মেন্যু
Menu

বৈশ্বিক ইতিহাসে হাকিমিয়্যার অবস্থান নির্ণয় : দ্বিতীয় কিস্তি | উসামা আল-আযামী

৯ অক্টোবর, ২০২৫

“বৈশ্বিক ইতিহাসে হাকিমিয়্যার অবস্থান নির্ণয় : প্রাক-আধুনিক ইসলামে সার্বভৌমত্ব ধারণা এবং মওদূদী ও কুতুব-পরবর্তী এর গ্রহণযোগ্যতা” শিরোনামের এই প্রবন্ধটি উসামা আল-আযামীর মূল প্রবন্ধ Locating Ḥākimiyya in global history: The concept of sovereignty in premodern Islam and its reception after Mawdūdī and Quṭb. থেকে অনুদিত। পড়ার সুবিধার্থে এখানে দুই কিস্তিতে ছাপানো হয়েছে। পয়লা কিস্তি পড়ুন। )

মওদূদীর চোখে সার্বভৌমত্বকে পুনর্পাঠ 

পশ্চিমা রাষ্ট্রচিন্তায় ‘সার্বভৌমত্ব’ নিয়ে হান্স মরগেনথাউ (মৃত্যু : ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দ/১৪০০ হিজরি)–এর প্রভাবশালী সংজ্ঞা আজও বারবার উদ্ধৃত হয়। তিনি সংক্ষেপে সার্বভৌমত্বকে সংজ্ঞায়িত করেন, “নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ওপর সর্বোচ্চ ক্ষমতার প্রয়োগকে”।[1] এ ছাড়াও তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, এটি “আইনের পরিভাষায় আধুনিক যুগের শুরুর এক মৌলিক রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বোঝায়, যেখানে একটি কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের কর্তৃত্ব অর্জন করে”।[2] মরগেনথাউ-এর এই সংজ্ঞা আইনগত ও রাজনৈতিক, এই দুই মাত্রাকে একত্রিত করে। তার বিশ্লেষণ যে মূলত পশ্চিম ইউরোপীয় ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট বিকাশকে নির্দেশ করে, তা স্পষ্ট। এই সংজ্ঞাটি তিনি প্রকাশ করেন ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে (১৩৬৭-৬৮ হিজরি), যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে তার শীর্ষ ক্ষমতার আসনে অবস্থান করছিল এবং মরগেনথাউ নিজে হয়ে উঠছিলেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিদ্যার এক শীর্ষস্থানীয় পণ্ডিত। তার সংজ্ঞা তাই শুধু তাত্ত্বিক নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট ইতিহাস, ভূরাজনীতি এবং ক্ষমতার প্রেক্ষাপটেও রচিত।

 

ধর্মের সংজ্ঞায়নে তালাল আসাদ যেমন দেখিয়েছেন যে, এটিকে একটিমাত্র সর্বজনীন সংজ্ঞায় বাঁধা যায় না, এবং ব্রেন্ট নংব্রি বলেছেন, এটি সাধারণত ইউরোপকেন্দ্রিকভাবে ব্যবহৃত হয়। আমি বলব, ‘সার্বভৌমত্ব’ নিয়েও একই কথা প্রযোজ্য। এই ধারণা নিয়ে বিভিন্ন সমাজ ও চিন্তাধারায় ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।[3] উইলিয়াম গ্যালির ভাষায়, এটি “মূলগতভাবে বিতর্কিত একটি ধারণা” (Essentially Contested Concept)—যার কোনো একক ব্যাখ্যা নেই, বরং সব সময় বিতর্ক ও নানা দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে দিয়ে এটি গড়ে ওঠে।

হান্স মরগেনথাউ ১৯৪৮ সালে ‘সার্বভৌমত্ব’ নিয়ে যে সংজ্ঞা দেন, সেটি তার সময়, স্থান এবং দৃষ্টিভঙ্গির ফল। তা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে আমেরিকার ক্ষমতার শিখরে পৌঁছার সময়, এবং মরগেনথাউ নিজেও ছিলেন একজন প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিশারদ। কিন্তু এই সংজ্ঞাকে ইসলামি রাজনৈতিক ভাবনার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে গেলে তা নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে হবে, এবং একে নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে।

 

এই দিক থেকে মওদূদী ও তাঁর অনুসারীদের ব্যাখ্যা বোঝার একটি উপায় হতে পারে, তাঁদের ব্যবহৃত ‘সার্বভৌমত্ব’ ধারণাটি কীভাবে গঠিত হলো, তা খুঁজে দেখা। যেমনটি গবেষক জামান দেখিয়েছেন, ‘সার্বভৌমত্ব’ শব্দটি মওদূদীর আগেই ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল। অর্থাৎ এই ধারণাটি ঔপনিবেশিক শক্তির মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় এসেছিল। সুতরাং মওদূদী এবং অন্যান্য ওলামারা এমন একটি ধারণার মুখোমুখি হন, যা পশ্চিমা আধিপত্যের অংশ হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে মওদূদী এই ধারণাটিকে সরাসরি গ্রহণ করেননি। বরং তিনি এটিকে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, সার্বভৌমত্ব মানুষের বা রাষ্ট্রের নয়, বরং একমাত্র আল্লাহর। তাঁর এই অবস্থান শুধু ধর্মীয় নয়, বরং রাজনৈতিকও। কারণ তিনি ইসলামি ভাষা ব্যবহার করে পশ্চিমা রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ভাবনার বিরোধিতা করেছেন।

মওদূদী বুঝেছিলেন যে, ‘সার্বভৌমত্ব’ ধারণা পশ্চিমা দেশগুলো তৈরি করেছিল (যেমন, মরগেনথাউ যেটি ব্যাখ্যা করেন), তা ইসলামের ইতিহাসে আইনের গঠন ও প্রয়োগের রীতির সঙ্গে মেলে না। পশ্চিমে যেমন বডিন বা হবস বলেছিলেন, একজন শাসক বা রাষ্ট্রই সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। মওদূদীর দেখা ব্রিটিশ উপনিবেশেও এর প্রতিফলন ছিল। কিন্তু ইসলামি সমাজে আইন প্রণয়ন কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে ছিল না, বরং তা ছিল আলেমদের একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আসলে ইসলামি দুনিয়ায় আইন বানানো হতো না, বরং আল্লাহর দেওয়া আইন আবিষ্কার করার চেষ্টা হতো। আল্লাহকেই আইনদাতা হিসেবে ধরা হতো, আর মানুষ ইজতিহাদ ও যুক্তির মাধ্যমে সেই আইন খুঁজে বের করত।[4]

ইউরোপেও বডিন বা আধুনিক চিন্তাবিদদের আগে এমন একটি ধারণা ছিল। যেখানে বলা হতো, প্রকৃত আইন আসে ঈশ্বর থেকে, মানুষ কেবল তা আবিষ্কার করে। আমি নিশ্চিত নই, মওদূদী এই ইউরোপীয় চিন্তার ধারার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন কি না। তবে এটি স্পষ্ট যে ইসলামি চিন্তার সঙ্গে এর একটি গভীর সাদৃশ্য রয়েছে, এবং মওদূদীর চিন্তায় সেটিই প্রতিফলিত হয়েছে।

 

বডিন, হবস, ফিলমার প্রমুখ চিন্তাবিদরা যে ‘আইন প্রণয়নের ক্ষমতা একটি কেন্দ্রীভূত শাসকের হাতে তুলে দেওয়ার’ তাত্ত্বিক অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, সেটি ইউরোপে সংস্কার আন্দোলন (Reformation) ও পরবর্তী ধর্মীয় যুদ্ধগুলোর পটভূমিতে একটি প্রতিক্রিয়ামূলক অবস্থান ছিল। এই চিন্তাবিদদের লক্ষ্য ছিল সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এবং সে লক্ষ্য পূরণে তারা আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের সমস্ত ক্ষমতা এমন একজন একনায়ক শাসকের হাতে কেন্দ্রীভূত করতে চেয়েছিলেন, যার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বৈধ নয়।

