ইমাম গাজালির মাকাসিদুল কুরআন, জ্ঞানের উৎস ও শ্রেণিবিন্যাস | মু. সাজ্জাদ হোসাইন খাঁন
মুকাদ্দিমা
মাকাসিদুল কুরআন বলতে বুঝায় আল কুরআনুল কারিমের মৌলিক ও প্রধান আলোচ্য বিষয়কে। আবার কোনো কোনো আলিম কুরআন নাজিলের উদ্দেশ্যকেই মাকাসিদুল কুরআন হিসেবে অভিহিত করেছেন। মাকাসিদুল কুরআন নিয়ে কথা বলতে গেলে সর্বপ্রথম যার নাম আসে, তিনি হচ্ছেন ইমাম আবু হামিদ আল গাজালি (মৃ. ৫০৫ হিজরি)। তিনিই সর্বপ্রথম এই বিষয়ে স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেন। ইমাম গাজালি বলেন, কুরআনের মৌলিক মাকসাদ হচ্ছে— আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দিকে মানুষকে আহ্বান জানানো, দাওয়াত দেওয়া। আবার এই মৌলিক মাকসাদটি ৬টি শাখায় বিভক্ত। গাজালি মনে করেন, সকল প্রকার দ্বীনি জ্ঞানের উৎসই হচ্ছে আল কুরআনুল কারিম এবং প্রতিটি জ্ঞানের মর্যাদা ও মর্তবা নির্ণীত হয় মাকাসিদুল কুরআনের সাথে তার সম্পর্কের ভিত্তিতে। গাজালি আরও মনে করেন, সকল প্রকার জাগতিক জ্ঞানও উৎসারিত হয়েছে আল কুরআন থেকে, মাকাসিদুল কুরআনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শাখা আল্লাহ তায়ালার মারিফত থেকে; আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে আল্লাহর আফয়ালের (কর্মের) মারিফত থেকে।
‘মাকাসিদুল কুরআন’ কী?
‘মাকাসিদ’ শব্দটি সচরাচর আমরা ‘শরিয়ত’ শব্দের সাথে যুক্ত হিসেবেই শুনে থাকি। কুরআনের সাথেও মাকাসিদ শব্দটি জুড়েছেন উলামারা। আসলে, মাকাসিদুল কুরআনের পূর্ণাঙ্গ কোনো সংজ্ঞা আমরা মুতাকাদ্দিমুন (প্রথম যুগের) আলিমদের কাছে পাই না। তবে ইমাম তাবারি থেকে শুরু করে হাল আমল পর্যন্ত যেসব আলিম এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন, তাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে আমরা মাকাসিদুল কুরআনের মোটামুটি তিনটি সংজ্ঞা দাঁড় করাতে পারি।
১. মৌলিকভাবে, মুতাকাদ্দিমুন আলিমসহ অধিকাংশ উলামা ‘মাকাসিদুল কুরআন’ বলতে আল কুরআনুল কারিমের মৌলিক ও প্রধান আলোচ্য বিষয়গুলোকেই বুঝিয়েছেন। যেমন, ইমাম ফখরুদ্দিন আর রাজি বলেছেন—
إن مقاصد القرآن التوحيد، والأحكام الشرعية، وأحوال المعاد.
“মাকাসিদুল কুরআন হচ্ছে— তাওহিদ, শরিয়তের আহকাম এবং আখিরাতের অবস্থা।”1
তাই ড. ঈসা বু উক্কায বলছেন, মাকাসিদুল কুরআন হচ্ছে—
المقاصد التي دارت عليها سور القرآن الكريم وآياته تعريفا برسالة الإسلام، وتحقيقا لمنهجه في هداية البشر.
“মাকাসিদুল কুরআন হচ্ছে ওই বিষয়গুলো, যেগুলোকে কেন্দ্র করে আল কুরআনুল কারিমের সকল সূরা ও আয়াতগুলো আবর্তিত হয় এবং যেগুলো ইসলামি রিসালাতের (মিশনের) পরিচয় হাজির করে এবং মানুষের হিদায়াতের ব্যাপারে তার অনুসৃত পদ্ধতি বাস্তবায়ন করে।”2
২. কোনো কোনো আলিম অবশ্য ‘মাকাসিদুল কুরআন’ ও ‘মাকাসিদুশ শরিয়াহ’কে প্রায় সমার্থকই বিবেচনা করেছেন। যেমন ইজ্জ ইবনু আব্দিস সালাম বলেছেন—
ومعظم مقاصد القرآن الأمر باكتساب المصالح وأسبابها، والزجر عن اكتساب المفاسد وأسبابها.
“কুরআনের অধিকাংশ মাকসাদই হচ্ছে— মাসলাহাত ও তার উপকরণ অর্জনের আদেশ এবং মাফসাদাত ও তার উপকরণ অর্জন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ।”3
ইমাম ইজ্জুদ্দিন ইবনু আব্দিস সালামের এই সংজ্ঞা থেকে পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে, তিনি মাকাসিদুল কুরআন বলতে মাকাসিদুশ শরিয়াহকেই ইশারা করছেন। কেননা আলিমদের মাঝে এই কথা স্বতঃসিদ্ধ, শরিয়তের মাকাসিদ হচ্ছে—
جلب المصالح ودرء المفاسد.
“মাসলাহাত (কল্যাণ) আনা এবং মাফসাদাত (অকল্যাণ) দূর করা।”
৩. মুতাআখখিরুন (পরবর্তী যুগের) আলিমদের মধ্যে যারা এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন, তাদের অধিকাংশই ‘মাকাসিদুল কুরআন’ বলতে বুঝিয়েছেন— কুরআন কেন, কী উদ্দ্যেশ্যে নাজিল হয়েছে। উসতায রাশিদ রিদার ‘আল ওয়াহি আল মুহাম্মাদি’ এবং উসতায ইউসুফ আল কারযাভীর ‘কাইফা নাতাআমালু মাআল কুরআন’ কিতাবে মাকাসিদুল কুরআন বিষয়ক আলোচনাই এই কথার সবচেয়ে উজ্জ্বল নমুনা। উসতায আল্লাল আল ফাসি এবং আল্লামা তাহির ইবনু আশুরও ‘মাকাসিদুল কুরআন’ বলতে কুরআন নাজিল হওয়ার উদ্দেশ্যকেই বোঝাতে চেয়েছেন। আব্দুল কারিম হামিদি মাকাসিদুল কুরআনকে সংজ্ঞায়ন করছেন এভাবে—
الغايات التي أنزل القرآن لأجلها تحقيقا لمصالح العباد، فالغايات المراد بها المعاني والحكم المقصودة من إنزال القرآن وهذه الغايات تهدف إلى تحقيق مصالح العباد في العاجل والآجل.
“মাকাসিদুল কুরআন হচ্ছে ওই সকল উদ্দেশ্য, যার জন্য কুরআন নাজিল হয়েছে বান্দাদের মাসলাহাত বাস্তবায়ন করতে। অতএব উদ্দেশ্যের মানে হচ্ছে— কুরআন নাজিল হওয়ার পিছনে উদ্দীষ্ট অন্তর্নিহিত মর্ম এবং হিকমত। আর এই উদ্দেশ্যগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যই হচ্ছে দুনিয়া ও আখিরাতে বান্দার মাসলাহাত নিশ্চিত করা।”4
গাজালি ও মাকাসিদুল কুরআন
ইমাম গাজালিই সর্বপ্রথম ‘মাকাসিদুল কুরআন’ বিষয়ক স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি লিখেন— ‘জাওয়াহিরুল কুরআন ওয়া দুরারুহ’ (কুরআনের মণিমুক্তা)। তার পরে যারাই এই বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন, তাদের অধিকাংশই গাজালির সূত্র ধরে আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। ইবনু জুযাই আল কালবি তাদের মাঝে অগ্রগণ্য।
মাকাসিদুল কুরআনের ওপর রচিত এই কিতাবকে গাজালি মোট ৩টি অধ্যায়ে ভাগ করেছেন। প্রথম অধ্যায়ে তিনি ভূমিকা ও প্রাক আলোচনা সেরেছেন আর একে ভাগ করেছেন মোট ১৯টি পরিচ্ছদে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে তিনি তুলে ধরেছেন মাকাসিদ এবং একে ভাগ করেছেন ‘জাওয়াহিরুল কুরআন’ (কুরআনের জহরত) ও ‘দুরারুল কুরআন’ (কুরআনের মুক্তাদানা) নামক পৃথক দুটি পরিচ্ছদে। আর সবশেষ, তৃতীয় অধ্যায়ে তিনি আলোচনা করেছেন ‘লাওয়াহিক’ বা ‘সংশ্লিষ্ট ও অনুগামী’ বিষয়গুলো নিয়ে।
মাকাসিদুল কুরআনের ওপর রচিত গাজালির এই কিতাবটি বিষয়বস্তুর বিচারে খুবই বস্তুনিষ্ঠ। অপ্রাসঙ্গিক বা ভিন্ন কোনো বিষয়ের আলোচনা গাজালি এতে অনুপ্রবেশ করান নি। অথচ তার আগে বা পরে যারাই ‘মাকাসিদুল কুরআন’ নিয়ে লিখেছেন, তাদের প্রায় সবাই-ই অন্যান্য এমন অনেক বিষয়ের সাথে একে মিশিয়ে ফেলেছেন, যেগুলোর সাথে এর কোনো সম্পর্কই নেই। উদাহরণস্বরূপ আমরা বলতে পারি— ইবনু আরাবির ‘কানুনুত তাবিল’, ইমাম শাতিবির ‘আল মুওয়াফাকাত ফি উসুলিশ শরিয়াহ’ এবং শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়ার ‘জাওয়াবু আহলিল ইলম ওয়াল ঈমান’ ও ‘মাজমুয়ুল ফাতাওয়া’সহ অন্যান্য কিতাবের কথা।
মাকাসিদুল কুরআনের সংজ্ঞা
ইমাম গাজালি তার কিতাবে মাকাসিদুল কুরআনের কোনো সংজ্ঞায়ন করেন নি; কিন্তু তার আলোচনা থেকে বোঝা যায়, তিনিও ‘মাকাসিদুল কুরআন’ বলতে আল কুরআনুল কারিমের মৌলিক ও প্রধান আলোচ্য বিষয়গুলোকেই বুঝিয়েছেন। গাজালি তার এই কিতাবের প্রথম অধ্যায়, দ্বিতীয় পরিচ্ছদে (পরিচ্ছদের শিরোনাম ফাসলুন ফি হাসরি মাকাসিদিল কুরআন ওয়া নাফায়িসি) বলছেন—
فلذلك انحصرت سُوَرُ القرآن وآياتُه في ستة أنواع.
