বৈশ্বিক ইতিহাসে হাকিমিয়্যার অবস্থান নির্ণয় : প্রথম কিস্তি | উসামা আল-আযামী
“বৈশ্বিক ইতিহাসে হাকিমিয়্যার অবস্থান নির্ণয় : প্রাক-আধুনিক ইসলামে সার্বভৌমত্ব ধারণা এবং মওদূদী ও কুতুব-পরবর্তী এর গ্রহণযোগ্যতা”1 শিরোনামের এই প্রবন্ধটি উসামা আল-আযামীর মূল প্রবন্ধ Locating Ḥākimiyya in global history: The concept of sovereignty in premodern Islam and its reception after Mawdūdī and Quṭb. থেকে অনুদিত। পড়ার সুবিধার্থে এখানে দুই কিস্তিতে ছাপানো হয়েছে। দুসরা কিস্তি পড়ুন। )
সারসংক্ষেপ
হাকিমিয়্যা (সার্বভৌমত্ব) ধারণাটি, এর প্রবক্তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে, এমন একটি ধারণাকে নির্দেশ করে, যেখানে আইন প্রণয়নের অধিকার মানুষের নয়, বরং একমাত্র আল্লাহর। এর সাথে অনিবার্যভাবে যুক্ত হয়ে আসে এই বিশ্বাস যে, রাজনৈতিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্বধারী মুসলমানদের জন্য ইসলামি আইনের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব স্বীকার করা অপরিহার্য। এই ধারণাটি আধুনিক সময়ে সর্বপ্রথম সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেন আবুল আ’লা মওদূদী। তবে এটি প্রাক-আধুনিক ইসলামি ফিকহি ঐতিহ্যের অন্তর্নিহিত চিন্তাগুলোর একটি পুনরাবিষ্কার বলেও বিবেচনা করা যেতে পারে। হাকিমিয়্যার এই আধুনিক রূপটি গঠিত হয়েছে ঔপনিবেশিক লিবারেল রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন কাঠামোর প্রতিক্রিয়ায়। যদিও এটি আধুনিক ভাষ্যে প্রবর্তিত, এবং অনেক পণ্ডিত এটিকে সম্পূর্ণ আধুনিক নির্মাণ বলে মনে করেন। আমি এখানে যুক্তি তুলে ধরছি যে, হাকিমিয়্যা বা সার্বভৌমত্বের এই ধারণার সুস্পষ্ট পূর্বসূরি ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের মধ্যেই রয়েছে। এই উপলব্ধি আমাদের এমন এক আলোচনার দিকে পরিচালিত করে যেখানে ইসলামি সার্বভৌমত্ব ধারণাগুলোকে কাজে লাগিয়ে আমরা পশ্চিমা রাজনৈতিক তত্ত্বে প্রচলিত সার্বভৌমত্ব ধারণার পুনর্মূল্যায়ন করতে পারি। আলোচ্য প্রবন্ধে আমি আরো দেখাতে চেয়েছি, মাওলানা মওদূদীর সমসাময়িক একজন প্রভাবশালী ও তুলনামূলকভাবে তরুণ ইসলামপন্থি আলিম আবুল হাসান আলী নদভীর মতামতকে। যদিও তিনি মওদূদী ও সাইয়্যেদ কুতুবের হাকিমিয়্যা ব্যাখ্যার সমালোচনা করেছেন, তদুপরি, তিনি নিজেও এই ধারণাকে সমর্থন করেছেন। সর্বোপরি, সংক্ষেপে আমি এই প্রতিফল উপস্থাপন করি যে, হাকিমিয়্যাকে সার্বভৌমত্ব হিসেবে বুঝতে পারলে তা কীভাবে বৈশ্বিক ইতিহাসচর্চায় ইউরোপকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাদেশিকীকরণ (Provincialisation) করতে সহায়তা করতে পারে।
মূল প্রবন্ধ
হাকিমিয়্যা একটি পরিভাষা, যা চতুর্দশ হি./বিশ শতকে উদ্ভূত হয়। ইসলামি পরিপ্রেক্ষিতে এটি এমন এক ধারণাকে নির্দেশ করে, যেখানে আল্লাহই চূড়ান্ত আইনপ্রণেতা (হাকিম)2 এবং সর্বোচ্চ আইনগত কর্তৃত্ব একমাত্র তাঁরই। এই পরিভাষাটির প্রাথমিক এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যাখ্যাকার ছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত, পরে পাকিস্তানি ইসলামপন্থি চিন্তাবিদ আবুল আ’লা মওদূদী3 (মৃত্যু : ১৩৯৯ হি./১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দ)। একজন বাগ্মী ও দক্ষ লেখক হিসেবে মওদূদী নিজেই হাকিমিয়্যার অনুবাদ করেছিলেন “সার্বভৌমত্ব” হিসেবে, তাঁর এই ব্যাখ্যা পরবর্তীতে উপমহাদেশে হাকিমিয়্যার মানে বোঝার ক্ষেত্রে একপ্রকার প্রভাবশালী মানদণ্ডে পরিণত হয়।
তবে মওদূদীর প্রভাব শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর বহু চিন্তা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে অনুবাদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে, যেখানে তাঁর চিন্তাধারা গভীরভাবে প্রভাব ফেলে আরব ইসলামপন্থি সমসাময়িক চিন্তাবিদ সাইয়্যেদ কুতুব (মৃত্যু : ১৩৮৬ হি./১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দ)-এর ওপর। সাইয়্যেদ কুতুব মওদূদীর চিন্তাগুলোকে সাহিত্যিক দীপ্তি ও বিপ্লবী আবেগ দিয়ে আরও বিস্তৃতভাবে উপস্থাপন করেন। মওদূদী ও কুতুব উভয়ের জন্যই হাকিমিয়্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আল্লাহর আইনপ্রণেতা হওয়ার একচ্ছত্র অধিকার। তাঁদের মতে, আল্লাহই চূড়ান্ত আইনপ্রণেতা, আর মানুষ কখনোই এই খোদায়ী অধিকার নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অনুমতি পায় না। কুতুবের দৃষ্টিতে, এই অধিকারকে লঙ্ঘন করা সরাসরি কুফর বা অবিশ্বাস (কুফর বাওয়াহ)4 হিসেবে বিবেচিত।
যদিও দক্ষিণ এশিয়ার আলিমগণ সাধারণত এতটা কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন না, তথাপি গবেষক মুহাম্মদ কাসিম জামান যথার্থভাবেই দেখিয়েছেন যে, আধুনিক ইসলাম ও ইসলামি আইনব্যবস্থায় আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ধারণাটি শুধু মওদূদী ও কুতুবের মতো ইসলামপন্থিদের একক চিন্তাভাবনার ফসল নয়, বরং এটি একটি বহুল বিস্তৃত ব্যাপার। যা ক্লাসিক্যাল অনেক মুসলিম চিন্তাবিদ ও শিক্ষিত সমাজের মধ্যেও দৃশ্যমান।5
এই প্রবন্ধের তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য রয়েছে।
প্রথমত, ইসলামি রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের ইতিহাসে হাকিমিয়্যা ধারণার অবস্থান নির্ধারণ করা। একাধিক গবেষক দাবি করেছেন যে, এই ধারণা মওদূদীর প্রভাবশালী ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের ব্যাখ্যা ব্যতীত, প্রাক-আধুনিক ইসলামি রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের পরসিরে উল্লেখযোগ্য কোনো সিলসিলা খুঁজে পায় না। কিন্তু আমি এই প্রবন্ধে তর্ক উপস্থাপন করছি যে, প্রাক-আধুনিক ইসলামি আলোচনাপরম্পরায় হাকিমিয়্যার পূর্বাভাস খুবই স্পষ্টভাবে খুঁজে পাওয়া যায়।6
দ্বিতীয়ত, আমি হাকিমিয়্যাকে ‘সার্বভৌমত্ব’ ধারণার বৃহত্তর বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে স্থাপন করতে চাই। এ প্রয়াসের মধ্য দিয়ে আমি একদিকে ইউরোপকেন্দ্রিকতার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরতে চাই (Provincialise Europe), এবং অপরদিকে সার্বভৌমত্ব ধারণাকে ঘিরে একটি ‘গ্লোবাল’ বা বিশ্বব্যাপী বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের রূপরেখা আঁকতে চাই।7 এই প্রেক্ষাপটে আমি প্রশ্ন রাখছি, মওদূদীর ‘সার্বভৌমত্ব’ ধারণা কীভাবে আমাদেরকে এই ধারণার বৈশ্বিক বৈচিত্র্য বুঝতে সাহায্য করতে পারে? আমি এটিও পরখ করার চেষ্টা করছি যে, এই ব্যাখ্যা কীভাবে আমাদেরকে আধুনিক পশ্চিমা রাজনৈতিক তত্ত্ব, ইতিহাসচর্চা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিদ্যায় প্রচলিত সার্বভৌমত্বের আধিপত্যশীল ধারণাগুলিকে নতুনভাবে চিন্তা করার সুযোগ করে দিতে পারে এবং পশ্চিমা চেতনার মধ্যেই ধারণাটির নতুনতর বিকাশ সম্ভব হতে পারে।
এই প্রসঙ্গে আমি যুক্তি উপস্থাপন করছি যে, ‘সার্বভৌমত্ব’ বা Sovereignty একটি ‘Essentially Contested Concept’ (মূলগতভাবে বিতর্কিত/বিভিন্ন ব্যাখ্যাযোগ্য একটি ধারণা)। যেমন, ন্যায়বিচার (Justice) বা গণতন্ত্র (Democracy)। মওদূদী ও তাঁর সমচিন্তার অনুসারীরা এই বিতর্কিত ধারণাটিকে ‘Decontestation’ (অবিতর্কিতীকরণ) করার চেষ্টা করেছেন। ‘Decontestation’ ধারণাটি রাজনৈতিক দার্শনিক মাইকেল ফ্রিডেন দ্বারা বিকশিত, যার দ্বারা বোঝায়, একটি বিতর্কিত বা বহু ব্যাখ্যাযোগ্য ধারণাকে নির্দিষ্ট ব্যাখ্যার পক্ষে তুলে ধরে সেটিকে চূড়ান্ত বা কর্তৃত্বপূর্ণ রূপ দেওয়ার চেষ্টা। মওদূদী ও তাঁর সহচরগণ হাকিমিয়্যার মাধ্যমে ঠিক সেটিই করেছেন। সার্বভৌমত্বের ইসলামি ব্যাখ্যাকে আধুনিক রাজনৈতিক বয়ানের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।8