কিন্তু ইসলামি ইতিহাসে, বিশেষ করে প্রাক-আধুনিক যুগে, এই দুটি ক্ষমতা তথা ‘আইন প্রণয়ন ও আইন প্রয়োগ’ পরস্পর থেকে আলাদা ছিল। আইন প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক বলপ্রয়োগের ক্ষমতা শাসকের হাতে থাকলেও তিনি আইন প্রণয়নকারী ছিলেন না। তিনি পরিচালিত হতেন এমন একটি আইনি কাঠামোর মধ্যে, যার রক্ষণাবেক্ষণ করতেন আলেম ও ফকিহগণ। তাঁরা শাসকের সঙ্গে কাজ করতেন বটে, কিন্তু তাঁদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতেন এবং সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, সেটি তারা অনেকাংশে সফলভাবেই করেছিলেন।[5] চিন্তাবিদ অ্যান্ড্রু মার্চ উল্লেখ করেন, ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তায় প্রকৃতপক্ষে আইনগত সার্বভৌমত্ব (Ultimate Legislative Sovereignty) দাবির অধিকারে ছিলেন এই ফকিহগণ বা ‘উলামারা’ এমনটি বলা যায়। তবে মার্চ নিজেও স্বীকার করেন, এটি ‘সার্বভৌমত্ব’ শব্দের সেই অর্থে সত্য নয়, যেমনটা বডিন, হবস বা মরগেনথাউ ব্যবহার করেছেন। ইসলামি আলেমরা কখনোই নিজেকে আইন তৈরির অধিকারী বলেননি; বরং তাঁদের ভূমিকা ছিল কুরআন ও হাদিসের আলোকিত নির্দেশনার ভিত্তিতে যুক্তি ও চিন্তাচর্চার মাধ্যমে বুঝে নেওয়া। যেখানে কোনো বিষয় নিয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত (ইজমা) ছিল না, সেখানে সম্ভাব্য ব্যাখ্যার ভিত্তিতে আইন আবিষ্কার করা হতো। সার্বভৌমত্ব তাই ইসলামি প্রেক্ষাপটে কখনোই একক ক্ষমতার সমার্থক নয়। বরং এটি ছিল একটি বিতরণকৃত, যুক্তিনির্ভর এবং ধর্মীয় পাঠকেন্দ্রিক প্রক্রিয়া। যেখানে রাষ্ট্র, আইন ও জ্ঞান-সম্প্রদায় পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হলেও একে অপরের অধীনস্থ ছিল না।[6]

মওদূদী যখন সার্বভৌমত্বকে আল্লাহর কাছে নির্দিষ্ট করে রাখেন, তখন তিনি তাত্ত্বিকভাবে ইসলামি আইন ও শাসনব্যবস্থার সেই পুরোনো ধারণাকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হন। যেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতার কাজ ছিল আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করা, তৈরি করা নয়। একই সঙ্গে, মওদূদী আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য একটি বিকল্প ধারণাও তুলে ধরেন, যেখানে সার্বভৌমত্বের কাঠামো এমন এক শাসনব্যবস্থার কথা বলে, যা হয়তো বডিন বা হবসের একনায়ক সার্বভৌমত্ব ধারণার চেয়ে, বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ ও একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে অনেক রাষ্ট্রের Post-authoritarian (স্বৈরশাসন-পরবর্তী) বাস্তবতার সঙ্গে আরও ভালোভাবে খাপ খায়।

 

এ ছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক গবেষক দেখিয়েছেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জগতে বহুপাক্ষিকতা (Multilateralism) বাড়ার ফলে ‘সার্বভৌমত্ব’ ধারণাটি আগের মতো আর নিরঙ্কুশ রয়ে যায়নি। জাতিসংঘ বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলো যখন নানা চুক্তি ও অংশীদারিত্বে যুক্ত হয়, তখন অনেক সময়ই তারা তাদের ঐতিহ্যগত সার্বভৌমত্বের কিছু অংশ অন্য কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের হাতে ন্যস্ত করে। অন্তত তত্ত্বগতভাবে, এই চুক্তি ও সংস্থাগুলো রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরের কিছু শক্তিকে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়।

 

আগেই আমরা দেখেছি, মওদূদী ও কুতুব যে ‘হাকিমিয়্যা’ ধারণা তুলে ধরেছেন, তা ইসলামি ঐতিহ্যে আল্লাহর আইনগত কর্তৃত্ব সম্পর্কিত ভাবনার সঙ্গে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন বা বিপ্লবাত্মক কিছু নয়। অর্থাৎ, এটি ইসলামের মূল ধারার ভাবনার বাইরে চলে যায়নি। তবে এটা মনে রাখা জরুরি যে, এই চিন্তা-প্রবাহ মওদূদী ও কুতুবের সমকালীন বহু গুরুত্বপূর্ণ আলেমদের সমালোচনার হাত থেকেও রেহাই পায়নি। এমনকি তাঁদের মধ্যেও যারা সামগ্রিকভাবে ইসলামপন্থি আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল। এই প্রবন্ধের বাকি অংশে আমি এমন একজন ইসলামপন্থি আলেমের কথাই বিশ্লেষণ করব, যিনি মওদূদী ও কুতুবের ‘হাকিমিয়্যা’ ধারণা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন এবং মনে করেন যে, এ ধারণায় ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা যথাযথভাবে প্রতিফলিত করে না।

 

বিশ্বপরিসরে ‘সার্বভৌমত্ব’ ধারণা নিয়ে যে ইতিহাসভিত্তিক আলোচনা এখানে উপস্থাপিত হচ্ছে, তার মধ্যে এই আলেমের দৃষ্টিভঙ্গিকে দেখা যেতে পারে আরেকটি বিকল্প ইসলামি ধারার চিন্তা হিসেবে। যেটি মূলত কুরআন ও হাদিসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এক গভীর চিন্তানির্ভর ধারণা, এবং এটি মওদূদী ও কুতুবের চিন্তার মতোই পশ্চিমা বিভিন্ন ‘সার্বভৌমত্ব’ ধারণার সাথে প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্ক তৈরি করে।

 

 

নদভীর দৃষ্টিকোণ থেকে মওদূদী ও কুতুব-সমালোচনা

 

এই প্রবন্ধের ভূমিকায় যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, মওদূদীর সার্বভৌমত্ব বিষয়ক ধারণার প্রারম্ভিক এক সমালোচনা পাওয়া যায় তার এককালের সহকর্মী ও দীর্ঘদিনের বন্ধু, প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ এবং দারুল উলূম নদওয়াতুল উলামার প্রধান আবুল হাসান আলি নদভীর লেখায়। নদভী তার এই বয়োজ্যেষ্ঠ সমসাময়িক মওদূদীর সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন এবং পাশাপাশি তিনি সাইয়্যেদ কুতুবের সঙ্গেও একটি আত্মিক বন্ধন গড়ে তোলেন। তিনি কুতুবকে “প্রিয় ও শিক্ষিত বন্ধু” বলে অভিহিত করেন এবং রাষ্ট্রনেতা জামাল আবদেল নাসের (মৃ. ১৩৯০ হিজরি/১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দ)-এর শাসনামলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় তাকে একজন শহীদ হিসেবে বর্ণনা করেন।

মওদূদীর প্রতি উৎসর্গীকৃত এক উদার স্মৃতিচারণে নদভী উল্লেখ করেন যে, তিনি মওদূদীর চেয়ে এক দশকের কিছু বেশি কনিষ্ঠ হলেও ১৩৬০ হিজরি/১৯৪০-এর দশকের শুরুতে তার রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং সংগঠনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে নেতৃত্বমূলক ভূমিকা পালন করেছিলেন বলেই প্রতীয়মান হয়।[7]

 

