মেন্যু
Menu

ধীরে বহে মেঘনা : সর্বভারতীয় বয়ানের পুনঃমঞ্চায়ন | মেহেদী হাসান শুভ

৩ ডিসেম্বর, ২০২৪

‘ধীরে বহে মেঘনা’ সিনেমাটি বাঙালির গুরুত্বপূর্ণ একাংশের মানস চরিত বোঝার জন্য অত্যন্ত কার্যকর। সিনেমায় পরিচালক ও নাট্যকার এমন কতিপয় সিদ্ধান্ত, আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন, যা একই সাথে বাস্তব-বহির্ভূত ও অনৈতিহাসিক। এক প্রকার ধরে নেওয়া প্রকল্পের অধীনে তিনি চিহ্নিত করেছেন প্রধান প্রধান দৃশ্যকল্প। সিনেমাটি বয়ানের দিক দিয়ে ফেলে আসা জাতীয়তাবাদের মিমিক্রি, যেখানে রীতি বিরুদ্ধ আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন পরিকল্পনামাফিক সাজানো হয়েছে। শিল্প কুশলতার বিভিন্ন ভঙ্গি সহযোগে এটি একক একটি বয়ানিক পরিণতির দিকে এগিয়েছে। এ লেখায় সিনেমাটির কিছু নির্দিষ্ট দৃশ্যকে চিহ্নিত করে এর একাডেমিক দুর্বলতা হাজির করা হয়েছে।

পপুলার বাঙালি জাতীয়তাবাদী বয়ানের পাটাতনে নির্মিত ‘ধীরে বহে মেঘনা’। বাঙালি জাতীয়তাবাদে আস্থাশীল একজন ব্যক্তির কাছে তার দেশকে কেন্দ্র করে যে স্বপ্ন, মানবিক সম্পর্ককে সে যেভাবে আবিষ্কার করতে চায়, তারই পূর্ণ রূপায়ণ এ সিনেমায় ঘটেছে। ভৌগোলিক, নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিকভাবে আলাদা দুটি জাতিকে এক ভাবার যে দুঃসাহস বাঙালি জাতীয়তাবাদ দেখিয়ে থাকে, সিনেমাটির পর্বায়ন ঘটেছে তার অনুপুঙ্খ দৃশ্যায়নের মধ্য দিয়ে। সেই অর্থে ‘ধীরে বহে মেঘনা’র আখ্যানে জটিলতা নেই, সরল গতিবেগে সিনেমাটির দৃশ্যকল্প নির্মিত হয়েছে। তবে প্রধান–অপ্রধান উভয় চরিত্রের সক্রিয়তায় আলমগীর কবিরের ভাবাদর্শিক বাতাবরণ বেশ দৃষ্টিগ্রাহ্য। কেন্দ্রীয় দুই চরিত্রের অন্তর্জাগতিক দ্বান্দ্বিক অবস্থানের মধ্যে দিয়ে গল্পের আখ্যানের সূচনা হলেও পরিণতিতে এই দুই চরিত্রের একমুখী ভাবাদর্শিক অবস্থান আমাদের সচেতন করে তোলে।

কলকাতায় অভিবাসী অনিতা দাশগুপ্ত ও বামপন্থী রাজনীতিক, রিপোর্টার সুমিত রহমানের অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে গল্প এগিয়েছে। দিল্লী কলেজের ইতিহাসের ছাত্রী অনিতা; মা অধ্যাপিকা, বোন আমেরিকার মডেল, বাবা থেকেও নেই। এককথায় প্রতিষ্ঠিত মধ্যবিত্ত। অনিতার ভেতর রয়েছে শেকড় ছেড়ার যাতনা, প্রেমিকের মৃত্যুঘটিত বিষাদ, যে মৃত্যুর কারণ আবার তার মাতৃভূমি বাংলাদেশ। বাংলাদেশের যুদ্ধে এসেই মৃত্যু হয়েছে তার প্রেমিকের। এসকল দ্বন্দ্ব ঘাড়ে চাপিয়ে অনিতা ঢাকা গমন করেছে। যে দ্বান্দ্বিক হৃদয় নিয়ে সে ঢাকায় এসেছে, তার নিরসন বাতলে দিয়েছেন পরিচালক। এই চলচ্চিত্রে আরেক প্রধান চরিত্র সদ্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বামপন্থী নেতা সুমিত। বর্তমানে সে একটি দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত।

