মেন্যু
Menu

উন্নতির উপায় কি | শেখ ফজলল করিম

২২ ডিসেম্বর, ২০২৪

(১৩ই ফেব্রুয়ারী; মহিষখচা-ধর্ম সভায় প্রদত্ত বক্তৃতা)

“পতিত মুসলমান” নামটা আমরা অনেক দিন হইতেই পাইয়াছি। কবির কাব্যে, বক্তার গলাবাজীতে, লেখকের মসী-লেপনের আড়ম্বরে এবং সমাজের সাধারণ অবস্থা পর্য্যালোচনা করিতে করিতে ধারণাটাও জমিয়া গিয়াছে। কিন্তু কথা হইতেছে, এ “পতিত” নামটা আর কতদিন থাকিবে? এখন কেমন করিয়া আমাদের উন্নতির পথ প্রশস্ত হইবে, তাই।

সমাজে আমরাই সব, অথবা আমরাই সমাজ। এমতাবস্থায় প্রত্যেকের জন্য প্রত্যেকের সহানুভূতি না থাকিলে, সমাজ নামক জিনিষটার কি অস্তিত্ব থাকে? জাতীয়তার প্রবল আকর্ষণে একত্রিত হইয়া আমরা আজ যথা কর্ত্তব্য স্থিরীকরণের জন্য যে অনিবার্য্য চিন্তায় বসিয়াছি, তাহা আমাদের দায়িত্ব, তাহা আমাদের জীবনের অন্যতম কাজ। আমাদের উন্নতিতে আমাদেরই লাভ; অন্যের লাভ নাই। সুতরাং নিজে, নিজের লাভালাভের দিকে দৃষ্টিপাত না করিয়া, গৃহমার্জারের মত জীবনের দিন গণনা করা কি কাপুরুষের ধর্ম্ম নহে? এই বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানোন্মত্ত যুগ, উন্নতির ইতিহাসে পূর্ণ; সকলেই উন্নতির জন্য নিজের জীবনকে কর্ম-কুরুক্ষেত্রের বিশাল প্রাঙ্গণে বলিদান করিতেছে। এ যুগে এহেন ভীরুতা প্রদর্শন করা কি আমাদের উচিত? আমরা অসভ্য নই, বর্ব্বর নই, হিতাহিত জ্ঞান সম্পন্ন মানুষ। ভাল-মন্দ এ দুইটা বিষয়ই বেশ বুঝি; যদি এটা আমাদের অনুচিত না হয়, তবে কর্ত্তব্য। যদি কর্ত্তব্যই হইল, তবে তাহা সাধারণের জন্য চেষ্টিত হওয়া কি মনুষ্যত্ব নহে? এখন কথা এই, যে মানব, মনুষ্যত্ব বজায় রাখিবার জন্যও নিজের জীবনের প্রতি উদাসীনতা প্রদর্শন করে না, সে কি মানব-পদের বাচ্য? ন্যায়ানুসারে সে পশু। বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, আজ দর্শন, বিজ্ঞান, ভূগোল, খগোল, ইতিহাসের সৃষ্টিকর্তা মুসলমানের সেই বংশধরগণকে অসময়ে- গ্রহবৈগুণ্যে পশু আখ্যায় বিভূষিত করিতে হইতেছে। এ বিষয়ে আমার অপেক্ষা ন্যায়শাস্ত্রের ধৃষ্টতা বেশি। কেন না, আমার অনিচ্ছা-সত্ত্বেও সত্য পিপাসু ন্যায়, অলক্ষ্যে (আমাদিগকে) পশু বলিয়া স্বীকার করিতেছে। বিদ্যা-শিক্ষা এবং আর্থিক উন্নতি অবনতির সহিত সমাজের উন্নতি অবনতির নিকটতর সম্বন্ধ। আবার এই দুইটি বিষয়ের মধ্যে শিক্ষার আকর্ষণই বেশি। কিন্তু সে কথা আর কি বলিব? বঙ্গীয় মুসলমানগণ যে কি প্রকার শিক্ষিত, শিক্ষার আবশ্যকতা কতদূর বুঝেন- তাহা কাহাকেও কষ্ট করিয়া বুঝাইয়া দিতে হইবে না। শিক্ষার অভাবে লোকের রুচি সভ্যতা ও অবস্থা এত অধোগামী হইয়াছে যে, আমরা এই দেশের সিংহাসন হইতে নামিয়া এই দেশেই মজুরি খাটিতেছি। মানুষ ইচ্ছা করিলে কি না করিতে পারে। অবিনশ্বর কায়াহীন খোদা তাআলা যদি মানবের সাধনার কলে ধরা দিতে পারেন, তবে আমাদের সাধনা সাংসারিক কার্যগুলিকে নূতন ভাবে জাগাইতে পারিবে না-এ কেমন কথা?

সৃষ্টি হইতে প্রত্যেক জিনিষ লইয়া মানুষই মানুষের জন্য প্রথম আবশ্যকীয় সামগ্রী প্রস্তুত করিয়াছে এবং করিয়া আসিতেছে; সেই কৰ্ম্ম-পটুতার ফলে অন্যান্য জাতিরা সংসারে স্বীয় ধৰ্ম্ম এবং জীবনের উন্নতি করিয়া যাইতেছেন, আর আমরা পারিব না-এ কি প্রলাপ নয়।

