সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ নাকি সন্ত্রাসবাদী যুদ্ধ | ইরফান আহমাদ
ইসরায়েলের মতো যেসব রাষ্ট্র আজকাল নিজেদেরকে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে নিয়োজিত রাষ্ট্র দাবি করে, সেসব রাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাই সন্ত্রাসবাদের কোলে জন্ম নিয়েছে।
(লেখাটি আল-জাজিরায় প্রকাশিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ (war on terror) নিয়ে ইরফান আহমাদ দুই-পর্বের প্রবন্ধের প্রথম পর্বের বাংলা তরজমা।)
(বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে দুই পর্বের এই প্রবন্ধে ইরফান আহমাদ সন্ত্রাসের প্রচলিত ধারণার ভ্রান্তি এবং এর পেছনের রাজনীতি তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, সন্ত্রাসবাদকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোর সহিংস কর্মকাণ্ড হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা ধারণাগতভাবে ভুল। ঐতিহাসিকভাবে কীভাবে ক্ষমতাসীন শ্রেণি ও রাষ্ট্রগুলো সন্ত্রাসকে ব্যবহার করেছে তা তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন উদাহরণের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্র এবং অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কোনো সুস্পষ্ট বিভাজন করা প্রায় অসম্ভব এবং এই ধারণাটি খুবই ঠুনকো।)
পশ্চিমা বিশ্বের নেতৃত্বে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের (War On Terror) বারোতম1 বছরে আমরা এসে পৌঁছেছি। সন্ত্রাসবাদ আসলে কী—এ প্রশ্ন করাটা এই সময় প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে যত বেশি পড়ি এবং দেখি, আমাদের কাছে এটি ততই অস্পষ্ট হয়ে উঠে। গণমাধ্যমে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে যে আলোচনা ও উপস্থাপনা হয়, তা প্রায়শই সন্ত্রাসবাদ এবং এর পেছনের রাজনীতিকে আরও জটিল করে তোলে। এই নিবন্ধে সন্ত্রাসবাদ এবং সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ নিয়ে প্রচলিত ধারণার সমালোচনা করা হয়েছে এবং একটি যৌক্তিক বিতর্কের স্বার্থে কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে। এই আলোচনায় আমি মোট তিনটি যুক্তি তুলে ধরব।
প্রথমত, সন্ত্রাসবাদ বলতে সাধারণত বোঝানো হয় অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোর ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটানোর উদ্দেশ্যে চালানো সহিংস কর্মকাণ্ডকে। প্রায় সর্বজনীন এই ধারণা শুধু বিভ্রান্তিকর এবং ঐতিহাসিকভাবে অগ্রহণযোগ্যই নয়, বরং এটি নৈতিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ এই সংজ্ঞা প্রায়শই রাষ্ট্রীয় সহিংসতা/সন্ত্রাসকে বৈধতা দিতে এস্তেমাল করা হয়—যা (অ-রাষ্ট্রীয়) সন্ত্রাসীদের দ্বারা সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের তুলনায় অনেক বেশি মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী।
দ্বিতীয়ত, আমাদের উচিত সন্ত্রাস-দমনকারীদের (counter-terrorists) সন্ত্রাস নিয়ে লেখালেখি শুরু করা। আমার দাবি হলো, সন্ত্রাসবিরোধী বা দমনকারীরাও সন্ত্রাস চর্চা করে। প্রকৃতপক্ষে তাদের সন্ত্রাস আরও ভয়ঙ্কর; কারণ এর রয়েছে তথাকথিত বৈধতা, বিশাল অবকাঠামো, ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্র এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিস্তৃত প্রভাব। এই প্রেক্ষিতে আমি “নতুন সন্ত্রাসবাদ” (new terrorism) নামক পরিভাষার “প্রতীকি সন্ত্রাস” (symbolic terror) নিয়ে আলোচনা করবো। আধুনিক সন্ত্রাসবাদকে বিশেষভাবে ধর্মীয় এবং প্রধানত ইসলামী (প্রায়শই পরোক্ষভাবে) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে তথাকথিত নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং সন্ত্রাসবাদী পণ্ডিতরা ইসলামের বিরুদ্ধে প্রতীকি সন্ত্রাস কায়েম করে।