শেষত, আমি বিশ্লেষণ করেছি হাকিমিয়্যা ধারণা সম্পর্কে এক প্রভাবশালী ইসলামপন্থি আলিমের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রতিক্রিয়া। যিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে উপমহাদেশে সম্ভবত মওদূদীর পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিজীবী। তিনি হলেন আবুল হাসান আলী নদভী (মৃত্যু : ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দ), যিনি একসময় মওদূদীর সহযোগীও ছিলেন। যদিও নদভী কখনোই মওদূদী বা সাইয়্যেদ কুতুবের মতো কোনো ইসলামপন্থি সংগঠনের শীর্ষ নেতা ছিলেন না, তথাপি বৈশ্বিক ইসলামপন্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবণতাগুলোর ওপর তাঁর প্রভাব অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের তুলনায় কম নয়। এ কারণে তাঁর গুরুত্ব গৌণভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে কিছু গৌণ গবেষণায়, তবে ‘সার্বভৌমত্ব’ বিষয়ে তাঁর ভাবনা এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত বিশ্লেষণের আওতায় আসেনি।9
যেসব জায়গায় তাঁর চিন্তা সংক্ষেপে উপস্থাপিত হয়েছে, সেখানে অনেক সময় তাকে মওদূদী ও কুতুবের চিন্তার অনুরূপ বলে তুলে ধরা হয়েছে। আসলে, গৌণ সাহিত্যেও প্রায়শই এমনটি বলা হয় যে, নদভী কুতুবপন্থি ছিলেন। যদিও তিনি কুতুবের চিন্তার সুস্পষ্ট সমালোচনা করেন ১৩৯৮ হি./১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দেই। আমাদের বিশ্লেষণে নদভীর চিন্তাকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে, তাঁর ভাবনার ব্যাপারে প্রচলিত বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যাকে শুধরানোর পাশাপাশি, আমি এ কথারও পক্ষে অতিরিক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করছি যে, সাম্প্রতিক দশকগুলোর ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে হাকিমিয়্যার কুতুবীয় ব্যাখ্যার প্রতি একটি সুস্পষ্ট প্রত্যাখ্যানই ছিল মূলধারার প্রবণতা। তবে একই সঙ্গে আমি এটিও দেখাতে সচেষ্ট থাকব যে, নদভী মোটেই আল্লাহর আইনি ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেননি। বরং, এই ধারণার প্রতি তাঁর একটি গভীর আস্থার প্রকাশ আমরা দেখতে পাই, যদিও তা কুতুবের চরমপন্থি ব্যাখ্যা থেকে পৃথক।
সাম্প্রতিক চিন্তায় হাকিমিয়্যার ধারণা
ওপরে আমি বিশেষভাবে মাওলানা মওদূদী ও সাইয়্যেদ কুতুবের চিন্তায় হাকিমিয়্যার আইনি দিকটি আলোকপাত করেছি। তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে বলা প্রয়োজন। এই দুই চিন্তকের আলোচনায় ‘সার্বভৌমত্ব’ (Sovereignty) কেবল আইন প্রণয়ন বা শরিয়াহর শাসনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সঙ্গে রাজনৈতিক মাত্রাও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। কারণ, আইন তৈরির অধিকার প্রদান নিজেই এক ধরনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কমপক্ষে পশ্চিমা রাজনৈতিক চিন্তায় তো তা-ই বিবেচিত হয়। এই অর্থে, ‘সার্বভৌমত্ব’ বা ‘হাকিমিয়্যা’ ধারণাটিকে বুঝতে হলে ‘আইন ও রাজনীতি’ এই দুইয়ের সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন করে দেখা চলে না।10
আমার বক্তব্য হলো, ইসলামি ঐতিহ্যেও এই সংযুক্তি স্বাভাবিক ও অনুমিত ছিল। প্রাক-আধুনিক যুগের ইসলামি ফকিহ ও আলিমগণ এমনটাই মনে করতেন যে, আল্লাহর আইনগত সার্বভৌমত্ব মানে, রাজনৈতিক ক্ষমতার অধীনতাও শরিয়াহর কাছে বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক ক্ষমতায় আসীন মুসলিম শাসকদের জন্য শরিয়াহর বিধান মেনে চলা ছিল শুধু ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক দায়িত্বও বটে। তাদের দৃষ্টিতে, শাসকের কর্তৃত্ব আল্লাহর নির্ধারিত আইনব্যবস্থার অধীন হওয়াই উচিত। সুতরাং, যতদূর পর্যন্ত প্রাক-আধুনিক ইসলামি চিন্তকরা এই দৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রহণ করেছিলেন, ততটুকুই তারা আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে আইনি ও রাজনৈতিক, উভয় ক্ষেত্রে বাস্তবায়নযোগ্য সত্য হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন।11
ওপরে আলোচিত বিষয়গুলো আমাদেরকে মুহাম্মদ কাসিম জামান-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্যকে আরও প্রাসঙ্গিকভাবে অনুধাবন করতে সহায়তা করে। তিনি বলেন, সাইয়্যেদ কুতুব ও আবুল আ’লা মওদূদীর দৃষ্টিতে ‘সার্বভৌমত্ব’ (হাকিমিয়্যা) স্পষ্টভাবে আইনি এবং রাজনৈতিক উভয় মাত্রায় গঠিত একটি ধারণা। জামান উল্লেখ করেন, এ দুজন ইসলামপন্থি চিন্তক মনে করতেন, আল্লাহর আইন ছাড়া অন্য যেকোনো কর্তৃত্ব বা শাসন মানা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উভয় প্রেক্ষাপটে শিরক, অর্থাৎ ইসলামের সবচেয়ে ঘৃণিত পাপের শামিল।12
বিশেষত সাইয়্যেদ কুতুব প্রসঙ্গে জামান আরও বলেন, ‘সার্বভৌমত্ব’কে কুতুব স্পষ্টভাবে একটি রাজনৈতিক ধারণা হিসেবেই উপস্থাপন করেছেন, যখন তিনি বলেন যে, “আল্লাহ হচ্ছেন সকল ক্ষমতার একমাত্র উৎস এবং কেন্দ্র”।13 নদভীর ক্ষেত্রেও পরবর্তী আলোচনায় আমরা দেখব, একই রকম আইন ও রাজনীতির সমন্বিত ধারণায় ভিত্তি করে গঠিত একটি সার্বভৌমত্বের রূপরেখা সেখানে হাজির আছে।
তবে বিশেষভাবে লক্ষণীয় হলো, জামানসহ সাম্প্রতিক সময়ে যেসব গবেষক হাকিমিয়্যা (সার্বভৌমত্ব) বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন, তারা একে মূলত একটি আধুনিক উদ্ভাবন হিসেবে বিবেচনা করেন।14 ‘পাকিস্তানে আধুনিকতাবাদ’-বিষয়ক তাঁর সাম্প্রতিক বইয়ে, জামান ইসলামপন্থিদের দাবিকে সুস্পষ্টভাবে আধুনিক বলে চিহ্নিত করেছেন। এই প্রবন্ধের শুরুতেই আলোচিত সাইয়্যেদ কুতুবের হাকিমিয়্যার ধারণাকে তিনি “আল্লাহর সর্বোচ্চ ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বিষয়ে একটি সুস্পষ্টভাবে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি” হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন।15 মধ্যযুগীয় তাফসিরগ্রন্থ নিয়ে তাঁর সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে মনে হয়, পূর্ববর্তীকালে মুসলমানরা আইনগত ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নীতিগতভাবে অনেকটাই উদার ও বহুবিধ পন্থার প্রতি গ্রহণযোগ্য ছিলেন। জামান মনে করেন, যদি আধুনিক ইসলামপন্থিদের পরিবর্তে সেই প্রাক-আধুনিক আলেমগণ থাকতেন, তবে তারা ইসলামি আইন বা রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নিয়ে অতিমাত্রায় আগ্রহী হতেন না।
এ বিষয়ে সাইয়্যেদ ভালী রেজা নাসর তাঁর প্রাথমিক পর্যায়ের মৌলিক গ্রন্থে বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, মওদূদীর চিন্তাধারা, বিশেষ করে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব (God’s Sovereignty)-বিষয়ক ধারণা, “ঐতিহ্যবাহী ইসলামের” (Traditional Islam) সাথে একটি মৌলিক ও গভীর বিচ্ছেদ সৃষ্টি করেছে।16 এই “ঐতিহ্যবাহী ইসলাম” বলতে নাসর বোঝাতে চেয়েছেন—যেসব সামাজিক রীতিনীতি ও প্রতিষ্ঠানকে মুসলিমরা পূর্ববর্তী ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখে এবং যেগুলো তাদের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বা অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। এই ব্যাখ্যা উইলিয়াম গ্রাহামের সংজ্ঞার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। বাস্তবে, নাসরের লেখাজুড়ে “ঐতিহ্যবাহী ইসলাম” শব্দটি একটি ইতিবাচক (সাহায্যকারী) শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা মওদূদীর ব্যতিক্রমধর্মী ও “আইডিওলজিক্যাল” (চেতনার স্তরে গঠিত) ইসলাম ব্যাখ্যার বিপরীতে দাঁড় করানো হয়েছে। অর্থাৎ, মওদূদী যে চিন্তাপদ্ধতি থেকে তাঁর ব্যাখ্যা তৈরি করেছেন, তা নাসরের মতে একটি ব্যক্তিক ও সমসাময়িক রাজনৈতিক রূপায়ণ, যা ইসলামের ঐতিহ্যগত কাঠামোর বাইরে গিয়ে নির্মিত হয়েছে।17