যদিও নদভী জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেওয়ার কিছুদিন পরই তা ছেড়ে দেন, তথাপি জীবনের শেষ পর্যন্ত মওদূদীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখে ছিলেন। তবে মওদূদীর মৃত্যুর এক বছর আগে তিনি তাঁর ধর্ম ও রাজনীতি-বিষয়ক চিন্তার ওপর একটি ছোট পুস্তিকা লেখেন। এটি ১৩৯৮ হিজরি/১৯৭৮ সালে উর্দু ভাষায় প্রকাশিত হয় এবং পরে আরবি ও ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়। পুস্তিকায় নদভী জানান যে, তিনি মওদূদীর জীবিত অবস্থায়ই বইটি তাঁকে দেখিয়েছিলেন। মওদূদী তা পড়ে প্রশংসা করেছিলেন, যদিও তিনি ভদ্রভাবে নদভীর মতামতের সাথে দ্বিমত পোষণ করেন।[8] মুহাম্মদ কাসিম জামান এই ধরনের সমালোচনাকে ‘আলিমদের ভেতরের সমালোচনা’ (Internal Criticism) বলে উল্লেখ করেছেন।[9] নদভী এবং পরবর্তী আলোচিত অন্যান্য আলিমদের মতো, অনেক দিক থেকেই তাঁরা ইসলামি আন্দোলনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে একমত ছিলেন। তাদের পার্থক্য ছিল মূলত পদ্ধতি ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে, ইসলামি রাজনীতিতে অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়।

 

নদভী ‘মওদূদী ও কুতুব’ এই দুজনকে ইসলাম সম্পর্কে প্রায় একই রকম চিন্তাধারার অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, কুতুব মওদূদীর চিন্তাধারায় “গভীরভাবে প্রভাবিত” হয়েছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে “পুরোপুরি একমত” ছিলেন। এই দুই বয়োজ্যেষ্ঠ চিন্তাবিদের প্রতি নদভীর সমালোচনা বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহকর্মীসুলভ, যাদের তিনি জীবনের কিছু সময় শিক্ষক বা অভিভাবক হিসেবেও দেখেছেন বলে মনে হয়। তাঁর এই সমালোচনার মূলত দুটি বিষয় রয়েছে, যা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন :

১. ইসলামকে অতিমাত্রায় রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার প্রবণতা। 

২. যার ফলে মুসলমানদের ‘তাকফির’ বা অমুসলিম ঘোষণা করার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এই প্রসঙ্গে নদভী মনে করেন, মওদূদীর ‘হাকিমিয়্যা’ বা আল্লাহর শাসন ক্ষমতা বিষয়ে কিছু বক্তব্য অতিরঞ্জিত। উদাহরণ হিসেবে তিনি মওদূদীর একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেন, যেখানে বলা হয়েছে, “যদি কেউ আল্লাহর অনুমতি ছাড়া অন্য কারো কথা মান্যতার যোগ্য মনে করে, তবে সে যেমন আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থাপন করে (শিরক), তেমনি অপরাধী সাব্যস্ত হয়।” আরও বলা হয়, যে শাসক নিজেকে চূড়ান্ত রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী দাবি করে, সে মূলত পরোক্ষে নিজেরই ‘উপাস্য’ হওয়ার দাবি করছে।[10] নদভীর মতে, এসব বক্তব্য অতিরঞ্জিত এবং ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ নয়।

 

তবে শুরুতেই নদভী তার লেখায় তুলে ধরেন, কীভাবে মওদূদীর চিন্তাধারা সাইয়্যেদ কুতুবকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। নদভীর বর্ণনায় কুতুব এমন একটি যুক্তি তুলে ধরেন, যেসব শাসনব্যবস্থা ও আইন ইসলামি উৎস থেকে না এসে মানুষের তৈরি, সেগুলো আসলে মানুষকেই চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী করে তোলে। আর এতে মানুষকে আল্লাহর পরিবর্তে উপাস্যের আসনে বসানো হয়। কুতুবের বিখ্যাত গ্রন্থ “মা’আলিম ফিত তারিক” (Milestones) থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে নদভী দেখান, কুতুব মনে করেন ইসলামি শাহাদাহ্ “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” (আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই)—এর প্রকৃত অর্থ হলো, আল্লাহ ছাড়া কোনো বৈধ শাসক বা আইনপ্রণেতা থাকতে পারে না। এই বক্তব্যের ফলে যে বিষয়টি নদভীর মতো সহানুভূতিশীল সমালোচকদের সবচেয়ে বেশি চিন্তিত করে তুলে, তা এই ধারণা যে, যেহেতু অধিকাংশ আধুনিক মুসলমান বা মুসলিম সমাজ এভাবে ভাবে না, বরং পশ্চিমা আইনব্যবস্থা ও শাসনতন্ত্রকে নিজেদের রাষ্ট্রকাঠামোতে স্থান দিয়েছে, তাই তারা প্রকৃত অর্থে মুসলমান নয়। বরং তাদের আবার ‘সত্যিকারের’ ইসলামের শিক্ষা দিয়ে, শাহাদাহ্-এর প্রকৃত তাৎপর্য বোঝাতে হবে।[11] নদভীর দৃষ্টিতে এভাবেই কুতুব ‘তাকফির’ অর্থাৎ গোটা মুসলিম সমাজকে অমুসলিম আখ্যা দেওয়ার দ্বারপ্রান্তে চলে যান। আর এটাই নদভীর কুতুবের ‘হাকিমিয়্যা’ ব্যাখ্যার প্রতি মূল আপত্তি।

 

কুতুবের লেখায়, ‘শাহাদাহ’কে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার ফলে ‘হাকিমিয়্যা’ বা আল্লাহর সর্বময় কর্তৃত্বের ধারণা প্রায়োগিকভাবে মুসলিম সমাজকে অমুসলিম বলার পথটি সরল ও সহজ করে তোলে। এ ছাড়াও, আল্লাহর ইবাদতের বিষয়ে কুতুব বলেন, “মুসলমান ও অমুসলমানকে আলাদা করে এমন ইবাদত হলো, আল্লাহর শাসনের (হুকুমুল্লাহ) প্রতি পূর্ণ আনুগত্য, অধীনতা ও একনিষ্ঠ অনুসরণ।”[12]

অর্থাৎ কুতুবের মতে, যে ব্যক্তি আল্লাহর শাসনের বাইরে অন্য কোনো নিয়ম বা আইন মেনে চলে, সে প্রকৃত মুসলমান নয়। কালের পরিক্রমায় কুতুবের এই ‘তাকফির’ অর্থাৎ অন্য মুসলমানদের অমুসলিম ঘোষণা করার প্রবণতা খুবই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এবং ১৩৮০ হিজরি/১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে মুসলিম ব্রাদারহুড উক্ত বক্তব্যের বিরোধিতা করে এবং তা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করে।[13]

 

তবে মনে রাখতে হবে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে আইনপ্রণেতা হিসেবে মানা বা আল্লাহর আইনের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব অস্বীকার করার ভিত্তিতে কারো ‘ঈমান’ অস্বীকার করা (তাকফির) একেবারে নতুন কোনো কথা নয়। ইসলামের ইতিহাসে এই ধরনের চিন্তার ছায়া বিভিন্ন যুগে পাওয়া যায়। এই প্রেক্ষাপটে, নদভীর সমালোচনাকে বুঝতে হবে একটু ভিন্নভাবে। তিনি কুতুবের মতো কড়া অবস্থান নেননি। বরং ইসলামের দাবিগুলো কীভাবে ধাপে ধাপে ও বাস্তবসম্মতভাবে মুসলমানদের জীবনে প্রতিফলিত হওয়া উচিত, সে বিষয়ে তার অবস্থান অনেক পরিমিত ও ভারসাম্যপূর্ণ।

একইভাবে, মওদূদীর ক্ষেত্রে নদভীর সমালোচনাকেও যেন ভুলভাবে না বোঝা হয় যে, তিনি মানুষের তৈরি আইনের সর্বময় কর্তৃত্বকে বৈধতা দিচ্ছেন। বরং তিনি শুধু এটাই বোঝাতে চাচ্ছেন যে, ইসলামে আল্লাহর সঙ্গে অন্য কিছুকে উপাস্য মানা স্পষ্ট শিরক ও একটি বড় গুনাহ্। পক্ষান্তরে, কারও আইনের অনুসরণ করাকে শিরকের সূক্ষ্ম রূপ বলা গেলেও তা সেই স্পষ্ট শিরকের মতো ভয়াবহ নয়।