“এ কারণেই কুরআনের সকল সূরা এবং আয়াতগুলো মোট ৬টি বিষয়ে সীমিত হয়ে গেছে...।”5
মাকাসিদুল কুরআন কী কী?
গাজালির কাছে, আল কুরআনুল কারিমে প্রধান ও মৌলিক মাকসাদ হচ্ছে— মানুষকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দিকে ডাকা, আহ্বান করা। গাজালি বলছেন—
سِرُّ القرآن، ولُبَابُه الأصفى، ومقصدُهُ الأقصى، دعوَةُ العباد إلى الجَبَّار الأعلى، ربِّ الآخرةِ والأولى، خالق السماوات العُلَى، والأرَضين السُلفى، وما بينهما وما تحت الثَّرَى.
“কুরআনের আসল রহস্য, তার নিরেট শাস এবং সর্বোচ্চ মাকসাদ হলো— বান্দাদের সুউচ্চ ও পরাক্রমশালী, দুনিয়া ও আখিরাতের রব, সুউচ্চ আসমান ও সুগভীর জমিনের সৃষ্টিকর্তা এবং এই দুইয়ের মাঝে ও মাটির নিচে যা কিছু আছে, তারও সৃষ্টিকর্তার (অর্থাৎ আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের) দিকে আহ্বান করা।”6
গাজালি বলছেন, আল কুরআনুল কারিমের সকল আয়াত ও সূরাগুলো এই মৌলিক মাকসাদ এবং এর থেকে নির্গত হওয়া ৬টি শাখাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। এই ছয়টি শাখা আবার ২ভাগে বিভক্ত। প্রথম ৩টিকে গাজালি নাম দিয়েছেন— ‘السوابق والأصول المهمة’ বা ‘অগ্রবর্তী ও মৌলিক উসুল’ আর পরের তিনটিকে বলেছেন— ‘ الروادف والتوابع المغنية المتمة’ বা ‘অনুগামী ও পূর্ণতা দানকারী সহযোগী বিষয়’।
অগ্রবর্তী ও মৌলিক উসুল ৩টি হলো—
১. মাদয়ু ইলাহির (অর্থাৎ যার দিকে ডাকা হচ্ছে তথা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের) মারিফত;
২. সেই সিরাতুল মুসতাকিমের মারিফত, আল্লাহর পথে চলতে যা অনুসরণ করে চলা আবশ্যক এবং
৩. আল্লাহর কাছে পৌঁছে যাওয়ার পর বান্দাদের হালত কী হবে, তার মারিফত।
সহজ ভাষায় বললে, এই তিনটি বিষয়কে আমরা এভাবে বলতে পারি—
১. আল্লাহর মারিফত;
২. সিরাতুল মুসতাকিম মারিফত এবং
৩. আখিরাতের মারিফত।
আল কুরআনের মৌলিক মাকসাদের অনুগামী ও পূর্ণতা দানকারী সহযোগী বিষয় ৩টি হলো—
৪. যারা রাসূলুল্লাহ সা. এর দাওয়াতে সাড়া দিয়েছে এবং যারা সাড়া দেয় নি, তাদের অবস্থার মারিফত;
৫. যুক্তিতর্কের মাধ্যমে কাফিরদের অজ্ঞতা, বিভ্রান্তি, মিথ্যা কল্পনা ও বাতিল চিন্তার খণ্ডন এবং
৬. (আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের) পথে চলার মনজিলগুলো কীভাবে আবাদ করতে হয়, কীভাবে তার জন্য আসবাবপত্র, সরঞ্জাম ও পাথেয় যোগাড় করতে হয় এবং কীভাবে সেই পথে চলার প্রস্তুতি নিতে হয়, তার মারিফত।
সহজ ভাষায় বললে, এই তিনটি বিষয়কে আমরা এভাবে বলতে পারি—
৪. কাসাসুল কুরআন (কুরআনের ঘটনাবলি);
৫. জাদালুল কুরআন (কুরআনি বিতর্ক) এবং
৬. আহকাম (বিধিবিধান)।
এখন আল কুরআনুল কারিমের মৌলিক মাকসাদ থেকে নির্গত এই ছয়টি শাখার বিস্তারিত আলোচনায় আমরা প্রবেশ করতে চাই।
অগ্রবর্তী ও মৌলিক উসুল
১. আল্লাহর মারিফত
আল কুরআনুল কারিমের প্রথম ও প্রধান আলোচ্য বিষয় গাজালির ভাষায়, ‘ تعريف المدعو إليه’ বা ‘যার দিকে ডাকা হচ্ছে অর্থাৎ আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের মারিফত।’ আল্লাহর মারিফতকে গাজালি তুলনা করছেন— ‘الكبريت الأحمر’ বা রেড সালফারের সাথে। আল্লাহর মারিফত আবার ৩ ভাগে বিভক্ত—
ক. জাতের মারিফত;
খ. সিফাতের মারিফত এবং
গ. আফয়ালের (কর্মের) মারিফত।
ক. আল্লাহর জাতের মারিফত: গাজালির ভাষায়, আল্লাহর জাতের মারিফত হাসিল করা খুবই কঠিন বিষয়। আল্লাহর জাতের বিবরণ হাজির করাও মানুষের দুঃসাধ্য বিষয়। এজন্য আল্লাহর জাতের মারিফতকে গাজালি তুলনা করছেন মহামূল্যবান ‘الياقوت الأحمر’ বা ‘Ruby’ পাথরের সাথে। যার সামান্য একটু পেলেই রাজা-বাদশাহরা নিজেদের ধনী মনে করে, অথচ অন্যান্য পাথর অনেক পরিমাণে পেলেও তারা এমনটি করে না।
যেহেতু আল্লাহর জাতের মারিফত সবচেয়ে মহামূল্যবান এবং তা হাসিল করা ও বর্ণনা করাও খুবই দুঃসাধ্য ব্যাপার, তাই আল কুরআনুল কারিমে খুব কমই ইলাহি জাতের বর্ণনা এসেছে। আর যতটুকু বর্ণনা এসেছে, তাও কেবল ইশারা বলা চলে। আল কুরআন যেখানেই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জাতের বর্ণনা দিয়েছে, সেখানেই সে ‘মুতলাক তাকদিস’ ও ‘মুতলাক তাজিম’ অর্থাৎ নিঃশর্তভাবে পবিত্র জ্ঞান করা ও সম্মান প্রদর্শন করার কথা বলেছে। যেমন মুতলাক তাকদিসের নির্দেশনা দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—
لَیۡسَ کَمِثۡلِهٖ شَیۡءٌ ۚ... ﴿۱۱﴾
“কোনো কিছুই তাঁর মতো নয়।” সূরা শুরা : ১১
قُلۡ هُوَ اللّٰهُ اَحَدٌ ۚ﴿۱﴾ اَللّٰهُ الصَّمَدُ ۚ﴿۲﴾ لَمۡ یَلِدۡ ۬ۙ وَ لَمۡ یُوۡلَدۡ ۙ﴿۳﴾ وَ لَمۡ یَکُنۡ لَّهٗ کُفُوًا اَحَدٌ ﴿۴﴾
“বলুন, তিনি আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়। আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাউকেও জন্ম দেননি এবং তাকেও জন্ম দেয়া হয়নি। আর তাঁর সমতুল্য কেউই নেই।” সূরা ইখলাস : ১-৪
মুতলাক তাজিমের নির্দেশনা দিয়ে কুরআন বলছে—
سُبۡحٰنَهٗ وَ تَعٰلٰی عَمَّا یَصِفُوۡنَ ﴿۱۰۰﴾ بَدِیۡعُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ؕ...﴿۱۰۱﴾
“তিনি পবিত্র- মহিমান্বিত! আর তারা যা বলে তিনি তার অনেক ঊর্ধ্বে। তিনি আসমান ও জমিনের সৃষ্টিকর্তা।” সূরা আনআম : ১০০, ১০১
খ. আল্লাহর সিফাতের মারিফত: আল্লাহর জাতের মারিফত হাসিল করার চেয়ে সিফাতের মারিফত হাসিল করার আওতা বিস্তৃত এবং বর্ণনার পরিধিও ব্যাপক। তাই আল কুরআনুল কারিমে আল্লাহর জাতের চেয়ে সিফাতের আয়াত অনেক বেশি এসেছে। ইলম, কুদরত, হায়াত, কালাম, হিকমত, সাম’ (শোনা) ও বাসার (দেখা)সহ আরও অসংখ্য ইলাহি সিফাতের বর্ণনা দিয়েছে কুরআন। আল্লাহর সিফাতের বিবরণকে গাজালি তুলনা করেছেন ‘الياقوت الأكهب’ বা ‘Jacinth’ পাথরের সাথে।
গ. আল্লাহর আফয়ালের মারিফত: আল্লাহর ‘আফয়াল’ বা কর্মের পরিধি এতই বিস্তৃত যে, তা যেন এক কুল-কিনারাহীন সাগর। তালাশ করে কারো পক্ষেই এর কুল-কিনারার সন্ধান করা সম্ভব নয়। গাজালি বলছেন, অস্তিত্বের জগতে কেবল আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আর তাঁর আফয়ালই আছে। আল্লাহ ছাড়া বিশ্বজাহানের বাকি সবকিছুই তাঁর আফয়াল। আল্লাহর আফয়ালের বিবরণকে গাজালি তুলনা করেছেন ‘الياقوت الأصفر বা ‘Topaz’ পাথরের সাথে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কিছু আফয়ালকে আমরা প্রত্যক্ষ করি দৃশ্যমান জগতে। আসমান, জমিন, গ্রহ, নক্ষত্র, পাহাড়-পর্বত, গাছপালা, পশুপাখি, সাগর, নদী সবকিছুই আল্লাহর আফয়াল।
