালিটির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।
পশ্চিমা মিডিয়া ছাড়া ইদানীং আরও কিছু বিকল্প যোগাযোগ মাধ্যম মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে গেছে। প্রচলিত মিডিয়ার বিকল্প হলেও এগুলোকে পুঁজির বিকল্প ভাবার সুযোগ নেই। কার্যক্রম ও চরিত্রের দিক থেকে এরা পুঁজিবিরোধী কোনো পাটাতন নয়, ফলে পুঁজির ঝোঁক ও ঝুঁকি থেকেও মুক্ত নয়। সুতরাং, পশ্চিমা মিডিয়া থেকেই হোক কিংবা বিকল্প মিডিয়া, কেউ যখন ফিলিস্তিন সম্পর্কে জানছে, পুঁজির আওতার বাইরে থেকে তা সম্ভব হচ্ছে না। যতই অনাগ্রহ থাকুক, যেকোনো একটি মিডিয়া থেকে খবর খরিদ করা ছাড়া ফিলিস্তিন প্রশ্নে তার কদম ফেলার জো নেই। যেখান থেকে, যে উপায়েই সে খবর নিক না কেন, তার বিপরীতে লাভবান হচ্ছে ঐ খবরবাহক। এভাবে স্রেফ ফিলিস্তিনের দুর্দশা জানতে গিয়েই সে কয়েক দফায় মুনাফালোভী পুঁজির খপ্পড়ে পড়ছে।
কেউ যখন ফিলিস্তিনের পক্ষ নেয়, প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে রাস্তায় নামে, তখনও পুঁজির দারস্থ না হয়ে তার উপায় থাকে না। আন্দোলনে অংশ নেওয়ার জন্য তাকে গায়ে জড়াতে হয় ফিলিস্তনের পতাকা, কেফিয়াহ বা মাফলার। নির্দিষ্ট করে কেফিয়াহর কথাই ধরা যাক। এই কেফিয়াহ এক সময় ছিল ফিলিস্তিনি কৃষক ও প্রতিরোধ যোদ্ধাদের লড়াইয়ের প্রতীক। এর সঙ্গে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস যুক্ত। ১৯৩৬ সালে ইতিহাসের তেমনই এক অধ্যায় শুরু হয়। অন্যায্য জমি দখল ও ইহুদী সেটেলমেন্টের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনে ফুঁসে ওঠে ক্ষোভের দাবানল। ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সেই ‘গ্রেট প্যালেস্টেনিয়ান রিভল্ট’ স্থায়ী হয়েছিল ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত। সেই যুদ্ধে ফিলিস্থিনের কৃষক ও প্রতিরোধ যোদ্ধারা নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে কেফিয়াহকে স্কার্ফ হিসেবে ব্যবহার করত। ক্রমে ক্রমে আজ তা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রেরই অবিচ্ছেদ্য নিশান হয়ে ওঠেছে।
স্বাভাবিকভাবেই ফিলিস্তিনপন্থী সংহতি সমাবেশ ও প্রতিবাদ মিছিলে বিশেষ গুরুত্বে হাজির হচ্ছে কেফিয়াহ। গত কয়েক দশকে সারা পৃথিবী জুড়েই এর চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়েছে। ফলে কল-কারাখানায় বানিজ্যিকভাবে শুরু হয়েছে কেফিয়াহ উৎপাদন। বস্ত্রশিল্প উদ্যোক্তা, আদতে যাদের বলা উচিৎ পুঁজিপতি, নানা শ্রেণি-পেশার ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন মান ও মূল্যের কেফিয়াহ বাজারে ছাড়ছে। এতে করে কেফিয়াহ আর শুধু ফিলিনিস্তিনি প্রতিরোধ সংগ্রামের প্রতীক থাকছে না, বাজারের ব্যাকরণে তা হয়ে ওঠছে বিক্রয়যোগ্য পণ্য।