তৃতীয়ত, সন্ত্রাসবাদ বিকারগ্রস্ত ব্যক্তিত্ব কিংবা তথাকথিত সহিংস ধর্ম ইসলাম থেকে উদ্ভূত বলে যে প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে, তা আমি নাকচ করছি। (একুশ শতকের সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক আলোচনা শেষ পর্যন্ত ইসলামের দিকেই ঘুরে যায়।) বরং আমার যুক্তি হচ্ছে, সন্ত্রাসীরা যে সহিংসতার আশ্রয় নেয়, তা মূলত আমাদের জাতীয় এবং বৈশ্বিক রাজনীতির সন্ত্রাসপূর্ণ বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে। সন্ত্রাসবাদের প্রতিষেধক হিসেবে সন্ত্রাস-দমন বিশেষজ্ঞরা (counter-terrorism pundits) যে “জাতীয় নিরাপত্তা” আরও জোরদার করা বা “জাতীয় স্বার্থের” অযৌক্তিক প্রসার ঘটানোর কথা বলেন, তা মোটেও কার্যকর সমাধান নয়। বরং এর প্রতিষেধক হলো মানবিক এমন এক পৃথিবী গড়ে তোলা, যেখানে মানুষের কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এখানে আমি “সন্ত্রাস-দমন” (counter-terrorism) শব্দটির ব্যবহার স্পষ্ট করতে চাই। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে এটি বোঝায় “এমন কিছু কার্যকলাপ, কৌশল ও কর্মপদ্ধতি, যা সরকার, সেনাবাহিনী, পুলিশ বিভাগ ও কর্পোরেশনগুলো সন্ত্রাসী হুমকি বা কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করে।” এই তালিকায় আমি সন্ত্রাস দমন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক গবেষক এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদেরও যোগ করতে চাই।
সন্ত্রাসবাদকে সংজ্ঞায়িত করার (অ)সম্ভাব্যতা
সন্ত্রাসবাদের কোনো সর্বজনীন সর্বসম্মত সংজ্ঞা নেই। ১৯৮৪ সালে অ্যালেক্স স্মিড (সন্ত্রাসবাদের) ১০০টিরও বেশি সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করেছিলেন। তবে ২০ বছর পর ২০০৫ সালে তিনি বলেন যে, সন্ত্রাসবাদের জন্য একটি “যথাযথ” সংজ্ঞা খুঁজে পাওয়ার প্রয়াস এখনো চলছে। একাডেমিক এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের দেওয়া সংজ্ঞা তো আছেই, একই রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগ কর্তৃক দেওয়া সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞাগুলোর মধ্যেও পার্থক্য, অস্পষ্টতা, এমনকি টানাপোড়েন দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর (Department of State), প্রতিরক্ষা দফতর (Department of Defense) এবং এফবিআই-এর সংজ্ঞাগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে।
“সন্ত্রাস শব্দটি দ্বারা বোঝানো হয়—বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে উপজাতীয় গোষ্ঠী (subnational groups) বা গোপন এজেন্টদের দ্বারা সংঘটিত পরিকল্পিত, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সহিংসতা। সাধারণত এটি কোনো গোষ্ঠীকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়।” – Patterns of Global Terrorism 2003, পৃ. xii, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর।
“সরকার ও বেসামরিক জনগণকে ভয় দেখানো বা কোনো কাজে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে মানুষ বা বিষয়-সম্পত্তির বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে সশস্ত্র শক্তি এবং সহিংসতা ব্যবহার করা … যা রাজনৈতিক বা সামাজিক লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়।” – Terrorism 2002-2005, পৃ. iv, এফবিআই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ।
“সরকার বা সমাজ লোকজনকে ভয় দেখানো বা কোনো কাজে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে বেআইনিভাবে সহিংসতা সৃষ্টি করা কিংবা সহিংসতার হুমকির দেওয়া। সন্ত্রাসবাদ সাধারণত ধর্মীয়, রাজনৈতিক বা অন্যান্য আদর্শিক বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত এবং সাধারণত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য ঘটানো হয়।” – Department of Defence Dictionary of Military and Associated Terms, (২০১২ সালে সংশোধিত), পৃ. ৩১৭।
যদিও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য সহিংসতার বিষয়টি প্রায় সবগুলো সংজ্ঞাতেই উল্লেখ করা হয়েছে, তবে অন্যান্য বিষয়গুলোর ব্যাপারে সংজ্ঞাগুলো পরস্পর ভিন্ন। প্রথম সংজ্ঞায় সন্ত্রাসীদের উল্লেখ করা হয়েছে “উপজাতীয় গোষ্ঠী বা গোপন এজেন্ট” হিসেবে, কিন্তু দ্বিতীয় এবং তৃতীয় সংজ্ঞায় তারা কারা– উপজাতি, গোপন কোনো গোষ্ঠী নাকি অন্যান্য কোনো দল– তা নির্দিষ্ট করা হয়নি। প্রথম সংজ্ঞা অনুসারে সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যবস্তু বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ; কিন্তু দ্বিতীয় সংজ্ঞা অনুযায়ী বিষয়-সম্পত্তিও সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যবস্ত হতে পারে। প্রথম সংজ্ঞায় সন্ত্রাসীদের আরেকটি লক্ষ্য “কোনো গোষ্ঠীকে প্রভাবিত করা”, অন্যদিকে দ্বিতীয় সংজ্ঞায় এটি রাজনৈতিক বা সামাজিক লক্ষ্য অর্জন। দ্বিতীয় সংজ্ঞার মতোই তৃতীয় সংজ্ঞায় সন্ত্রাসীদের উদ্দেশ্যের উপর গুরুত্ব দিয়ে বলা হচ্ছে যে, তারা কীভাবে ভীতি সঞ্চারের মাধ্যমে সরকার, বেসামরিক জনগণ এবং সমাজকে নির্দিষ্ট কোনো কাজে বাধ্য করার চেষ্টা করে।