দৃশ্যমান জগতের আফয়ালের চেয়ে অদৃশ্য জগতের আফয়াল আরও বেশি বিস্ময়কর এবং আরও সীমাহীন। অদৃশ্য জগতের মধ্যে রয়েছে— ফিরিশতা ও শয়তান। মানুষের রুহ আর কলবও অদৃশ্য জগতেরই অন্তর্ভুক্ত। অদৃশ্য জগতের আফয়াল এতই বিস্তৃত যে, তা বর্ণনা করা শেষ করা যাবে না। সেই জগতে কিছু আছে মানুষের ব্যাপারে, দুনিয়াবি কাজকর্মের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফিরিশতা। আবার এমনও কিছু ফিরিশতা আছে, যারা অবস্থান করে পবিত্র প্রাঙ্গণে। তারা সার্বক্ষণিক আল্লাহর জিকির আর তাসবিহ নিয়েই পড়ে আছে। মানুষের দিকে তাকানোর সুযোগও তাদের নেই। কীভাবেই-বা তারা তাকাবে মানুষের দিকে? তারা ব্যস্ত আছে মানুষের রবকে নিয়ে। এমনকি তারা জানেও না, দুনিয়ায় এমন কোনো সৃষ্টি আছে কিনা, যারা আল্লাহর অবাধ্যতা করে। গাজালি ইবনু আব্বাসের সূত্রে বর্ণনা করছেন, নবিজি সা. বলেছেন—
إن للهِ أرضاً بيضاء، مسيرةُ الشمس فيها ثلاثون يوماً، مِثلُ أيام الدنيا ثلاثين مرة، مشحونةٌ خلقاً لا يعلمون أن الله تعالى يُعْصَى في الأرض، ولا يعلمون أن الله تعالى خلق آدَمَ وإبليس.
“আল্লাহর একটি শুভ্র সাদা জমিন আছে। সেখানে সূর্যের (একবারের) পরিভ্রমণ (অর্থাৎ একদিনের পরিমাণ) ত্রিশ দিনের অর্থাৎ এই দুনিয়ার ত্রিশবার পরিভ্রমণের সমান। সেই জগত এমন মাখলুকাত দিয়ে ভরপুর, যারা জানেই না জমিনে কেউ আল্লাহর অবাধ্যতা করে। তারা জানেই না, আল্লাহ তায়ালা আদম ও ইবলিসকে সৃষ্টি করেছেন।”
জাত, সিফাত ও আফয়াল— আল্লাহর মারিফতের এই তিন প্রকার বর্ণনা করার পর গাজালি বলছেন—
فإنها زُبْدَةُ القرآن وقلبُهُ ولُبَابُه وسِرُّه.
“এগুলোই হচ্ছে কুরআনের শ্রেষ্ঠাংশ ও সারকথা, তার কলব, তার মূল শাঁস এবং তার আসল রহস্য।”8
২. সিরাতুল মুসতাকিমের মারিফত
সিরাতুল মুসতাকিম বা আল্লাহ তায়ালার পথ হচ্ছে— ‘তাবাত্তুল’ বা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর স্মরণে মজে যাওয়া। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—
وَ اذۡکُرِ اسۡمَ رَبِّك وَ تَبَتَّلۡ اِلَیۡهِ تَبۡتِیۡلًا ؕ﴿۸﴾
“আর আপনি আপনার রবের নাম স্মরণ করুন এবং তার প্রতি মগ্ন হোন একনিষ্ঠভাবে।” সূরা মুযযাম্মিল : ৮
এই আয়াত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গাজালি বলছেন—
انقَطِعْ إليه، والانْقِطاع إليه يكون بالإقبال عليه، والاعراضِ عن غيره، وتَرجمَتُهُ قوله {لاَ إله إِلاَّ هُوَ فاتخذه وَكِيلاً} . والإقبالُ عليه إنما يكون بملازمة الذِّكر، والإِعراضُ عن غيره يكون بمخالفة الهَوَى والتَّنَقِّي عن كدورات الدنيا وتزكيةِ القلب عنها، والفلاحُ نتيجتها كما قال الله تعالى {قَدْ أَفْلَحَ مَن تزكى وَذَكَرَ اسم رَبِّهِ فصلى}
“একনিষ্ঠভাবে তাঁর প্রতি নিমগ্ন হোন। আর তাঁর প্রতি নিমগ্ন হওয়া সম্পন্ন হবে— তাঁর দিকে গমন এবং তাঁকে ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে বিমুখ হওয়ার মাধ্যমে। আর এ কথারই তরজমা হচ্ছে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের এই বাণী—
“তিনি ছাড়া আর কোনো (সত্য) ইলাহ নেই; অতএব তাকেই আপনি গ্ৰহণ করুন উকিল (কর্মবিধায়ক) হিসেবে।” সূরা মুযযাম্মিল : ৯
আল্লাহর দিকে গমন সম্পন্ন হবে— সার্বক্ষণিক আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকার মাধ্যমে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে বিরত থাকা সম্পন্ন হবে— প্রবৃত্তির বিরোধিতা, দুনিয়ার কদর্যতা থেকে পবিত্র থাকা এবং তা থেকে কলবের তাজকিয়া হাসিলের মধ্য দিয়ে। আর আল্লাহর দিকে গমন ও তিনি ছাড়া অন্য কিছু থেকে বিমুখ থাকার ফলাফলই হচ্ছে— সফলতা। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—
“অবশ্যই সফলতা লাভ করবে যে তাজকিয়া হাসিল করে। আর তার রবের নাম স্মরণ করে এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করে।” সূরা আলা : ১৪,১৫”9
অতএব গাজালির কাছে, সিরাতুল মুসতাকিম বা আল্লাহর পথের স্তম্ভ হচ্ছে ২টি। যথা—
১. মুলাজামা বা লেগে থাকা: সার্বক্ষণিক আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জিকিরে লেগে থাকা।
২. মুখালাফা বা বিরত থাকা: যা কিছু আল্লাহ তায়ালা থেকে গাফিল রাখে, তা থেকে বিরত থাকা।
গাজালি বলছেন, সিরাতুল মুসতাকিমের পথে চলার এই সফর হচ্ছে— আল্লাহর দিকে সফর। তবে এই সফরে কোনো নড়াচড়া বা পথচলা নেই; মুসাফিরের দিক থেকেও না, যার দিকে সফর করা হচ্ছে তার দিক থেকেও না। কেননা তারা উভয় একসাথেই থাকে। যেমনটি আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন—
وَ نَحۡنُ اَقۡرَبُ اِلَیۡهِ مِنۡ حَبۡلِ الۡوَرِیۡدِ ﴿۱۶﴾
“আর আমরা তার গ্ৰীবাস্থিত ধমনীর চেয়েও নিকটতর।” সূরা কাফ : ১৬
আল্লাহ পানে এই সফরের মুসাফির এবং যার দিকে সফর করা হচ্ছে (অর্থাৎ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন), গাজালি তাদের তুলনা করছেন— তালিব আর মাতলুবের সাথে, আয়না আর তাতে ফুটে উঠা প্রতিবিম্বের সাথে। তাই এই সফরের মূল মাকসাদ পথ চলা নয়; বরং হিজাব বা পর্দার অপসারণ। আয়নায় জং ধরলে যেমন তাতে প্রতিবিম্ব ফুটে উঠে না, ঠিক তেমনি কলব কলুষিত হলে তাতেও আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নুর উদ্ভাসিত হয় না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হলেন আসমান ও জমিনের নুর, তিনি সুস্পষ্ট, তিনি গোপন নন। তাই কারো কাছ থেকে তিনি যদি গোপন থাকেন, তাহলে বুঝতে হবে, তার চোখ কোটরে সমস্যা। হয় তার চোখ কোটরে ময়লা পড়েছে কিংবা তা দুর্বল হয়ে গেছে। দেদীপ্যমান সূর্যের আলোও বাদুড় তার চোখের দুর্বলতার কারণে দেখতে পায় না। তাই আল্লাহর দিকে এই সফরের মূল মাকসাদই হচ্ছে— এই হিজাব বা পর্দার অপসারণ। মাকসাদুল কুরআনের এই শাখাকে গাজালি বলছেন— ‘الدر الأزهر’ বা উজ্জল মুক্তো, মোতি।
৩. আখিরাতের মারিফত
আখিরাতের মারিফত হচ্ছে— আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে পৌঁছে যাওয়ার পর বান্দাদের হালত কী হবে, তার মারিফত।
নেককার বান্দারা আল্লাহর কাছে পৌঁছে যাওয়ার পর যেই সুখ-শান্তি ও নিয়ামত লাভ করবে, তার সামগ্রিক নাম হচ্ছে— জান্নাত। আর এই জান্নাতের সর্বোচ্চ নিয়ামত হচ্ছে— আল্লাহকে দেখতে পাওয়ার আনন্দ।
আর বদকার বান্দারা আল্লাহর কাছে পৌঁছে যাওয়ার পর যেই আজাব, গজব, কষ্ট ও লাঞ্ছনা ভোগ করবে, তার সামগ্রিক নাম হলো— জাহান্নাম। আর এই জাহান্নামের সবচেয়ে বড়ো আজাব হচ্ছে— আল্লাহ রাব্বুল আলামিন থেকে দূরে চলে যাওয়ার কষ্ট।
