আধুনিক বিশ্ব এবং ঐতিহ্যবাহী মানুষ | জুলিয়াস ইভোলা
(এটি জুলিয়াস ইভোলার Ride The Tiger: Survival Manual For The Aristocrats of The Soul কিতাবের প্রথম অধ্যায়ের অনুবাদ।)
এই বইটি বর্তমান যুগকে একটি অবক্ষয়/ভাঙনের যুগ (age of dissolution) হিসেবে চিহ্নিত করার কিছু পদ্ধতি পাঠে আগ্রহী। একইসঙ্গে এটি বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি নির্দিষ্ট মানব রূপের (α particular human type) জন্য যথাযথ আচরণ ও অস্তিত্বের ধরণ কী হতে পারে সে প্রশ্ন নিয়েও আলোচনা করতে চায়।
কিন্তু শুরুতেই একটি সীমাবদ্ধতাকে মাথায় রাখতে হবে। এখানে যা আমি বলতে যাচ্ছি, তা আমাদের সময়ের কোন সাধারণ মানুষের সাথে সম্পর্কিত নয়। বরং আমি এখানে সেই মানুষটির কথা বলছি, যে আজকের পৃথিবীর সঙ্গে জড়িত, এমনকি এর সবচেয়ে জটিল ও সংকটময় অবস্থাতেও; কিন্তু সে অন্তর থেকে এই পৃথিবীর অংশ নয় এবং সে নিজেকে এর কাছে সঁপেও দেয় না। সে নিজেকে সত্তাগতভাবেই অধিকাংশ সমকালীনদের চেয়ে আলাদা ভিন্ন এক জাতির সদস্য মনে করে।
এমন একজন মানুষের স্বাভাবিক স্থান, যেখানে সে অপরিচিত বোধ করবে না—তা হলো ঐতিহ্য বা তুরাসের জগৎ (world of Tradition)। আমি “ঐতিহ্য” শব্দটি একটি বিশেষ অর্থে ব্যবহার করছি, যা আমি অন্য জায়গায় সংজ্ঞায়িত করেছি। এটি প্রচলিত অর্থ থেকে আলাদা, তবে রেনে গ্যেনোঁ তার The Crisis of the Modern World গ্রন্থে যে অর্থ দিয়েছেন তার কাছাকাছি। এই বিশেষ অর্থে একটি সভ্যতা বা সমাজকে তখনই “ঐতিহ্যবাহী” বলা হয়, যখন এটি এমন নীতিমালার দ্বারা পরিচালিত হয়, যা নিছক মানবীয় ও ব্যক্তিগত সীমানার উর্ধ্বে এবং যখন এর সমস্ত পরিসরগুলো উপর থেকে গঠিত ও শৃঙ্খলিত এবং কোন উচ্চতর লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত। ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকের মাঝেও সত্তাগতভাবে অপরিবর্তনীয় ও অভিন্ন একটি ঐতিহ্যের জগৎ (world of Tradition) বিদ্যমান। আমি অন্যত্র ঐতিহ্যের মূল্যবোধ ও প্রধান বর্গগুলোকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছি— যে মূল্যবোধগুলো নিজেকে উচ্চতর অর্থে স্বাভাবিক এবং বাস্তবিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে দাবি করতে পারে এমন কোনো সভ্যতা, সমাজ বা অস্তিত্বের বিন্যাসের মূলভিত্তি।
আধুনিক বিশ্বে যা কিছু প্রাধান্য লাভ করেছে, তা যে কোনো ঐতিহ্যবাহী সভ্যতার সম্পূর্ণ বিপরীত (anti-thesis)। তদোপুরি, বর্তমান পরিস্থিতি এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করেছে যেখানে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে বর্তমান অবস্থার প্রকৃত ও অর্থবহ পরিবর্তন ঘটানো প্রায় অসম্ভব, এমনকি যদি তা ঐতিহ্যের মূল্যবোধকে ধারণ করার মাধ্যমেও হয় (যদি ধরেও নিই যে সেগুলোকে এখনও চিহ্নিত ও ধারণ করা সম্ভব)। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অস্থিরতা-উত্তর সময়ে কোন জাতি কিংবা ব্যক্তিবর্গের জন্য কোথাও থেকে শুরু করার মতো কোনো ভিত্তি (strating point) নেই। আধুনিক প্রতিষ্ঠান, সমাজের সার্বিক অবস্থা, কিংবা এই যুগের প্রভাবশালী চিন্তা, স্বার্থ ও উদ্যমের মধ্যে এমন কিছুই নেই যা পুনর্জাগরণের ভিত্তি হতে পারে।