স্পষ্টতই, এই সংজ্ঞাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ শব্দ যেমন “আদর্শিক বিশ্বাস”, “ধর্মীয়”, “উপজাতীয়”, “সহিংসতা”, এমনকি “সমাজ”—এসব শব্দকে সুবিধামতো ব্যবহার করে যেকোনো কিছুকেই সন্ত্রাসবাদ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা কিংবা বাদ দেওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের “সন্ত্রাস প্রতিরোধ আইন, ২০০২” অনুযায়ী, সন্ত্রাসবাদ মানে এমন যেকোনো কাজ, যার উদ্দেশ্য “ভারতের ঐক্য, অখণ্ডতা, নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলা বা জনগণের মধ্যে ভয় তৈরি করা।” (এখানে উল্লেখযোগ্য যে) মূলধারার সংজ্ঞাগুলোতে “রাজনৈতিক” শব্দটি মূলত ব্যবহৃত হয় সন্ত্রাসবাদকে এমনসব অপরাধ থেকে আলাদা করতে, যা একজন “অস্বাভাবিক” ব্যক্তি ব্যক্তিগত কারণে ঘটিয়ে থাকে। কিন্তু “রাজনৈতিক” শব্দটি এভাবে সংজ্ঞায়িত করাও সমস্যাজনক। কেননা রাজনীতির অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে সবকিছুই রাজনৈতিক, অথবা নারীবাদীরা যে মন্ত্র আওড়ায়—“ব্যক্তিগত মানেই রাজনৈতিক” (the personal is political)।
তবে এই তিনটি সংজ্ঞাতেই একটি গভীর মিল আছে— রাষ্ট্র বা সরকার কখনোই সন্ত্রাসবাদের ক্রীড়নক নয়। এটি সন্ত্রাসবাদের পুরোনো সংজ্ঞাগুলো থেকে বড় ধরনের বিচ্যুতি। ১৯৭৮ সালে সিআইএ কর্মকর্তা ও গবেষক এডওয়ার্ড মিকোলাস সন্ত্রাসবাদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকেও অন্তর্ভুক্ত করেছিল। তার মতে, “রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বলতে এমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে বোঝায়, যা কোনো জাতীয় সরকার নিজের দেশের ভেতরে পরিচালনা করে।” উদাহরণ হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নকে উল্লেখ করা হয়েছিল। রিগান প্রশাসন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদকে সমর্থনের অভিযোগ করেছিল। ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক সালমান রুশদির মতো বুদ্ধিজীবিরা পাকিস্তানকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছিল। কোনো রাষ্ট্র কেন নিজের কর্মকাণ্ডকে সন্ত্রাসবাদ বলবে না, সেটা বোঝা সহজ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একাডেমিক এবং নিরাপত্তা/সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞরা কেন তাদের সংজ্ঞা থেকে রাষ্ট্রকে বাদ দেন?
“যার ইতিহাস নেই, কেবল তাকেই (ইচ্ছামতো) সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব”— নিৎশে’র এই পর্যবেক্ষণকে উপেক্ষা করে সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ ব্রুস হফম্যান সরলভাবে বলে দিয়েছেন, সন্ত্রাস “উপজাতীয় বা অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠী দ্বারা সংঘটিত হয়” (ইনসাইড টেররিজম, ২০০৬, পৃ. ৪০)। একইভাবে, জেমস লুটজ এবং ব্রেন্ডা লুটজ লিখেছেন, সন্ত্রাস হলো “সহিংসতা অথবা সহিংসতার হুমকি দেয়া” এবং এটি “অ-রাষ্ট্রীয় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মাধ্যমে সংঘটিত হয়” (গ্লোবাল টেররিজম, ২০০৮, পৃ. ৬)।
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এসব সংজ্ঞায় রাষ্ট্রকে সন্ত্রাসবাদের আওতা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে? অথচ বাস্তবতা হলো, বিশ শতকে যেখানে (অ-রাষ্ট্রীয়) সন্ত্রাসীদের হাতে ৫ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে, সেখানে বিভিন্ন রাষ্ট্র যুদ্ধকালীন সময়ে ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে এবং যুদ্ধের আইনি সীমারেখার বাইরে গিয়ে আরও ১৭ কোটি মানুষকে হত্যা করেছে (David Wright-Neville, Dictionary of Terrorism, ২০১০, পৃ. x)।
এই সংজ্ঞাগুলো কি শুধু ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর দেওয়া সংজ্ঞার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি তাদের চালানো বিশাল সহিংসতাকে বৈধতা দেয়ার একটি পন্থা হতে পারে? এই ধরনের সংজ্ঞা কি ইসরায়েলের সহিংস দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা রাষ্ট্রহীন ফিলিস্তিনিদের মতো অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোকে সহজেই “সন্ত্রাসী” হিসেবে চিহ্নিত করতে সাহায্য করে? একই সাথে এই সংজ্ঞাগুলো কেন এবং কীভাবে তারা এই রাষ্ট্রহীন অবস্থায় নিপতিত হয়েছে, সেই প্রশ্নগুলোকে অবদমনে কি ভূমিকা রাখে?