প্রতিবাদ থাকলে তার প্রতীকায়নও থাকবে। প্রায় সব আন্দোলন-সংগ্রামেই প্রতিবাদের ভাষা জোগায় বিচিত্র সব প্রতীক ও চিহ্ন। সচারাচর দেখা যায়, প্রতিবাদী মানুষ নানা ধরণের ব্যানার, ফেস্টুন, অবয়ব ও বেশ-ভূষা সহযোগে পথে নামে। ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ব্যতিক্রম নয়। আমরা লক্ষ্য করি, পতাকা, কেফিয়াহ, মাফলার ছাড়াও ফিলিস্তিনের মানচিত্র সম্বলিত ব্রেসলেট, লকেট, হেডব্যান্ড প্রভৃতি প্রতিবাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে ওঠছে। শুধু তাই নয়, কখনো ফিলিস্থিনী অর্থনীতি ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক জয়তুন, কখনো-বা সংগ্রামরত যোদ্ধাদের সৃজনশীল প্রতিরোধের প্রতীক তরমুজ বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে হাজির হচ্ছে। দখলদার ইজরায়েলের বিধ্বংসী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এ দুই ফসল শুধু প্রতিবাদের ভাষাই দিচ্ছে না, একইসঙ্গে ফিলিস্তিন নামক ভূ-খণ্ডের চরিত্র ও উত্তরাধিকার চিহ্নিত করে দিচ্ছে। দেখিয়ে দিচ্ছে- স্বামী ও সন্তানহারা যে নারী জয়তুনের শুষ্ক শাখায় পরম যত্নে জীবন আনে, আর কেউ নয়, সে-ই ফিলিস্তিনের সহজাত ভূ-সন্তান।
পশ্চিমা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে আমরা জয়তুন ও তরমুজ সংক্রান্ত নানাবিধ স্লোগান দেখতে পাই। যেমন-
If you shoot a watermelon, the seed will spread and grow into a forest of resistance.
Uprooting olives, uprooting hope—Resist.
From olive roots, revolution grows.
They steal our olives, we harvest resistance.
ব্যাপারটা শুধুমাত্র প্রতিবাদের ভাষা হিসেবেই সক্রিয় নেই, বরং এ দুই কৃষিজ প্রতীকও পুঁজির প্রচ্ছন্ন থাবায় ডুবে গেছে। তার স্পষ্ট প্রমাণ বাজারে বিদ্যমান জয়তুন ও তরমুজের ইমোজি বা ছবি খচিত টি-শার্ট, হ্যাট, প্যান্ট, টোটে ব্যাগ ও মাফলার। এ ছাড়াও ফিলিস্থিনের প্রতীক খচিত স্কার্ফ, হিজাব, বোরখা, ব্রোচ প্রভৃতি এখন বস্ত্র-বাজারের উল্লেখযোগ্য অংশ। এসব পণ্য আজকাল অভিজাত সব ফ্যাশন ব্র্যান্ডের সংগ্রহে স্থান পাচ্ছে। উত্তর বিশ্বের বুটিক দোকানে ফিলিস্তিনি প্যাটার্নের স্কার্ফ বিক্রি হচ্ছে, যার দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এই পণ্যগুলো কতটা ফিলিস্তিনিদের সহায়তা করে, তা সহজেই আন্দাজ করা যায়। একে বরং ফিলিস্তিনের প্রতি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পরিহাস হিসেবে দেখাই সমীচীন, যেখানে প্রতিরোধের প্রতীকও বিলাসী পণ্যে পরিণত হয়।
পুনরায় পতাকা ও কেফিয়াহ প্রসঙ্গে ফেরা যাক। ফিলিস্তিনের সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পদ হওয়ার পরও এ দুই বস্তুর উৎপাদন ও বাজার বিপনন দেশটির অর্থনীতিতে কোনোরকম অবদান রাখছে না। খোদ ফিলিস্থিনের প্রতীক হলেও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে এদের মোট ভূমিকা প্রায় শূন্য। অথচ এই দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রতীককে পুঁজি করে বিশ্বের ক্ষুদ্র, মাঝারি ও প্রভাবশালী ব্র্যান্ডগুলো দুই হাতে ব্যবসা করে চলেছে। প্রচুর মানুষ কিনছে বিধায় এসব পণ্যের ব্যাপক ও বানিজ্যিক উৎপাদনও ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। সম্ভাব্য ক্রেতাদের লক্ষ্য করে পুঁজিপতি ও উদ্যোক্তারা বিভিন্ন ধরন ও মানের পণ্য তৈরি করছে। বাজারে এখন ফিলিস্তিন-প্রতীকায়িত পণ্যের অসংখ্য রকমফের বিদ্যমান। এগুলোর কোনোটা নিন্মমানের, ফলে সুলভে ক্রয়যোগ্য। কোনোটি আবার সুতার কোমলতায়, নকশার সূক্ষ্মতায়, রঙের পক্কতায়, ঐতিহ্যের বিশুদ্ধতায় পরিপূর্ণ, ফলে দাম তার আকাশ ছোঁয়া।