তবুও এমন কিছু মানুষ এখনো আছে, যারা ভাঙন ও অবক্ষয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন এবং যারা কমবেশি সচেতনভাবে সেই উর্ধ্ব-জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। একটি ক্ষুদ্র দল এখনো সংগ্রাম চালিয়ে যেতে ইচ্ছুক, যদিও তাদেরকে অনেকাংশেই পরাজিত বলে মনে হয়। যতক্ষণ তারা আত্মসমর্পণ না করে, কিংবা এমন কোনো প্রলোভনের কাছে নতিস্বীকার না করে, যা তাদের সফলতাকে নস্যাৎ করে দিতে পারে, ততক্ষণ তাদের এই প্রত্যয় গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে কিছু মানুষ নিজেদেরকে বর্তমান অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে আগ্রহী। কিন্তু জন্য প্রয়োজন প্রচুর প্রাণশক্তি এবং বিশেষ সুবিধাজনক বস্তুগত পরিস্থিতি—যা দিন দিন আরও দুর্লভ হয়ে উঠছে। তবুও এটি সম্ভাব্য বিকল্প একটি সমাধান। আমাদের মনে রাখতে রাখতে হবে যে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে অল্প কয়েকজন এখনো আছেন, যারা তাৎক্ষণিক লক্ষ্যে পৌঁছানোর তাড়নাকে ছাপিয়ে “ঐতিহ্যবাহী” মূল্যবোধকে ধারণ করতে পারেন এবং “প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ” গ্রহণ করতে পারেন। এটি বর্তমান বাস্তবতাকে প্রতিরোধ করতে খুবই কার্যকরী—যেখানে শুধু বস্তুগত নয় বরং চিন্তাগত সকল জগৎকেও বাঁধা দেয়া হয় এবং ভিন্ন কোনো উপায়কে দমিয়ে রাখা হয়। সেসকল ব্যক্তিদের পক্ষেই এই দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হয় এবং জীবনের অন্যান্য অর্থ ও সম্ভাব্য মাত্রা চিহ্নিত করা জন্য সম্ভবপর হয়, যারা শুধুমাত্র বর্তমান পারিপার্শ্বিক বাস্তবতায় আটকে না থেকে নিজেদের মুক্ত করতে সক্ষম হন।
কিন্তু যারা বস্তুগত বিচ্ছিন্নতাকে গ্রহণ করে নেয়ার মতো সৌভাগ্যবান নয়, তাদের জন্য এটি কোন বাস্তব ও ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান বয়ে আনে না। বিশেষ করে যারা বর্তমান জীবনের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায় না বা পারে না এবং যাদেরকে প্রতিনিয়ত নিজেদের জীবনকে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে মানবীয় সম্পর্ক ও যাপিত জীবনের মতো সাধারণ বিষয়গুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
এই বইটি ঠিক সে ধরনের মানুষের জন্যই লেখা হয়েছে। তাদের জন্য এক মহান পূর্বসূরীর উক্তিটি প্রযোজ্য: “মরুভূমি এগিয়ে আসছে। দুর্ভাগ্য তার, যার অন্তরে মরুভূমি বাসা বেঁধেছে!” এমন মানুষকে সত্যিই বাইরের কেউ সাহায্য করতে পারবে না। ঐতিহ্যবাহী সমাজ-সভ্যতায় যে সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পুরোপুরি বিকশিত হতে, নিজেদের অস্তিত্বকে পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীনভাবে সুশৃঙ্খল করতে এবং নিজেদের স্বীকৃত মূল্যবোধগুলোকে সৃজনশীলভাবে প্রয়োগ করতে সাহায্য করত, তা আর নেই। তাই তাদের জন্য এমন কোনো পদক্ষেপের পরামর্শ দেওয়া অর্থহীন, যা স্বাভাবিক ঐতিহ্যবাহী সভ্যতার জন্য উপযুক্ত এবং মানদণ্ড হিসেবে কাজ করত, কিন্তু এখন আর কার্যকর নয়। কারণ তারা এখন এক অস্বাভাবিক পরিবেশে বসবাস করছে যেখানে সামাজিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং বস্তুগত স্তরে ভাঙন বা অবক্ষয়ের আবহ বিরাজ করছে; একটি এমন ব্যবস্থায় আটকে আছে যা প্রায় নিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলার (restrained disorder) দ্বারা পরিচালিত এবং যার ঊর্ধ্বতন কোনো বৈধতার স্বীকৃতি নেই। এখান থেকেই শুরু হয় সেই নির্দিষ্ট সমস্যাগুলো, যা আমি এই বইয়ে আলোচনা করতে চাই।