আমাদের বঙ্গীয় বিলাসিতা প্রিয় অলস যুবকদল এতই নিরুৎসাহ যে, যে কোন কার্যের অনুষ্ঠান দেখিলেই, তাঁহারা অকাতরে উত্তর দেন, “আমাদের দ্বারা কি এ গুরুতর কাজ হয়, এ ক্ষেত্রে আমরা সম্পূর্ণ অসমর্থ।” কিন্তু ভাই, তুমি কেন পার না। তোমার এ স্ত্রীজনোচিত অসার কথার মূল্য কি? তুমি এত কাজ করিতে পার, মামলা মোকদ্দমায় ঘরের টাকা পরকে দিয়া সংসার শ্মশান করিতে পার, আর নিজের ও সমাজের হিতের জন্য একটু চেষ্টা তুমি করিতে পার না, এ কথার অর্থ কি? এ সময় তোমার সমাজ মৃত; এই বিষম দুর্দ্দিনে যদি এ প্রকার অর্থহীন ভাষা তোমার সমাজ- প্রীতির চরম উৎকর্ষ হয়, তবে নিরাশ্রয় দুর্বল সমাজ দাঁড়ায় কোথায়? যতদূর বুঝা যায়, তাহাতে শিক্ষা, ধর্মহীনতা ও আদর্শের অভাবে আমাদের এই কু-ফল ফলিয়াছে। নেপোলিয়ান বলিয়াছিলেন— “অভিধানের পৃষ্ঠা হইতে “না” শব্দটা উঠাইয়া দাও; মানুষ কোন কাজ না করিতে পারে?” চেষ্টা ও অধ্যবসায় বলে মানুষ সব কাজ পারে এবং পারিয়াছে। বাস্তবিক মানুষ কোন কার্য্যেই অপারগ নহে; কেবল সাধনার উদাসীনতাই অবনতির এক মাত্র কারণ।

যে প্রকার প্রতিকূল অবস্থা পরম্পরায় আমাদের সমাজ হাবুডুবু খাইতেছে, তাহাতে এত দিন এ দেশে মুসলমানের নাম পর্যন্ত পাওয়া দুষ্কর হইত। কেবল জাতীয় রক্তের সামান্য মাত্র উষ্ণতা থাকাতেই আমরা মরিয়াও মরি নাই। সুখের বিষয়, সময় থাকিতে আমাদের মধ্যে দুই একজন লোকের ঘুম ভাঙ্গিতে আরম্ভ হইয়াছে। কিন্তু সমাজের জন্য তাহারা যে পরিমাণে জীবনের ক্ষতি করিতেছেন, তাহার সিকি অংশও সহানুভূতি পাইতেছেন না। একদিকে যুবকদলের উপেক্ষা, অন্যদিকে পয়সাওয়ালা লোকদের ভাবনা, কখন বা কিছু আদায়ের চেষ্টা করিয়া “সমাজ-সেবক” নামধারী সরকারি পেয়াদা হাজীর হয়! এই প্রকার বিপরীত-বিশ্বাসের ফলে আমরা দাঁড়াইবার স্থান পাইতেছি না। অন্তহীন চিন্তা-সমুদ্রের মধ্যে দূরলোক প্রত্যাগত কোলাহল শুনিতে শুনিতে উদাস-নেত্রে অতি উর্ধ্বে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতে শিখিতেছি। কোন উপায় নাই, কোন পথ নাই, আছে সহানুভূতির পরিবর্তে বিদ্রূপ—আছে সান্ত্বনার পরিবর্ত্তে যষ্টি! আমাদের বড় সৌভাগ্য– এবার এমন কয়েকটা “বেহায়া” “সমাজ-সেবক” নাম লইয়া বাহির হইয়াছি যে, লোকে আমাদিগকে ঠেঙ্গাইলেও আমরা আমাদের “তেরেরাম” ছাড়িব না। আমরা ঠেকিয়া শিখিয়াছি; এ দেশের, এ সমাজের লোকের প্রত্যেকের শিরা উপশিরা চিনিয়াছি। আর কাহারও নিরুৎসাহে উদ্যমহীন হইব না, কাহারও প্রলোভনে জীবনের কর্তব্য বিস্মৃত হইব না; দেখি, কেমন করিয়া উন্নতি না হয়।

এই স্থানে আর একটা বিষয়ের উল্লেখ প্রয়োজন। আমাদের সমাজে কতকগুলি মৌখিক হিতৈষির আবির্ভাব হইয়াছে। তাহারা সভা সমিতিতে খুব যোগ দেয়। নিজের নাম জাকাইবার জন্য মুনশী মেহেরুল্লা সাহেবকে আনিয়া এক আধ বার লম্বা চৌড়া লেকচার ঝাড়াইয়া দেয়-ফলে কিন্তু তাহাদের অন্তরের ভাব আমাদের বর্তমান অবস্থার প্রতিকূল।১  যাহা হউক, এবার আমরা তাহাদের মত আশু বন্ধুর মিষ্ট সহানুভূতিতেও ভুলিব না। এবার আমরা কর্মবীর হইব বলিয়া প্রতিজ্ঞা করিয়া আসিয়াছি। লোকে এখন আমাদের প্রশংসার পরিবর্তে নিন্দা করিবে, সেজন্য আমরা আমাদের হৃদয়কে সর্বদা প্রস্তুত করিয়া আসিয়াছি-আমাদের কর্তব্য পালনের জন্য যে কোন প্রকার হিংসা, দ্বেষ, কঠোরতা ও অত্যাচার সহ্য করিতে স্বীকার করিয়া লইয়াছি। দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিলের মত আশা করিয়াছি, আজ না হক, এ শতাব্দীতে না হক, আমরা যদি সত্যের জন্য নিজের জীবনকে বিপদাপন্ন করিতে পারি, তবে চারি শতাব্দী পরে কোন দিন ভুল করিয়াও কেহ আমাদের নাম উচ্চারণ করিবে। আমরা ততকাল বাঁচিয়া থাকিব না সত্য, কিন্তু লোকের সহানুভূতির পুণ্যফল নিশ্চয় সেই অন্ধকার সমাধি-গহ্বরে আমাদের জন্য ক্ষণিক সান্ত্বনা বহিয়া আনিতে সমর্থ হইবে। সমবেত শক্তির চেষ্টায় আমাদের মত মানুষই যে অসাধ্য সাধনের অধিকারী হইতে পারে, ইতিহাস তাহার জ্বলন্ত প্রমাণ। লাল কুর্ত্তিওয়ালা বাঙ্গালী পল্টন একদিন কত কাজ করিতে পারিয়াছে; ব্যবসায়ী ইংরেজ জাতির একতা আজ পৃথিবীর প্রতাপান্বিত রাজশক্তিতে পরিণত হইয়াছে। স্বল্প সংখ্যক “পার্ব্বত্য মুষিকের” জ্বালায় একদিন হিন্দুস্থান অস্থির হইয়া উঠিয়াছিল; আজ দুর্দ্দিনে বিপদের উপর বিপৎপাতের সময়ে এত আদর্শের কথা, এমন সহজ উপমাগুলি আমরা ভুলিয়া যাইতেছি। জাতীয় একতার অভাবে সামাজিক-বীর্যে, যে তিমিরাবরণ পড়িয়াছে, তাহা আমাদের পাণ্ডু- কলুষিত নেত্রের পক্ষে কম কুহেলিকাচ্ছন্ন নহে; কিন্তু চক্ষের এ রোগের জন্য এখন আমাদের চিকিৎসার সময় আসিয়াছে; আমাদের সমাজের শরীরে ধর্মের উষ্ণ রক্ত স্রোত বহাইতে হইবে; “দুনিয়ার” জন্যও আমাদের জীবনের এক অংশ ক্ষয় করিতে হইবে। আমাদিগের মত জাতিকে জাগাইতে হইবে, সঙ্গে সঙ্গে এ চিন্তা করা উচিত। দেশী বিদেশী কত জাতি কোম্পানী করিয়া প্রচুর অর্থশালী হইতেছে, কিন্তু আমরা যে “ভিখমাঙ্গা” সেই “ভিখমাঙ্গা”! আমরা মরিও না, বাঁচিও না। আমরা যদি মিলিয়া মিশিয়া প্রত্যেক কার্যে ভ্রাতৃত্ব রক্ষণ করিতে চেষ্টা করি, তবে কে বলে আমাদের সে মিলনের ফল বৃথা হইবে? কে বলে আমাদের জাতীয় শোণিতে এখনও ধর্মোষ্ণতার অভাব হইয়াছে? কেবল সহানুভূতির অভাবে যে নির্জীবতার প্রশ্রয় দেওয়া হইয়াছে, তাহা সাময়িক জড়তা মাত্র। আমরা যদি প্রতিজ্ঞা করিয়া জাগিয়া উঠি- কর্ম-সাধনের পথের কঠোর বিপত্তি রাশি অতিক্রমের জন্য প্রস্তুত হই, তবে উন্নতি কত দূরে?