উপরোক্ত গবেষকদের পাশাপাশি, হুমায়রা ইকতিদার সম্প্রতি মওদূদীর রচনায় হাকিমিয়্যার রাজনৈতিক দিকটি বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, মওদূদীর হাকিমিয়্যার ধারণা মূলত আধুনিক রাষ্ট্রকে একটি “জ্ঞানভিত্তিক বিনয়” (Epistemic Humility) শেখানোর একটি উপায় হিসেবে কাজ করে। কারণ, মওদূদীর দৃষ্টিতে আধুনিক রাষ্ট্র “জনসার্বভৌমত্ব” (Popular Sovereignty)-এর নামে মানুষের হাতে একপ্রকার সীমাহীন ও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা তুলে দেয়। যা একদিকে যেমন অযৌক্তিক ও অন্যায্য, অন্যদিকে শাসিতদের জন্য বিপজ্জনকও বটে।18
তবে হুমায়রা ইকতিদার এটাও লক্ষ করেন যে, আধুনিক রাষ্ট্রকে কেবল হুমকি হিসেবে নয়, একটি সম্ভাব্য ‘সামাজিক প্রকৌশলের’ (Social Engineering) হাতিয়ার হিসেবেও দেখেছেন মওদূদী, এমন এক পরিসরে যা প্রাক-আধুনিক মুসলমানদের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়।19 বিশেষভাবে তিনি তুলে ধরেন যে, মওদূদীর প্রধান উদ্বেগ ছিল এই, আধুনিক রাষ্ট্রের সর্বগ্রাসী চরিত্র, যার শিকড় নিহিত পশ্চিমা সেক্যুলার ঐতিহ্যে, তা ইসলামের পরিপূর্ণ ও সর্বব্যাপী দৃষ্টিভঙ্গিকে সমাজ থেকে উপড়ে ফেলতে পারে। মওদূদী আশঙ্কা করেন, এমন রাষ্ট্রীয় কাঠামো ইসলামের নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সর্বব্যাপী ভূমিকা পালনের পথ রুদ্ধ করে দিতে পারে।20
তবে জামানের মতোই ইকতিদারও মওদূদীর কুরআনের আয়াতসমূহে আল্লাহর কর্তৃত্বসংক্রান্ত বহু ব্যাখ্যাকে “অসাধারণ ও নবচিন্তনমূলক পাঠ” হিসেবে দেখেন।21 জামানের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তিনিও দাবি করেন, প্রাক-আধুনিক ইসলামি চিন্তাবিদরা “আল্লাহর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা” নিয়ে খুব একটা আগ্রহ দেখাননি। উদাহরণ হিসেবে ইকতিদার উল্লেখ করেন যে, মওদূদীর সূরা নূর, আয়াত ৫৫-এর ব্যাখ্যা ছিল “প্রচলিত ওলামাসমাজের সঙ্গে একটি স্পষ্ট বিচ্যুতি”, কারণ মূলধারার ওলামারা এই আয়াতকে বুঝতেন এভাবে যে, “প্রত্যেক মানুষ তার নিজের কাজের জন্য দায়ী”।
তদুপরি, তিনি দাবি করেন যে, “প্রচলিত ওলামা মতের বিপরীতে গিয়ে মওদূদী রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাকে সকল মুসলমানের ওপর একটি ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন।”22 তবে, এই দুটি দাবির পক্ষে ইকতিদার কোনো প্রমাণস্বরূপ বা মূলধারার ওলামাদের বক্তব্যের কোনোরূপ উদ্ধৃতি প্রদান করেন নাই। যদিও পরবর্তী অংশে আমি ইসলামি রাজনৈতিক ও আইনি সার্বভৌমত্বের প্রাক-আধুনিক ভিত্তি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব। এখানে সংক্ষেপে ইকতিদারের উক্ত দাবিসমূহ ও মওদূদীর তথাকথিত নবউদ্ভাবনের আলোচনার একটি মূল্যায়ন তুলে ধরছি। ইকতিদারের ওপরের মন্তব্যের বিপরীতে, আমি যে সমস্ত ওলামার তাফসিরগ্রন্থ পর্যালোচনা করেছি। তারা প্রত্যেকেই সূরা নূর, আয়াত ৫৫-এর ব্যাখ্যায় এই দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন যে, এই আয়াত মুসলমানদের প্রতি আল্লাহর দেওয়া রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রতিশ্রুতির দিকেই ইঙ্গিত করে, যদি তারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট সময় বা অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি ইসলামের ধ্রুপদী যুগ থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত বিস্তৃত এবং সুন্নি মাজহাবগুলোর বিভিন্ন ভৌগোলিক পরিসরে বিস্তৃত চিন্তানায়কগণের লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এই ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, পারসীয় পণ্ডিত ও বহু বিদ্যাবিশারদ আল-তাবারী (মৃত্যু ৩১০ হি./৯২৩ খ্রি.)-এর রচনায়, পারসীয় হানাফি ফকিহ আল-জাসসাস (মৃত্যু ৩৭০ হি./৯৮১ খ্রি.), খ্যাতনামা ইরাকি শাফেয়ি পণ্ডিত আল-মাওয়ার্দী (মৃত্যু ৪৫০ হি./১০৫৮ খ্রি.),পারসীয় সুফি মনীষী আল-কুশাইরি (মৃত্যু ৪৬৫ হি./১০৭২ খ্রি.), পারসীয় শাফেয়ি তাফসিরকার আল-বাঘাভী (মৃত্যু ৫১৬ হি./১১২২ খ্রি.), আন্দালুসীয় মালিকি পণ্ডিত ইবনুল আরাবি (মৃত্যু ৫৪৩ হি./১১৪৮ খ্রি.), মিশরীয় শাফেয়ি মনীষী আল-সুয়ুতি (মৃত্যু ৯১১ হি./১৫০৫ খ্রি.), ওসমানীয় হানাফি আলিম এবুসসুউদ (মৃত্যু ৯৮২ হি./১৫৭৪ খ্রি.), আধুনিক যুগের ইরাকি হানাফি পণ্ডিত আল-আলুসি (মৃত্যু ১২৭০ হি./১৮৫৪ খ্রি.), আধুনিক সৌদি হাম্বলি আলেম আল-সা’দী (মৃত্যু ১৩৭৬ হি./১৯৫৬ খ্রি.), এবং আধুনিক উপমহাদেশীয় হানাফি পণ্ডিত মুহাম্মদ শফী (মৃত্যু ১৩৯৬ হি./১৯৭৬ খ্রি.) ও তাঁর পুত্র মুহাম্মদ তাকি উসমানি (জ. ১৩৬২ হি./১৯৪৩ খ্রি.)-এর লেখায়।
এই বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় সুন্নি পণ্ডিতগণ সবাই একমত যে, সূরা নূর, আয়াত ৫৫-তে মূলত মুসলিম উম্মাহর হাতে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও শক্তির অর্পণকে বোঝানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ এই কথাও স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, এই আয়াতের প্রতিশ্রুতি সবচেয়ে নিখুঁতভাবে বাস্তবায়িত হয়েছিল খিলাফায়ে রাশেদার শাসনামলে, তবে এ-ও স্বীকার করেছেন যে, এই রাজনৈতিক আদর্শ ও মূল্যবোধ মুসলিম উম্মাহর মধ্যে পরবর্তীতেও রক্ষার জন্য অব্যাহত রয়েছে।
কয়েকটি নির্দিষ্ট উদাহরণ নেওয়া যাক : ইমাম আল-তাবারী তাঁর তাফসিরে ব্যাখ্যা করেন যে, আয়াতে ব্যবহৃত “لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ” (নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করবেন) বাক্যাংশটি দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, আল্লাহ মুমিনদেরকে আরব ও অনারব মুশরিকদের ভূমির উত্তরাধিকার দান করবেন এবং তাঁদেরকে সেসব ভূমির ওপর রাজা (মুলুক) ও শাসক (সাসা) করে তুলবেন।23 দুই-এক শতক পরে আল-বাঘাভীও তাঁর তাফসিরে প্রায় হুবহু একই ভাষায় এই ব্যাখ্যা প্রদান করেন। এ ছাড়া, খ্যাতনামা উসমানি পণ্ডিত ও বহু বিদ্যায় পারদর্শী এবুসসুউদ আয়াতের উক্ত বাক্যাংশ সম্পর্কে বলেন, “এর অর্থ হলো, আল্লাহ মুত্তাকি মুমিনদেরকে খলিফা (খুলাফা) বানাবেন, যারা রাজাদের মতো নিজেদের রাজ্যসমূহে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে।”24
তিন শতক পরে আল-আলুসিও তাঁর তাফসিরে এই বাক্যাংশ হুবহু একইভাবে উদ্ধৃত করেছেন। এগুলো বলার উদ্দেশ্য এই নয় যে, উপরোক্ত আলেমরা এই আয়াতকে রাজতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্রের পক্ষে ব্যাখ্যা করেছেন। বরং মূল বিষয়টি হলো, এইসব আলেম নিঃসন্দেহে মনে করেন যে, আল্লাহ এই আয়াতে মুত্তাকি মুমিনদের জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
পরিশেষে, মওদূদীর প্রতিদ্বন্দ্বী ধারার আধুনিক যুগের দেওবন্দি চিন্তাবিদ মুহাম্মদ শফী ও তাঁর পুত্র মুহাম্মদ তাকি উসমানি উক্ত আয়াতের তাফসিরে উল্লেখ করেন যে, “এটি আল্লাহর রাসুলকে দেওয়া একটি প্রতিশ্রুতি, যে তাঁর উম্মাহকে আল্লাহ পৃথিবীতে নিজের খলিফা করবেন এবং তারা ক্ষমতা ও মর্যাদার সাথে শাসন করবে।”25
তাঁরা কয়েক পৃষ্ঠাজুড়ে মুসলিমদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও শক্তির আদর্শ ব্যাখ্যা করেছেন এবং সুন্নি মত অনুযায়ী, প্রথম চার খলিফাকে সেই আদর্শের সর্বোত্তম উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, তাঁরা এই আদর্শকে কেবল অতীতের স্মৃতিরূপে নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যও এক চলমান রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে তুলে ধরেছেন।26