যুদ্ধপূর্ববর্তী সময়ে প্রগতিশীল নেতা সুমিতের প্রেম ছিল আরেক প্রগতিশীল নেতা মানবেন্দ্র বা মানু দা’র বোন হাসুর সঙ্গে। অসম সামাজিক এ সম্পর্কে কোনো পক্ষেরই তেমন আপত্তি ছিল না। কিন্তু যুদ্ধ সম্পূর্ণ ভিন্ন সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠা এই দুই মানুষকে এক হওয়ার সুযোগ দেয়নি। এই বিচ্ছেদে ঘনিয়ে উঠেছে সুমিতের মনোজাগতিক উদ্বিগ্নতা। নির্মাতা এই উদ্বিগ্নতার অবসান ঘটিয়েছেন অনিতার সাথে তার মিলনের মধ্য দিয়ে। এই দুই ব্যক্তির সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক সীমানায় স্পষ্ট ফারাক থাকা সত্ত্বেও লেখক তাদের শুধু মিলিতই করেননি; বরং প্রতীকী অর্থে তিনি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের ভেতর বসে প্রস্তাব করেছেন ভিন্ন এক রাষ্ট্রীয় নমুনা। সেখানে কল্পিত হয়েছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সীমানাবিহীন অবস্থা, ঠিক সাতচল্লিশ পূর্ববর্তী মানচিত্রের মতো।

‘ধীরে বহে মেঘনা’র শুরুতে নির্মাতা একটি প্রতিকী গল্পের ছলে দেখিয়েছেন তার পুরো ন্যারেটিভের ঐতিহাসিক রূপরেখা। গল্পটি সুমিতের বাবা, মা, সৎ বাবা, আর সৎ বোন নাজমাকে কেন্দ্র করে। একান্তই পারিবারিক এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন সুমিতের মা, শুনেছেন মানবেন্দ্র, ওদিকে আড়াল থেকে শুনেছে আরও একজন–অনিতা। গল্পটা এরকম : সুমিতের বাবা ছিলেন মায়ের থেকে বয়সে বড়, দুজনের মধ্যে তফাতও ছিল অনেক। এর আগে সুমিতের বাবার এক বিলিতি স্ত্রী ছিল, যাকে তিনি কোনোদিন ভুলতে পারেননি। সুমিতের বাবা প্রচন্ড জ্ঞানী ছিলেন। বলা যায়, তৎকালীন সমাজের পশ্চিমা আধুনিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ। একদিন একটি দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়।

অন্যদিকে আরেক চরিত্র রফিক সুমিতের মায়ের বয়সী হলেও চারিত্রিক গুণে অনন্য। নানান দেশ ঘুরে তিনি অর্জন করেছেন মুগ্ধতা ছড়ানো ব্যক্তিত্ব। সেই ব্যক্তিত্বই আকর্ষণ করেছে সুমিতের মাকে। বিয়ের প্রস্তাব বারবার ফিরিয়ে দিলেও হাল ছাড়েননি রফিক। একপর্যায়ে রফিকের প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ে সুমিতের মা, যার পরিণতিতে জুটি বাধে এই দম্পতি। কিন্তু একদিন সুমিতের মা জানতে পারে রফিকই সুমিতের বাবার খুনি, সম্পত্তির লোভে সে বিয়ে করেছে সুমিতের মাকে। অবশেষে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে মৃত্যু ঘটে রফিকের। গল্পের আরেক নিষ্ক্রিয় চরিত্র নাজমা, নাজমা রফিকের কন্যা যার জন্ম সুমিতের মায়ের গর্ভে; পারিবারিক এ সকল ঘটনার কোনো খবরই সে জানে না। পরিবারে এই বিরাট ঘটনার ব্যাপারে তার নেই কোনো অংশগ্রহণ, এমনকি পরোক্ষভাবেও না। তার আছে কেবল একরাশ ব্যক্তিগত দুঃখ।