যাঁহারা দরিদ্র বলিয়া সমাজ-সেবায় উদাস-যাহারা অক্ষম বলিয়া পরিচিত করিয়া অর্থের সেবায় জীবনোৎসর্গ করিয়াছেন, তাঁহাদেরও নৈরাশ্য বা নিদ্রাপরায়ণতা উচিত নয়। আমরা অকূল সমুদ্রের মধ্যে কর্ণধারহীন জীবন-তরণীর অলক্ষ্য পরিচালন করিতেছি। আমাদের অবলম্বন কিছুই নাই। আমরা চাই সহৃদয়তা, আমরা চাই সাহায্য, আমরা চাই উপদেশ, আমরা চাই প্রতিকারের ঔষধ। কিন্তু হায়! আজ আমাদের রোগ-ক্লিষ্ট সমাজের ঔষধ খাওয়াইবার কেহই নাই; আজ আমাদের সমাজ- সেবকগণ পথ্য পাইতেছেন না। যাহা পাইতেছেন, তাহা তাঁহাদের রোগ উপশমের বিপরীত; তাহা তাঁহাদের সাধনা ডুবাইবার অন্যতম কৌশল; তাহা তাঁহাদের জীবন বধের পথ।

প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের কথা আমরা ভুলিতে পারি নাই। সেই ক্ষুধা-কাতর নিঃসম্বল দরিদ্র-সন্তান একদিন স্বীয় চরিত্রবল, প্রতিভা, ধৈর্য ও আত্মত্যাগ বলে জগতের একটা গৌরব স্থানীয় পদে অধিষ্ঠিত হইয়াছিলেন। নিরাশ্রমের অন্তিম সম্বল হৃদয়ের দৃঢ়তা। পরোপকার ও স্বজাতির সেবা সেই দৃঢ়তার অলঙ্কার। আব্রাহাম স্কুলে পড়িয়া বিদ্বান হন নাই; কাহারও ক্ষমতার গলগ্রহ হইয়া আপনাকে জগতে পরিচিত করেন নাই; তিনি আপনার দৃঢ়তায়-আপনার নৈসর্গিক মহত্ত্বে জগতের সম্মুখে পরার্থ সেবা ও স্বদেশ হিতৈষণার দ্বার উদ্ঘাটন করিয়া গিয়াছেন। তাঁহার জীবনী লেখক বলিয়াছেনঃ “যতদিন পৃথিবীতে মনুষ্য বসতি করিবে, যতদিন ভূমণ্ডলে সাম্য ও স্বাধীনতার সম্মান থাকিবে, যতদিন নরলোকে আত্মোৎসর্গ ও স্বদেশ হিতৈষিতা, বিশ্বজনীন প্রেম ও সার্বভৌমিক ভ্রাতৃভাব শব্দ বর্তমান থাকিয়া অভিধানের পত্র উজ্জ্বল করিবে, ততদিন প্রেসিডেন্ট, লিঙ্কন স্বদেশ-হিতৈষিগণের অগ্রণী বলিয়া জগতে প্রীতি ও ভক্তি পুষ্পাঞ্জলি পাইতে বঞ্চিত হইবেন না; ততদিন দেবতার ন্যায় সভ্য জগতের গৃহে গৃহে পূজিত হইতে থাকিবেন। ততদিন ভূমণ্ডলস্থ নর-নারী একবাক্যে তাঁহার স্বর্গীয় অমর আত্মার উদ্দেশে গভীর আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও অকৃত্রিম অনুরাগ উপহার দিতে কুণ্ঠিত হইবেন না।” এই প্রেসিডেন্ট লিঙ্কন কি করিয়াছিলেন? তিনি স্বদেশের কলঙ্ক মোচনের জন্য, দরিদ্রের প্রাণের যাতনা নিবারণের জন্য, নিজের জীবনের পরিবর্তে আমেরিকার দাস ব্যবসায়ের উচ্ছেদ সাধন করিয়াছিলেন। ভাই মুসলমান, সামান্য কৃষক-সন্তান যদি পৃথিবীর ইতিহাসের পৃষ্ঠা এমন উজ্জ্বল করিতে পারেন, যদি সমাজের ঘৃণিত কার্যের মূলোচ্ছেদনের জন্য অসাধারণ ধৈর্য সমবায়ে জয়ী হইতে পারেন, তবে এতগুলি বাঙ্গালী মুসলমানের সমাজ প্রীতি ও অনুষ্ঠান কাজে আসিবে না, কোন মূর্খ এ কথা বিশ্বাস করে? আমরা ল্যাফেটের জীবনী পড়িয়া দেখিয়াছি- সেখানেও এই দৃঢ়তা, ধৈর্য্য ও কর্মপ্রিয়তার জীবন্ত ছবি। সামান্য সূত্রধর পুত্র ল্যাফেট এক দিন গৃহহীন ফকিরের বেশে পারিসের (Paris) পথে পথে ভ্রমণ করিয়াছিলেন, আর সেই ল্যাফেট এক দিন এমন সম্মানের অধিকারী হইয়াছিলেন যে, ফ্রান্সের (France) সম্রাটের ভাগ্যেও তাহা ঘটে নাই। পঞ্চাশ হাজার লোক ল্যাফেটের মৃতদেহ সমাধিস্থ করিবার সময় তাঁহার জন্য দুঃখ প্রকাশ করিতে করিতে, মৃতদেহের অনুগমন করিয়াছিল। ভাই বাঙ্গালী মুসলমান, এমন অচিন্ত্য পূর্ব্ব ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনেরও কি তোমার কৌতূহল উদ্দীপ্ত হয় না? সামান্য ছুতারের পুত্র কি করিয়া এত বড় সম্মান লাভ করিল। চাই প্রাণের বল; চাই মনুষ্যত্ব; চাই আশা ও অনুরাগ। একটা সামান্য আলপিন তাঁহার জীবনকে সৌভাগ্যের পথে দীক্ষিত করিয়াছিল। তাই বলি, এ সময় আমাদের ছোট হইতেই বড় হইবার সাহস করা উচিত। নিদ্রার সময় নাই; অলসতার অবসর নাই; অই ঘনীভূত অন্ধকার আসিবার পূর্বেই প্রদীপের আয়োজন করিতে হইবে। এ প্রদীপ, জ্ঞানের প্রদীপ। এ আয়োজন আমাদের জীবনের পরিবর্তন। বর্তমানের ক্ষুদ্র মৃৎ-প্রদীপের সাহায্যে সমুদয় বঙ্গীয়-সমাজ সম্যক আলোকিত হইবে না সত্য, কিন্তু তাই বলিয়া নিরস্ত হইও না। আগে সাহস করিয়া লও: জাতীয় একতার সাহায্যে সার্বভৌমিক বল সঞ্চয় কর, তারপর দেখিবে, এ প্রদীপ মৃত্তিকার থাকিবে না। এ প্রদীপের কত আদর, এ আয়োজনের কত মূল্য, এ জীবন ক্ষয়ের কত সার্থকতা- তখন তাহা বুঝিতে পারিবে।