(আসল কথা হলো) হফম্যান ও লুটজের মতো সংজ্ঞাগুলো বাছাইমূলক (selective); এগুলো সন্ত্রাসবাদের ইতিহাস থেকে “উপযোগী” দিকগুলোকে বেছে নিয়ে বর্তমানকে রূপায়িত করে। কিন্তু আমি দেখাতে চাই যে, সন্ত্রাসবাদের ইতিহাস আসলে শাসক শ্রেণি এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ইতিহাসও বটে। হফম্যান ও লুটজের বক্তব্যের বিপরীতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বলতে আমি শুধুমাত্র কোনো রাষ্ট্র কর্তৃক সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করাই বুঝাচ্ছি না। বরং আমার যুক্তি হচ্ছে, রাষ্ট্র তার সীমানার ভেতরে এবং বাইরেও সন্ত্রাস চালায়; আর এই সন্ত্রাস অধিকাংশ রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্রেই অন্তর্নিহিত। মোটাদাগে আমার বক্তব্য হলো, রাষ্ট্র এবং অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর মধ্যকার তড়িঘড়ি করে টানা এই সরল বিভাজনটি আসলে খুবই দুর্বল। কারণ রাষ্ট্রগুলো (যখন তখন) কার্যকর এবং বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে নিজেদেরকে অ-রাষ্ট্রীয় সত্ত্বা হিসেবে তুলে ধরতে পারে, যেভাবে অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোও (যেকোনো সময়) রাষ্ট্রীয় সত্তায় পরিণত হতে পারে বা হয়ে থাকে। জন পারকিন্স তার ‘কনফেশন অব অ্যান ইকোনমিক হিটম্যান’ বইয়ে দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র এবং অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলো কীভাবে নিবিড়ভাবে একসাথে কাজ করে, অথচ জনসাধারণের সামনে নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখে।
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস: একটি অসম্পাদিত সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
খোদ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা না করে প্রচলিত সংজ্ঞাগুলো সাধারণত সন্ত্রাসবাদের ক্রীড়নকদের ওপর আলোকপাত করে এবং যদি তারা অ-রাষ্ট্রীয় হয়, তাহলে তাদেরকে “সন্ত্রাসী” বলে চিহ্নিত করে। সন্ত্রাসী কাজ ও প্রকৃতির বদলে এর ক্রীড়নকদের উপর এই অতিরিক্ত মনোযোগের বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, হফম্যান অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠী থেকে রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীকে আলাদা করার ব্যাপারে জোর দেয় এবং এর মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকেও বৈধতা দেয়। এর মাধ্যমে মূলত তাদের মধ্যকার সাদৃশ্যকে অস্বীকার করা হয়। কারণ এটি “সন্ত্রাসী এবং তাদের সমর্থকদের পক্ষে সুবিধাজনক হতে পারে; তারা যুক্তি দিতে পারে যে, জনাকীর্ণ কোনো বাজারে ময়লার ঝুড়িতে পুঁতে রাখা একটি ‘লো-টেক’ পাইপ-বোমা এবং ২০,০০০ ফুট উপর থেকে এয়ার ফোর্স বোমারু-বিমানের ফেলা ‘হাই-টেক’ নির্ভুল বোমাবর্ষণ একইরকম উদ্দেশ্যহীন ধ্বংস ডেকে আনে।” (হফম্যান, পৃ. ২৫)। তবে রজার উড্ডিসের ভাষায়, প্রকৃতপক্ষে এদের মধ্যে কি আসলেই কোনো পার্থক্য আছে?
Throwing a bomb is bad/ Dropping a bomb is good;
Terror, no need to add/ Depends on who’s wearing the hood.