 

এই যুক্তি তুলে ধরার মাধ্যমে নদভী ইসলামি বিদ্যাচর্চার এক সুপ্রতিষ্ঠিত বিভাজন নীতি অনুসরণ করেন, যা মওদূদী ও কুতুবের নির্দিষ্ট কিছু লেখায় উপেক্ষিত হয়েছে। সেটি হলো প্রকাশ্য বা বড় শিরক এবং আড়ালিত বা ছোট শিরক এর মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য। ছোট বা সূক্ষ্ম শিরকের ধারণা পাওয়া যায় হাদিসসমূহে। যেখানে নবি (সা.) ছোট শিরকের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তিনি এর ব্যাখ্যায় বলেন, এটি হলো রিয়া, অর্থাৎ লোকদেখানোর জন্য ইবাদত করা। আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে মানুষের প্রশংসা কামনায় কাজ করা।[14] আরেকটি হাদিসে নবি (সা.) আড়ালিত শিরকের বিপদ নিয়েও সতর্ক করেছেন, যার অর্থ, এমন ইবাদত বা কাজ, যা বাহ্যিকভাবে ঠিক মনে হলেও তার অন্তরে আছে খ্যাতির বাসনা বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য।

 

এইসব ধারণা প্রাক-আধুনিক ইসলামি চিন্তাধারায় নিয়মিত আলোচনা হয়েছে। যেমন, প্রখ্যাত মালিকি আলেম ইবনে বাত্তাল (মৃ. ৪৪৯ হিজরি/১০৫৭ খ্রিষ্টাব্দ) উল্লেখ করেন, নবির (সা.) রিয়া সম্পর্কিত সতর্কবার্তা থেকে বোঝা যায়, এই পাপ ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষকে ইসলামের বাইরে নিয়ে যায় না, যতক্ষণ না তা কারো বিশ্বাসের মূলভিত্তিকেই আঘাত করে (عقد الإيمان)।[15] তেমনইভাবে পরবর্তী যুগের প্রখ্যাত হাম্বলি আলেম ইবনে রজব আল-হাম্বলি (মৃ. ৭৯৫ হিজরি/১৩৯৩ খ্রিষ্টাব্দ) বলেন, শিরক কখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তা মানুষকে ইসলামের বাইরে নিয়ে যেতে পারে, আবার অনেক সময় তা ছোট বা অপ্রধান (শিরক আল-আসগর) ধরনের হয়ে থাকে।

ছোট শিরকের উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন :

-আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর নামে কসম খাওয়া, 

-আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করা,

-আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ওপর ভরসা রাখা বা নিজেকে তার দাসত্বে সমর্পণ করা,

-কিংবা এই ধরনের বাক্য বলা : “যা আল্লাহ চান এবং আপনি চান” (মাশাআল্লাহ ওয়া শি’তা)।[16]

 

তিনি এ বিষয়ে আলাদা ব্যাখ্যা করেছেন, স্পষ্টভাবে কোন ধরনের শিরক মানুষকে ইসলামের গণ্ডির বাইরে নিয়ে যায়। এক হাদিসের ব্যাখ্যায় যেখানে বলা হয়েছে, মুসলমানদের বিশ্বাস রাখতে হবে যেসব নেয়ামত একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। সেখানে ইবনে রজব মন্তব্য করেন, “যে কেউ আল্লাহর সঙ্গে অন্য কিছুর প্রতি নেয়ামতের উৎস হিসেবে বিশ্বাস রাখে, এবং মনে করে যে সেগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে নয়, সে প্রকৃত শিরক করেছে (হাকিকি মুশরিক)।” তার বিপরীতে, যদি কেউ বলে, বৃষ্টি হয়েছে তারকা বা নক্ষত্রের প্রভাবে, কিন্তু একই সাথে বিশ্বাস রাখে যে আসল কারণ আল্লাহই, তাহলে সে শুধু সূক্ষ্ম শিরক করেছে; এতে করে সে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায়নি, তবে এটা একটি গুনাহ।[17] এই বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, ইবনে রজব স্পষ্টভাবে ছোট ও বড় শিরকের মাঝে পার্থক্য করেন, যা নদভীর অবস্থানের সঙ্গেও সংগতিপূর্ণ। এই পার্থক্য মওদূদী ও কুতুবের লেখায় স্পষ্ট নয়।

 

নদভী মওদূদীর সমালোচনায় একই ধরনের পার্থক্য তুলে ধরেন। যখন মওদূদী বলেন, আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্ব অস্বীকারকারী ব্যক্তি সেই ব্যক্তির মতোই শিরকের অপরাধে দোষী, যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে উপাসনা করে বা যার কাছে প্রার্থনা করে।[18] নদভী এর প্রতিবাদে বলেন, রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থার প্রশ্নকে প্রকৃত শিরক বা মূর্তিপূজার সঙ্গে এক কাতারে রাখা যায় না। তাঁর মতে, কেবল মওদূদীর লেখা পড়লে এমনটি মনে হবে যেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিরক হলো রাজনৈতিক ও আইনগত ক্ষেত্রে আল্লাহর কর্তৃত্ব অস্বীকার করা। আর প্রকৃত মূর্তিপূজার মতো শিরক যেন গৌণ বিষয়।[19] নদভী এর জবাবে কুরআনের বহু আয়াত উদ্ধৃত করে দেখান। ইসলামের সবচেয়ে মৌলিক ও প্রাথমিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল প্রকৃত শিরক ও মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। তিনি বলেন, সব নবির মিশনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই শিরকবিরোধী আহ্বান। ভারতের বাস্তবতা থেকে নদভী মনে করেন, আজও মূর্তিপূজা ও প্রকৃত শিরক সমাজে ব্যাপকভাবে বিরাজমান। অথচ মওদূদীর চিন্তায় রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রশ্নটিকে এতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, আর মূর্তিপূজাকে তুলনামূলকভাবে অবহেলা করা হয়েছে, এটাই নদভীর মূল আপত্তির জায়গা।[20]

 

এই সংক্ষিপ্ত আলোচনায় প্রাক-আধুনিক ইসলামি চিন্তাধারার আলোকে বলা যায়, মওদূদীর সমালোচক নদভীর মতো আলেমরা আসলে এই কথাটিই বলছেন যে, মওদূদীর চিন্তার সবচেয়ে বড় নতুনত্ব (বা বিচ্যুতি) হলো, তিনি বড় শিরক ও ছোট শিরকের গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যকে উপেক্ষা করেছেন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে উল্টে দিয়েছেন। ফলে মওদূদীর ব্যাখ্যায় আল্লাহর প্রাধান্য নিয়ে কুরআন-হাদিসের যেসব উদ্ধৃতি উঠে এসেছে, সেগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, যা প্রাচীন ইসলামি আলেমদের দৃষ্টিতেও ছিল অপরিহার্য।

 

নদভীর মতো লেখকেরা আদৌ এ কথা বলছেন না যে, আল্লাহর আইনপ্রণেতা হওয়ার অধিকার বা রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ইসলাম অস্বীকার করে। বরং তাঁরা বলছেন দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় :

১. যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহর শাসনকেই অস্বীকার করে, তাতেই সে সরাসরি কাফির বা ইসলামবহির্ভূত হয়ে যায়। এমনটি বলা ঠিক নয়।

২. এই ধরনের অস্বীকৃতি বা ভুল, যতই গুরুতর হোক, তা কখনোই প্রকৃত শিরক বা কুফরের মতো ভয়াবহ নয়, বরং তা অপেক্ষাকৃত হালকা।

 

নদভীর সার্বভৌমত্ব-বিষয়ক ধারণা

 

নদভী মওদূদীর চিন্তায় আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে অতিরিক্ত রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার যে কড়া সমালোচনা করেছেন, তা সত্য হলেও তিনি নিজে কখনোই মনে করেন না যে ইসলাম রাজনীতি বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ে চিন্তা করে না। নদভী সাধারণভাবে “হাকিমিয়্যা” (আল্লাহর শাসন) শব্দটির ব্যবহার এড়িয়ে যান, যদিও তাঁর লেখায় স্পষ্ট বোঝা যায়, ইসলামে মুসলমানদের জন্য রাজনৈতিক দায়িত্ব এবং রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের বিষয়টি তিনি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতেন।