দশটা লাঠি এক জায়গায় করিলে শীঘ্র ভাঙ্গে না; এই একটি গল্প ছোট কালে একখানি ইংরেজি পুস্তকে পড়িয়াছিলাম। আজ যৌবনের উদ্দীপনায় সেই পুরাতন কথাটা মনে হইতেছে। তোমার চেষ্টা ব্যর্থ হইবে, আমার চেষ্টা ব্যর্থ হইবে, এ জন্য কি সকলের চেষ্টাই ব্যর্থ হইবে। কখনই না। আমরা ছাই উড়াইতে উড়াইতে মাণিক পাইবই পাইব। আমরা সাগর ছেঁচিতে ছেঁচিতে মুক্তা লাভ করিবই করিব। তবে এ সাধনার সময়টুকু ধৈর্যাবলম্বন না করিলে চলিবে কেন? আবার সামান্য সুখে অধীর হইবারও আমাদের সময় নয়; কারণ অনেক সময়ে অতিরিক্ত সুখ মানুষের অকাল মৃত্যুর কারণ হইয়া থাকে। সুতরাং এ সময়ে, এই অবিরাম পতন-স্রোত চালিত নিদ্রাতুর বা অলস বঙ্গীয় মুসলমানের ধৈর্যাবলম্বন করিয়া খাটিবার সময়। এ হেন প্রতিকূল স্রোত তাড়নার মধ্যে দু’দিনের দুর্বল যত্ন লইয়া হঠাৎ উপরের দিকে যাইবার প্রয়াস বিড়ম্বনা মাত্র।

আমাদের সকল কার্যই মৌখিক। এই দেখুন, আমরা আজ এমন জাঁক জমকের সহিত এখানে Lecture শুনিতেছি। কাল যেমনটা ছিলাম, তেমনটি হইব। আমার কথা এই, কেবল তাঁবু সামিয়ানা খাটাইয়া একত্রে দু'চারশত লোক একদিন লেকচার শুনিলেই সমাজের উপকার হইবে না। বরং উন্নতির সময়টুকু অপব্যয় করিয়া সমাজের দারুণ ক্ষতি করা হইবে। এ প্রকার মৌখিক হিতানুষ্ঠান বিকৃত সমাজ সংস্কারের যথেষ্ট আয়োজন নহে। আমাদের উচিত, একদিকে যেমন সারগর্ত লেকচার শুনিতেছি, অন্যদিকে তাহার সহিত কোন স্থায়ী সমাজ হিতকর বিষয়ের শুভানুষ্ঠানের সূচনা স্থাপন করা। যে শিক্ষার অভাবে আমাদের ঘোরতর অবনতি হইয়াছে, সঙ্গে সঙ্গে সেই অবনতি দূর করিবার জন্য, শিক্ষা বিস্তারের পথ পরিষ্কার করা। নতুবা এমন ফাঁকা বক্তৃতা এক কান দিয়া শুনিয়া অন্য কান দিয়া বাহির করিয়া দিলে, সমাজের কণামাত্র হিত সাধিত হইবে না। আমাদের এ ভণ্ডামীর ফল নিতান্ত অশুভকর ও শোচনীয়। ইহার জন্য একদিন আমাদিগকে খুব বেশি অনুতাপ করিতে হইবে।