“বোমা ছুঁড়ে মারা খারাপ/ (আকাশ থেকে) বোমা ফেলা ভালো;
সন্ত্রাস, বলার অপেক্ষা রাখে না/ নির্ভর করে মুখোশ কার মাথায় ।”
সন্ত্রাসবাদ যুগ যুগ ধরে শাসক শ্রেণির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। বিখ্যাত ভারতীয় শাসক চন্দ্রগুপ্তের উপদেষ্টা চাণক্য (খ্রিস্টপূর্ব ২৮০ সালে জন্ম) শত্রুদেরকে সন্ত্রাসের মাধ্যমে দমন করার জন্য বিভিন্ন গোপন পদ্ধতি প্রস্তাব করেছিল। অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে চাণক্য (কৌটিল্য নামেও পরিচিত) রাষ্ট্রের প্রাকৃতিক চাহিদার বর্ণনা দিয়ে লক্ষ্য অর্জনে পদ্ধতির তুলনায় ফলাফলকে (ends, not means) অধিক গুরুত্ব দেয়। চাণক্যের কাছে (ম্যাক্স ওয়েবারের মতে যে ম্যাকিয়াভেলির সমতুল্য) নৈতিকতা নয়, বরং রাজ্যের টিকে থাকা এবং যুদ্ধজয়ের মাধ্যমে এর সম্প্রসারণই ছিল মূখ্য। চাণক্য গোপন যুদ্ধকেও অনুমোদন করেছিল, কারণ তার মতে, “অস্ত্র, আগুন বা বিষ দিয়ে একটি হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে পুরোপুরি সজ্জিত একটি সেনাবাহিনীর চেয়ে বেশি কিছু অর্জন করা সম্ভব।”
তার গ্রন্থে কেবল শত্রু রাজা ও তাদের কর্মকর্তাদের হত্যার পদ্ধতিগুলোই আলোচনা করা হয়নি, বরং কীভাবে সেখানকার সাধারণ মানুষজনকে আতঙ্কিত করা যায় তাও বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছিল। এই উদ্দেশ্যে তার পরামর্শ ছিল গুপ্তচর, নারী, চক্রান্ত, গুজব, প্রচারণা ইত্যাদি পদ্ধতি ব্যবহার করা। বিজয় নিশ্চিত করার জন্য চাণক্য প্রস্তাব করেছিল যে, “দানব-সাপ এবং মাংস-খেকো বাঘের ছদ্মবেশে থাকা এজেন্টরা সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করবে, যাতে শত্রু রাজা শহরের প্রাচীরের বাইরে প্রার্থনা অনুষ্ঠানের জন্য আসতে বাধ্য হন, যেখানে তাকে ফাঁদে ফেলে হত্যা করতে হবে।” (র্যান্ডাল ল, টেররিজম: আ হিস্ট্রি, ২০০৯, পৃ. ১৩-১৪)।
সিকারী, অ্যাসাসিন এবং ঠগিদের মতো প্রাচীন যুগের আরো অন্যান্য উদাহরণ নিয়ে আলোচনা না করে আমি সরাসরি আধুনিক ফ্রান্সের দিকে মনোযোগ দেব। এসময়ই সন্ত্রাস শব্দটি ইংরেজি ভাষায় প্রবেশ করে। লাতিন থেকে উদ্ভূত এই শব্দের অর্থ শারীরিক কম্পন হলেও, এটি দিয়ে তখন ১৭৮৯-পরবর্তী বিপ্লবী শাসকদের, বিশেষ করে জ্যাকোবিনদের সন্ত্রাসী শাসনামল (the Reign of Terror; la Grande Terreur) বোঝানো হতো। এখানে লক্ষণীয় যে তখন সন্ত্রাস বলতে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকেই বোঝানো হতো, অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর কার্যকলাপকে নয়।
১৭৯৩ সালে ষোড়শ লুইয়ের পতনের পর কনভেনশন নামে একটি নতুন আইনসভা গঠিত হয়, যেখানে রোবেসপিয়ারের মতো জ্যাকোবিনদের প্রাধান্য ছিল। একই বছরে কনভেনশন একটি ডিক্রি পাশ করে ঘোষণা করে, “সন্ত্রাসই বর্তমান সময়ের নীতি” (terror is the order of the day)। তারা সন্দেহভাজন আইন (Law of Suspects) নামক একটি আইনও কার্যকর করে, যার মাধ্যমে “যারা তাদের আচরণ, সম্পর্ক বা মৌখিক অথবা লিখিত কথাবার্তার মাধ্যমে অত্যাচারের পক্ষপাতী… এবং স্বাধীনতার শত্রু হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছে” তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৭৯৩ থেকে ১৭৯৪ সালের মধ্যে ১৭,০০০ মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি, পাঁচ লক্ষ মানুষকে বন্দি করা হয়। সন্ত্রাসী শাসনামলে মোট হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০,০০০।
সন্ত্রাস মানে “একটি স্বেচ্ছাচারী সরকারের সৃষ্ট ত্রাস”— এই ব্যাখ্যাটি পাওয়া যায় জন লরেন্স নামে এক ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীর একটি নোট থেকে। ১৮৫৭ সালের উপনিবেশবিরোধী বিদ্রোহ দমন এবং ভারতীয় সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে বন্দির পর লরেন্স লিখেছিল, জাফরের ছেলেদের তাৎক্ষণিক মৃত্যুদণ্ড “পুরো মুসলিম জনসংখ্যার মধ্যে ত্রাসের সঞ্চার করবে এবং একটি কার্যকরী ভয় সৃষ্টি করবে” (পৃ. ১৪৩)।