কিন্তু কিছু গবেষক, বিশেষ করে সাইয়্যেদ হোসেন নাসর নদভীর অবস্থানকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তারা মনে করেন নদভী যেন মওদূদীর চিন্তার পুরোপুরি বিরোধী ছিলেন।[21] বাস্তবে তা ঠিক নয়। নদভীর সমালোচনার মূলকথা হলো, মওদূদী ইসলামে রাজনীতির গুরুত্ব এতটাই বেশি দিয়েছেন যে, আধ্যাত্মিকতা, আত্মশুদ্ধি আর নৈতিক দিকগুলো অনেকটাই আড়ালে পড়ে গেছে। নাসরের মতো কেউ কেউ নদভীকে “অরাজনৈতিক আলেম” মনে করলেও আসলে তিনি তা ছিলেন না। বরং নদভী বিশ্বাস করতেন, ইসলামি রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক বা সামরিক সংগ্রাম প্রয়োজন হতে পারে, যাতে ইসলামি শরীয়াহ অনুযায়ী সমাজ পরিচালিত হয়।[22]

মওদূদীর তুলনায় নদভীকে হয়তো “ধারাবাহিক ও প্রথাগত আলেম” বলা হয়, কিন্তু বাস্তবে তিনিও একজন ইসলামপন্থি চিন্তাবিদ ছিলেন, যিনি ইসলামের রাজনৈতিক দিককে গুরুত্বের সাথে দেখতেন এবং তা প্রতিষ্ঠা করতে চাইতেন। মওদূদীর চিন্তার সমালোচনায় নদভী যে বই লিখেছেন, তার শেষ দিকে তিনি নিজেই ইসলামি রাজনৈতিক ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। “শরীয়াহ ও ইতিহাসের আলোকে দ্বীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব” নামক অধ্যায়ে তিনি লেখেন,[23]

“আমার জানা মতে, ইসলামের প্রাথমিক যুগের আলেমদের (সালফে সালেহিন) মধ্যে এ বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই যে, রাজনৈতিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব অর্জনের চেষ্টা করা মুসলমানদের জন্য জরুরি। যেন সমাজে আল্লাহর শাসন (হাকিমিয়্যা) বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং শরিয়তের আইন, বিধান ও শাস্তি কার্যকর করা সম্ভব হয়। এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে যেখানে আল্লাহর বিধানের বিরোধী কোনো ক্ষমতা, সরকার, আইন বা আনুগত্য থাকবে না। যা মানুষের মধ্যে বিশৃঙ্খলা বা ফিতনা সৃষ্টি করতে পারে।” এর পক্ষে তিনি কুরআনের একটি আয়াত উল্লেখ করেন, “তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যতক্ষণ না ফিতনা দূর হয় এবং ধর্ম শুধুই আল্লাহর জন্য হয়।” (সূরা আনফাল, আয়াত ৩৯)

 

মুসলমানদের এমন ক্ষমতা ও প্রভাব অর্জন করাও জরুরি, যাতে তারা ভালো কাজে উৎসাহ দিতে এবং খারাপ কাজ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে আনতে পারে। শুধু মুখে ইসলামের কথা বলা বা ভালো কথার উপদেশ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। এই কারণেই কুরআন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হওয়া ভাষায় বারবার “আদেশ দেওয়া” (আমর) আর “নিষেধ করা” (নাহী) শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। এই শব্দগুলো বলার পেছনে একটা বিশেষ বার্তা আছে। আর সেটা হলো, আদেশ বা নিষেধ তখনই কার্যকর হয়, যখন তার পেছনে বাস্তব ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব থাকে। আল্লাহ কুরআনে বলেন, “তোমরাই তো সেই উত্তম জাতি, যাদের মানুষের জন্য বের করা হয়েছে। তোমরা ভালো কাজে আদেশ দাও, মন্দ কাজে নিষেধ করো, আর আল্লাহর ওপর ঈমান রাখো।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১১০)

 

মুসলমানদের জন্য এমন ক্ষমতা ও নেতৃত্ব অর্জনের চেষ্টা করা জরুরি, যার মাধ্যমে আল্লাহর বিধান সমাজে চালু করা যায়। কুরআন ও হাদিসে এমন অনেক নির্দেশ আছে, যেগুলো স্পষ্টভাবে বলে, এই দায়িত্ব অবহেলা করা বা এড়িয়ে যাওয়া কখনোই ঠিক না। এই কারণেই ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক খেলাফত বা ইসলামি শাসনব্যবস্থা কায়েম করার ওপর অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এমনকি শরিয়াহ বলেছে, যদি কোনো মুসলিম ইসলামি শাসন ছাড়া জীবনযাপন করে, তাহলে সেটা জাহেলিয়াতের (ইসলাম-পূর্ব অন্ধকার যুগের) মতো জীবন। আর সে অবস্থায় মৃত্যু হলে, তা হবে জাহেলি মৃত্যু।[24]

 

নদভী বলেন, রাসূলের সাহাবিরা এবং পরবর্তী যুগের ফকিহ ও আলেমগণ সবাই এ বিষয়ে একমত ছিলেন যে, রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয়। তবে তিনি একথাও স্পষ্ট করে বলেন, এই রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল উদ্দেশ্য নয়; বরং ছিল একটি মাধ্যম, যার লক্ষ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, এবং ইসলামি শিক্ষা, মূল্যবোধ ও আমল সমাজে প্রতিষ্ঠা করা।

 

সুতরাং, ক্ষমতা ছিল প্রয়োজনীয়, কিন্তু একমাত্র লক্ষ্য নয়। নদভীর মূল সমালোচনা এখানেই। তিনি মনে করেন, মওদূদী ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তায় এত বেশি ডুবে গিয়েছিলেন, যার ফলে ইসলামের অনেক মূল আকিদা ও আত্মিক দিক গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিল। নদভীর দৃষ্টিতে, এই ভারসাম্যহীনতা ইসলামি দাওয়াহ ও ইসলামের মূল উদ্দেশ্য দুটোকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

 

মওদূদীর মতো অনেক আলেম যারা ‘ইকামতুদ্দীন’ অর্থাৎ ‘ধর্ম প্রতিষ্ঠা’ ধারণাটি কুরআনের আয়াত (সূরা শূরা, ৪২:১৩) থেকে উদ্ভূত বলে ব্যাখ্যা করেন, নদভী এই প্রসঙ্গে ‘হাকিমিয়্যা’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। নদভীর মতে, ওই আয়াতের আসল অর্থ হলো ধর্মকে সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠা করা অর্থাৎ ধর্মের সব দিক, যেমন : মূল বিশ্বাসের (আকাইদ), ইবাদতের নিয়ম এবং সামাজিক সম্পর্ক ও লেনদেনসহ (‘মু’আমালাত’) সকল ক্ষেত্রেই ধর্ম প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। এখানে শুধু খেলাফত, সরকার প্রতিষ্ঠা বা রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভকেই (হাকিমিয়্যা) একমাত্র বোঝানো হয়নি।[25] এটি পরিষ্কার করে যে, নদভীর দৃষ্টিতে রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব অর্জন অবিশ্বাস্য বা অপ্রিয় কোনো বিষয় নয়। তবে তার কাছে ইসলাম কেবল রাজনৈতিক শাসন প্রতিষ্ঠা করাই শেষ কথা নয়। ইসলাম তার চেয়েও ব্যাপক ও গভীর কিছু। বিশেষ করে আধ্যাত্মিক ও ইবাদতমূলক দিকগুলো। নদভীর প্রকৃত আপত্তি মওদূদীর সেই চিন্তাভাবনার প্রতি, যেখানে তিনি ইসলামের রাজনৈতিক দিককে এতটা গুরুত্ব দিয়েছেন যে, ইসলামের মূল আধ্যাত্মিক ও ভক্তিমূলক বিষয়গুলো উপেক্ষিত হয়ে গেছে। নদভীর চোখে রাজনৈতিক বিষয়গুলো হলো শুধু একটি মাধ্যম, যদিও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইসলাম প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য হলো আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।