সমুদয় বঙ্গদেশের অবস্থা পর্যালোচনা করিয়া, মুসলমানদের হীনতারই সংবাদ পাইয়াছি। হিন্দু, সকল স্থানেই প্রধান; মুসলমান, সকল স্থানেই গোলাম। এজন্য আমরা হিন্দুকে বেশি দোষ দিতে পারি না। কারণ নিজের বল-বীর্যের উপর আমাদের আত্ম- নির্ভরতা নাই। আমরা জাতীয় জীবন ও জাতীয় একতা হারা; অথচ সমান সম্মান পাইবার অভিলাষী। নিজের অবস্থা স্মরণ করিয়া উন্নতির আশায় দাঁড়াইবার পূর্বে বর্তমানের অবহেলাই আমাদের প্রাণে বৃশ্চিক দংশনের মত লাগে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, অন্যের ঘৃণা, আমাদিগকে উন্নতির জন্য উৎসাহিত করে না। বলি, হিন্দুর কাছে মুসলমান কি খৃস্টান অপেক্ষাও অস্পৃশ্য জাতি? সুতরাং অবহেলা জনিত অবস্থান্তরে আমাদেরই দোষ সমধিক। মুসলমান রাজত্বের দিনে হিন্দু যে আমাদের করুণার ভিখারী হইয়া গৌরবান্বিত হইত, আজ কি তাহা তাহাদের স্মরণ হইতেছে না। আজ হিন্দু, আমাদিগকে কেন ঘৃণা করে? কেবল ইংরেজ রাজত্বের সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতার দোহাই-বলে নয়, আমাদের জাতীয়তার অন্তঃসারশূন্যতার জন্য। কিন্তু হিন্দু যদি বুঝিতে পারে, মুসলমান তাহাদের নিকট আত্মীয় এবং প্রতিবাসী; অনেক দিন তাহারা মুসলমানের নিমক খাইয়াছে; তবেই তাহাদের স্বদেশদ্রোহীতা ঘুচিবে। ভারতের উন্নতির মূলে মুসলমান শক্তির আবশ্যকতা বুঝিয়া আপনা হইতেই আমাদিগকে ডাকিয়া লইবে। বড় পরিতাপের বিষয়, কংগ্রেসওয়ালাদের মধ্যেও অনেকে মুসলমানকে ঘৃণা করিয়া, আপনাদিগকে বাহাদুর মনে করে। জানি না, হিন্দু মুসলমানের জাতিগত পার্থক্যের এই ঘৃণিত নাটকের কতদিনে যবনিকা পতন হইবে!

আজ মুসলমান সমাজে লোক নাই; আজ দীনহীন ফকিরের দেশে হিন্দুর মুখ চাহিয়া, তাহারা নিজেদের দুঃখ দারিদ্র্যের কথা গভর্নমেন্টের কর্ণগোচর করিতেছে। ইহাতে ফল কতদূর আশানুরূপ হইতেছে, তাহা সকলেই জানিতে পারিতেছেন। জাতীয় বীর্যের এই শক্তিহীনতা আমাদের নিজের কর্তব্যে যেমন পরমুখাপেক্ষী করিতেছে, তেমনি স্বাবলম্বনতা নষ্ট করিয়া ফেলিতেছে। এই জন্যই এই আপনার লোক না থাকাতেই, আমরা আজ দীনাতিদীন ও ঘৃণিত “যবন” (?) আখ্যা পাইতেছি। শক্তি নাই, সম্বল নাই, সাহস নাই; কে আমাদের এ দুর্নাম ঘুচাইতে অগ্রসর হইবে ? ক্রমে লোকের কাছে মুসলমান এক প্রকার বীভৎস পশু শ্রেণীতে পরিণত হইতেছে। এই দুর্দিনে, একই শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত হইয়া হিন্দুর মুসলমান বিদ্বেষ নিতান্তই মূঢ়তা ও নিমকহারামীর পরিচারক, সন্দেহ নাই। যাক, হিন্দুর এ ব্যবহার বৈষম্যের আলোচনা করিয়া নিজের অদৃষ্টকে আর ধিক্কার দিবারও সময় নাই। কর্ম্মময় সংসার যে মানুষের খাটিয়া খাইবার স্থান, কেবল আত্ম চিত্ত বিনোদনই যে মানব-জীবনের লক্ষ্য নহে, বিশেষভাবে তাহা স্মরণ করাই এখন আমাদের কর্তব্য। আমরা পিতৃ-পুরুষের বীরগাথা ও সাহিত্য-দর্শনের অতীত স্বপ্ন দর্শন করিয়া বুক ফুলাইয়া যতটুকু সময় অপব্যয় করিতেছি, সেটুকু আমাদের মানব-জীবনের ঘোরতর কলঙ্ক। এই অতীত স্বপ্ন যে দিন আমাদের বর্তমান অবস্থোন্নতির পথ প্রদর্শক হইবে, সেই দিন হইতেই আমরা মনুষ্যত্ব রক্ষার জন্য জীবন পণ করিব। কিন্তু হায়, তেমন স্বপ্ন আমরা কদাচিৎ দেখিতে চেষ্টা করি বলিয়াই, এ দুর্দশা ও হীনতা অস্থি মজ্জাগত হইয়া পড়িতেছে। জাতীয় জীবন হারা বাঙ্গালী মুসলমানের অবনতির ইহাও একটা কারণ। আমরা যদি মানুষ হইতাম, আমরা যদি সমাজের প্রত্যেকের একটা জীবনের ভাবী গুরুত্বের দিকে লক্ষ্য রাখিতাম, আমাদের সকলের দ্বারা প্রকৃতই কাজ হইতে পারে, এ দৃঢ় বিশ্বাস যদি আমাদের থাকিত, তবে কে বলে আমাদের উন্নতি হইতে পারিত না। বড় পরিতাপের বিষয়, সে দিকে আমাদের নজর দেওয়া অপেক্ষা অলসতা, বিলাসিতা ও ধর্ম বিগর্হিত কার্য কলাপের উপর বেশি নজর। সুতরাং এ সমাজের উন্নতির আশা কোথায়? তুমি পয়সাওয়ালা,২ তুমিও আইস; আমাদের কল্পিত শুভানুষ্ঠানে তোমার সাধ্যমত সাহায্য কর; তুমি উদ্যোগী, তুমিও আইস, এ দুঃসময়ে তোমার দ্বারা আমাদের যথেষ্ট উপকার হইবে। তুমি লেখক, তুমিও আইস, এ ঘোর দুর্দিনে তোমার লেখনী আমাদের পাষাণ প্রাণ গলাইতে পারিবে। তুমি জ্বলন্ত প্রাণ, তুমিও আইস, তোমার উদ্দীপনায় আমাদের মৃত জীবনের সঞ্জীবনী শক্তির সঞ্চার হইবে। মোট কথা, কাহাকেও আমাদের বাদ দিবার নাই। এ সময় একজনকে ছাড়িয়া আর একজনকে লওয়া উদ্দেশ্যের অন্তরায়। আমরা সকলকেই চাই; একই পথে একই ভাবের বিভিন্ন শাখা শক্তির একত্রীকরণ প্রার্থনা করি। কাহাকেও ছাড়া হইবে না। কিন্তু বর্তমান অবস্থার হিসাবে এ আশাও দুরাশা। এ কল্পনাও প্রলাপ। কারণ, জননী মুসলমান-কুল লক্ষ্মী এবার সকল সন্তানেরই উদারতায় যথেষ্ট নিগৃহিতা, এমন কি চির-বহিষ্কৃতা হইয়াছেন; তাই এ সমাজের সন্তানগণ শ্রীভ্রষ্ট! যাহারা সু-সময়ের বন্ধু, তাঁহারা যে গতিক দেখিয়া সরিয়া পড়িয়াছেন। আজ অসময়ে কেহই নাই। দাবদগ্ধ মরুভূমির মধ্যে তৃষ্ণাতুরা, ক্ষুধা-ক্লীষ্টা শীর্ণা জননী অন্তিম শ্বাস টানিবার আয়োজন করিতেছেন। একদিন সমগ্র পৃথিবীর বুকে এই মায়ের সন্তানেরাই হুহুঙ্কার করিয়া বেড়াইয়াছেন, আর আজ মা আমাদের দীনা কাঙ্গালিনী। কালের এ বিচিত্র পরিবর্তন-রহস্যে, পতনের অন্ধকার কক্ষে বসিয়া মুহ্যমান মুসলমান বৃন্দ আজ দুঃখের জীবন বহন করিতেছে। হায়! কে জানে, আর কোনও যুগে সে দিন ফিরিবে কি না?