আল কুরআনুল কারিমের মাকসাদের এই মৌলিক উসুল আখিরাতের মাঝে আরও অন্তর্ভুক্ত হবে— হাশর, নশর, হিসাব, মিজান ও সিরাত।
গাজালি বলছেন, আল কুরআনুল কারিমের এক-তৃতীয়াংশ সূরা এবং আয়াতই আখিরাতের বিবরণ হাজির করেছে। মাকসাদুল কুরআনের এই শাখাকে তিনি তুলনা করেছেন ‘الزمرد الأخضر’ বা সবুজ পান্নার সাথে।
অনুগামী ও পূর্ণতা দানকারী সহযোগী বিষয়
৪. কাসাসুল কুরআন
আল কুরআনুল কারিম আমাদের কাছে ২ ধরনের মাখলুকাতের ঘটনাবলি বর্ণনা করে।
এর মাঝে একদল হচ্ছে তারা, যারা আল্লাহর পথে চলেছে, তাঁর কথা মেনে জীবন চালিয়েছে। তারা হচ্ছেন— আল্লাহর নবি ও ওলিরা। যেমন, কুরআন আমাদেন কাছে বর্ণনা করে আদম আ., নুহ আ., ইবরাহিম আ., মুসা আ., হারুন আ., যাকারিয়া আ., ইহইয়া আ., ঈসা আ., মারিয়াম আ., দাউদ আ., সুলাইমান আ., ইউনুস আ., লুত আ., ইদরিস আ., খিজির আ., শুয়াইব আ., ইলইয়াস আ., মুহাম্মাদ সা., জিবরাঈল, মিকাঈল ও অন্যান্য ফিরিশতাসহ অসংখ্য নবি ও ওলির ঘটনা। এসব ঘটনাবলি বর্ণনা করার মাকসাদ হচ্ছে— মানুষকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পথে চলতে আগ্রহী করে তুলা।
আরেকদল হলো তারা, যারা আল্লাহকে অস্বীকার করেছে, তার পথ থেকে বিভ্রান্ত হয়েছে। যেমন, আল কুরআনুল কারিম আমাদের কাছে বর্ণনা করেছে— নমরুদ, ফিরাউন, আদ, লুতের জাতি, তুব্বার জাতি, আইকার অধিবাসী, মক্কার কাফির ও মূর্তিপূজকদের ঘটনাবলি। কুরআন আরও বর্ণনা করেছে ইবলিস ও শয়তানের ঘটনা। এসব ঘটনাবলি বর্ণনা করার মাকসাদ হচ্ছে— মানুষকে সতর্ক করা, সাবধান করা এবং তাদের ইবরাত (শিক্ষা) দেওয়া।
মাকসাদুল কুরআনের এই শাখাকে গাজালি বলছেন— ‘العنبر الأشهب’ বা ছাঁই বর্ণের জাফরান ও ‘العود الرطب الأنضر’ বা সতেজ সুগন্ধি উদ কাঠ। এই শাখার বিবরণ দিয়েও আল কুরআনে অসংখ্য আয়াত এসেছে।
৫. জাদালুল কুরআন
জাদালুল কুরআন অর্থ হলো কুরআনি বিতর্ক। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আল কুরআনুল কারিমে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে কাফিরদের জাহালত, মিথ্যা দাবি ও বাতিল চিন্তার খণ্ডন করেছেন। গাজালি বলছেন, মৌলিকভাবে কুরআন কাফিরদের ৩ প্রকার অসার চিন্তাকে খণ্ডন করেছে। এগুলো হচ্ছে—
ক. আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ব্যাপারে এমন কিছু বলা, যা তার শানের সাথে যায় না। যেমন, ফিরিশতাদের আল্লাহর কন্যা বলা কিংবা বলা— আল্লাহর সন্তান আছে, তাঁর শরিক আছে কিংবা আল্লাহ হলেন তিনজনের তৃতীয়জন ইত্যাদি।
খ. রাসূলুল্লাহ সা. এর ব্যাপারে এমন কিছু বলা, যা তার শানের সাথে যায় না। যেমন, নবিজিকে যাদুকর, গণক বা মিথ্যাবাদী বলা, তাঁর নবুওয়তকে অস্বীকার করা কিংবা বলা— তিনি আর অন্য সকল মানুষের মতোই সাধারণ মানুষ; সুতরাং তার আনুগত্য করা যাবে না।
গ. আখিরাত, পুনরুত্থান, জান্নাত, জাহান্নাম এবং (পরকালে) আনুগত্য ও অবাধ্যতার পরিণতিকে অস্বীকার করা।
জাদালুল কুরআন অংশে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যুক্তি, হুজ্জত ও বুরহানের আঘাতে বাতিলকে ধরাশায়ী করেন এবং উড্ডীন করেন হকের পতাকাকে। এই অংশের মাকসাদ সম্পর্কে গাজালি বলছেন, বাতিলের ভুল উন্মোচন করা এবং হককে সুস্পষ্ট ও সুপ্রতিষ্ঠিত করা।
মাকসাদুল কুরআনের এই শাখাকে গাজালি বলছেন ‘الترياق الأكبر’ বা বিষের সবচেয়ে বড়ো প্রতিষেধক। এই শাখার বিবরণ হাজির করা আয়াতও অনেক।
৬. আহকাম
গাজালি বলছেন, দুনিয়া হলো আল্লাহর পথের মনজিলগুলোর মাঝে একটি মনজিল। আর এই পথের বাহন হচ্ছে— মানুষের শরীর। তাই কেউ যদি এই মনজিল ও বাহনের ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে গাফিল হয়ে যায়, তাহলে তার সফর পুরো হবে না। যার দুনিয়ার জীবন সুশৃঙ্খল হবে না, তার সুলুক অর্থাৎ আল্লাহর পথে চলা এবং একনিষ্ঠভাবে তার ইবাদতে মজে যাওয়াও হবে না। তাই গাজালি বলছেন, মানুষের শরীর ও নসল (বংশধারা) ঠিক থাকলেই কেবল তার সুলুক ঠিক থাকবে।
মানুষের শরীর ও নসল (বংশধারা) ঠিক রাখতে ২ ধরনের উপাদান আছে। একধরনের উপাদান এর অস্তিত্ব ও টিকে থাকার কারণ হিসেবে কাজ করে, আর আরেক ধরনের উপাদান একে রক্ষা করে ধ্বংস ও ফাসাদের হাত থেকে। এই ২ প্রকার উপাদানগুলো হচ্ছে—
ক. অস্তিত্ব ও টিকে থাকার কারণ হিসেবে কাজ করা উপাদানগুলো হচ্ছে— খাবার-দাবার ও বিয়ে-শাদি। খাবার-দাবারের মাধ্যমে শরীর টিকে থাকে আর বিয়ে-শাদির মাধ্যমে টিকে থাকে নসল বা বংশধারা।
প্রকৃতিগতভাবেই মানুষ খাবার-দাবার গ্রহণ করে, বিয়ে-শাদি করে। কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এগুলোকে কেবলই মানুষের প্রকৃতির ওপরই ছেড়ে দেন নি; বরং এগুলোর জন্য ঠিক করে দিয়েছেন আইন-কানুন ও বিধিবিধান। যদি আল্লাহ তায়ালা আইন-কানুন ও বিধিবিধান ঠিক করে না দিতেন, তাহলে মানুষ একে অপরের সাথে জড়িয়ে যেত বিবাদে, হত্যা করত একে অপরকে। আর এভাবেই তারা বিচ্যুত হয়ে যেত আল্লাহর পথ থেকে। তাই আল কুরআনুল কারিম অসংখ্য আয়াতে অর্থ-সম্পদ ও বিবাহ বিষয়ক বিধানের বর্ণনা দিয়েছে।
খ. ধ্বংস ও ফাসাদের হাত থেকে রক্ষাকারী উপাদানগুলো হচ্ছে উকুবাত বা শাস্তির বিধানগুলো। যেমন— কাফির ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের সাথে যুদ্ধের বিধান ও ফৌজদারি দণ্ডবিধিগুলো (হুদুদ, জরিমানা, তা’জির, কাফফারা, দিয়াত ও কিসাস ইত্যাদি)।
কিসাস ও দিয়াতের বিধান দেওয়া হয়েছে মানুষের জীবনকে রক্ষা করতে। চুরি ও ডাকাতির হদ জারি করা হয়েছে মানুষের অর্থ-সম্পদ রক্ষা করতে। জিনা, সমকামিতা ও অপবাদের শাস্তির বিধান দেওয়া হয়েছে মানুষের বংশধারাকে রক্ষা করতে। কাফিরদের সাথে জিহাদের বিধান দেওয়া হয়েছে মানুষের জীবন ও দ্বীনদারিতাকে রক্ষা করতে, কেননা কাফিরদের পক্ষ থেকে হুমকি আসে মানুষের দ্বীনদারি ও জীবনধারনের উপকরণে; অথচ আর এই দুইটিই হলো আল্লাহর কাছে পৌঁছার মাধ্যম এবং তাঁর পথে চলার উপায়। বা’গি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের সাথে লড়াইয়ের বিধান দেওয়া হয়েছে বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ করতে, কেননা তারা নবির নায়িব বা প্রতিনিধি হিসেবে যিনি দ্বীনি রাজনীতিকে পরিচালনা করে, তার কায়িম করা শৃঙ্খলায় বিশৃঙ্খলা ঘটায়।
সহজ কথায়, কুরআনের মৌলিক মাকসাদের পূর্ণতা দানকারী সহযোগী এই শাখা, গাজালি যাকে বলছেন—
تعريف عمارة منازل الطريق وكيفية التَّأهُّب لِلزَّاد، والاستعداد بإِعداد السلاح الذي يَدفعُ سُرَّاقَ المنازل وقُطَّاعَها.