বিশ শতকেও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চলমান ছিল। নাৎসি এবং স্তালিন রেজিমের সন্ত্রাসের কথা সর্বজনবিদিত। ঠিক তেমনি হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে (আমেরিকার) পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের ঘটনাও, যাকে কনার গিয়ার্টি “একটি বিশুদ্ধ রাজনৈতিক সন্ত্রাস” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন—“দেখুন আমরা কী করতে পারি! এখন আমাদের কথা শুনুন।” এসব ছাড়াও আরও অনেক ঘটনা আছে। সুহার্তোর সামরিক শাসনামলে দশ লাখ ইন্দোনেশীয়কে হত্যা করা হয় এবং আরও ৮০,০০০ মানুষকে বিচার ছাড়াই কারাগারে পাঠানো হয়।
১৯৭৪ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে পল পটের সরকার প্রায় ১৩ লাখ কম্বোডিয়ানকে হত্যা করে। ১৯৭৩ সালে সিআইএ চিলির গণতান্ত্রিক সরকার আলেন্দেকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর, (যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত) পিনোশের নির্মম শাসনে কয়েক মাসের মধ্যে ১৫,০০০ মানুষ নিহত হয়। আর সান্তিয়াগোর স্টেডিয়ামগুলোকে কারাগারে রূপান্তরিত করা হয়। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সালের মধ্যে আর্জেন্টাইন রাষ্ট্র বিরোধীদের দমন অভিযানের মাধ্যমে ১০,০০০ থেকে ২০,০০০ মানুষকে হত্যা করে।
১৯৭৯ সালে নিকারাগুয়ার বিপ্লবী সানদিনিস্তা দল যখন মার্কিন-সমর্থিত ডেবায়েল শাসনকে উৎখাত করে, তখন যুক্তরাষ্ট্র সানদিনিস্তা সরকারকে ধ্বংস করার জন্য সব ধরনের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা দেয়। তারা সানদিনিস্তার বিরোধী প্রতিবিপ্লবী দল কন্ট্রাদের সমর্থন করে। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৩ সালের মধ্যে সিআইএ অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করে কন্ট্রাদের জন্য আশ্রয়স্থল তৈরি এবং প্রশিক্ষণে সহায়তা করে।
১৯৮৮ সালে মার্কিন কংগ্রেস কন্ট্রাদের জন্য অতিরিক্ত তহবিল চেয়ে প্রেসিডেন্ট রিগানের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করার পর, গোপনে ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রির মাধ্যমে সে তহবিল সংগ্রহ করা হয়—যা ‘ইরান-কন্ট্রা’ কেলেঙ্কারি নামে পরিচিত। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, সানদিনিস্তা দল ১৯৮৪ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে। আর কন্ট্রা যুদ্ধে প্রায় ৩০,০০০ মানুষ নিহত হয়, যার মধ্যে সাধারণ মানুষও ছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট রিগানের কাছে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত কন্ট্রারা ছিল “আমাদের ভাই… স্বাধীনতা যোদ্ধা… নৈতিক দিক থেকে আমাদের জাতির জনকদের (founding fathers) সমান”।
যে প্রচলিত ধারণা সন্ত্রাসবাদকে কেবল অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত করে, তার অসারতা প্রমাণ করতে এ প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে যে, প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত সন্ত্রাসবাদ প্রতিটি রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর রাষ্ট্রগুলো দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় স্তরেই এই সন্ত্রাস এস্তেমাল করেছে। “কোনো রাষ্ট্র অন্য কোনো অঞ্চলে অন্যায়ভাবে দখল চালিয়ে সেখানকার প্রতিরোধকারীদেরকে আক্রমণ ও হত্যা করলেও তা অপরিহার্যভাবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নয়”— জেনা থম্পসনের এই মন্তব্যটি (পৃ. ১৫৬) উপর্যুক্ত দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে ধারণাগত এবং নৈতিক উভয় দিক থেকেই খুবই দুর্বল। তবে রাষ্ট্র এবং অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর মধ্যে যে বিভাজন অযৌক্তিকভাবে টানা হয়, সেটি যতক্ষণ না প্রশ্নবিদ্ধ হবে, ততক্ষণ আমার যুক্তি অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। এই বিভাজন কতটা দূর্বল এবং প্রতারণাপূর্ণ নিচে আমি তা-ই দেখানোর চেষ্টা করব।
ঠুনকো বিভাজন