অনুতাপ একটা খুব বড় রকমের প্রায়শ্চিত্ত। এতদিন পরে বঙ্গের নানাস্থান হইতে যে হৃদয়-ভেদী আর্ত্তনাদ উঠিতেছে, তাহাতেই ক্ষীণ আশার আভাষ অনুভব করা যাইতে পারে। তাই সমস্বরে নিবেদন করি ভাই সমাজের সন্তান; ভাই ইসলামের সেবক; একবার ফিরিয়া আইস, একবার চাহিয়া দেখ, তোমার প্রাণসম প্রিয়তম ভ্রাতা ভগ্নিগণ অজ্ঞানতা ও পাপাচারে ডুবিয়া যাইতেছে। জগতের উন্নতিশীল জাতিদিগের পাদুকা-স্পর্শে তাহাদের মস্তক চূর্ণ বিচূর্ণ হইয়া যাইতেছে। বিজ্ঞান-দর্শনের অধীশ্বর, আজ পেটের দায়ে ভিক্ষা করিতে বাহির হইয়াছে। এ দুঃখ রাখিবার স্থান নাই; এ মর্মভেদী বর্ণনার লোক নাই; এ দুর্দ্দশা মোচনের ত্যাগশীল ব্যক্তি কেহ নাই। আমার বিশ্বাস, যতদিন মুসলমান সমাজে ফারগুসন কলেজের অধ্যাপকদের মত স্বার্থহীনতার বীজ না পড়িবে; ততদিন কিছুতেই এ সমাজের উন্নতি হইবে না। আমরা কেহ কাহারও কথা শুনিতেছি না। আপনার বুদ্ধিতে বড় হইয়া, আমাদের এক মাত্র শ্লাঘার জিনিষ জাতীয় সমাজকে কলঙ্কিত করিয়াছি; আমাদের এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত নাই। জ্বলন্ত হৃদয়ের আগুনে শত কোটি বৎসর অনুতাপও বোধ হয় ইহার প্রকৃত শাস্তি নহে। এখনও সময় আছে, এখনও অবসর হইতে পারে, একবার আত্ম-পরিচয় লইবার জন্য কৃতসঙ্কল্প হও; একবার জননীর অশ্রু বিগলিত বিশীর্ণ মুখের দিকে দেখিয়া প্রাণকে কাঁদাইতে চেষ্টা কর; একেবারে পশ্বাচারে ডুবিও না; একেবারে মানুষের মনুষ্যত্ব ধ্বংস করিও না; এই অসময়েই জননী সেবায় মহত্ত্ব। মনে রাখিও, সন্তানের কর্তব্য অবহেলার পরিণতি মহাপাপে। ভাই, এ পাপ হইতে নিবৃত্ত হইতে অনুনয় করি। আজ সভ্য জগত তোমাদের পরিণাম দেখিয়া মুখ ঢাকিয়া (স্থান বিশেষে হাততালি দিয়া) হাসিতেছে; সুতরাং এই অসময়ের উপহাস প্ররোচনাকেই তোমাদের উন্নতির উপদেশ বলিয়া গ্রহণ কর। অগ্রসর হইলেই আমাদের কামনা পূর্ণ হইবে। আহুতি পাইলেই আগুণের তেজ বাড়িবে। বসিবার সময় চাহিও না, দাঁড়াইবার সময় খুঁজিও না, এইবার পথে বাহির হইয়া পড়-এস, একে অন্যের সাহায্য করিতে করিতে যাই। দেখি উন্নতি কত কঠিন? দেখি মানুষের শক্তির সীমা কোথায়?