 

নদভী আসলে মওদূদীর ইসলামি রাষ্ট্র গড়ার চিন্তার বিরুদ্ধে নন। তিনি চান এমন এক রাষ্ট্র, যেখানে শরিয়াহ অনুযায়ী আইন চালু থাকবে। কিন্তু নদভীর মতে, মওদূদী রাজনীতি ও ক্ষমতার ব্যাপারটাকে এত বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, যার ফলে ইসলামের আসল উদ্দেশ্য আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক, ইবাদত আর আধ্যাত্মিকতা পেছনে পড়ে গেছে। এইভাবে ধর্ম শুধু কিছু আদেশ-নিষেধের নিয়মে পরিণত হয়, যেখানে আল্লাহর সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক ও আত্মিক উন্নতি থাকে না। নদভী “হাকিমিয়্যা” (আল্লাহর আইনই একমাত্র আইন) কথাটা খুব বেশি ব্যবহার না করলেও, তিনি বিশ্বাস করতেন, আল্লাহর আইনই চূড়ান্ত আইন হওয়া উচিত। তবে সেটাকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে আত্মিকতা, ভক্তি আর মানুষের হৃদয়ের পরিবর্তন গুরুত্ব পায়।

 

 

 

শেষ কথা

 

এই প্রবন্ধে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে, ‘হাকিমিয়্যাত’ বা আল্লাহর শাসনব্যবস্থার ধারণা আসলে নতুন কিছু নয়। এর শিকড় ইসলামের পুরনো চিন্তাধারায়ই আছে। এটিকে পাশ্চাত্যের ‘সার্বভৌমত্ব’ বা সর্বময় ক্ষমতার ধারণার সঙ্গে তুলনা করে দেখা যেতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম চিন্তাবিদ আবুল আ’লা মওদূদী ‘হাকিমিয়্যাত’-এর যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা পাশ্চাত্যের ‘সার্বভৌমত্ব’-এর ধারণার পাশে রেখে বুঝলে আরও পরিষ্কার হয়। তবে আমি শুধু পশ্চিমা ভাবনার আলোকে তাকে ব্যাখ্যা করিনি। বরং মওদূদীকে আমি একজন বৈশ্বিক চিন্তাবিদ হিসেবে দেখাতে চেয়েছি, যিনি নিজের মত তৈরি করেছেন ইসলামি জ্ঞানভান্ডার থেকে, পাশ্চাত্যের ধ্যানধারণা থেকে নয়।

এইভাবে, মওদূদী ছিলেন এমন একজন চিন্তাবিদ, যিনি একটি বিতর্কিত ধারণা (যেমন : কে শাসন করবে বা কাদের অধিকার থাকবে) নিয়ে নিজের ব্যাখ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ‘হাকিমিয়্যাত’ বা আল্লাহর শাসনের বিষয়টি নিয়েও ইসলামপন্থি চিন্তাবিদদের মধ্যে ভিন্নমত আছে। যেমন, মওদূদীর সমকালীন এক প্রভাবশালী আলেম, আবুল হাসান আলী নদভী, বলেছেন, মওদূদী রাজনীতিকে এত গুরুত্ব দিয়েছেন যে, ইসলামের আধ্যাত্মিক দিকগুলো পিছনে পড়ে গেছে।

 

ওপরে আলোচিত বিষয়গুলো আমাদেরকে এটা বুঝতে সাহায্য করে যে, রাজনীতির ক্ষেত্রে ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের মূল ধারণাগুলো কীভাবে পাশ্চাত্য চিন্তার প্রভাবশালী ধ্যানধারণা থেকে ভিন্ন। আগে আমরা দেখেছি হুমায়রা ইতকিদার মন্তব্য করেছিলেন, মওদূদী “মুসলিম” ও “অমুসলিম” পরিচয়কে ধর্মীয় নয়; বরং রাজনৈতিক শ্রেণিতে রূপান্তর করেছেন। কিন্তু একে আরো ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করলে এবং বলা যায়, ইউরোপকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ করতে এটি আরও বেশি কার্যকর হবে। 

 

আমরা বলতে পারি, ঔপনিবেশিক লিবারেল রাষ্ট্রই “মুসলিম” ও “অমুসলিম” পরিচয়কে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করে তোলে। এখানে “ধর্ম” শব্দটি ব্যবহার করা হয় ইউরোপীয় মানদণ্ড অনুযায়ী, যেখানে ধর্ম মানেই কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত, কিন্তু রাজনীতি বা সমাজ নিয়ে কিছু বলার সুযোগ থাকে না। এই সংকীর্ণ ধারণার ফলে ঔপনিবেশিক শাসকরা মুসলমানদের দমন করতে পেরেছে, যদি তারা ইসলামি ঐতিহ্যের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দাবি তুলে ধরে। এই একই প্রবণতা এখনো আছে। যেমন ‘ওয়ার অন টেরর’-এর নামে মুসলমানদের নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা, কিংবা ইউরোপীয় নেতাদের “আরও শক্তিশালী উদারতাবাদ” গড়ে তোলার ডাক।[26] ওভামির আনজুম ঠিকই বলেছেন, ইসলামের ইতিহাসের শুরু থেকেই ধর্মীয় চিন্তার মধ্যে রাজনৈতিক বিষয় স্পষ্টভাবে উপস্থিত ছিল। তাই আমাদের প্রশ্ন করা উচিত, “ইসলাম কীভাবে রাজনীতিক হলো?” তা নয় বরং, “ইসলাম কীভাবে রাজনীতি থেকে আলাদা হয়ে গেল?”[27] পশ্চিমা ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর ‘ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্ব’ তৈরি করার প্রচেষ্টাই এই বিচ্ছিন্নতার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

 

আধুনিক চিন্তাবিদদের মধ্যে নাসর, জামান ও ইকতিদার ঠিকই বলেছেন যে, সমসাময়িক ইসলামি চিন্তার ওপর আধুনিক যুগের বড় প্রভাব রয়েছে। তবে এই প্রবন্ধে আমি যে যুক্তি তুলে ধরেছি, তা হলো এই চিন্তাবিদরা হয়তো অতিরিক্ত দূরে চলে গেছেন। যখন তারা বলেন যে, ‘হাকিমিয়্যাত’-এর মতো ধারণাগুলো ইসলামি ঐতিহ্য থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন, কিংবা এতটাই নতুনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে, আগের যুগের মুসলিম আলেমদের কাছে তা অপরিচিত ঠেকত। আমি বরং দেখাতে চেয়েছি, এই ধারণার ভিত্তি প্রাক-আধুনিক ইসলামি আইন ও তাফসিরের ঐতিহ্যের মধ্যেই আছে।

আমার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উপনিবেশিক শাসন এবং তারপর পশ্চিমা আধিপত্যের কারণে মুসলিম সমাজগুলো বিগত শতকে তাদের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে গভীর বিচ্ছেদ বা ছেদ অনুভব করেছে। ফলে, অনেক আগে থেকেই ধরে নেওয়া কিছু বিষয় নিয়ে স্পষ্টভাবে নতুন করে কথা বলা শুরু হয়। ‘হাকিমিয়্যাত’ ছিল তেমনই একটি ধারণা, যা আগে ইসলামি আইন ও চিন্তার ভেতরে অপ্রকাশিতভাবে থাকলেও, আধুনিক কালে সেটা আলাদাভাবে জোর দিয়ে বলা শুরু হয়। কারণ, আধুনিক বিশ্বে যখন পশ্চিমা চিন্তা ধর্মকে রাজনীতি ও আইনের বাইরে রাখার চেষ্টা করছে, তখন মুসলমানরা আল্লাহর আইনের সর্বোচ্চ কর্তৃত্বকে রক্ষা করার জন্য তা প্রকাশ্যভাবে তুলে ধরতে শুরু করেন। এই পরিস্থিতিতে মুসলিম চিন্তাবিদরা বিকল্প এক মডেল হাজির করতে চান। যেখানে তারা আল্লাহর শাসনকেই প্রকৃত কর্তৃত্ব হিসেবে তুলে ধরেন। তবে তা প্রকাশ করতে গিয়ে তারা পশ্চিমা ধারণা থেকে “সার্বভৌমত্ব” (Sovereignty) নামটি ধার নেন। এই ‘সার্বভৌমত্ব’ ধারণাটি মূলত ইউরোপের ধর্মীয় যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গঠিত হয়েছিল, যেখানে রাজা নিজ প্রজাদের ওপর সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও আইনি ক্ষমতা রাখতেন। মুসলিম চিন্তাবিদরা এই ধারণাটিকে কিছুটা রূপান্তর করে আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের সম্পর্কের আলোকে ব্যাখ্যা করেন।