১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধী সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা এবং বিরোধীদের কারাগারে পাঠানোর মধ্য দিয়ে সরাসরি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস কায়েম করেছিল। ডানপন্থী আরএসএস সমর্থক কাবিতা নারাওয়ানে তার বই গ্রেট বিট্রেয়াল-এ এই শাসনকে “সন্ত্রাসী শাসনামল” বলে আখ্যা দেয় এবং ইন্দিরা গান্ধীকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করে। তার মতে, ইন্দিরা গান্ধী যে সাংবিধানিক ধারা ব্যবহার করে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিল, তা ছিল “স্বৈরাচারী”। নারাওয়ানে আরও উল্লেখ করে যে, ইন্দিরা গান্ধী নতুন গুপ্তচর সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং (RAW) এবং সেন্ট্রাল রিজার্ভ ফোর্স ও বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স-এর মতো “অর্ধসামরিক বাহিনী” গঠন করে। তার মতে, ইন্দিরা গান্ধী এ কাজ করেছিল “সাধারণ মানুষের মনে ত্রাসের সৃষ্টি করতে, যাতে কোনো ব্যক্তি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস না পায়” (পৃষ্ঠা ১১১-১৩)।
নারাওয়ানের বইয়ের ভূমিকায় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ী লেখিকার এই সন্ত্রাসের ধারণাকে সমর্থন করে স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার প্রয়োগ এবং আইন লঙ্ঘনের নিন্দা করেছিল। কিন্তু দুই দশক পরে যখন বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী হয়, তখন তার সরকার ৯/১১ পরবর্তী সময়ে সন্ত্রাস দমন আইন (The Prevention of Terrorism Act) পাস করে। এই আইনটি স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা প্রয়োগের দিক থেকে আগের সব আইনকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। (সেসময় এই আইনের সমর্থনে) বাজপেয়ী এমনকি এটাও বলেছিল—“মুসলমানরা যেখানেই থাকুক, তারা অন্যদের সঙ্গে শান্তিতে থাকতে চায় না” এবং “তারা হুমকি এবং ভয় দেখিয়ে টিকে থাকে।”
এটি স্পষ্ট যে বাজপেয়ী এবং তার দল, যারা ১৯৭০-এর দশকে রাষ্ট্রের বাইরে থাকা শক্তি (non-state actor) ছিল, তৎকালীন শাসনকে “সন্ত্রাসী শাসন” বলে অভিহিত করেছিল। কিন্তু দুই দশক পর যখন তারা ক্ষমতায় আসে, তখন তারা কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন পাস করে। এর মাধ্যমে স্পষ্টতই তারা বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে, তাদের সরকার সন্ত্রাসবাদের চর্চা করে না। আমার বক্তব্য সহজ—১৯৭০-এর দশকের এই অ-রাষ্ট্রীয় শক্তিগুলো ২০০০-এর দশকে রাষ্ট্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছিল; এবং ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে তাদের কাছে সন্ত্রাসবাদের অর্থও পাল্টে গিয়েছিল। স্পষ্টতই সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ এবং রাষ্ট্রীয় গবেষকেরা রাষ্ট্রীয় এবং অ-রাষ্ট্রীয় শক্তির মধ্যে যে সীমারেখা টানেন, তা খুবই ঝাপসা।
১৮৬৬ সালে গঠিত শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসী সংগঠন কু ক্লাক্স ক্লান-এর উদাহরণ বিবেচনা করা যাক। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিল আমেরিকার গৃহযুদ্ধ-ফেরত ছয়জন কনফেডারেট/বিচ্ছিন্নতাবাদী সৈনিক (Confederate veterans); এর প্রধান সদস্যরাও ছিল তা-ই। ১৮৬৭-৬৮ সালে যখন নিরপরাধ কৃষ্ণাঙ্গদের হত্যা করা হচ্ছিল, তখন টেনেসি এবং আরকানসাসের অনেক স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কু ক্লাক্স ক্লানকে সমর্থন করেছিল। (সেসময়) তাদের সন্ত্রাস মোকাবিলায় কোনো সেনা পাঠানো হয়নি।
কিন্তু কু ক্লাক্স ক্লান তাদের অবাধ সহিংসতার জন্য খুব কম ক্ষেত্রেই শাস্তি পেয়েছিল, কারণ “পুলিশ বাহিনীগুলো কু ক্লাক্স ক্লানের সদস্য বা সমর্থক দ্বারা ভরপুর ছিল”। বিশ শতকের শুরুর দিকে চারজন গভর্নর এবং পাঁচজন সিনেটর কু ক্লাক্স ক্লানের সদস্য ছিল (র্যান্ডাল ল, পৃ. ১৩৭-৩৮)। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে “অ-রাষ্ট্রীয় শক্তি” কু ক্লাক্স ক্লান এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় শক্তির মধ্যকার সম্পর্ক এখানেও কতটা ঝাপসা। বিশ শতকের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো উসমানী সাম্রাজ্য। পশ্চিমা শক্তি বিভিন্ন কারণে এই সাম্রাজ্যকে ভেঙে ফেলে, যার মধ্যে একটি লক্ষ্য ছিল ইসরায়েল রাষ্ট্রের উদ্ভব নিশ্চিত করা।