উল্লেখিত চরিত্রগুলোর দ্বন্দ্ব মূলত প্রতীকী, যার পাঠোদ্ধারের মধ্য দিয়ে আমরা বুঝতে পারব নির্মাতার নির্মাণে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস ও তার গতি-প্রকৃতি। নির্মাতা এই প্রতীকী গল্পের প্রতিটি চরিত্রের মধ্যে আরোপ করেছেন আরেক প্রতীকী বয়ান। গল্পে সুমিতের মা হলো বাংলাদেশ ভূখণ্ড, যিনি একসময় জ্ঞান-বিজ্ঞানের পন্ডিত সুমিতের আপন বাবার সাথে সম্পর্কিত ছিল। সুমিতের বাবাকে হত্যা করে ছলনার মাধ্যমে যিনি বিয়ে করেছিলেন সুমিতের মাকে, সেই রফিক হলো পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিরূপ–নির্মাতার ভাষায়, যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে একপ্রকার ছলনার মধ্য দিয়ে। সুমিতের বাবাকে অনায়াসেই পাঠ করা চলে ৪৭ পূর্ববর্তী ব্রিটিশ ভারতের প্রতিরূপ হিসেবে। গল্পে সুমিতের মা, অর্থাৎ বাংলাদেশকে লেখক অভাগারূপে প্রতিকায়িত করেছেন। দেশকে যেমন অসাধু রাজনৈতিকেরা তাদের স্বার্থ হাসিলের পাটাতন হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে যুগের পর যুগ, বিশেষত পাকিস্তানিরা, তেমনি সুমিতের মাকে ব্যবহার করে রফিক হাসিল করতে চেয়েছেন সুমিতের বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি। সুমিত চরিত্রটি দেশের সচেতন মধ্যবিত্ত। তার কাছেই ধরা পড়ে মৃত্যুমুখে পড়েছিল রফিক। তেমনি এই সুমিতের হাতেই স্বাধীন হয়েছিল বাংলাদেশ, পরাজিত হয়েছিল পাকিস্তানি শক্তি। নাজমাকে প্রতিকায়িত করা হয়েছে দেশের সাধারণ জনগণের প্রতিরূপে, যারা শোষণের ব্যাপারে সচেতন না হলেও নিজেরা বঞ্চনার শিকার। তারা এ শোষণের মুক্তি চায়, কিন্তু মুক্তিদাতা কে! নির্মাতা সিনেমার ৫২ মিনিটের মাথায় সে সমস্যার সুরাহা করেছেন। নাজমার স্বামীকে হত্যার পর মিলিটারি যখন তাকে ধরে নিয়ে যায়, তখন সে ক্ষুদ্র একটি বাতায়নে মুখ বের করে মুক্তির উপায় অন্বেষণের চেষ্টা চালায়। ঠিক তখনই নির্মাতা মুক্তিদাতারূপে হাজির করেন ভারতীয় পতাকার প্রতীক। এর দ্বারা যেকোনো দর্শক উপলব্ধি করতে পারবেন নির্মাতার বয়ানের গতিপথ।

একটি স্বাধীন দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে অখণ্ড ভারতের ইউটোপিয়া কায়েমের বাসনা আদতে কতটুকু যুক্তিযুক্ত? যুক্তির ভিত্তি যতই হালকা হোক, হাল আমল এমনকি সে যুগেও এমন উদাহরণের কমতি ছিল না। যে জাতীয়তাবোধের বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে দুই দফায় স্বাধীন হয়েছে একটি দেশ, তার পুরাবৃত্তির এই বাসনা বাংলাদেশ নামক নয়া রাষ্ট্রকাঠামোর জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা বলার অবকাশ রাখে না। এই যে দুটি স্বাধীন ভূখণ্ডের অস্তিত্বে হস্তক্ষেপের বাসনা, দুইটি পৃথক জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক চরিত্রকে অস্বীকার করার প্রবণতা, একের উপর অন্যকে আরোপনের প্রচেষ্টা–এর পেছনে সক্রিয় রয়েছে দীর্ঘ উপনিবেশিক কতৃত্বের অপভ্রংশ। নির্মাতা আলমগীর কবিরের ‘ধীরে বহে মেঘনা’ এ ধরনের বয়ান তৈরির মধ্য দিয়ে নয়া ঔপনিবেশিক ক্ষমতা-কাঠামোর পথই সুগম করেন। এ ধরনের সর্বভারতীয় রাজনৈতিক বয়ানের মধ্য দিয়ে বেমালুম অপর হয়ে যায় ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক বর্গের অসংখ্য আদম সন্তান।