“(আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের) পথে চলার মনজিলগুলো কীভাবে আবাদ করতে হয়, কীভাবে তার জন্য আসবাবপত্র, সরঞ্জাম ও পাথেয় যোগাড় করতে হয় এবং কীভাবে সেই মনজিলের চোর ও ডাকাতদের ঠেকাতে অস্ত্র ধারণ করে প্রস্তুতি নিতে হয়, তার মারিফত।”10
এটা হলো আহকাম ও হালাল-হারামের বর্ণনা।
মাকসাদুল কুরআনের এই শাখার ব্যাপারে গাজালি বলছেন—
ولا يخفى عليك الآياتُ الواردة في هذا الجنس، وتحتَهُ أسياساتٌ ومصالحُ وحِكَم وفوائد يدركها المتأمل في محاسن الشريعة المبيِّنة لحدود الأحكام الدنيوية.
“আর তোমার কাছে অজ্ঞাত থাকার কথা না, এই শাখার ব্যাপারে আল কুরআনুল কারিমের অসংখ্য অগণিত আয়াত বর্ণিত হয়েছে। এই শাখার অধীনে আছে বেশ কিছু আসাসিয়্যাত (মূলনীতি), মাসলাহাত (কল্যাণ), হিকমত (প্রজ্ঞা) ও ফায়দা (উপকারিতা)। আর এগুলো সে-ই জানতে পারবে, যে দুনিয়াবি আহকামের হুদুদ বর্ণনাকারী মাহাসিনুশ শরিয়াহ (বা মাকাসিদুশ শরিয়াহ) নিয়ে চিন্তাভাবনা করবে।”11
মাকসাদুল কুরআনের এই শাখার ব্যাপারেও আল কুরআনুল কারিমে অনেক আয়াত এসেছে। গাজালি এই শাখাকে বলছেন— ‘المسك الأذفر’ বা সবচেয়ে বেশি সুগন্ধযুক্ত মিশক।”
গাজালির ভাষায়, উপর্যুক্ত ৬টি হচ্ছে আল কুরআনুল কারিমের সকল আয়াত ও সূরার মূল আলোচ্য বিষয়, কুরআনের মূল মাকসাদ আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দিকে দাওয়াতের শাখা। তবে এই শাখার সংখ্যা তার সকল প্রশাখাসহ হয় ১০টি, যেমনটি আমরা ওপরের আলোচনায় দেখেছি। তাই গাজালি বলছেন—
وإن جمعتَ الأقسامَ (السِتَّة المذكورة) مع شُعَبها المقصودة في سلك واحد ألْفَيْتَها عشرةَ أنواع: ذِكرُ الذات، وذِكرُ الصفات؛ وذكر الأفعال؛ وذِكرُ المَعاد؛ وذِكرُ الصِّراط المستقيم، أعني جانِبيَ التَّزكيَة والتَّحليَة؛ وذِكرُ أحوال الأَوْلياء؛ وذِكرُ أحوال الأعداء، وذِكرُ مُحاجَّةِ الكفار؛ وذِكرُ حدود الأحكام.
“আপনি যদি সব (৬টি) প্রকারকে তার উদ্দীষ্ট প্রশাখাসহ এক মালায় গাঁথেন, তাহলে দেখতে পাবেন, তা মোট ১০ প্রকার হচ্ছে। এগুলো হলো—
১. আল্লাহর জাতের বিবরণ, ২. তাঁর সিফাতের বিবরণ, ৩. তাঁর আফয়ালের বিবরণ, ৪. আখিরাতের বিবরণ, ৫+৬. সিরাতুল মুসতাকিমের বিবরণ অর্থাৎ কী কী থেকে মুক্ত থাকতে হবে (তাজকিয়া) এবং কী কী অর্জন করতে হবে (তাহলিয়া) তার বিবরণ, ৭. (পরকালে) আল্লাহর ওলিদের হালত, ৮. (পরকালে) আল্লাহর শত্রুদের হালত, ৯. কাফিরদের সাথে যুক্তিতর্কের বিবরণ এবং ১০. আহকামের সীমাপরিসীমার বিবরণ।”12
জ্ঞানের উৎস ও শ্রেণিবিন্যাস
সকল দ্বীনি জ্ঞানের উৎস
গাজালি বলছেন, সকল প্রকার দ্বীনি জ্ঞান উপর্যুক্ত ১০ প্রকার অর্থাৎ মাকসাদুল কুরআনের ১০টি প্রশাখা থেকেই নির্গত হয়েছে। তবে সকল জ্ঞানের মর্তবা এক নয়; বরং মাকসাদের সাথে নৈকট্য বা দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয় তার মর্তবা ও মর্যাদা।
জ্ঞানের শ্রেণিবিন্যাস : খোসা জ্ঞান ও আসল জ্ঞান
মাকাসিদুল কুরআনের সাথে সম্পর্কের ভিত্তিতে গাজালি দ্বীনি জ্ঞানকে মৌলিকভাবে ২ভাগে ভাগ করছেন। এগুলো হলো—
১. علم الصدف والقشر والكسوة বা খোসা জ্ঞান এবং
২. علم اللباب والجواهر বা আসল জ্ঞান।
১. খোসা জ্ঞান
ফলের মূল শাঁসের উপরিভাগে যেমন অবস্থান করে খোসা, ঠিক তেমনিভাবে আসল জ্ঞানের উপরিভাগেও অবস্থান করে খোসা জ্ঞান। কিছু কিছু লোক খোসাকেই মনে করে সব, তাই তাদের জ্ঞান সফর থেমে যায় খোসা জ্ঞানের মাঝেই আবার কিছু কিছু লোক পৌঁছায় আসল জ্ঞানের মহাসাগরে।
গাজালির ভাষায়, খোসা জ্ঞান হচ্ছে আরবি ভাষার জ্ঞান। এই খোসা জ্ঞান আবার মোট ৫ভাগে বিভক্ত। যথা—
ক. ইলমু মাখারিজিল হুরুফ বা ইলমুত তাজবিদ;
খ. ইলমুল লুগাহ;
গ. ইলমুন নাহু;
ঘ. ইলমুল কিরাআত এবং
ঙ. ইলমুত তাফসির আজ জাহির।
গাজালি বলছেন, সকল খোসা জ্ঞানের মর্তবা আবার এক নয়; বরং কিছু কিছু খোসা জ্ঞান হচ্ছে আসল জ্ঞানের অভ্যন্তর, বাতিনমুখী আর কিছু কিছু বহির্ভাগ, জাহিরমুখী। তাই কোনো খোসা জ্ঞান আসল জ্ঞানের যত কাছাকাছি অবস্থান করে, আসল জ্ঞানের সাহচর্য ও সান্নিধ্যের কারণে তার মর্তবা ও মর্যাদা তত বেশি হয়ে থাকে।
ক. ইলমু মাখারিজিল হুরুফ বা ইলমুত তাজবিদ : আসল জ্ঞান থেকে সবচেয়ে দূরে এবং খোসা জ্ঞানের সবচেয়ে বহিঃস্থ ভাগে অবস্থান করে জ্ঞানের এই শাখা। এই জ্ঞানের বিষয়বস্তু হলো— সওত বা ধ্বনি এবং তা বিশুদ্ধ উচ্চারণের পন্থা। এই জ্ঞান নিয়ে ব্যস্ত থাকেন— কারিরা।
গাজালি বলছেন, এটা আল কুরআনুল কারিমের মৌলিক বা আসল জ্ঞান না, এমনকি খোসা জ্ঞানেরও সর্ববহিস্থ ভাগ; এতত্সত্ত্বেও অজ্ঞতাবশত কিছু কিছু লোক ভেবে নিয়েছে, সওত (ধ্বনি) আর হরফ মিলেই বোধহয় কুরআন। তাই এর ওপর ভিত্তি করে তারা বলতে শুরু করেছে, কুরআন নাকি মাখলুক! কেননা হরফ আর ধ্বনি মাখলুক। অথচ সওত হচ্ছে কুরআনি আসমানের সর্ববহিস্থঃ তবকা।
খ. ইলমুল লুগাহ : ইলমুত তাজবিদের চেয়ে আসল জ্ঞানের আরও কাছাকাছি অবস্থান করে ইলমুল লুগাহ। এই জ্ঞান শামিল করে কুরআনের তরজমা এবং গারিবু আলফাজিল কুরআন (অর্থাৎ কুরআনের অপরিচিত শব্দভাণ্ডার)।
গ. ইলমুন নাহু : ইলমুল লুগাহর চেয়ে আসল জ্ঞানের আরও কাছাকাছি অবস্থান করে— ইলমু ইরাবিল লুগাহ বা ইলমুন নাহু।