সুতরাং, মওদূদী যদি এই আয়াতকে (সূরা নূর ২৪:৫৫) রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেন, তা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। বরং ইতিহাসের ধারায় এটিই স্বাভাবিক। কারণ, ইসলামি শরিয়তে মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অনেক পুরনো ধারার আলেমদের লেখায় স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। যদিও এই বিষয়ে তাঁরা বিস্তারিত আলোচনা করেননি, কারণ তখনকার বাস্তবতায় একটি স্বীকৃত খিলাফত ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। ফলে, মুসলমানদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকা, এটি ছিল এমন এক স্বাভাবিক বিষয়, যা নিয়ে আলাদা করে প্রমাণের প্রয়োজন পড়ত না। নিঃসন্দেহে, মওদূদী তাঁর সময়ের “উদার ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থা” থেকে প্রভাবিত হয়েছিলেন, যা হুমায়রা ইকতিদার যথার্থভাবে উল্লেখ করেছেন। এই প্রভাব থেকেই তিনি ইসলামি রাষ্ট্র ধারণাকে আধুনিক কাঠামোয় রূপ দিতে চেয়েছেন। কিন্তু তাই বলে ইকতিদারের এই দাবি, যে মওদূদীর চিন্তাই প্রথম ইসলামকে এমনভাবে রূপান্তর করেছে, যাতে মুসলিম ও অমুসলিম পরিচয় শুধুমাত্র ধর্মীয় নয়; বরং রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবেও চিহ্নিত হয়ে ওঠে। এমন দাবি যথার্থ নয়।27
ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে এমন কঠোর বিভাজনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আধুনিক যুগের একটি বৈশিষ্ট্য, যা প্রাচীন সমাজ, বিশেষ করে মুসলিম সমাজে সম্পূর্ণভাবেই অচেনা ছিল। ইসলামি ঐতিহ্যে ধর্ম ও রাজনীতি কখনো একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। বরং এই দুই অঙ্গ ছিল পরস্পরসম্পৃক্ত, একটি অন্যটিকে পরিপূর্ণ করে। এই প্রসঙ্গে ইসলামি চিন্তাবিদ ওভামির আনজুম-এর কথাটি প্রাসঙ্গিক। তিনি উল্লেখ করেন, মুসলমানদের কাছে রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন এমন একজন পূর্ণাঙ্গ আদর্শ, যিনি আধুনিক পাশ্চাত্য মানদণ্ড অনুযায়ী “ধর্মীয়” ও “ধর্মনিরপেক্ষ” উভয় ক্ষেত্রেই অনুকরণযোগ্য। ফলে, তাঁর অনুসরণ মানেই কেবল আধ্যাত্মিক অনুশীলন নয়; বরং সামাজিক, নৈতিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব কেমন হওয়া উচিত, তাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মুহাম্মদ কাসিম জামান তাঁর আলোচনায় মওদূদীর আইনি ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব-বিষয়ক ধারণাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যেন তা ইউরোপীয় প্রভাবশালী রাজনীতি বিশেষজ্ঞ জ্যাঁ বোদ্যাঁ (মৃত্যু : ১০০৪ হি./১৫৯৬ খ্রি.) এবং টমাস হবস (মৃত্যু : ১০৯০ হি./১৬৭৯ খ্রি.)-এর চিন্তার সাথে সংগতিপূর্ণ। তবে জামান এর পাশাপাশি ইঙ্গিত করেন, ইসলামের প্রাক-আধুনিক যুগের বিশিষ্ট আলেমরা এইরূপ ‘সার্বভৌমত্ব’ ধারণার সাথে একমত হতেন না।28
এই প্রবন্ধের পরবর্তী অংশে আমি এই দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতা করছি। আমি দেখাতে চাই, ইসলামি ঐতিহ্যের প্রামাণ্য ও প্রভাবশালী আলেমরা ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় চূড়ান্ত সার্বভৌমত্ব কেবলমাত্র আল্লাহরই বলে বিশ্বাস করতেন। যদিও তাঁরা হয়তো “সার্বভৌমত্ব” বোঝাতে নির্দিষ্ট কোনো একটি আরবি শব্দ ব্যবহার করেননি, তবুও তাঁদের লেখনীতে স্পষ্ট যে, আইন প্রণয়নের অধিকার কেবলমাত্র আল্লাহর; আর এর অর্থ হলো, ইসলামি শাসকদের ক্ষমতা ইসলামি শরিয়ত দ্বারা সীমাবদ্ধ ছিল। অতএব, বোদ্যাঁ বা তাঁর উত্তরসূরি ইউরোপীয় চিন্তাবিদদের মতো যে ‘অনির্বিশেষ ও অপ্রতিবন্ধ্য’ সার্বভৌম শাসনব্যবস্থা তারা কল্পনা করেছিলেন, ইসলামি আলেমগণ সেই ধরনের সার্বভৌমত্বের ধারণা কখনোই সমর্থন করেননি। বরং ইসলামি রাজনীতি-চিন্তায় শাসক বা রাজা হচ্ছেন আল্লাহর বিধান কার্যকর করার জন্য নিযুক্ত প্রতিনিধি, যাঁদের সিদ্ধান্ত সর্বোচ্চ নয়, বরং শরিয়তের অধীন।
প্রাক-আধুনিক ইসলামে সার্বভৌমত্ব
বিভিন্ন গবেষণা প্রবন্ধ ও সাহিত্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, উলামাগণ কর্তৃক উপস্থাপিত ইসলামি প্রথাগত চিন্তাধারায় আইন প্রণয়নের অধিকার একমাত্র আল্লাহর বলে দাবি করা হয়েছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, আধুনিক সার্বভৌমত্ব-চিন্তকরা আইন প্রণয়ন-ক্ষমতাকে সার্বভৌমত্বের মূল বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এজন্য নিচের অধিকাংশ উদাহরণ এই দিকটিকেই কেন্দ্র করে উপস্থাপন করা হয়েছে। অবশ্য, সমাজের সবচেয়ে ক্ষমতাবানদের নিয়ন্ত্রণের সামর্থ্য না থাকলে আইন অর্থহীন হয়ে পড়ে। এখানেই রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সঙ্গে এই ধারণার সংযোগ ঘটে। আল্লাহর আইন প্রণয়নের একচেটিয়া অধিকার বলবৎ রয়েছে ধরে নেওয়া মানেই রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষও সেই আইনের অধীন। এবং ব্যাপকভাবে স্বীকৃত যে, ইসলামি আইনের ওপর শাসকদের সরাসরি কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না।29 এই আইন বিকশিত হয়েছে একটি দ্বি-পাক্ষিক প্রক্রিয়ায় (Dialectically), যেখানে নেতৃত্ব দিয়েছেন উলামাগণ। যাঁদের নবিদের উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হতো; কারণ তাঁরা কুরআন ও সুন্নাহ থেকে আইন উদ্ভাবন করতেন। তাঁরা নির্বাহী ক্ষমতা বা শাসকদের অধীন ছিলেন না, বরং তুলনামূলক স্বাধীনভাবে কাজ করতেন।
প্রশাসনের হাতে ছিল “শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা (Shawka)”, কিন্তু উলামারা মনে করতেন, শাসকরা এই আইন বাস্তবায়নের জন্য নিযুক্ত সেবকমাত্র। যদিও বাস্তবে অনেক সময় উলামাদের ক্ষমতা সীমিত ছিল, তবে তারা নিয়মতান্ত্রিক ও ধর্মীয় নীতির মাধ্যমে শাসকদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করতেন। গবেষক Andrew March বলেন, “যেহেতু আলেমরা শরিয়াহভিত্তিক কোনো সুলতানি আদেশ বা নীতিকে বাতিল (ভেটো) করতে পারতেন, তাই বলা যায়, তারা একপ্রকার চূড়ান্ত আইনগত কর্তৃত্ব দাবি করতেন।”30
Patricia Crone উল্লেখ করেন যে, প্রাচীন আলেমরা শাসকদের বর্ণনা দিতেন ‘কেবল শক্তির বাহক’ হিসেবে, যাদের নিজস্ব কোনো মূল্য ছিল না। তারা শুধু ধর্ম টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। তাঁদের দৃষ্টিতে শাসকের আসল কাজ ছিল কেবল শৃঙ্খলা বজায় রাখা।31 আর Noah Feldman তুলে ধরেন যে, প্রাক-আধুনিক ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় শাসকদের বৈধতা নির্ভর করত এই স্বীকৃতির ওপর যে, তাঁরা আল্লাহ এবং আল্লাহর শরিয়াহর অধীন, যেটি উলামারা ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ করতেন।32
এই মনোভাবগুলো ভালোভাবে বোঝা যায় দামেশকের প্রখ্যাত হাম্বলি ফকিহ ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যার (মৃ. ৭৫১ হি./১৩৫০ খ্রি.) নিম্নোক্ত বক্তব্য থেকে, “সঠিকভাবে বললে, শাসকদের আনুগত্য করা হয় কেবল তখনই, যখন তাঁদের আদেশ ধর্মীয় জ্ঞানের (শরিয়াহর) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। সুতরাং, শাসকদের প্রতি আনুগত্যের কর্তব্য আসলে ফকিহদের প্রতি আনুগত্যের কর্তব্য থেকেই উদ্ভূত। আনুগত্য একমাত্র কল্যাণকর বিষয়ের (মাআরুফ) ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, এবং সেটি অবশ্যই শরিয়ত-নির্ধারিত হতে হবে। যেহেতু ফকিহদের প্রতি আনুগত্য নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আনুগত্যের ধারাবাহিকতা, ঠিক তেমনি শাসকদের প্রতি আনুগত্যও মূলত ফকিহদের প্রতি আনুগত্য থেকেই উৎসারিত।”33
এই বক্তব্যটি একটি এমন ধারণাকে তুলে ধরে যা প্রাক-আধুনিক উলামাদের মধ্যে প্রান্তিক বা বিচ্ছিন্ন ছিল না; বরং এটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল যে, রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের তুলনায় উলামাদের মর্যাদা কোনো এক অর্থে উচ্চতর, কারণ শাসকদের প্রতি আনুগত্যের কর্তব্য মূলত উলামাদের প্রতি আনুগত্যের কর্তব্য থেকেই উদ্ভূত। তবে, এই ফকিহদের কর্তৃত্ব কোনো স্বতন্ত্র আইনপ্রণেতা হিসেবে নয়; বরং কুরআন ও নবির শিক্ষা থেকে উদ্ভূত ওহির ব্যাখাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। মাইকেল কুক অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে যুক্তি দিয়েছেন যে, ফকিহদের দৃষ্টিতে শরিয়াহর একমাত্র বৈধ উৎস হলো কুরআন ও হাদিস। বহু প্রভাবশালী প্রাক-আধুনিক ইসলামি ফকিহের রচনার মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন যে, যুগে যুগে ইসলামি চিন্তাবিদদের একটি সুস্পষ্ট ধারা ছিল—যাতে তাঁরা এমন আইনকে একান্তভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন, যার উৎস ইসলামি নয়; যতক্ষণ না সেই আইন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে ইসলামি স্বীকৃতি অর্জন করেছে।34