দুই বঙ্গের বৃহৎ পরিচয়কে ধারণ করে যে জনগোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছিল সাতচল্লিশ পূর্ববর্তী সময়ে, তাকে অস্বীকারের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নতুন কতৃত্বের সংকট। এ কথা অনস্বীকার্য যে, ঐতিহাসিক এবং নৃতাত্ত্বিকভাবে দুই বঙ্গের জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ পার্থক্যের সিলসিলা। যাপিত জীবন, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতায় দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে তফাত বিস্তর। আবুল মনসুর আহমদ সাক্ষ্য দিচ্ছেন :

  • বাংলার মানুষের সমাজ একটা নয়, দুইটা। সে দুইটা সমাজ এক্সক্লুসিভ। তাদের মধ্যে খাওয়া–পরা, বিবাহ–শাদি ইত্যাদি সামাজিক মিল নাই। তাই এগারশ বছর একই দেশে বাস করিয়া, একই খাদ্য পানীয় খাইয়াও তারা দুইটা পৃথক সমাজ রহিয়া গিয়েছে। এক সমাজের লোক জন্মিলে খৎনা করিয়া নিজস্ব সমাজে বাস করিয়া মরিয়া গোরস্থানে যায়, অপর সমাজের লোক অশৌচন্ত ও উপনয়ন করিয়া নিজের সমাজে বাস করিয়া মৃত্যুর পর শ্মশানে যায়। ফলে এই দুইটি সমাজে দুইটা প্যারালাল কালচার গড়ে উঠিয়াছে। জাতীয় কালচার গড়ে ওঠে নাই। বাংলা ভাগের মধ্যে দুইটা কালচার নিজ–নিজ আশ্রয়স্থল খুঁজিয়া পাইয়াছে।১

যে জীবন মানুষের কাম্য, সামাজিক দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে যার উদ্ভাসন ঘটে, সেটাই মানুষের প্রগতি। সাতচল্লিশের দেশভাগ ছিল এই দুই জনপদের মানুষের হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা। এই আকাঙ্ক্ষা তাকে দিয়েছে যাপিত জীবনের স্বাধীনতা, নিজ জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোনো প্রকার সাম্প্রদায়িক সংঘাত ছাড়াই জীবনযাপনের সুযোগ। কিন্তু নির্মাতা আলমগীর কবির এই দুই জনপদের স্পষ্ট সীমানা থাকা সত্ত্বেও আরোপ করতে চেয়েছেন এমন এক একীভূত সামাজিক কাঠামো, যার সুরাহা হয়ে গিয়েছে ‘ধীরে বহে মেঘনা’র অন্তত দুই যুগ আগে।

দুই বাংলার বাহ্যিক জীবনের ছায়ায় যে কেবল বিভাজনের চিত্র বিদ্যমান রয়েছে তা নয়, এদের মনস্তাত্ত্বিক পরিগঠন, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, এমনকি কাব্য জগতেও রয়েছে বিপুল ব্যবধান। একদিকে নদীমাতৃক জীবন, সে জীবনের মুখ্য বিষয় সংগ্রাম আর গতিশীলতা। অন্যদিকে রয়েছে শালবন বিধৃত এমন এক জীবন, যা প্রকৃতির মত স্থবির। এই পরস্পর বিরোধী দুই প্রাকৃতিক সত্তার সঙ্গে লেপ্টে আছে দুই জনপদের কাব্য ধরার ভিন্ন দুই রূপ ও রস। হুমায়ুন কবিরের মতে :