১৯২৩ সালে ব্রিটিশদের সরাসরি শাসনামলে ফিলিস্তিনে ইহুদি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ১৫ শতাংশেরও কম। পরে এটি বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং এর ফলে আরব বিদ্রোহ ঘটে। একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জায়নবাদী সন্ত্রাস তীব্রতর হয়। জেভ জাবটিনস্কি ইরগুন জাভি লিউমি (জাতীয় সামরিক সংগঠন) নামে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন গঠন করে, যা একাধিক সন্ত্রাসী হামলা চালায়। ১৯৩৯ সালে ইরগুন-এর দলছুট গোষ্ঠী হিসেবে লোহামি হেরুত ইসরায়েল বা লেহি (ইসরায়েলের স্বাধীনতা যোদ্ধারা) গঠিত হয়। এই সংগঠন আরও ভয়াবহ সন্ত্রাস কায়েম করে, যার ফলে শত শত মানুষ নিহত হয়।
লেহি-র অন্যতম প্রধান নেতা ইৎজাক শামির বলেছিল—“ইহুদি নীতিশাস্ত্র কিংবা ইহুদি ঐতিহ্য কোনটাই যুদ্ধের মাধ্যম হিসেবে সন্ত্রাসকে খারিজ করে দেয় না।” ১৯৪৩ সালে মেনাচাম বেগিন ইরগুন-এর নতুন কমান্ডার হয় এবং এটিকে সেনাবাহিনীর আদলে পুনর্গঠন করে, যাতে আলাদা আলাদা হামলাকারী দল, প্রচারণা শাখা এবং নিয়োগকারী কর্মকর্তা ছিল। (মজার ব্যাপার হলো,) অঞ্চলটি পর্যবেক্ষণের জন্য নিয়োজিত জাতিসংঘের সংস্থা বেগিনের সঙ্গে দুবার সাক্ষাৎ করেছিল (র্যান্ডাল ল, পৃ. ১৮২, ১৮৫)।
ইরগুন-এর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ না দিয়ে একটি বিষয় উল্লেখ করছি। সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত থাকা বেগিন এবং শামির পরবর্তীতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিল। পূর্বে আলাদাভাবে বিভিন্ন সন্ত্রাসী অভিযান চালানো ইরগুন এবং লেহি ১৯৪৮ সালে একত্রিত হয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (IDF) গঠন করে (র্যান্ডাল ল, পৃ ১৮৮)। এছাড়াও লক্ষণীয় যে, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থায় নেলসন ম্যান্ডেলা সন্ত্রাসী হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট হন (এবং ৯/১১-র পরে যুক্তরাষ্ট্র তার নাম আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের তালিকা থেকে মুছে ফেলে)।
২০০৮ সালে মালেগাঁও শহরের একটি মসজিদের কাছে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া লেফটেন্যান্ট কর্নেল শ্রীকান্ত পুরোহিত ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন কর্মরত গোয়েন্দা অফিসার। অন্যদিকে রুয়ান্ডার মতোই ইন্দোনেশিয়ান সামরিক বাহিনী গোয়েন্দা তথ্য, প্রচারণা এবং হুমকির মাধ্যমে স্থানীয় সম্প্রদায়গুলোকে (অ-রাষ্ট্রীয় পক্ষ) হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করেছিল।
রাষ্ট্র এবং অ-রাষ্ট্রীয় পক্ষের মধ্যে স্পষ্ট কোনো বিভাজন হয়তো আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ হতে পারে, কিন্তু আমার দৃষ্টিতে তা ভয়ানক। আর এই বিভাজন অযৌক্তিক হলে সন্ত্রাসবাদকে শুধুমাত্র অ-রাষ্ট্রীয় পক্ষে সীমাবদ্ধ রাখারও কোনো যৌক্তিক ভিত্তি থাকে না। রাজনৈতিক সহিংসতা ও ভীতি ছড়ানো যদি নৈতিকভাবে নিন্দনীয়, অন্যায় ও হুমকিস্বরূপ হয়, তবে এর ক্রীড়নকরা ইউনিফর্ম পরিহিত (রাষ্ট্র) নাকি ইউনিফর্মবিহীন (অ-রাষ্ট্রীয়)—এতে কী আসে যায় ?
(মূলত) অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি-র সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞাটিই যথার্থ—
(সন্ত্রাসবাদ হলো) “রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য অনানুষ্ঠানিক বা অননুমোদিত সহিংসতা এবং ভীতিপ্রদর্শনের ব্যবহার; (মূলত) জনগণের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য সরকারের বা শাসক গোষ্ঠীর দ্বারা এ ধরনের পদ্ধতি ব্যবহৃত হয় (প্রায়শই আধাসামরিক বা অনানুষ্ঠানিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে); (বর্তমানে সাধারণত) লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য কোনো গোপন বা প্রবাসী সংগঠনের দ্বারা এ ধরনের পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়।”
1 লেখাটি ২০১২ সালে প্রকাশিত।
মূল লেখা : https://www.aljazeera.com/opinions/2012/9/11/how-the-war-on-terror-is-a-war-of-terror/
তরজমা করেছেন হাসান আবদুল্লাহ।