এই ভাবনাটি প্রাক-আধুনিক ইসলামি চিন্তায় কোনো বিচ্ছিন্ন বা প্রান্তিক মত ছিল না; বরং এটি ইসলামি মূলধারার অনেক আলিমের মধ্যে দৃঢ়ভাবে বিদ্যমান ছিল। উদাহরণস্বরূপ, দামেশকের বিখ্যাত তাফসিরবিদ ইমাম ইবনে কাসির (মৃত্যু : ৭৭৪ হিজরি/১৩৭৩ খ্রিষ্টাব্দ) তার তাফসিরে এমন মুসলমানদের কঠোরভাবে নিন্দা করেন, যারা কুরআন ও সুন্নাহর চেয়ে ইসলামবহির্ভূত আইনকে প্রাধান্য দেয় বা সেই আইনের প্রতি অনুগত থাকে। তিনি বলেন,
“তাদের মধ্যে যারা শরিয়তের পরিবর্তে অন্য কোনো বিধানের প্রতি আকৃষ্ট হয়, তারা কাফির। তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ফরজ, যতক্ষণ না তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শরিয়াহর প্রতি ফিরে আসে এবং কোনো ছোট বা বড় বিষয়ে আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে বিচার না করে।”35
ইবন কাসিরের এই বক্তব্য ছিল না কোনো উগ্র বিচ্যুতির ফল; বরং এটি ছিল একটি সুপ্রতিষ্ঠিত মনোভাব। যা মধ্যযুগীয় ইসলামি বিশ্বে বহু প্রভাবশালী আলিম ধারণ করতেন। এমন দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়কার বিশেষ প্রেক্ষাপট ছিল মোঙ্গলদের ইসলামে নামেমাত্র ধর্মান্তর। তারা বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করলেও তখনো বাস্তবে তারা ‘ইয়াসা-ই কাবির’ (চেঙ্গিস খানের প্রণীত মোঙ্গলীয় আইন সংহিতা) অনুসরণ করছিল। এই দ্বৈত আচরণের বিরুদ্ধে ইবনে তাইমিয়া (মৃত্যু : ৭২৮ হি./১৩২৮ খ্রি.), যিনি ইবনে কাসিরের ওস্তাদ ছিলেন, তীব্র সমালোচনা করেন এবং স্পষ্ট ভাষায় বলেন, যারা শরিয়াহ পরিত্যাগ করে ইয়াসা অনুসরণ করে, তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ বৈধ। ইবনে কাসিরের বক্তব্যে তার ওস্তাদ ইবনে তাইমিয়ার প্রভাব পরিষ্কার হলেও এটি কোনো ব্যতিক্রমী মত নয়। বরং এটি ছিল প্রাক-আধুনিক ইসলামি চিন্তায় একটি সুগভীর এবং সুদীর্ঘকাল ধরে চলে আসা অবস্থান। যেখানে আল্লাহর আইনই একমাত্র বৈধ আইন হিসেবে বিবেচিত হতো, এবং ইসলামি রাষ্ট্রপরিচালনায় সেটাই ছিল সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের উৎস।
এই ভাবধারাগুলো যে ইসলামি আইনি সংস্কৃতিতে কতটা ব্যাপকভাবে বিদ্যমান ছিল, তার আরও বহু উদাহরণ পাওয়া যায়। প্রাচীন ও প্রভাবশালী সুন্নি তাফসিরবিদ ইমাম আল-তাবারির (মৃত্যু : ৩১০ হিজরি/৯২৩ খ্রি.) ব্যাখ্যায় এ ধারা খুব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে এসব ধারণা ইসলামি চিন্তায় শুরু থেকেই স্বাভাবিক (Normative) ছিল। সূরা আল-মায়েদার ৪৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে : “যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার করে না, তারাই কাফির।” এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল-তাবারি উল্লেখ করেন, যদিও এটি কিছু ইহুদির বিষয়ে অবতীর্ণ হয়েছিল, যারা রাসূলুল্লাহর (সা.) নিকট সালিশি করতে এসেছিল। তবুও এটি একটি সাধারণ নীতিরূপে মুসলমানদের ওপরও প্রযোজ্য।36 অর্থাৎ, কোনো মুসলমানও যদি আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে অন্য আইন অনুসরণ করে, সে একই রকম কাফির সাব্যস্ত হয়।
ইসলামের ইতিহাসে ‘জাহেলি যুগের’ কিছু আইন ইসলামে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মাইকেল কুক মন্তব্য করেন, “এইসব ব্যতিক্রমী আইনগুলো ইসলামি উৎস নয়, বরং ইসলামি আইনের চূড়ান্ত কর্তৃত্ববাদের (God’s Legal Monopoly) বাইরে থেকে এসেছে বলেই এগুলোর গ্রহণযোগ্যতা ব্যাখ্যার দাবি রাখে। এগুলো ছিল ব্যতিক্রম, মূল নিয়ম নয়।”37
৭ম হিজরি/১৩শ শতকের শুরুতে মোঙ্গলরা ইসলাম গ্রহণ করলেও তারা বারবার তাদের নিজস্ব প্রাচীন আইন, ‘ইয়াসা’ বা ‘ইয়াসাক’ অনুসরণে আগ্রহ দেখায়। এই আচরণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ইসলামি আলিমদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে ছিল। কারণ তারা শরিয়াহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন না করে চেঙ্গিস খানের আইনি কাঠামোকে গুরুত্ব দিচ্ছিল। এই প্রেক্ষাপটে সার্বভৌমত্ব (Sovereignty)-সংক্রান্ত যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, তা হচ্ছে, একদিকে ইসলামি চিন্তায় আইন প্রণয়নের অধিকার একমাত্র আল্লাহর, এটি একটি মৌলিক বিশ্বাস; অন্যদিকে চেঙ্গিসি দৃষ্টিভঙ্গিতে সার্বভৌমত্ব ও সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের উৎস ছিল চেঙ্গিস খান নিজেই। এই দ্বৈত ধারা ইসলামি চিন্তার সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করেছিল এবং বহু আলিম একে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন।
অরাজনৈতিক-আরব-ফারসি খলিফার মূলভূমির বাইরের ‘উলামাদের’ মধ্যেও ইসলামবহির্ভূত আইনপ্রণয়নের প্রতি তীব্র বিরোধিতা লক্ষ করা যায়। প্রাক-আধুনিক ভারতের ইতিহাসে সমানতর ধারায় এমন নৈঃশব্দিক উদাহরণ দেখা যায়, সেই সময়ের একজন মুসলিম স্কলার সম্রাট আকবরের (মৃত্যু : ১০১৪ হিজরি/১৬০৫ খ্রিষ্টাব্দ) সমন্বিত ধর্মীয় সংস্কারের কঠোর সমালোচনা করেছেন। আহমদ সিরহিন্দী (মৃত্যু : ১০৩৪ হিজরি/১৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ) তার কঠোর সমালোচনায় প্রমাণ করেন, দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এই আলেম কতটা বিদ্বেষভরে ইসলামবহির্ভূত আইনসমূহকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সিরহিন্দীর মতে, আকবরের অন্যতম অপরাধ ছিল অবিশ্বাসীদের আইনকে ফারসিতে অনুবাদ করা, যার উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের ধ্বংস।38
আবারও দেখা যায় আকবরের এমন সার্বভৌম আইন প্রণয়নের দাবি, যা সম্পূর্ণরূপে শরিয়াহ থেকে স্বাধীন ছিল, যা ইসলামি পণ্ডিত সমাজে কঠোর প্রতিবাদ ডেকে আনে। কারণ এটি ঐকমত্য যে, আইন প্রণয়নের অধিকার শুধুমাত্র নবি মুহাম্মদের অবতীর্ণ ওহি তথা শরিয়াহর মধ্যে সীমাবদ্ধ। আকবরের বিশ্বাসের প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন শুধু সিরহিন্দী নন; বরং তার রাজসভায় এমন প্রশংসিত পণ্ডিতরাও পরবর্তীকালে আকবরকে মুরতাদ মনে করতেন।
একশ বছর পরেও দিল্লির বিশিষ্ট ইসলামি পণ্ডিত শাহ ওয়ালি উল্লাহর (মৃত্যু : ১১৮৬ হিজরি/১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দ) প্রধান উদ্বেগ ছিল ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের মাঝে বাস করা সংখ্যালঘু মুসলিমরা যেন হিন্দু সংস্কৃতি ও শরিয়াহবিরোধী সাংস্কৃতিক প্রভাব থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে। যেমন, বিধবার পুনরায় বিয়ে না করার হিন্দু বিধিনিষেধ। অর্থাৎ, দক্ষিণ এশিয়াতেও আল্লাহর আইন প্রণয়নের একমাত্রত্ব নিয়ে উদ্বেগ ইসলামিবাদীদের আগেই বিদ্যমান ছিল, এবং সেটা শতাব্দী পূর্ব থেকেই।
অটোমান সাম্রাজ্যের অঞ্চলগুলোতেও মুসলিম আইনজ্ঞদের মধ্যে রাষ্ট্রের আইন বা ‘কানুন’ নিয়ে একটা উদ্বেগ ছিল, কারণ তারা মনে করতেন এটা আল্লাহর আইন তৈরির একাধিকার লঙ্ঘন করছে। ১৫২১ সালের দিকে, অটোমান শাসিত মিসরের একজন পণ্ডিত অটোমান শরিয়াহ আইনকে ‘অবিশ্বাসীদের আইন’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন, যার জন্য তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।39 যদিও অনেক মহান অটোমান ফকিহরা ‘কানুন’কে শরিয়াহর বাইরে হলেও আইনগতভাবে সমর্থন করেছিলেন, তবুও শরিয়াহ এবং শরিয়াহ ‘কানুন-এর মাঝে মতবিরোধও হতো। এর মাধ্যমে পরিলক্ষিত হয় যে, ইসলামে আল্লাহর আইনের একচ্ছত্র আধিপত্য কতটা শক্তিশালী ছিল।