  • পশ্চিম–বাঙলায় শালবন আর কাঁকরের পথ–দিগন্তে প্রান্তর দৃষ্টিসীমার বাইরে মিলিয়ে আসে। শীর্ণ জলধারার গভীর রেখা কাটে দীর্ঘ সংখ্যাহীন স্রোতস্বিনী। বাতাসে তীব্রতার আভাস, তপ্ত রৌদ্রে কাঠিন্য, দিনের তীক্ষ্ম ও সুস্পষ্ট দীপ্তির পর অকস্মাৎ সন্ধ্যার মায়াবী অন্ধকারে সমস্ত মিলিয়ে যায়। রাত্রি-দিনের অনন্ত অন্তরকে মনের দিগন্তে উদাস করে তোলে। পশ্চিম–বাঙলার প্রকৃতি তাই বাঙালির কবি মানসকে যে রূপ দিয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে লোকাতীত রহস্যের আভাস।২

পশ্চিমবঙ্গের প্রকৃতির সমান্তরালেই সেখানকার মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিগঠন, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে কাব্যে। প্রকৃতির স্থবিরতা মানুষের উদাস মনকে তার প্রতি অনুরাগী করে তোলে, তাকে ধাবিত করে জাগতিক সম্পর্কগুলোকে ছাড়িয়ে অন্য জগতের দিকে। এই আধ্যাত্বিক চরিত্রের প্রকাশ ঘটে কাব্যের মধ্যে। কিন্তু পূর্ববঙ্গের প্রাকৃতিক গঠন, মনস্তাত্ত্বিক সংকট কিংবা কাব্য ধারা–সবখানে রয়েছে ভিন্ন এক দ্যোতনা, ভিন্ন ধরনের রূপ-রস-গন্ধ। সবুজ প্রকৃতি, নদী, চরে গড়ে ওঠা একের পর এক জনপদ আর তাদের ভাঙ্গা গড়ার গল্প পূর্ববঙ্গকে সম্পূর্ণ আলাদা করেছে পশ্চিমবঙ্গের জীবন থেকে। বিচিত্র প্রাণ চাঞ্চল্য এ জনগোষ্ঠীকে দিয়েছে ভিন্ন এক সাংস্কৃতিক জীবন, যে জীবনের হদিস পাওয়া যায় এখানকার কাব্যচর্চায় :

  • বাঙলার পূর্বাঞ্চলের প্রকৃতি ভিন্নধর্মী। পূর্ব–বাঙলার নিসর্গ হৃদয়কে ভাবুক করেছে বটে, কিন্তু উদাসী করেনি। দিগন্ত প্রসারিক প্রান্তরের অভাব সেখানে নেই, কিন্তু সে প্রান্তরে রয়েছে অহোরাত্র জীবনের চঞ্চল লীলা। পদ্মা–যমুনা–মেঘনার অবিরাম স্রোতধারায় নতুন জগতের সৃষ্টি ও পুরাতনের ধ্বংস। প্রকৃতির বিপুল শক্তি নিয়তই উদ্যত হয়ে রয়েছে, কখন আঘাত করবে তার ঠিকানা নাই। কূলে কূলে জল ভরে ওঠে, সোনার ধানে পৃথিবী ঐশ্বর্যময়ী, আর সেই জীবন ও মরণের অনন্ত দোলার মধ্যে সংগ্রামশীল মানুষ। প্রকৃতির যে ঔদার্য, সৃষ্টি এবং ধ্বংসের–সেই সংহত শক্তি ভোলবার অবসর কই? চরের মানুষ নদীর সাথে লড়াই করে, জলের ঐশ্বর্যকে লুটে জীবনের উপাদান আনে। লোকাতীতের মহত্ব হৃদয়কে সেখানেও স্পর্শ করে, তাই মনের দিগন্তকে প্রসারিত করেই তার পরিসমাপ্তি।৩