ঘ. ইলমুল কিরাআত : ইলমুন নাহুর চেয়ে আসল জ্ঞানের আরও কাছাকাছি অবস্থান করে— ইলমুল কিরাআত। জ্ঞানের এই শাখা আলোচনা করে ই’রাবের বিভিন্ন ধরন এবং উচ্চারণের বিভিন্ন পন্থা নিয়ে। জ্ঞানের এই শাখা লুগাহ আর নাহুরই একটি অংশ, তবে তা কেবলই কুরআনের সাথেই খাস। তাই যারা ইলমুল লুগাহ ও নাহু জানে তাদের মর্যাদা, তাদের চেয়ে বেশি, যারা কেবলই ইলমুল কিরাআত জানে।
ঙ. ইলমুত তাফসির আজ জাহির : ইলমুত তাফসির আজ জাহির বা জাহিরি তাফসিরের জ্ঞান হলো খোসা জ্ঞানের সর্বশেষ শাখা এবং আসল জ্ঞানের সবচেয়ে নিকটতম শাখা। এজন্য অনেকে এটাকেই আসল জ্ঞান ভেবে বসে। তারা মনে করে, এরচেয়ে মূল্যবান জ্ঞান বোধহয় আর নেই, অথচ আসল জ্ঞান তার অধরাই রয়ে গেছে।
এ কথা ঠিক, খোসা জ্ঞানের মাঝে সবচেয়ে মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান হচ্ছে তাফসিরের জ্ঞান। কেননা তাফসিরের জ্ঞান হাসিলের উদ্দেশ্যেই খোসা জ্ঞানের বাকি চারটি হাসিল করা হয়।
গাজালি বলছেন, খোসা জ্ঞানের এই প্রতিটি ভাগই যথাযথ শর্ত মোতাবেক যারা হাসিল করবে, হিফজ করবে এবং যথার্থভাবে অপরের কাছে পৌঁছে দিবে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদের কর্মপ্রচেষ্টাকে অবশ্যই পুরষ্কৃত করবেন। যেমনটি নবিজি সা. বলেছেন—
نضَّرَ اللهُ امرأً سمع مَقالتي فواعاها فأدَّاها كما سمعها، فَرُبَّ حاملِ فقهٍ إلى غير فقيه، وَرُبَّ حاملِ فقهٍ إلى من هو أفقَه منه.
“যে ব্যক্তি আমার কোনো কথা শুনল, তা মুখস্থ রাখল এবং অন্যের কাছেও যেভাব শুনেছে ঠিক সেভাবেই পৌঁছে দিল, আল্লাহ তায়ালা তাকে চিরউজ্জ্বল করে রাখবেন। জ্ঞানের অনেক বাহক এমন লোকের কাছে তা বহন করে নিয়ে যায়, যে ফকিহ বা সমঝদার নয়। আবার জ্ঞানের অনেক বাহক তার চেয়েও অধিক সমঝদার লোকের কাছে তা বহন করে নিয়ে যায়।”13
গাজালি বলছেন, জ্ঞানের এই ভাগের (খোসা জ্ঞানের) অধিকারীরা এই জ্ঞান অপরের কাছ থেকে শুনেছে এবং তা অপরের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। তাই তাদের জন্য রয়েছে বহন করা ও পৌঁছে দেওয়ার সওয়াব। হয়ত তারা তাদের চেয়ে অধিক ফকিহ বা সমঝদারের কাছে এই জ্ঞান পৌঁছে দিয়েছে কিংবা সমঝদার নয়, এমন লোকের কাছে তা পৌঁছে দিয়েছে। তাই একজন মুফাসসির যে কেবলই মানকুল বর্ণনার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে, সে কেবল একজন শ্রোতা ও বাহকই। এমনিভাবে, কুরআনের একজন হাফিজও একজন শ্রোতা ও বাহকই।
২. আসল জ্ঞান
আসল জ্ঞানকে গাজালি বলছেন— উলুমুল লুবাব। গাজালির ভাষায়, এই আসল জ্ঞান হচ্ছে মাকসাদুল কুরআনের ৬টি শাখার জ্ঞান।
এই আসল জ্ঞান আবার ২ভাগে বিভক্ত। যথা—
ক. নিচু তবকার আসল জ্ঞান এবং
খ. উঁচু তবকার আসল জ্ঞান।
ক. নিচু তবকার আসল জ্ঞান
নিচু তবকার আসল জ্ঞান হচ্ছে— মৌলিক মাকাসিদুল কুরআনের অনুগামী ও পূর্ণতা দানকারী সহযোগী বিষয়গুলো (علوم الرودف والتوابع المغنية المتمة) সম্পৃক্ত জ্ঞান। আগেই আমরা জেনে এসেছি, এই বিষয়গুলো মোট ৩টি। তাই নিচু তবকার আসল জ্ঞানও মোট ৩ প্রকার। যথা—
১. কাসাসুল কুরআনের জ্ঞান;
২. জাদালুল কুরআনের জ্ঞান এবং
৩. আহকামের জ্ঞান।
এবার এই তিন প্রকার নিয়ে কথা বলা যাক।
১. কাসাসুল কুরআনের জ্ঞান: জ্ঞানের এই শাখায় আলোচিত হয় কুরআনের ঘটনাবলি। যেমন— নবিদের কাহিনী, (পূর্ববর্তী) নেককারদের কাহিনী এবং আল্লাহর শত্রু কাফিরদের কাহিনী।
জ্ঞানের এই শাখা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন কুসসাস (কিচ্ছা বর্ণনাকারী), ওয়ায়িজ এবং কিছু কিছু মুহাদ্দিসরা।
গাজালি বলছেন—
وهذا علم لا تعم إليه الحاجة.
“এই জ্ঞান সবার প্রয়োজন হয় না।”14
গাজালির এই কথা সামগ্রিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়; কেননা কুরআনে এমন কোনো কিছু বর্ণিত হতে পারে না, যা মানুষের অপ্রয়োজনীয়। তাই ড. আদম বালালু বলছেন—
وقول الغزالي بأنَّ علم قصص القرآن لا تعمُّ إليه الحاجة؛ لا يمكن قبوله إلا إذا قصد أن القصة بحدّ ذاتها ليست مهمة، وإنما المهم منها الاعتبار والاتعاظ بما ورد فيها من الوعظ وأخذ العبرة وغير ذلك.
“কাসাসুল কুরআনের জ্ঞান সবার প্রয়োজন নেই, গাজালির এই কথা গ্রহণযোগ্য নয়। এই কথা তখনই কেবল গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যদি এর মানে হয়, স্বয়ং কিচ্ছা বা কাহিনীগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে— তাতে যেই উপদেশ, নসিহত বর্ণিত হয়েছে, তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা এবং ইবরত হাসিল করা ইত্যাদি।”15
২. জাদালুল কুরআনের জ্ঞান: জ্ঞানের এই শাখায় আলোচিত হয়— কাফির ও অবিশ্বাসীদের সাথে যুক্তিতর্ক। জ্ঞানের এই শাখা থেকেই উৎপত্তি হয়েছে ইলমুল কালামের। ইলমুল কালামের মাধ্যমে বিদআতি ও পথভ্রষ্টদের পক্ষ থেকে ইসলাম ও ইসলামি জীবনব্যবস্থার ব্যাপারে উত্থাপিত আপত্তির খণ্ডন করা হয়। মুতাকাল্লিমরা জ্ঞানের এই শাখা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। গাজালি বলছেন—
ومقصود هذا العلم حراسة عقيدةِ العَوَامّ عن تشويش المُبتَدِعَة.