একই বিষয়ের কিছু উদাহরণ আছে, যেখানে ‘কানুন’ এবং ‘শরিয়াহ’র মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা গেছে। দুই মামলায় বিচারাধীন পক্ষ দাবি করেছিল তাদের ক্ষেত্রে শরিয়াহ প্রযোজ্য নয়, ‘কানুন’ই প্রযোজ্য। তখন অটোমান শায়খুল ইসলাম আবদুর রহিম এফেন্ডি তাদেরকে তাদের ঈমান এবং বিবাহ পুনরায় করতে বলেছেন, যা বোঝায় তারা হয়তো ধর্মত্যাগী হয়েছে।40 এই থেকে স্পষ্ট যে, শরিয়াহর কর্তৃত্ব অস্বীকার করে কাউকে ধর্মত্যাগী ঘোষণা (তকফির) করার মতো ধারণার উদ্ভাবক কুতুব বা মওদূদী নন। তবে, পরবর্তীতে আমরা দেখব, কুতুবের সমালোচকরা বলছেন যে, পুরো মুসলিম সমাজকে একসঙ্গে তাকফির করার ধারণা তার জন্য অতি নতুন এবং বিরল।
অটোমান শাসনব্যবস্থায় ‘কানুন’ বা রাষ্ট্রীয় আইন একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, অনেকে বলবেন রাষ্ট্রে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করত। মওদূদীও যেহেতু প্রশাসনিক নিয়ম-কানুন এবং যাকে তিনি ‘মানবীয় আইন’ বলেন, তা যৌক্তিকভাবে গ্রহণ করার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন, তাই দেখা যায় তিনি হয়তো তার আগের সময়কার কিছু ইসলামি চিন্তাবিদের তুলনায় কিছুটা নমনীয় ছিলেন।
মিশরের কুতুবও শরিয়াহ উপেক্ষিত হচ্ছে বলে যে অভিযোগ তোলেন, তা একেবারে নতুন নয়। বরং তার জন্মের আগেই মিশরের এক শাফেয়ি মুফতি দেশটির শাসকদের তীব্রভাবে সমালোচনা করেছিলেন। তারা নাকি উপনিবেশবাদীদের চাপে কুরআনকে উপেক্ষা করে শরিয়াহবিরোধী আইন তৈরি করছিলেন, আর আদালতগুলোকে সেই আইন মানতে বাধ্য করছিলেন।41
এই বিষয়ে গবেষক মাইকেল কুক বলেন, এসব বিদেশি আইন ছিল মূলত কাফেরদের প্রথা ‘ইয়াসা’-র মতো, যা অটোমান খলিফাদের স্বীকৃত ‘কানুন’-এর মতো ছিল না। তাই ঔপনিবেশিক ও পরবর্তী যুগের এই আইনব্যবস্থার বিরুদ্ধে ইসলামপন্থিদের প্রতিক্রিয়া আসলে আগের ইসলামি চিন্তারই ধারাবাহিকতা মাত্র। এখানে মওদূদীর বিশেষ ভূমিকা ছিল, তিনি ইউরোপের ‘সার্বভৌমত্ব’ শব্দটি গ্রহণ করে তা ইসলামি ভাষায় ব্যবহার করেন, যার মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, আইন তৈরি করার একমাত্র অধিকার আল্লাহর, এবং আল্লাহর সেই কর্তৃত্বই রাজনীতির ক্ষেত্রেও প্রাধান্য পাবে।
প্রভাব ও ধারণাগত ইউরোসেন্ট্রিসিজমের পুনর্বিবেচনা
হাকিমিয়্যার মতো আধুনিক মুসলমানদের প্রকাশিত ধারণাগুলোকে অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন বলে মনে করার প্রবণতাটি সম্ভবত সমাজবিজ্ঞানে ঐতিহাসিকভাবে প্রভাব বা প্রভাব বিস্তারের ধরনকে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তারই একটি ফল। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে গবেষকরা পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ‘পূর্ব’কে বোঝার প্রচলিত রীতি নিয়ে ক্রমশ প্রশ্ন তুলছেন। এটি এমন এক অভ্যাস, যা সম্ভবত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অ-পশ্চিমের ওপর পশ্চিমা আধিপত্যের ফলে গড়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে এবং হাকিমিয়্যার মতো ইসলামি ধারণার ঐতিহাসিক উৎস বিবেচনায় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে: মওদূদীর ব্যাখ্যায় গঠিত ‘সার্বভৌমত্ব’ (Sovereignty) ধারণাকে কি এখনো আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসবিদদের বোদিন বা হোবস-এর সঙ্গে তুলনা করে বিচার করা উচিত? এমনভাবে যেন এই দুই পাশ্চাত্য চিন্তাবিদই সেই ধারণাকে পরিমাপ করার সঠিক মানদণ্ড?
যেমন অনেক গবেষক বলেছেন, বোদিন এবং হবস ষোড়শ শতকে ইউরোপে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতিক্রিয়ায় সার্বভৌমত্ব (Sovereignty)-বিষয়ক তাদের নতুন ধারণা তৈরি করেছিলেন। এই অস্থিরতা পুরনো সার্বভৌমত্ব ধারণাকে বদলে দিয়ে এটিকে একটি বিকেন্দ্রিক ও ছড়ানো ধারণা থেকে সরিয়ে এনে একক ও স্বৈরশাসক রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে কেন্দ্রীভূত করে দেয়।42 তবে মওদূদীর চিন্তায় তেমন বড় কোনো ঐতিহ্যবিচ্ছেদ নেই, যেমন আমি আগেও ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি। বরং তাঁর ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, পুরনো ঐতিহ্যেরই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় উপযোগী করে পুনর্নির্মাণ। মওদূদীর হাকিমিয়্যা ভাবনায় আল্লাহর সার্বভৌমত্বের যে ধারণা উঠে আসে, তা ইসলামি বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের একটি ধারাবাহিকতা বহন করে। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, মওদূদীর ধারণাকে ইউরোপীয় মানদণ্ডে বিচার করার যৌক্তিকতা কোথায়? এর বদলে, সার্বভৌমত্বকে এমন একটি ধারণা হিসেবে দেখা উচিত, যার মতো কিছু অনুরূপ ধারণা প্রতিটি সমাজেই আছে। যেমন : ‘ধর্ম’, ‘রাজনীতি’ বা ‘অর্থনীতি’। তবে একই সঙ্গে স্বীকার করতে হবে, এসব ধারণা বিভিন্ন সমাজে বিভিন্নভাবে প্রকাশ পায় এবং প্রতিটি প্রসঙ্গেই তার নিজস্ব ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য থাকে।
অন্য একটি সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে, বিশেষত ইউরোপবহির্ভূত সমাজে ‘সার্বভৌমত্ব’ নামক ধারণাটির সন্ধান করা আদৌ অর্থবহ কি না, এ প্রশ্নটি আজ আর কেবল একাডেমিক কৌতূহলের বিষয় নয়। কিছু চিন্তক মনে করেন, এমন চেষ্টাগুলো হয়তো সময়ের বাইরে গিয়ে ইতিহাসকে পাঠ করার একটি বিভ্রান্তিপূর্ণ প্রয়াস বা আরও গভীরতরভাবে, একধরনের ইউরোকেন্দ্রিক মানসিকতারই প্রতিফলন।43 এ অভিযোগ হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। তবে এটিকে জ্ঞানচর্চার পথ সংকুচিত করার বদলে একটি সৃজনশীল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা যেতে পারে। যা আমাদেরকে প্রচলিত বিশ্লেষণ কাঠামোর সীমাবদ্ধতা অনুধাবনে সহায়তা করে, এবং এক নতুন দৃষ্টিকোণ খুলে দেয়।
তবে এই অভিযোগেরও একটি সীমা রয়েছে। আমি বলব, ইংরেজি ভাষায় ব্যবহৃত বড় বড় বিশ্লেষণমূলক ধারণাগুলো মূলত এমন এক একাডেমিক পরিসরে গড়ে উঠেছে, যা অ-পশ্চিমের ওপর পশ্চিমা আধিপত্যের ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। দীপেশ চক্রবর্তী যেমনটি বলেছেন, পশ্চিমা একাডেমিক ব্যবস্থার “জ্ঞানগত কাঠামো” (Knowledge Protocols) এমনভাবে গঠিত যে, তা “অতিনির্মিত ইউরোপকে” (Hyperreal Europe)44 বিশেষ গুরুত্ব দেয়।
এই প্রেক্ষাপট থেকে বলা যায়, গবেষকরা আজও নিয়মিতভাবে ‘ধর্ম’, ‘রাষ্ট্র’, ‘রাজনীতি’ এবং ‘সার্বভৌমত্ব’-এর মতো ধারণা ব্যবহার করেন। অন্য সময় বা স্থানের সমাজগুলো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে—তবে প্রায়ই খেয়াল করেন না যে, এসব ধারণা নিয়ে তাঁদের বিশ্লেষণ অনেক সময়ই আধুনিক পশ্চিমা ব্যাখ্যার দ্বারা প্রভাবিত। আসলে, মওদূদীর মতো অ-পশ্চিমা সমাজের চিন্তাবিদরা যখন পশ্চিমা আধিপত্যের প্রেক্ষাপটে এসব ধারণা এবং সেগুলোর আধিপত্যশীল পশ্চিমা ব্যাখাগুলোর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন, তখন সেটা এক নতুন বৈশ্বিক ও আন্তঃসংযুক্ত ইতিহাসচর্চার প্রয়াসের পটভূমি তৈরি করে। এই দৃষ্টিকোণটি স্বীকার করা প্রয়োজন।
এই আলোচনায়, সব সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেই, আমাদের চেষ্টা হবে দৃষ্টির অভিমুখ উল্টে দেওয়া, চিন্তার ভরকেন্দ্র এবার ইউরোপের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া। লক্ষ্য হচ্ছে মওদূদীর চিন্তার আলোয় পশ্চিমা ‘সার্বভৌমত্ব’ ধারণাকে পুনরায় পাঠ করা। যেন আলো আসে অন্য এক দিগন্ত থেকে, যেন ইতিহাসের একমুখী ব্যাখ্যা ছাপিয়ে উঠে আসে বহুমাত্রিক এক বয়ান।
টীকা
আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই, হুমায়রা ইকতিদার এবং অলিভার শার্ফডট-এর প্রতি, যাঁরা আমাকে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কিংস কলেজ লন্ডনে অনুষ্ঠিত "হাকিমিয়্যা ধারণা" বিষয়ক তাঁদের কর্মশালায় অংশগ্রহণের জন্য সদয়ভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী সকলের মূল্যবান পর্যালোচনার জন্য আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। বিশেষভাবে, আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই হুমায়রা, অলিভার, ওমর আনচাসি, সায়মন উল্ফগ্যাং ফুকস, অ্যান্ড্রু মার্চ, ক্রিস্টোফার পুয়া রাজাভিয়ান, মুহাম্মদ কাসিম জামান এবং দুইজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রিভিউয়ারকে, যাঁরা আমাকে অমূল্য মতামত দিয়েছেন। আমার লেখায় কোনো ভুলত্রুটি থাকলে তার দায়ভার তাঁদের নয়।
তারিখ উদ্ধৃত করার ক্ষেত্রে আমি সাধারণত হিজরি তারিখের পর গ্রেগরিয়ান (খ্রিস্টীয়) সাল উল্লেখ করি, যেমন: ১৪৪২/২০১০।
এই প্রবন্ধে ইসলামপন্থী (Islamist) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মুসলমানদের বোঝাতে। যেমন, দক্ষিণ এশিয়ার জামায়াতে ইসলামি বা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম ব্রাদারহুড। তবে এতে আইএস বা আল-কায়েদা-র মতো সংগঠন অন্তর্ভুক্ত নয়, যাদের আমি এই ক্যাটাগরির অংশ মনে করি না (যা আমি ভবিষ্যতের কোনো লেখায় ব্যাখ্যা করব)।
সাইয়্যেদ কুতুব, Fi Zilal al-Qur'an, 34তম সংস্করণ, কায়রো, ২০০৪, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৯৯০—এ কুতুব সূরা ইউসুফ ১২:৪০ আয়াতের ব্যাখ্যায় হাকিমিয়্যার গুরুত্ব তুলে ধরেন। অনুবাদ ও ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, Zaman, Islam in Pakistan, পৃ. ১৩৯ Zaman, The Sovereignty of God, পৃ. ৩৯৩. কুতুব তার অন্যান্য লেখাতেও হাকিমিয়্যার ধারণা জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন, যেমন: al-ʿAdāla al-Ijtimāʿiyya fī al-Islām (ইসলামে সামাজিক ন্যায়বিচার), Maʿālim fī al-Ṭarīq (মাইলস্টোনস), দেখুন: W. E. Shepard, Sayyid Qutb and Islamic Activism, New York, 1996 O. Carré, Mystique et politique, Paris, 1984 ইংরেজি অনুবাদ: Qutb, Milestones, ed. A. B. al-Mehri, Birmingham, 2006, হাকিমিয়্যা সর্বত্র “sovereignty” হিসেবে অনূদিত হলেও মওদূদীর নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।
কাশিম জামান মূলত দক্ষিণ এশিয়ার ওপর আলোকপাত করলেও হাকিমিয়্যার অন্তর্নিহিত ধারণা মওদূদী বা কুতুবের নাম উল্লেখ না করেও অন্যান্য ইসলামি চিন্তাবিদদের লেখায় পাওয়া যায়। উদাহরণ: মুহাম্মদ আল-আমীন আশ-শানকিতি (মৃত্যু: ১৩৯৩ হি./১৯৭৪), সৌদি আরবে বসবাসরত মৌরিতানীয় আলেম তাঁর Adwāʾ al-Bayān fī Tafsīr al-Qurʾān bi-l-Qurʾān, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৫৯ফ (বেইরুত, ১৯৯৫)। সেখানে তিনি বলেন, আইন প্রণয়ন একমাত্র আল্লাহর অধিকার। এটি মওদূদীর ধারণার সঙ্গতিপূর্ণ হলেও, তিনি তাকে সরাসরি উল্লেখ করেননি।
“T. Asad-এর "Islamic discursive tradition" ধারণার জন্য দেখুন, T. Asad, “The Idea of an Anthropology of Islam”, Qui Parle 17, 2 (2009 [মূল: 1986]), পৃ. ২০।
“গ্লোবাল ইন্টেলেকচুয়াল হিস্ট্রি” ও ইউরোপকে প্রাদেশিকীকরণের ধারণার জন্য দেখুন, D. Chakrabarty, Provincializing Europe, Princeton, 2000, S. Subrahmanyam, "Connected Histories", Modern Asian Studies 31, 3 (1997), পৃ. ৭৩৫–৭৬২, S. Moyn and A. Sartori (eds.), Global Intellectual History, New York, 2013। সমালোচনামূলক পর্যালোচনার জন্য দেখুন: S. Subrahmanyam, "Global Intellectual History beyond Hegel and Marx", History and Theory 54.1 (2015), পৃ. ১২৬–১৩৭।
মাইকেল ফ্রিডেনের “decontestation” তত্ত্বের জন্য দেখুন, M. Freeden, Ideologies and Political Theory, Oxford, 1998 idem, Ideology: A Very Short Introduction, Oxford, 2003
মুহাম্মদ কাসিম জামান বলেন, আবুল হাসান আলী নদভী ছিলেন তাঁর প্রজন্মের সবচেয়ে প্রভাবশালী ভারতীয় আলেম। দেখুন, Zaman, The Ulama in Contemporary Islam, Princeton, 2002, পৃ. ৫৩, ১৬০–১৭০
J. Hartung, Viele Wege und ein Ziel: Leben und Wirken von Sayyid Abu Hasan Ali al-Hasani Nadwi, Würzburg, 2004 . Euben ও Zaman ইসলামপন্থী চিন্তাবিদ হিসেবে নদভীকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যদিও তারা ওসামা বিন লাদেনকেও একই শ্রেণিতে রেখেছেন যার সঙ্গে লেখক একমত নন। R. L. Euben and M. Q. Zaman (eds.), Princeton Readings in Islamist Thought, Princeton, 2009, পৃ. ১০৭–১১১
ভিন্ন একটি প্রেক্ষাপটে, আইনজ্ঞ মার্টিন লফলিন ও স্টিফেন টিয়ার্নি উল্লেখ করেছেন যে আধুনিক যুগে "সার্বভৌমত্ব" ধারণাটি "অন্তর্নিহিতভাবে রাজনৈতিক এবং আইনগত"। দেখুন: মার্টিন লফলিন ও স্টিফেন টিয়ার্নি, “The Shibboleth of Sovereignty,” The Modern Law Review ৮১, সংখ্যা ৬ (২০১৮), পৃ. ৯৮৯।
অ্যান্ড্রু মার্চ মন্তব্য করেন যে "আইন প্রণয়নের চূড়ান্ত অধিকারই প্রাচীন রোমান সংবিধান থেকে শুরু করে হবস, ক্যান্ট ও অস্টিন পর্যন্ত সার্বভৌম ক্ষমতার মূল প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।" দেখুন: অ্যান্ড্রু মার্চ, The Caliphate of Man: Popular Sovereignty in Modern Islamic Thought (কেমব্রিজ, এমএ, ২০১০), পৃ. ২৪৩, টীকা ২।
জাঁ বোদাঁর দৃষ্টিতে, “আইন প্রণয়নের ক্ষমতাই ছিল সার্বভৌম মর্যাদার মুখ্য লক্ষণ (le point principal de la majesté souveraine)।” দেখুন: জাঁ বোদাঁ, Six Books of the Commonwealth, সম্পাদনা: এম. জে. টুলি (অক্সফোর্ড, ১৯৫৫), পৃ. ৩২। ডিটার গ্রিম বলেন: “সার্বভৌম শাসকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো সে প্রজাদের জন্য আইন প্রণয়ন করে, পুরনো আইন বাতিল করে এবং অপ্রচলিত আইন সংশোধন করে।” দেখুন: ডিটার গ্রিম, Sovereignty: The Origin and Future of a Political and Legal Concept, অনুবাদ: বি. কুপার (নিউ ইয়র্ক, ২০১৫), পৃ. ২০।
তবে এ কথাও স্বীকার করতে হয় যে, যেসব আদর্শ উলেমাগণ প্রস্তাব করেছেন তা সব সময় বাস্তবায়িত হয়েছে—এমনটা বলা যাবে না। তবে এই কথা সব রাজনৈতিক ব্যবস্থার আদর্শের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
দেখুন: মুহাম্মদ কাসিম জামান, Islam in Pakistan, পৃ. ১৩৬; idem, “The Sovereignty of God,” পৃ. ১৫৯।
দেখুন: মুহাম্মদ কাসিম জামান, Islam in Pakistan, পৃ. ১১৯; idem, “The Sovereignty of God,” পৃ. ১৯৪।
আমি ভালি রেজা নাসর, মুহাম্মদ কাসিম জামান ও হুমাইরা ইকতিদারের মতামতসমূহ পরবর্তীতে আলোচনা করবো। এ বিষয়ে অনুরূপ ধারণা দিয়েছেন, উইলিয়াম শেফার্ড, জন ক্যালভার্ট, শিরাজ মাহের, স্তেফান লাক্রোয়া।
দেখুন: উইলিয়াম শেফার্ড, “Sayyid Qutb’s Doctrine of Jahiliyya”; জন ক্যালভার্ট, Sayyid Qutb and the Origins of Radical Islamism; শিরাজ মাহের, Salafi-Jihadism: The History of an Idea (নিউ ইয়র্ক, ২০১৬); স্তেফান লাক্রোয়া, “Hakimiyya”।
দেখুন: মুহাম্মদ কাসিম জামান, Islam in Pakistan, পৃ. ১৩৪; জামান, “The Sovereignty of God,” পৃ. ১৯৩।
নাসর একইভাবে নাদভিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন তিনি মওদূদীর চিন্তাকে “প্রচলিত রীতিনীতির সঙ্গে এক মৌলিক ছেদ” হিসেবে দেখতেন। আমি নিচে নাদভির লেখাগুলো বিশ্লেষণের সময় এই দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করবো। দেখুন: নাসর, Mawdudi, পৃ. ৫৯। আমি জামানকেও একইরকম ইঙ্গিত দিতে দেখি, যদিও তিনি নাসরের মতো সরাসরি এই বক্তব্য দেন না।