প্রকৃতির এই বিপুল ব্যবধান প্রভাবিত করেছে মানুষের মনকে, যার শৈল্পিক প্রকাশ ঘটেছে দুই বাংলার স্পষ্ট কাব্যিক বিভাজনে। ভাবুক রহস্যে ঘেরা পশ্চিমের কাব্য আর সংগ্রামী কৃষিজীবী পুবের কাব্যে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মনন ও আঙ্গিক। এই মননের প্রকাশ কেবল কাব্য জগতের ভেতরেই বদ্ধ না, দুই জনপদের রাজনৈতিকতার মধ্যেও এর উপাদান নিহিত। পশ্চিমবঙ্গ যেখানে বারবার ঔপনিবেশিক শক্তির সামনে নিজ সত্তাকে হারিয়েছে, সেখানে পূর্ব বাঙলা আমরণ লড়াই করেছে আত্মসত্তাকে টিকিয়ে রাখার জন্য। পশ্চিম সরাসরি রাজশক্তি আর্য কিংবা ইংরেজ দ্বারা নতজানু হয়েছে ইতিহাসের পরম্পরায়, সেখানে পূর্ব সর্বান্তকরণে চেষ্টা চালিয়েছে আধিপত্যের বিরুদ্ধে। এমনকি রাজনীতি ছাড়িয়ে সে তার ভাষার জগতেও অবস্থান করেছে রাজশক্তির প্রতিমূখে :

  • বাঙলার বৌদ্ধবিপ্লব কেবলমাত্র ধর্ম বিপ্লব নয়। বাঙলাদেশে এ বিপ্লব উত্তর ভারতীয় আর্যসংস্কৃতির বিরুদ্ধে ধ্বজা তুলেছিল, সেই বিদ্রোহের মধ্যে পেয়েছিল রাজনৈতিক প্রেরণা। তার ফলে সংস্কৃতের হলো পরাজয়, প্রাকৃত ও দেশজ ভাষার দিকে পড়ল ঝোঁক।৪

ইতিহাসের সকল শাখায় জমা হয়ে আছে দুই বাংলার অজস্র ভিন্নার্থক জীবনযাপন ও তৎপরতার দৃশ্য। রাজনৈতিকভাবে এসকল দ্বন্দ্বমূলক তৎপরতা অবসানের সূচনা ঘটেছিল সাতচল্লিশে। কিন্তু বাঙালি মুসলমান তার আশার কুটিরে যে আলো জ্বেলেছিল, তার শেষ রক্ষা হয়নি। সৃষ্টি হয় নতুন বন্দোবস্তের আকাঙ্ক্ষা। একাত্তরে সেই কাঙ্ক্ষিত বন্দোবস্তের আপাত রাজনৈতিক সুরাহার মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয় নতুন ভূখণ্ড। আর তার সাথে সাথেই ভস্মিভূত হয়ে যায় অন্য সব জাতীয়তাবাদী বাসনা। কেননা বাঙালি জাতীয়তাবাদী উপাদানকে আশ্রয় করেই এই নতুন রাষ্ট্রের সূচনা। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই ভূ-খণ্ডে, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মনস্তত্ত্বে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ছাপ কতটা তা প্রশ্নসাপেক্ষ, কিন্তু বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র জন্ম নিয়েছিল পূর্ববঙ্গের বাঙালি জনগোষ্ঠীর বরাত দিয়েই। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি পূর্ববঙ্গের মানুষের অধিকার, লড়াই ও সংগ্রামেরই ফলাফল। অথচ নির্মাতা আলমগীর কবির এই স্বাধীন ভূখণ্ড ব্যবহার করে এমন এক বয়ানের মঞ্চায়ন করেছেন, যার সম্ভাব্যতা কেবল হাজির ছিল সাতচল্লিশ পূর্ববর্তী বাস্তবতায়। তার প্রস্তাবিত দুই রাষ্ট্র কাঠামোর একীভূত রূপ তাই বর্তমান থেকে ইতিহাসে যাত্রা, বাস্তবকে কল্পনায় বদলে দেওয়ার নামান্তর।

হদিস

১. আবুল মনসুর আহমদ (২০১৭), বাংলাদেশের কালচার, আহমদ পাবলিশিং হাউজ, ঢাকা।

২. হুমায়ূন কবির (২০২০), বাঙলার কাব্য, কবি প্রকাশনী, ঢাকা।

৩. হুমায়ুন কবির, প্রাগুক্ত, কবি প্রকাশনী, ঢাকা।

৪. হুমায়ুন কবির, প্রাগুক্ত, কবি প্রকাশনী, ঢাকা।