“এই জ্ঞানের মাকসাদ হচ্ছে সাধারণ মানুষের আকিদা-বিশ্বাসকে বিদআতিদের বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করা।”16
৩. আহকামের জ্ঞান: জ্ঞানের এই শাখা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন ফকিহরা। গাজালি বলছেন, সবারই জ্ঞানের এই শাখা প্রয়োজন। কেননা এর সাথেই জড়িত মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের সালাহিয়্যাত। ফিকাহ যেহেতু সবার প্রয়োজন, তাই এই জ্ঞানের প্রসার ঘটে অনেক বেশি। রচিত হয় অসংখ্য অগণিত গ্রন্থ। এমনকি, যারা এই জ্ঞান চর্চা করেন অর্থাৎ ফকিহরা, সমাজে তাদের মান-মর্যাদাও বেড়ে যায়। অবশ্য এর নেতিবাচক দিকও আছে। গাজালির ভাষায়, ফিকাহ চর্চা যেহেতু সমাজে মান-মর্যাদা ও শান-শওকত লাভের উপায় হয়ে ওঠে, তাই অনেক অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় আলোচনারও প্রসার ঘটে জ্ঞানের এই শাখায়, রচিত হয় ইখতিলাফি বিষয় নিয়ে অসংখ্য অগণিত গ্রন্থ।
যাইহোক এভাবেই ফিকাহ শাস্ত্রের উৎপত্তি ঘটে কুরআন থেকে। গাজালি বলছেন—
فهذا وجهُ انْشِعاب الفقه من القرآن، ويتولَّد من بين الفقه والقرآن والحديث علم يسمى أصول الفقه، ويرجع إلى ضبط قوانين الاستدلال بالآيات والأخبار على أحكام الشريعة.
“এভাবেই কুরআন থেকে ফিকাহর উৎপত্তি ঘটে। আর ফিকাহ, কুরআন ও হাদিস থেকে জন্ম হয় আরেকটি জ্ঞানের, যার নাম— উসুলুল ফিকাহ। এই জ্ঞান ঠিক করে দেয়— শরিয়তের বিধানের ব্যাপারে হাদিস (আখবার) ও আয়াতের মাধ্যমে দলিল উপস্থাপন করার নিয়মকানুন বা পদ্ধতি।”17
গাজালি বলছেন, কুসসাস বা কাহিনীকার ও ওয়ায়িজদের মর্যাদা ও মর্তবা ফকিহ ও মুতাকাল্লিমদের চেয়ে কম। ফকিহ ও মুতাকাল্লিমদের মর্যাদা প্রায় কাছাকাছি। তাই আমরা বলতে পারি, জাদালুল কুরআন ও আহকামের জ্ঞান সমমর্যাদার নিচু তবকার আসল জ্ঞান। আর মর্তবার দিক থেকে এই দুটির পরে অর্থাৎ সবশেষে অবস্থান করে— কাসাসুল কুরআনের জ্ঞান।
খ. উঁচু তবকার আসল জ্ঞান
উঁচু তবকার আসল জ্ঞান হচ্ছে— মাকাসিদুল কুরআনের ‘السوابق والأصول المهمة’ বা অগ্রবর্তী ও মৌলিক উসুল সম্পৃক্ত জ্ঞান। আগেই আমরা জেনে এসেছি, এই বিষয়গুলো মোট ৩টি। তাই উঁচু তবকার আসল জ্ঞানও মোট ৩ প্রকার। যথা—
১. আল্লাহর মারিফতের জ্ঞান;
২. আখিরাতের জ্ঞান এবং
৩. সিরাতুল মুসতাকিমের জ্ঞান।
এই তবকার আসল জ্ঞানকে গাজালি বলছেন, ইলমুল মাকসাদ। গাজালি মনে করেন— লুগাহ, নাহু, ই’রাব, বালাগাত ও কিরাআতসহ আরবি ভাষার সকল প্রকার জ্ঞান এবং এগুলোর সাহায্যে কুরআনের আয়াতের তাফসির অর্থাৎ ‘তাফসির-ই জাহিরি’ জানা আসল উদ্দেশ্য বা মাকসাদ নয়; বরং কেবলই মূল মাকসাদের পথে ওসিলা। আসল মাকসাদ হচ্ছে— ‘তাফসির-ই বাতিনি’ হাসিল করা অর্থাৎ কুরআন নাজিল হওয়ার অন্তর্নিহিত মাকসাদ উপলব্ধি করা, কুরআনের আয়াত নিয়ে চিন্তা-ফিকির ও তাদাব্বুর করা এবং এই ইলাহি কালাম থেকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের যেই মাকসুদ সাব্যস্ত হবে, সেই অনুযায়ী আমল করা।18
এখন উঁচু তবকার আসল জ্ঞানের ৩ প্রকার নিয়ে একটু কথা বলা যাক।
১. আল্লাহর মারিফতের জ্ঞান: আল্লাহর মারিফতের জ্ঞান হচ্ছে সবচেয়ে সম্মানিত জ্ঞান, সবচেয়ে উঁচু জ্ঞান। গাজালি বলছেন—
والعلم الأعلى الأشرفُ عِلمُ معرفة الله تعالى، فإن سائر العلوم تُرادُ له ومن أجله وهو لا يُراد لغيره.
“সবচেয়ে উঁচু মর্তবার, সবচেয়ে সম্মানিত জ্ঞান হচ্ছে—আল্লাহর মারিফতের জ্ঞান। কেননা বাকি সকল প্রকার জ্ঞানই হাসিল করা হয় আল্লাহর মারিফতের এই জ্ঞান হাসিল করার মানসে, কিন্তু এই জ্ঞান বাকি জ্ঞানের জন্য হাসিল করা হয় না।”19
এই জ্ঞানেরও আবার মোট ৩টি তবকা আছে। সেগুলো হলো—
ক. আল্লাহর জাতের জ্ঞান;
খ. আল্লাহর সিফাতের জ্ঞান এবং
গ. আল্লাহর আফয়ালের জ্ঞান।
এই ৩টি তবকার মাঝে সবচেয়ে উঁচু তবকার জ্ঞান হচ্ছে— আল্লাহর জাতের জ্ঞান। তারপর সিফাতের জ্ঞান, আর তারপর আফয়ালের জ্ঞান। আল্লাহর জাতের জ্ঞান এতই উঁচু তবকার যে, তা খুব সামান্যই মানুষের বুঝে আসবে। এজন্যই নবিজি সা. বলেছেন—
تفكَّروا في خَلق الله ولا تفكَّروا في ذات الله.
“তোমরা আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা কর; কিন্তু আল্লাহর জাত নিয়ে চিন্তা কর না।”20
গাজালি বলছেন, আল্লাহর মারিফতের জ্ঞান হাসিল করতে ক্রমধারা অবলম্বন করতে হবে। শুরু করতে হবে আফয়ালের জ্ঞান দিয়ে, তারপর সিফাতের জ্ঞান এবং সবশেষ জাতের জ্ঞান। এই ক্রমধারা অবলম্বনের ইশারা পাওয়া যায় নবিজির হাদিস শরিফে। নবিজি দুআ করতেন—
أَعُوذُ بِعَفْوِكَ مِنْ عِقَابِكَ وَأَعُوذُ بِرِضَاكَ مِنْ سَخَطِكَ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْكَ.
“হে আল্লাহ, আমি আপনার আজাব থেকে আপনার ক্ষমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আপনার অসন্তুষ্টি থেকে আপনার সন্তুষ্টির আশ্রয় চাচ্ছি এবং আপনার থেকে আপনার আশ্রয় কামনা করছি।” (মুসলিম : ৪৮৬, আবু দাউদ : ৮৭৯, তিরমিজি : ৩৪৯৩, নাসায়ি : ৫৫৩৪)
দুআর প্রথম অংশ—
أَعُوذُ بِعَفْوِكَ مِنْ عِقَابِكَ
এখানে আল্লাহর আফয়ালের কথা বলা হয়েছে। তারপর নবিজি বলছেন—
وَأَعُوذُ بِرِضَاكَ مِنْ سَخَطِكَ
এখানে আল্লাহর সিফাতের কথা বলা হয়েছে। আর সবশেষে নবিজি সা. বলছেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জাতের কথা—
وَأَعُوذُ بِكَ مِنْكَ
২. আখিরাতের জ্ঞান: উঁচু তবকার দ্বিতীয় প্রকার আসল জ্ঞান হচ্ছে— আখিরাতের জ্ঞান। গাজালি একে আরও বলছেন ইলমুল মাআদ (علم المعاد)। আল্লাহর মারিফতের জ্ঞানের পরেই এর অবস্থান। গাজালি বলছেন—
وِأشرَفُها العلمُ باللهِ واليوم الآخر لأنه علم المَقْصِد.
“উঁচু তবকার আসল জ্ঞানের সবচেয়ে মহত্তর জ্ঞান হচ্ছে— আল্লাহর জ্ঞান এবং আখিরাত দিবসের জ্ঞান। কেননা এটাই ইলমুল মাকসাদ।”21
৩. সিরাতুল মুসতাকিমের জ্ঞান: সিরাতুল মুসতাকিম বা আল্লাহর পথে চলার জ্ঞানের মর্তবা আখিরাতের জ্ঞানের পর। গাজালির ভাষায়, সিরাতুল মুসতাকিম বা সুলুকের পথের জ্ঞান হচ্ছে—
وهو معرفةُ تزكية النفس، وقطعُ عقبات الصفات المُهلِكات، وتَحْلِيَتُها بالصفات المُنَجِّيَات.