 

এইভাবে, ইসলামপন্থি চিন্তাবিদরা প্রাচীন ইসলামি ঐতিহ্যের ভিতর থেকেই যুক্তি তুলে আনেন, যাতে তারা আধুনিক পশ্চিমা রাষ্ট্রের ‘সার্বভৌমত্ব’-এর ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। তারা বলেন, ইসলামি রাষ্ট্র কখনো নিজেকে সর্বোচ্চ আইনপ্রণেতা দাবি করতে পারে না, যতক্ষণ না সে আল্লাহর ইচ্ছার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন প্রণয়ন করে।

যদিও ইসলামে সব সময়ই স্বীকৃত যে, মানুষ আল্লাহর বাণীর ব্যাখ্যায় ভুল করতেপারে। তবে মৌলিক নীতির দিক থেকে মওদূদীর অবস্থান প্রাক-আধুনিক ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তাধারার মধ্যেই পড়ে। এইভাবে মওদূদী এবং তার অনুসারীরা পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে ইসলামি চিন্তার একটি বিকল্প দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। যারা ‘সার্বভৌমত্ব’ ধারণার একটি বৈশ্বিক ইতিহাস রচনা করতেচান, তাদেরজন্য মওদূদীর চিন্তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ, তিনি মুসলিম বিশ্বে পশ্চিমা চিন্তার আধিপত্যের বিরুদ্ধে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবাদ ও বিকল্প



[1] H. J. Morgenthau, Politics Among Nations: The Struggle for Power and Peace (নিউ ইয়র্ক, ১৯৪৮), পৃষ্ঠা ২৪৩; H. J. Morgenthau এবং K. W. Thompson, Politics Among Nations: The Struggle for Power and Peace (নিউ ইয়র্ক, ১৯৯৭), পৃষ্ঠা ৩১৮।

[2] পূর্বোল্লিখিত উৎসই।

[3] দেখুন T. Asad, Genealogies of Religion: Discipline and Reasons of Power in Christianity and Islam (বাল্টিমোর, ১৯৯৩), পৃষ্ঠা ২৯; এবং B. Nongbri, Before Religion: A History of a Modern Concept (নিউ হেভেন, ২০১৩), পৃষ্ঠা ১৮।

[4] দেখুন: Grimm, Sovereignty, পৃষ্ঠা ১৪–১৭।

[5] দেখুন: March, Feldman এবং Hallaq-এর পূর্বে উল্লিখিত গবেষণাকর্মসমূহ।

[6] ইসলামি আইন প্রণয়নে ‘সম্ভাব্যতা’ (probabilism) ধারণা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন: Aron Zysow, The Economy of Certainty: An Introduction to the Typology of Islamic Legal Theory (আটলান্টা, ২০১৪)।

[7] নদভীর লেখা মওদূদীর স্মরণভাষণের (obituary) পিডিএফ পাওয়া যাবে এই ঠিকানায়: https://archive.org/details/nadwimawdudiobituary/mode/aup

[8] নদভী, Mawdudi Obituary; Appreciation, পৃ. ১২; Asr-e Hazir, পৃ. ১১। নদভী আরও উল্লেখ করেন যে, মওদূদী তাকে উৎসাহিত করেছিলেন যেন তিনি তার অন্যান্য লেখাও একইভাবে সমালোচনামূলকভাবে মূল্যায়ন করেন। আমি যে আরবি সংস্করণ ব্যবহার করছি, তাতে ‘দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকাটি’ নেই, যা উর্দু ও ইংরেজি সংস্করণে পাওয়া যায়।

[9] দেখুন: মুহাম্মদ কাসিম জামান, Modern Islamic Thought in a Radical Age: Religious Authority and Internal Criticism (কেমব্রিজ, ২০১২)। এই গ্রন্থে জামান ‘আলিমদের অভ্যন্তরীণ সমালোচনার’ ধারণা তুলে ধরেছেন, যা নদভীর সমালোচনার প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ

[10] দেখুন: আল-নদভী, আল-তাফসির আল-সিয়াসি, পৃ. ৬৭, ৮৪ এর পরবর্তী অংশ; Appreciation, পৃ. ৩৭ ও ৬৭ এর পরবর্তী অংশ; Asr-e Hazir, পৃ. ৫৯ ও ৬৪ এর পরবর্তী অংশ। মূল উৎস হিসেবে দেখুন: সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী, Qur’an ki Char Bunyadi Istilahain: Ilah, Rabb, Ibadat aur Din (লাহোর, তারিখহীন), পৃ. ৩৬ এর পরবর্তী অংশ। এর ইংরেজি ও আরবি অনুবাদ রয়েছে, Four Basic Qur’anic Terms, অনুবাদ: আবু আসাদ (লাহোর, তারিখহীন), পৃ. ২৮; Al-Mustalahat al-Arba’a fi al-Qur’an, ৫ম সংস্করণ, কুয়েত, ১৯৭১, পৃ. ৩১-এর পরবর্তী অংশ। এই আরবি সংস্করণটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৭৪ হিজরি / ১৯৫৫ সালে এবং মনে করা হয় যে কুতুব সম্ভবত খুব শিগগিরই এটি পড়েছেন। প্রকাশকের ভূমিকায় (পৃ. ৩) বলা হয়েছে, মূল গ্রন্থটি রচিত হয়েছিল ১৩৬০ হিজরি/১৯৪১ সালে, লাহোরে।

[11] দেখুন: আল-তাফসির আল-সিয়াসি, পৃ. ৬৯ এর পরবর্তী অংশ; Appreciation, পৃ. ৫৯; Asr-e Hazir, পৃ. ৬৩ এর প্রথমাংশ।— এখানে নদভী তাঁর মূল সমালোচনাসমূহ আরও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন, বিশেষত মওদূদীর ধারণায় শিরকের ব্যাখ্যা এবং আল্লাহর সার্বভৌমত্বের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বিষয়ে।

[12] দেখুন: নদভী, আল-তাফসির আল-সিয়াসি, পৃ. ৭১ এর পরবর্তী অংশ; Appreciation, পৃ. ৬০; Asr-e Hazir, পৃ. ৬৫।

আমি এখানে কুতুবের একটি উক্তির নদভীর করা উর্দু অনুবাদ অনুসরণ করছি। নদভী কুতুবের আরবি শব্দ “hukm Allah”–এর অনুবাদ করেন “খুদা কি হাকিমিয়্যত” হিসেবে। এটি যদিও আক্ষরিক নয়, তবুও কুতুবের যুক্তির প্রেক্ষাপটে যথাযথ। মূল আরবি উদ্ধৃতির জন্য দেখুন: সাইয়্যেদ কুতুব, ফি যিলাল আল-কুরআন, খণ্ড ৪, পৃ. ১৯৬৩।

[13] মুসলিম ব্রাদারহুডের (MB) প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যের জন্য দেখুন টীকা ১২। সাইয়্যেদ কুতুবের কার্যকলাপের বিস্তৃত ইতিহাসের জন্য দেখুন: জন ক্যালভার্ট, Sayyid Qutb।