স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, ফিলিস্তিনি প্রতিবাদ-প্রতিরোধের প্রতীকসমূহ পণ্যে পর্যবসিত হওয়ার পর বাজারের নিয়মেই তাদের বিভিন্ন গ্রেড বা ক্যাটাগরি তৈরি হয়েছে। আর একই পণ্যের একাধিক গ্রেড হাজির থাকায় উত্তম-অধমের তুলনাও ডানা মেলেছে। সর্বোপরি উত্তম-অধমের এই প্রচার-প্রচারণা ও বিক্রয়-ব্যবস্থাপনায় বিকশিত হয়েছে ফ্যাশনের ধারণা, যেমনটা অন্যান্য পণ্যের বেলায় ঘটে। এভাবে, ধরা যাক একটি ভালো মানের কেফিয়াহ, প্রতিরোধ সংগ্রামের প্রতীক থেকে প্রথমে হয়ে ওঠেছে পণ্য, এরপর ফ্যাশনের উপাদান। এ প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত কেফিয়াহর রাজনৈতিক তাৎপর্য ফিকে হয়ে যায়, প্রকৃত উদ্দেশ্য হারিয়ে তা মোড় নেয় ফ্যাশনের দিকে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই ফ্যাশনসর্বস্বতা ব্যক্তিকে যেমন মিথ্যে স্বস্তির ঘেরাটোপে বন্দী করে, তেমনি ইজরায়েলের নৃশংসতা ও ভয়াবহতার উপর কয়েক স্তর পর্দা বিছিয়ে দেয়। সাজানো শহর গাজাকে বিরান ভূমিতে পরিণত করার যে বীভৎস আক্রমণ, তার তীব্রতাকে হালকা করে দিতে এটাও পুঁজিবাদী এক অস্ত্র। পুঁজি এই অস্ত্র খোদ ফিলিস্তিনপন্থীদের উপরই হরদম প্রয়োগ করে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনের প্রতি সহমর্মী সম্প্রদায়ই এর খদ্দের।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগ্রামের সাথে সংহতি রেখে তামাম দুনিয়ার মানুষ প্রতিবাদ করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে; বিভিন্ন হ্যাশট্যাগ, স্লোগান ইত্যাদি ব্যবহার করে। এসব মিডিয়ার বেশিরভাগই পশ্চিম নিয়ন্ত্রিত, অনেক্ষেত্রে এরা নিজেরাই জায়নবাদের মদদদাতা। সন্ত্রাস, উগ্রতা, অসহিষ্ণুতা ইত্যাদি তকমা দিয়ে এরা বিরামহীনভাবে ফিলিস্তিনপন্থী প্রচারণাকে সেন্সর করে চলেছে। এহেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইজরায়েলী দখলদারিত্বের বিরোধীতা কতটা ফলপ্রসূ- এই প্রশ্ন বাড়তি মনোযোগের দাবি রাখে।
এটা সত্যি যে, ফিলিস্তিন নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জনমত গঠনে এসব মিডিয়া ব্যবহারকারী উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। কিন্তু যারা এগুলো ব্যবহার করছে, তারা শেষমেষ পুঁজিরই দারস্ত হচ্ছে, চূড়ান্ত অর্থে তারা পুঁজির জন্যেই কাজ করছে। শুধু তাই নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়ানোর ফলে ব্যক্তির সামাজিক প্রভাব ও মর্যাদা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেইসাথে তার ইতিবাচক ইমেজও তৈরি হচ্ছে। সেই ইমেজ পরবর্তীতে তার ডিজিটাল আয়ের পথ খুলে দিচ্ছে। দুঃখজনক হলেও এ ধরণের দৃষ্টান্ত আজ আর দুর্লভ নয়। সচেতনে হোক বা অচেতনে, ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি এভাবে ব্যক্তির কাছেও ‘কনটেন্ট’ হয়ে ওঠছে। বলা বাহুল্য, এসব ডিজিটাল এক্টিভিজমের অর্থনৈতিক সুফল কখনোই ফিলিস্থিনিদের ঘরে যায় না। দুর্দশাগ্রস্থ ফিলিস্তিনিদের অর্থনৈতিক সহায়তা, দখলদারদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ এবং পুনরায় স্বাধীন ফিলিস্থিন গঠনে এগুলো প্রায় কোনো অবদানই রাখে না।
দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, পুঁজিবাদ প্রতিটি প্রতিবাদ ও আন্দোলনকে তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। শুধু তা-ই নয়, এসব বিদ্রোহকে সে সুবিধামাফিক বাজারে বিক্রি করতেও সিদ্ধহস্ত। ফলে ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়ানোর বিশ্বব্যাপী চর্চাকে যদি পুঁজি তার বাজার কৌশলের অংশ বানিয়ে ফেলে, তাহলে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগ্রামের চেতনা ও স্বপ্ন দুর্বল হয়ে পড়বে - এতে কোনো সন্দেহ নেই। মনে রাখতে হবে, স্রেফ বিক্রয়ের আকাঙ্ক্ষা ছাড়া ফিলিস্তিনের প্রতি পুঁজিবাদী বিশ্বব্যস্থার আলাদা কোনো সহানুভূতি নেই। সেজন্যই দেখি, কিছু বহুজাতিক কোম্পানি ইতোমধ্যেই ‘Solidarity with Palestine’ শীর্ষক Limited Edition পণ্য বিক্রি শুরু করলেও ইজরায়েলে অর্থ লগ্নি বন্ধ করেনি। যেমন - Ben & Jerry’s ২০২১ সালে ইসরায়েলের দখলকৃত ভূমিতে আইসক্রিম বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল, কিন্তু তাদের মালিকানাধীন Unilever ইসরায়েলে বিনিয়োগ চালিয়ে যায়। একইভাবে, Starbucks ফিলিস্তিনি পতাকা প্রদর্শনের কারণে ইউনিয়ন কর্মীদের বরখাস্ত করে, আবার দ্বিগুণ উৎসাহে ‘Social Justice’ ব্র্যান্ডিং চালায়।
পুঁজির পাহাড়াদার এই বহুজাতিক কোম্পানিগুলো দেখাতে চায়, তারা মনেপ্রাণে ন্যায়পন্থি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা ইসরায়েলি পুঁজির সাথে সবসময় আঁতাত করে চলে। এই দ্বিচারিতা যদি বাড়ে, তাহলে সংহতির নামে শুধু একটি ভোক্তা সংস্কৃতি গড়ে ওঠবে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এতে ফিলিস্তিনিদের ভাগ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন না আসবে না, তবে বাজার সম্প্রসারিত হবে নিশ্চিত। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর এই আচরণকে ‘Woke Capitalism’ ধারণা দিয়ে পাঠ করা যায়। এ প্রক্রিয়ায় কোম্পানিগুলো হাল আমলের শিক্ষিত, প্রাগ্রসর ও বিবেকবান প্রজন্মকে আকৃষ্ট করে এবং তাদের সরল নৈতিকতা সুকৌশলে খরিদ করে।
ফিলিস্তিনের সংগ্রাম কোনোক্রমেই স্রেফ স্বস্তিদায়ক প্রতিবাদ কিংবা ফ্যাশনের উপজীব্য নয়। এটি ন্যায্যতার লড়াই, এর জন্য প্রয়োজন স্থায়ী, গভীর ও শক্তিশালী তৎপরতা। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সবসময়ই চাইবে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও সংহতিকে তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে। কিন্তু আমাদের সচেতন থাকতে হবে, যেন প্রতিবাদের মৌলিক চেতনা থেকে আমরা সরে না যাই। ফিলিস্তিনের সাথে একাত্মতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা কেবল পতাকা উড়ানো বা পোস্ট দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব কর্মে রূপ নেবে।
ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগ্রামকে যদি আমরা শুধু ‘স্ল্যাকটিভিজম’ কিংবা ফ্যাশনসর্বস্বতায় সীমাবদ্ধ রাখি, তবে আখেরে তা পুঁজিরই জয়গানে পরিণত হবে। এক্ষেত্রে, গ্রামসির ভাষায়, Intellectual Subversion বা বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্রোহই একমাত্র পথ- যেখানে আমরা পুঁজি নির্মিত সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করব, প্রতীক ও চিহ্নগুলোর মালিকানা ফিরিয়ে নেব এবং ফিলিস্তিনের মুক্তিকে কেবল ট্রেন্ড নয়, অপরিহার্য দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করব।
মনে রাখা দরকার, প্রকৃত রাজনীতি সচেতন মানুষের প্রতিরোধ কেবল জালেম এবং মজলুমের প্রশ্নে আবদ্ধ নয়, বরং তা আরও বিস্তৃত ও সুদূরপ্রসারী ক্ষমতা-কাঠামোর সুলুক সন্ধানে নিবেদিত। পুঁজি এমনই এক সর্বগ্রাসী ব্যবস্থা, জালিম-মজলুম প্রশ্ন থেকেও বৃহত্তর সঙ্কট। সে একাধারে ক্ষমতার বিশ্বমাত্রা চর্চায় লিপ্ত, অবার বিশ্ব-ক্ষমতার একচ্ছত্র নির্মাতা। এমন নিদারুণ বাস্তবতায় আমাদের সংগ্রাম কেবল ফিলিস্তিনের পক্ষে এবং ইজরায়েলের বিপক্ষে নয়, একইসঙ্গে পুঁজির সবক’টি হাত ও তার ইশারার বিরুদ্ধে।
সাফাই
Aouragh, Miriyam. Palestine Online: Transnationalism, the Internet, and the Construction of Identity. London: I.B. Tauris, 2011.
Banet-Weiser, Sarah. Authentic™: The Politics of Ambivalence in a Brand Culture. New York: NYU Press, 2012.
Chomsky, Noam, and Edward S. Herman. Manufacturing Consent: The Political Economy of the Mass Media. New York: Pantheon Books, 1988.
Fisher, Mark. Capitalist Realism: Is There No Alternative? London: Zero Books, 2009.
Gramsci, Antonio. Selections from the Prison Notebooks. Edited and translated by Quintin Hoare and Geoffrey Nowell Smith. New York: International Publishers, 1971.
Kelley, Robin D.G. Freedom Dreams: The Black Radical Imagination. Boston: Beacon Press, 2002.
Khalili, Laleh. Heroes and Martyrs of Palestine: The Politics of National Commemoration. Cambridge: Cambridge University Press, 2007.
Klein, Naomi. No Logo: Taking Aim at the Brand Bullies. New York: Picador, 1999.
Morozov, Evgeny. The Net Delusion: The Dark Side of Internet Freedom. New York: PublicAffairs, 2011.
Philo, Greg, and Mike Berry. Bad News from Israel. London: Pluto Press, 2004.
Slyomovics, Susan. The Object of Memory: Arab and Jew Narrate the Palestinian Village. Philadelphia: University of Pennsylvania Press, 1998.
Swedenburg, Ted. Memories of Revolt: The 1936–1939 Rebellion and the Palestinian National Past. Minneapolis: University of Minnesota Press, 1995.
নোক্তা : ‘পুঁজিকরণ’ দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে পুঁজি তার নিজস্ব কৌশল ও প্রযুক্তির সহায়তায় ভিন্ন কোনো বর্গকে আয়ত্ত, আত্মস্ত ও আত্মসাৎ করে ফেলে।