“ইসলাম মিশন” (Islam mission) ও “জাতীয় মহাসমিতির” (National congress) জন্য কতজন কত প্রকারে প্রাণান্ত করিতেছেন, কিন্তু ফল শূন্য দাঁড়াইতেছে। আমরা টাকার মায়া বেশি বুঝিয়াছি; কিন্তু জ্ঞানের অত্যুচ্চ সিংহাসনের কাছে আমাদের অর্থ-মহিমা ধুলায় মিশাইয়া যাইতেছে। লোকে আমাদিগকে জীবন্ত ‘জানোয়ার’ মনে করিতেছে- সেদিকে আমাদের দৃষ্টি নাই। একই বঙ্গের, একই অবস্থাপন্ন হিন্দু মুসলমানের কার্যের সমালোচনা করিলে, হৃদয় বুঝিতে পারে, মুসলমান কত অলস। কত কর্তব্যবিমুখ। আজ হিন্দুদের শত শত কাজ নির্বিঘ্নে সমাহিত হইতেছে, আর মুসলমানের কিছুই হইতেছে না। সকল অবস্থায় সকল কার্যেই মুসলমান পর্যুদস্ত ও বিপন্ন। এ অভাব কই, কে বুঝে? কে এ শূন্য ভাণ্ডার পুরাইতে অগ্রসর হইতেছে? যাহা হউক, এসব ঘরের দোষ পরকে দিয়া লাভ নাই। আমরা মানুষ নহি; আমরা মহা অভিশাপগ্রস্ত। নতুবা তেমন বংশে জন্মিয়া, তেমন সমাজের সন্তান হইয়া নিজের মস্তকে পুকুর দিব কেন? আমাদের সব গিয়াছে, তাতে ফিরাইবার জন্য যথেষ্ট সহৃদয়তারও অভাব। একে একে সমাজে ঘোর বিপ্লব উপস্থিত। এহেন কর্মযুগে ধর্ম গিয়াছে; উদ্যাগ আয়োজন গিয়াছে; সদাভিলাষ গিয়াছে; জাতীয় হাব ভাব, পোষাক পরিচ্ছদ, শিক্ষা সভ্যতা, চর্ম বর্জ্য- এক কথায় উন্নতি নামক পদার্থটা দূরীভূত হইয়াছে। আছে কি? ভিক্ষার ঝুলি। জীর্ণ মূল বৃক্ষের মত অসার দেহ পিন্ড লইয়া কেবল মরণের প্রতীক্ষা করিতেছি; কিন্তু ভাই! এ মরণে আমাদের শান্তি বা মুক্তি নাই। প্রাণপণ করিয়া হযরত ইসলাম রক্ষা করিয়া গিয়াছেন, হৃদয়ের শোণিত দিয়া তাঁহার অনুসরণকারীরা ইসলামে বল সঞ্চয় করিয়া গিয়াছেন; আমরা তাহা ডুবাইয়াছি, আমরা তাঁহার নাম হাসাইয়াছি, এজন্য আমাদিগকে জবাব দিতে হইবে। এ জন্য আমাদের জীবনকে ধিক্কার দিতে হইবে।

যে প্রকার বিভিন্নমুখী ঘটনা প্রবাহের কেন্দ্রস্থলে আমরা দাঁড়াইয়াছি, তাহাতে দুই দিকের চাপ সহ্য করিবার জন্য প্রস্তুত হইতে হইবে। এই অসহায় অবস্থায় সামান্য তৃণ-খণ্ডও আমাদের উপেক্ষণীয় নহে। প্রত্যেক স্থানের অভাব মোচনের জন্য, প্রত্যেকের বদ্ধপরিকর হওয়া উচিত। একটা অভাবগ্রস্ত সমাজের দিন ফিরান, একজনের কাজ নহে- একজনের জীবনে সাধ্যায়ত্ত নহে। আমাদের মত লক্ষ লক্ষ জীবন উৎসর্গ করিতে হইবে; জননীর সেবায় এ ঘৃণিত জীবনের উপসংহার করিতে হইবে; তবে কিছু প্রায়শ্চিত্ত হইবে; তবে একবার সে দিনের মুখ দেখা যাইবে।

যিনি হতাশ হইয়া আছেন, তিনি আশ্বস্ত হউন। তিনি ষোল আনার মধ্যে আধ আনা করিয়া গেলেই সমাজ উপকৃত হইবে। আমরা তাঁহার স্কন্ধে সমুদয় বোঝা চাপাইয়া দিতেছি না। তাঁহার জানা উচিত, আমাদের পরে যাহারা আসিতেছে, তাহারা আমাদের ঐ আধ আনা সাধনের ফল ভোগ করিয়া দেড় আনা করিয়া যাইতে পারিবে। এইরূপে ক্রমশঃ আমাদের উন্নতি পরিস্ফুট হইবে। ইহা এক দিনের কাজ নহে; এ সাধনা দীর্ঘকাল ব্যাপী করিতে হইবে। এ সাধনার ক্ষেত্র সকল প্রকার শুভানুষ্ঠান বুক পাতিয়া লইবার জন্য প্রশস্ততর হইবে। জননীর সেবক সন্তানেরা হর্ষোৎফুল্ল লোচনে দেখিতে পাইবেন, তাঁহাদের স্বহস্ত রোপিত ফুলকুল আজ ফুটিয়া গিয়াছে। আজ তাঁহাদের আদরের ফুল তাঁহাদিগের কণ্ঠে জাতীয় একতার সুমধুর হার পরাইয়া দিয়াছে।

আমরা আর সেই পতিত মুসলমান নহি; আমরা আর সে দীনহীন ফকীর নহি; আমরাও অন্যের মত বিক্রান্ত উন্নত কর্মবীর জাতি। দেবতার আশীর্ব্বাদ অনেক দিন পরে মস্তকে পড়িয়াছে।