“তাজকিয়াতুন নফসের মারিফত, ধ্বংসকারী সিফাতের প্রতিবন্ধকতা মাড়ানো এবং মুক্তি দানকারী সিফাত অর্জন করা।”22
জাগতিক সকল জ্ঞানের উৎস
গাজালি বলছেন, কেবল দ্বীনি জ্ঞান নয়; বরং জাগতিক সকল জ্ঞানও নির্গত হয়েছে আল কুরআনুল কারিম থেকে। দুনিয়ায় এ যাবত যত জ্ঞান আবিষ্কৃত হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে; তার সবই আল্লাহর মারিফতের সাগর থেকে নির্গত হয়েছে। আমরা জেনে এসেছি, আল্লাহর মারিফতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো— তাঁর আফয়ালের মারিফত। এই বিশ্বজাহানে যা কিছু আছে, আল্লাহর সত্তা ছাড়া বাকি সবকিছুই তাঁর আফয়াল। গাজালি বলছেন—
ثم هذه العلوم ما عددناها وما لم نعدها ليست أوائِلُها خارجةً عن القرآن، فإن جميعها مُغْتَرَفَةٌ من بحر واحد من بحار معرفة الله تعالى، وهو بحرُ الأفعال، وقد ذكرنا أنه بحرٌ لا ساحلَ له.
“তারপর কথা হচ্ছে আমরা যেই জ্ঞানগুলোর কথা বললাম এবং যেগুলোর কথা বললাম না, সেগুলোর মৌলিক উপাদান কুরআনের বহির্ভূত না। এই জ্ঞানের সবগুলোই আল্লাহর মারিফতের সাগরগুলোর একটি সাগর থেকে নেওয়া। আর সেই সাগরটি হচ্ছে— (আল্লাহর) আফয়ালের সাগর। আমরা আগেই বলে এসেছি, এটা এমন এক সাগর, যার কোনো কূলকিনারা নেই।”23
অর্থাৎ গাজালির ভাষায় জাগতিক যত জ্ঞান আছে, তা হাসিল করার মানে হলো— আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের এক একটি ফি’ল বা কর্মের মারিফত হাসিল করা।
গাজালি উদাহরণ টেনে বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে তুলছেন আমাদের কাছে। তিনি বলছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের কথা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের একটি কর্ম হচ্ছে— রোগ দেওয়া ও শিফা বা আরোগ্য দান করা। তিনি ইবরাহিম আ. এর জবানিতে বলেছেন—
وَ اِذَا مَرِضۡتُ فَهُوَ یَشۡفِیۡنِ ﴿۪ۙ۸۰﴾
“আর আমি যখন রোগাক্রান্ত হই, তখন তিনিই আমাকে শিফা— আরোগ্য দান করেন।” সূরা শুআরা : ৮০
গাজালির ভাষায়, আল্লাহর এই রোগ দেওয়া ও শিফা করার ফি’ল বা কর্মের জ্ঞানই হলো চিকিৎসা বিজ্ঞান। তিনি বলছেন—
وهذا الفعل الواحد لا يعرفه إلا من عرف الطِبَّ بكماله، إذ لا معنى للطب إلا معرفةُ المرض بكماله وعلاماته، ومعرفةُ الشفاء وأسبابه.
“যে ব্যক্তি পরিপূর্ণভাবে চিকিৎসা বিজ্ঞান জানবে না, সে আল্লাহর এই কর্মটি সম্পর্কে জানবে না। কেননা চিকিৎসা বিজ্ঞানের মানে— পরিপূর্ণভাবে রোগ ও রোগের উপসর্গ জানা এবং তার নিরাময় বা চিকিৎসা ও চিকিৎসার উপকরণ সম্পর্কে জানা ছাড়া আর কিছুই না।”24
গাজালি আরও বলছেন, জ্যোতির্বিজ্ঞানের কথা। চাঁদ, সূর্য ও গ্রহ-নক্ষত্রের কক্ষপথ এবং গতি নির্ধারণ করা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনেরই একটি ফি’ল বা কর্ম। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—
اَلشَّمۡسُ وَ الۡقَمَرُ بِحُسۡبَانٍ ﴿۪۵﴾
“সূর্য ও চাঁদ আবর্তন করে নির্ধারিত হিসেবে।” সূরা আর রহমান : ৫
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেছেন—
وَالشَّمۡسُ تَجۡرِیۡ لِمُسۡتَقَرٍّ لَّهَا ؕ ذٰلِك تَقۡدِیۡرُ الۡعَزِیۡزِ الۡعَلِیۡمِ ﴿ؕ۳۸﴾
“আর সূর্য ভ্রমণ করে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে, এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নির্ধারণ।” সূরা ইয়াসিন : ৩৮
আল্লাহর এই কর্মের মারিফত হাসিল করাই হলো জ্যোতির্বিজ্ঞানের জ্ঞান হাসিল করা। কেননা জ্যোতির্বিজ্ঞান মানে কী? জ্যোতির্বিজ্ঞান হচ্ছে— চাঁদ ও সূর্যের গতি, তাদের গ্রহণ এবং দিন ও রাতের আবর্তন ইত্যাদি বিষয় জানার নাম।
সারকথা হচ্ছে, গাজালির ভাষায়, আল্লাহর আফয়ালের মারিফতই হলো জাগতিক সকল জ্ঞানের উৎস। আর আল্লাহর আফয়াল এমন এক সীমাহীন সাগর, যার কোনো কূলকিনারা নেই।
সারকথা
আমাদের সমগ্র আলোচনার সারকথা হলো ইমাম গাজালির মাকাসিদুল কুরআন বিষয়ক আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে— আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ও তাঁর মারিফত। তিনি মনে করেন, কুরআনের মাকসাদ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার দিকে মানুষকে আহ্বান করা। তার মতে, সকল প্রকার জ্ঞানই এই মাকাসিদুল কুরআন থেকে কোনো না কোনোভাবে উদ্ভুত কিংবা কোনো না কোনোভাবে এর সাথে সম্পর্ক রাখে। সবশেষ, আমাদের তামাম আলোচনা খোলাসা হচ্ছে—
১. গাজালির কাছে মাকাসিদুল কুরআন হচ্ছে আল কুরআনুল কারিমের মৌলিক আলোচ্য বিষয়।
২. কুরআনের মৌলিক মাকসাদ হচ্ছে আল্লাহর দিকে মানুষকে দাওয়াত দেওয়া।
৩. এই মৌলিক মাকসাদের শাখা মোট ৬টি। যথা— আল্লাহ, সিরাতুল মুসতাকিম, আখিরাত, কাসাসুল কুরআন, জাদালুল কুরআন ও আহকামের মারিফত।
৪. খোসা ও আসল সকল প্রকার দ্বীনি জ্ঞান মাকসাদুল কুরআনের এই শাখাগুলো থেকেই উৎসারিত।
৫. সকল প্রকার জাগতিক জ্ঞানও কুরআন থেকে উৎসারিত। যেকোনো জাগতিক জ্ঞান হাসিল করা মানেই হচ্ছে— আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কোনো না কোনো কর্মের মারিফত হাসিল করা।
বরাত
তাফসিরু ফাখরুর রাজি, দারুল ফিকর, প্রথম ছাপা, বৈরুত, ১৪০১ হি/ ১৯৮১ খ্রি., ৩০/২৪৯।
দেখুন মাকাসিদুল কুরআনিল কারিম ওয়া মাহায়িরুহু ইনদাল মুতাকাদ্দিমিন ওয়াল মুতাআখখিরিন, ড. ঈসা বু উক্কায।
কাওয়ায়িদুল আহকাম ফি ইসলাহিল আনাম, আবু মুহাম্মদ ইজ্জুদ্দিন আব্দুল আজিজ ইবনি আব্দিস সালাম, দারুল কুতুব আল ইলমিয়্যাহ - বৈরুত এবং দারু উম্মিল কুরা - কায়রো, ১৪১৪ হি/ ১৯৯১ খ্রি., ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০।
আব্দুল কারিম হামিদি, মাকাসিদুল কুরআন মিন তাশরিয়িল আহকাম, দারু ইবনু হাজম, প্রথম ছাপা, বৈরুত, ১৪২৯ হি/ ২০০৮ খ্রি., পৃষ্ঠা ২৯।
আবু হামিদ গাজালি, জাওয়াহিরুল কুরআন, মুহাম্মদ রাশিদ রিদা আল কাব্বানির তাহকিক, দারু ইহইয়া উলুমিদ্দিন, ৩য় ছাপা, বৈরুত, ১৪১১হি/ ১৯৯০ খ্রি., পৃষ্ঠা ২৩।
প্রাগুক্ত।
প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৭।
প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৮।
প্রাগুক্ত।
প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩২।
প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩৪।
প্রাগুক্ত।
প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩৮।
প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩৯।
ড. আদম বালালু, জুহুদুল উলামা ফিল কাশফি আন মাকাসিদিল কুরআনিল কারিম ওয়া মাওদুআতিহি মিনাল কারনিল আওয়াল আল হিজরি ইলাল কারনিত তাসি’ আল হিজরি, পৃষ্ঠা ৪৫
প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩৯।
প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৪০।
দেখুন ড. আদম বালালু, জুহুদুল উলামা ফিল কাশফি আন মাকাসিদিল কুরআনিল কারিম ওয়া মাওদুআতিহি মিনাল কারনিল আওয়াল আল হিজরি ইলাল কারনিত তাসি’ আল হিজরি, পৃষ্ঠা ৪৪।
প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৪২।
প্রাগুক্ত।
প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৪১।
প্রাগুক্ত।
প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৪৫।
প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৪৫, ৪৬।