দেখুন: নাসর, Mawdudi, passim। “আইডিওলজি” এবং তার অনুগত শব্দগুলো মওদূদী এবং তার সমসাময়িকরা ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করেছেন। মওদূদী তাঁর রাজনৈতিক প্রবন্ধগুলোর অনেকগুলো লেখেন বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, যখন “আইডিওলজি” শব্দটি রাজনৈতিক আলোচনা ও বিতর্কে এক সম্মানজনক অবস্থান রাখত। এজন্যই মওদূদী “ইসলামি আদর্শ” বা “ইসলামি আইডিওলজি” বলতে গর্ব অনুভব করতেন। তবে বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে ও একবিংশ শতাব্দীতে এসে "ideology" শব্দটি পশ্চিমা জনপরিসরে নেতিবাচক অর্থ ধারণ করতে শুরু করে। এই প্রেক্ষিতে মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল বেল ১৩৮০/১৯৬০-এর দশকে The End of Ideology গ্রন্থে যুক্তি দেন যে, পূর্ববর্তী শতাব্দীর মহৎ আদর্শগুলো আর কার্যকর নয়। এই ধারা ধরে পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় “ideology” শব্দটি প্রায়ই সংকীর্ণ, একরোখা মতবাদ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এই অর্থগত পরিবর্তন মাথায় রেখে মওদূদীর লেখা পড়া প্রয়োজন। তাঁর "ideology" শব্দ ব্যবহারের যথার্থতা বোঝার জন্য শব্দটি “বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি (worldview)” কিংবা সমাজতাত্ত্বিক অর্থে “imaginary” হিসেবে ভাবা যেতে পারে। অথবা, মাইকেল ফ্রিডেনের যুক্তির মতো,"ideology" শব্দটি নেতিবাচক না হয়ে বরং বিশ্লেষণাত্মক অর্থেও ব্যবহার করা যেতে পারে। দেখুন: মাইকেল ফ্রিডেন, Ideology।
দেখুন: হুমায়রা ইকতিদার, “Theorizing Popular Sovereignty in the Colony: Abul Ala Maududi’s ‘Theodemocracy’,” The Review of Politics ৫২, সংখ্যা ৪ (২০২০), পৃ. ৬০৩, ৬০৬, ৬১৭।
মওদূদী সম্ভবত প্রাক-আধুনিক অনুপ্রেরণার ভিত্তিতে বিশ্বাস করতেন যে রাষ্ট্রের কাজ শুধুমাত্র সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা নয়, বরং তা ধর্মীয় শিক্ষার প্রচার ও নৈতিক চরিত্র গঠনের মাধ্যমেও ধার্মিক প্রজন্ম গড়ে তোলা। দেখুন: মার্চ, Caliphate of Man, পৃ. ২১০। এই দৃষ্টিভঙ্গি বহু প্রাক-আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে, বিশেষত শাসকের দায়িত্ব সংক্রান্ত আলোচনায়। এই ধারার সবচেয়ে প্রভাবশালী রচনার একটি হলো: আল-মাওয়ার্দী, আল-আহকাম আল-সুলতানিয়া, সম্পাদনা: আহমাদ জাদ (কায়রো, ২০০৬), পৃ. ৪০। অনুবাদ: The Ordinances of Government (রিডিং, ১৯৯৬), পৃ. ১৬। এটি ইকতিদারের সেই মতের বিপরীতে অবস্থান নেয়, যেখানে তিনি মনে করেন—রাষ্ট্রকে সামাজিক প্রকৌশলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চিন্তাভাবনা মওদূদীর একটি আধুনিক উদ্ভাবন। অথচ প্রাক-আধুনিক রচনাগুলো এই ধারণাকে সমর্থন করে। তবে মওদূদী যে রাষ্ট্রকে অনেক বড় পরিসরে সামাজিক প্রকৌশলে ব্যবহার করতে চেয়েছেন, সেটি অবশ্যই আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষমতার ফসল। যা ইকতিদার নিজেও স্বীকার করেছেন।
দেখুন: হুমায়রা ইকতিদার, Theorizing Popular Sovereignty, পাসিম। তিনি উল্লেখ করেন যে, মওদূদীর বিশ্বাস ছিল—একটি ইসলামি রাষ্ট্র সামগ্রিক কর্তৃত্ববাদী বা ফ্যাসিবাদী প্রবণতা থেকে অনেকটাই নিরাপদ থাকবে, কারণ তার সার্বভৌমত্বের দাবিকে ইসলাম নিজেই সীমিত করে দেয়।
একই গ্রন্থ, পৃ. ৬০৫।
একই গ্রন্থ, পৃ. ৬০৭; উদ্ধৃত: আবুল আ’লা মওদূদী, Islam ka Nazariyya Siyasi (বেরেলী, তারিখহীন), পৃ. ১৯৬। আরবি অনুবাদ দেখুন: আবুল আ’লা আল-মওদূদী, Nazariyyat al-Islam al-Siyasiyya (কায়রো, ১৯৫১), পৃ. ৪৯-৫১। উক্ত আয়াতের অনুবাদ: “আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করে, তাদের তিনি পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন (لَيَسْتَخْلِفَنَّهُم فِي الْأَرْضِ) যেমনটি তিনি তাদের পূর্ববর্তীদেরকে দিয়েছেন; তিনি তাদের সেই দ্বীনকে শক্তিশালী করবেন যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন; তিনি তাদের ভয়ের পরিবর্তে নিরাপত্তা প্রদান করবেন। তারা শুধু আমারই ইবাদত করবে, এবং কিছুই আমার সাথে শরিক করবে না। এরপর যারা কুফর করবে, তারা হবে ফাসিক।” (উৎস: এম. এ. আবদেল হালিম, The Qur'an: A New Translation, অক্সফোর্ড, ২০১০)
আল-তাবারী, তাফসির, খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ৪৩৬।
আবু আল-সু’উদ, পূর্বোক্ত রচনায়, সংশ্লিষ্ট স্থান (অনুবাদে পুনরাবৃত্তি)।
মুফতী শাফি, মা’আরিফুল কুরআন, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪৫১।
একই, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪৫৩।
ইকতিদার, Theorizing Popular Sovereignty, পৃষ্ঠা ৬৪৬।
দেখুন: জামান, Islam in Pakistan, পৃষ্ঠা ১৩৬; জামান, "The Sovereignty of God", পৃষ্ঠা ১৮৯-১৯০।
এই বিষয়ে দেখুন: মার্চ, Caliphate, পৃষ্ঠা ১৮-২২; ডেভিড হাল্লাক, The Impossible State: Islam, Politics, and Modernity’s Moral Predicament (নিউ ইয়র্ক, ২০১৩), বিশেষ করে পৃষ্ঠা ৩৭-৭৩।
March, Caliphate, পৃষ্ঠা (উল্লিখিত অংশ)।
P. Crone, Medieval Islamic Political Thought (Edinburgh, ২০০৪), পৃ. ৩৪৬।
N. Feldman, The Fall and Rise of the Islamic State (Princeton, ২০০৮), পৃ. ৫৪৯।
“K. A. El Fadl, ‘The Centrality of Shari‘ah to Government and Constitutionalism in Islam,’ in Constitutionalism in Islamic Countries: Between Uphold and Continuity (eds. R. Grote ও T. Roder; New York, ২০১২), পৃ. ৪৯। March, Caliphate বইয়ে পৃষ্ঠা ১৯-এ উদ্ধৃত। আমি March ও Abou El Fadl-এর অনুবাদ সামান্য পরিবর্তন করেছি।”
“M. Cook, Ancient Religions, Modern Practices: The Islamic Court in Comparative Perspective (Princeton, ২০১৪), বিশেষ করে পৃ. ২৭০–২৮২।
“Ibn Kathir, Tafsir al-Qur’an al-‘Azim (Riyadh, ১৯৯৯), খণ্ড ২:১৩১ (সূরা ৫:৫০-এর মন্তব্য)। Cook, Ancient Religions বইয়ে পৃ. ২৭৩-এ উদ্ধৃত। উল্লেখ্য, Cook-এর মতোই Zaman তার মধ্যযুগীয় সার্বভৌমত্বের ধারণার আলোচনা করতে Ibn Kathir ও al-Tabari উভয়কেই উল্লেখ করেন, তবে Zaman Cook-এর বিবেচ্য অংশগুলো ছাড়াও অন্যান্য ছোট অংশকেও বিবেচনা করেন। দেখুন Zaman, Law in Pakistan, পৃ. ১৩; Zaman, ‘The Sovereignty of God,’ পৃ. ১৯০–উপর।”
“Al‑Tabari, Ṭālib, ৮:৪৬৬‑৮; Cook‑এর ‘Early Medieval Christian and Muslim Attitudes to Pagan Law’, in Islam and Its Past: Jahiliyya, Late Antiquity, and the Qur'ān (সম্পাদক: C. Bakhon ও M. Cook; Oxford, ২০১৭)।”
“Cook, ‘Early Medieval Christian’ (উল্লেখিত স্থানে; পাশাপাশি পৃষ্ঠাগুলো ২৪০–২৪১)।”
“Y. Friedmann, Sharya Ahmad Shint: An Outline of His Thought and a Study of His Image in the Lives of Post‑Jerity (Montreal, ১৯৭১), পৃ. ৩৩–৩৪। Cook-এর Ancient Religions–এ পৃ. ২৫৮–এ উদ্ধৃত।
৫৯. Cook, Ancient Religions, পৃ. ২৭৪।
Cook, Ancient Religions, পৃ. ২৭৪–২৭৬ এবং লাইন ১৪০।
R. Peters, Islam and Colonialism: The Doctrine of Jihad in Modern History (New York, ১৯৭৯), পৃ. ৮১১। এই উদ্ধৃতটি Cook-এর Ancient Religions–এ অন্তর্নিহিত।
এই মতামতের সারসংক্ষেপের জন্য দেখুন: Grimm, Sverigety। প্রচলিত ইতিহাসের জটিলতা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা দেখতে পারেন: J. C. Lopez প্রমুখ, “Forum: In the Beginning There Was No Word (for it): Terms, Concepts, and Early Sovereignty”, International Studies Review ২০, সংখ্যা ৩ (২০১৮), পৃ. ৪৮৯–৫১৯।
সার্বভৌমত্ব নিয়ে গবেষণায় যে সব সমস্যা রয়েছে—বিশেষত ইউরোকেন্দ্রিকতা—তা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাম্প্রতিক আলোচনা পাওয়া যাবে আয়শে জারাকালের (Ayşe Zarakol) প্রবন্ধে, যা উপরের Lopez et al.-এর “Forum” সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত।
চক্রবর্তী, Provincializing Europe, পৃষ্ঠা ৪৫। (বইটি উপনিবেশবাদ-পরবর্তী বিশ্বে ইউরোপীয় ধারণার প্রাধান্য ও তার বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।)
তরজমা করেছেন কামারুজ জামান।