আমরা মানুষ; মানুষে যা পারিয়াছে, আমরা তাহা পারিব; হতাশ হইবার কারণ নাই। সামান্য রেলগাড়ীর গার্ড এডিসন যদি প্রতিভাবলে পৃথিবীর একজন শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক হইতে পারেন; এক ওয়াশিংটনের ব্রহ্ম-চৈর্য্যের পরিবর্তে যদি আমেরিকার স্বাধীনতা ফিরিতে পারে; এক নেপোলিয়ানের প্রতিজ্ঞায় যদি ইউরোপে একচ্ছত্র রাজদণ্ড পরিচালনের ক্ষমতা জাগে; এক ম্যাটসিনীর জীবনের মূল্য যদি ইতালির স্বাধীনতা হয়; এক প্রতাপ সিংহের জীবন যদি রাজস্থানের গৌরব জাগাইতে পারে; বোবা প্রায় ডিমস্থিনিসের চেষ্টা যদি তাঁহাকে জগতের প্রধান বক্তা করিতে পারে; এক লি হাং চাং অথবা প্রিন্স বিসমার্ক যদি পৃথিবীর গৌরব মুকুট হইতে পারেন, এক বিদ্যাসাগরের দয়ায় যদি পৃথিবী গুণগান করিতে পারে; এক সুলতান গাজী আবদুল হামিদ খান যদি তুর্কী জাতির ভীষণ অধোগতির গতি ফিরাইতে পারেন, এক আমীর আবদুর রহমান খান যদি অসভ্য দুৰ্দ্দান্ত আফগান জাতির হৃদয়ে অপূর্ব নব শক্তির সঞ্চার করিয়া দিতে পারেন, এক সৈয়দ আহমদ খান যদি একটা দেশের অধিবাসীকে মানুষ করিবার আয়োজন করিতে পারেন, এক শেখ অল সনৌসী যদি কোটি কোটি মানবকে ধর্ম বলে বলীয়ান ও একতার সুদৃঢ় রজ্জুতে বন্দীভূত করিতে পারেন, এক রামমোহনের জীবন যদি কোন জাতির প্রাণে তড়িদ্বেগের সঞ্চার করিতে পারে; তবে আমাদের এতগুলি লোকের চেষ্টা বিফল হইবে, কে এ কথা সাহস করিয়া বলিতে পারে? যে বলে, তাহাকে আমি পাগল বলি। তাহার লঘু চিন্তাকে আমি উপহাস করি। ভাই মুসলমান! আইস, এই অর্দ্ধ চন্দ্রাঙ্কিত জাতীয় পতাকার তলে আইস-আজ একই কেন্দ্রে আমরা একত্রিত হই; আজ একই মন্ত্রে আমরা দীক্ষিত হই। ভাবিয়া দেখ, আমাদের প্রত্যেক অঙ্গ প্রত্যঙ্গ লইয়া যেমন শরীর, তেমনি প্রত্যেক জেলা লইয়া এই বিশাল বঙ্গ দেশের বিরাট মুসলমান সমাজ গঠিত। আমাদের হাত পা নড়িলে যেমন সমস্ত শরীর আলোড়িত ও অভাব পূর্ণ হয়, তেমনি আমাদের সমাজের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আমরা না নাড়িলে, আমরা না জাগিলে, আমাদের উন্নতি নাই। ভাই ধর্মপ্রাণ মুসলমান, ভাই সমাজ প্রাণ পুরুষ, ভাই স্বজাতি-হিত চিকির্যু। আইস, আজ অসময়ে মায়ের সেবা করিয়া প্রকৃত সন্তানের কাজ করি। নিজের কাজ নিজে করিয়া কৃতার্থ হই। মুখামুখি করিয়া সময় নষ্ট করিবার আর অবসর নাই। আমাদের প্রত্যেকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শক্তিই এখন কাজে আসিবে। নিরাশ হইবার সময় নয়, এ সময় Alexander Selkirk এর মত “I am monarch of all I survey”, করিয়া দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়িলে মানুষের উপযুক্ত কাজ হইবে না। যখন মানুষ নাম লইয়া জন্মিয়াছি, তখন একবার জন্মের শোধ সমাজের জন্য জীবন বলিদান করিয়া দেখ দেখি; অচিরে আমাদের সুখের দিন ফিরিবে; অচিরে আমাদের দুঃখের রজনী অবসান হইবে, আমরা কর্মবীর হইব। আমাদের সাধনার অংশ, আমরা জগতকে উপহার দিতে সমর্থ হইব। আবার আমাদের সৌভাগ্যসূর্য্য সমুদিত হইবে। আমরা মানুষের মত মানুষ হইতে পারিব। জানিও, কর্ম্মপ্রিয় লোকের কাছে উন্নতি সু-দুর্লভ নহে। আমীন।।

টীকা

  1. যত দিন আমরা মুনশী মেহেরুল্লা সাহেবের লেকচারকে যাত্রা-থিয়েটরের মত একটা আমাদের জিনিস মনে করিব, ততদিন উন্নতির আকাঙ্খা করা দুরাশা। দুঃখের বিষয়, অধিকাংশ স্থানে সভার ফল বিকৃত হইতেছে। (লেখক)

  2. বঙ্গে মুসলমান অর্থশালীর সংখ্যা নিতান্ত কম নহে। কিন্তু বলিতে লজ্জা হয়, ইহাদের মধ্যে চৌদ আনা ধুরন্ধর অপব্যয় ও ধনব্যয় ও ধনমদে মত্ত। এই সমস্ত মহারথীকে বেশি কিছু বলিবার নাই। কারণ অতবড় মাহমুদ গজনবির উপদেশ, “রিক্ত হস্তে সমাধি দ্বারে গমন” তাঁহাদের পক্ষে কম ঔষধ নহে। আমরা বিপদ-সঙ্কুল লেখক জন্ম লইয়াছি; সত্যের অনুরোধে সকল কথা বলিতে হইলেও খোলাখোলি ভাবে বলিতে Libel এর ভয় করি। কারণ সময় বড় খারাপ। যাহা হউক, তাঁহাদের মনে করা উচিত, এই ধন-গর্ব ভবিষ্যৎ ইতিহাসে তাঁহাদিগকে বিকট-চিত্রে চিত্রিত করিবে। বর্তমান অবস্থায় ইহাদের কার্য-কলাপ, ব্যবহার ও চরিত্র সমালোচনা করিলে দেশের ও সমাজের বিকৃতি বুঝা সহজ হইতে পারে। এই শ্রেণীর ধনী পুঙ্গবেরা নিজে নিজে বড় লোক সাজিয়া বাহাদুর হইতে পারেন, আমরা কিন্তু পথের একটা ধুলি কণার সহিত ইহাদের সমকক্ষর বিচার করিতে লজ্জিত।

হদিস

(হোসেন মাহমুদ ও মো. আব্দুল কুদ্দুস সম্পাদিত “শেখ ফজলল করিম রচনাবলী” থেকে সংকলন করা হয়েছে।)