[14] এই হাদিসটি আহমাদ ইবনে হাম্বল (মৃ. ২৪১ হিজরি / ৮৫৫ খ্রি.)-এর মুসনাদ-এ বর্ণিত হয়েছে। দেখুন: মুসনাদ আহমাদ, সম্পাদনা: শ. আর্নাউত প্রমুখ (বেইরুত, ২০০১), খণ্ড ৩৯, পৃ. ৩৯–৪৪। আধুনিক সম্পাদকেরা এই হাদিসকে “হাসান”, অর্থাৎ নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করেছেন। এই হাদিসটি ইবনে হাজার আল-আসকালানী (মৃ. ৮৫২ হি./১৪৪৯)-এর সংক্ষিপ্ত ফিকহি হাদিস সংকলন বুলুগ আল-মারাম-এও আছে, যেখানে তিনিও এটিকে “হাসান” বলেন। দেখুন: বুলুগ আল-মারাম, সম্পাদনা: সালেহ আল-যুহাইরি (রিয়াদ, ২০০৩), পৃ. ৪৫০।

[15] দেখুন: ইবনে বাত্তাল, শরহ সহিহ আল-বুখারী, খণ্ড ১, পৃ. ১১২–১১৪। এই রেফারেন্স ও পরবর্তী ব্যাখ্যার জন্য Islamweb.net ওয়েবসাইটের এই ফতোয়া দেখুন: “الرياء بين الشرك الأكبر والأصغر” (রিয়া: বড় ও ছোট শিরকের মাঝামাঝি অবস্থান), Islamweb Fatwa Portal, ১৬ মার্চ ২০১৭, https://www.islamweb.net/ar/fatwa/348361 (প্রবেশ: ৫ এপ্রিল ২০২০)। এ ছাড়া, ইমাম গাজ্জালির (মৃ. ৫০৫ হি./১১১১) ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন-এ ছোট শিরক সম্পর্কিত আলোচনা দেখুন, যেখানে তিনি উল্লিখিত হাদিসের ভিত্তিতে বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। দেখুন: ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন, (জেদ্দা, ২০১১), খণ্ড ৬, পৃ. ৩২৪ ও ৩৪৮।

[16] ইবনে রজব আল-হাম্বলি, তাফসির ইবনে রজব আল-হাম্বলি, (সম্পা. ত. আবু মু’আয), রিয়াদ, ২০০১, খণ্ড ২, পৃ. ৬৭৬। এই অনুচ্ছেদটি আরও পাওয়া যায়: আব্দুল্লাহ আল-গুফায়লি, ইবনে রজব আল-হাম্বলি ও সালাফ আকিদার ব্যাখ্যায় তাঁর ভূমিকা, রিয়াদ, ১৯৯৮, পৃ. ৩৯১।

[17] ইবনে রজব আল-হাম্বলি, Lata’if al-Ma’arif fī-mā li-l-Mawāsīm min Waẓā’if, সম্পাদনা: ইয়াসির আল-সাওয়াস (বেইরুত, ১৯৯৯), পৃষ্ঠা ১৪২। (এখানে লেখকের মূল বক্তব্যকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।)

[18] দেখুন: নদভী, আল-তাফসির আল-সিয়াসি, পৃ. ৬৭, ৮৪; Appreciation, পৃ. ৫৭, ৬৭; Asr-e Hazir, পৃ. ৫০-এর পরবর্তী অংশ ও ৭৪-এর পরবর্তী অংশ। এই পৃষ্ঠাগুলোতে নদভী মওদূদীর চিন্তায় “হাকিমিয়্যা”-র গুরুত্ব ও তার অতিরঞ্জিত প্রয়োগ নিয়ে সমালোচনা করেন।

[19] দেখুন: আল-তাফসির আল-সিয়াসি, পৃ. ৮৫;

Appreciation, পৃ. ৬৭-এর পরবর্তী অংশ; Asr-e Hazir, পৃ. ৭৪–৭৬।—নদভী এখানে ব্যাখ্যা করেন যে, মওদূদীর ধারণায় রাজনৈতিক আদর্শকে ধর্মের মূল নির্ধারক করে তোলা হয়েছে।

[20] দেখুন: আল-তাফসির আল-সিয়াসি, পৃ. ৯৩; Appreciation, পৃ. ৭৪-এর পরবর্তী অংশ; Asr-e Hazir, পৃ. ৮৪-এর পরবর্তী অংশ।— নদভীর এই সমালোচনার একটি সীমাবদ্ধতা হলো, তিনি এই আপত্তিগুলো বহু দেরিতে প্রকাশ করেন। কারণ, মওদূদী তাঁর “হাকিমিয়্যা” বিষয়ক বক্তব্য প্রথম প্রকাশ করেন ১৩৬০ হিজরি/১৯৪১ সালে, এবং নদভী তার পরবর্তী তিন দশকেরও বেশি সময় মওদূদীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন—সমালোচনা প্রকাশের আগপর্যন্ত।

[21] হাকিমিয়্যা শব্দটি সাধারণভাবে একটি আধুনিক উদ্ভাবনী শব্দ (Neologism) হিসেবে পরিচিত। তবে সম্প্রতি শিরাজ মাহের (Sali-kaliom, পৃ. ১৭১, ২৪১, নোট ২) দাবি করেছেন যে, এই শব্দটি প্রাক-আধুনিক পণ্ডিত দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছে; তিনি দাবি করেন যে এটি আল-মাওয়ার্দির শাসনব্যবস্থা সম্পর্কিত প্রথাগত গ্রন্থ আল-আহকাম আল-সুলতানিয়্যাহ-এর একটি অনুবাদের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু worldcat.org অনুসারে, তিনি যে অনুবাদটির কথা বলছেন তা আদৌ অস্তিত্বশীল নয় এবং যে পৃষ্ঠা নম্বর তিনি উল্লেখ করেছেন, তা আমি যে দুটি ইংরেজি অনুবাদ জানি, সেগুলোর সাথে মেলে না। এ ছাড়া আল-শামিলা সফটওয়্যারে পাওয়া গ্রন্থটির আরবি সংস্করণে ইলেকট্রনিক অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, আল-মাওয়ার্দির মূল পাঠে “হাকিমিয়্যা” এই আধুনিক শব্দটি নেই।

[22] অবশ্য, নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়া মানেই এই নয় যে, নদভীর রাজনৈতিক ক্ষমতার যে রূপ কল্পনা করা হচ্ছে তা স্বৈরাচারী বা সর্বগ্রাসী হবে।

[23] এটি সেই অধ্যায় শিরোনামের অনুবাদ, যেটি উর্দু ও আরবি সংস্করণে যেমন আছে, ইংরেজি সংস্করণে তা আংশিক ভুল অনুবাদ হয়েছে।

[24] দেখুন: আল-নদভী, আত-তাফসির আস-সিয়াসী, পৃ. ১৩৪–১৩৬; নদভী, Are Hujjāt, পৃ. ১০৭–১০৯; নদভী, Appreciation, পৃ. ৯২১।

[25] দেখুন: আল-নদভী, আত-তাফসির আস-সিয়াসী, পৃ. ১৪১; নদভী, Appreciation, পৃ. ৯৬; নদভী, Are Hujjāt, পৃ. ১১৩।

[26] নিরাপত্তা-পন্থা (Securitisation) বিষয়ে দেখুন: কে. ই. ব্রাউন, “Contesting the Securitization of British Muslims”, International Relations, ১২:২ (২০১০), পৃ. ১৭১–১৮২; জে. চেসারি, Why the West Fears Islam: An Exploration of Muslims in Liberal Democracies (নিউ ইয়র্ক, ২০১৩), পৃ. ৮৩–১০৩। “Muscular liberalism” বিষয়ে দেখুন: সি. জপকে, “The Retreat is Real but What Is the Alternative? Multiculturalism, Muscular Liberalism, and Islam”, Constellations ২১ (২০১৪), পৃ. ২৮৬–২৯৫; জান ডবেরনাক, “The Missing Politics of Muscular Liberalism”, Identities, ১৫:৪ (২০১৮), পৃ. ৩৭৭–৩৯০।

[27] আনজুম, Politics, পৃ. xii–xiii। মূল লেখকের উচ্চারণিত কথার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

তরজমা করেছেন কামারুজ জামান।