শুরুতেই “অবশিষ্টাংশগুলো” (survivals) নিয়ে গ্রহণযোগ্য দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে তা স্পষ্ট করা জরুরি। আজও, বিশেষ করে পশ্চিম ইউরোপে, পুরনো জগতের (অর্থাৎ বুর্জোয়া জগতের) অভ্যাস, প্রতিষ্ঠান ও রীতিনীতি অনেকাংশে টিকে আছে। বস্তুত আজকাল যখন সংকটের কথা বলা হয়, তখন যা বোঝানো হয় তা মূলত বুর্জোয়া জগতের সংকট। বুর্জোয়া সভ্যতা ও সমাজের ভিতগুলোই এই সংকটে ভুগছে এবং অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে। তবে এটি সেই জগৎ নয়, যাকে আমি “ঐতিহ্যের জগৎ” নামে অভিহিত করছি। সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে যা ধসে পড়ছে তা হলো তৃতীয় শ্রেণির (Third Estate) বিপ্লব ও প্রথম শিল্পবিপ্লবের পর গড়ে ওঠা ব্যবস্থা, যদিও প্রায়শই এর মধ্যে আদি প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলা একটি প্রাচীনতর ব্যবস্থার কিছু অবশিষ্টাংশও বিদ্যমান ছিল।
এমন এক দুনিয়ার সঙ্গে আমার আলোচ্য মানব রূপের (human type) সম্পর্ক কী হতে পারে? এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ওপর নির্ভর করে আজকের দিনে ক্রমবর্ধমানভাবে দৃশ্যমান সংকট ও অবক্ষয় সম্পর্কিত ঘটনাগুলোর অর্থ কী দাঁড়াবে এবং এসবের মুখোমুখি হওয়ার ক্ষেত্রে কী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা হবে এবং যেগুলো এখনো পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি, সেগুলোর প্রতি মনোভাব কী হবে।
এই প্রশ্নের উত্তর কেবল নেতিবাচক হতে পারে। যে মানব রূপের কথা আমি বলছি, বুর্জোয়া জগতের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তাকে অবশ্যই বুর্জোয়া পৃথিবীর সবকিছুকে সাম্প্রতিক এবং ঐতিহ্যবিরোধী হিসেবে গণ্য করতে হবে— যা এমন প্রক্রিয়া থেকে উদ্ভূত যা নিজেরাই নেতিবাচক এবং বিধ্বংসী। অনেক ক্ষেত্রেই বর্তমান সংকটময় ঘটনাগুলোতে এক ধরনের প্রতিশোধ বা প্রতিঘাতমূলক প্রভাব (nemesis or rebound effect) লক্ষ্য করা যায়। যদিও এখানে এসব বিশদভাবে আলোচনা করা সম্ভব নয়, তবু ঠিক সেই শক্তিগুলো—যা একসময় পূর্ববর্তী ঐতিহ্যবাহী ইউরোপীয় সভ্যতার বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়েছিল—এখন তাদেরই বিরুদ্ধে ফিরে এসেছে যারা সেগুলোকে ডেকে এনেছিল। সেই শক্তিগুলোই এখন তাদেরকে দুর্বল করে ফেলছে এবং সাধারণ অবক্ষয়ের প্রক্রিয়াকে আরও গভীরতর করেছে।
উদাহরণস্বরূপ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে কৃষক-মহাজন বা তৃতীয় শ্রেণির (Third Estate) বুর্জোয়া বিপ্লব এবং পরবর্তী সমাজতান্ত্রিক ও মার্কসবাদী আন্দোলনের মধ্যকার সম্পর্কের ভেতর দিয়েই এটি খুব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়; যেখানে একদিকে ছিল গণতন্ত্র ও উদারনৈতিকতা (liberalism), আর অন্যদিকে সমাজতন্ত্র। প্রথম বিপ্লব যেখানে সমাজতন্ত্রের পথকে সুগম করেছিল, সেখানে সমাজতন্ত্রীরা বিপ্লবে বুর্জোয়াদের ভূমিকা শেষ হয়ে যাওয়ার পর তাদেরকে নির্মূল করাই নিজেদের মূল মাকসাদ বানিয়ে নিয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে একটি সমাধান সরাসরি বর্জন করা আবশ্যক: তাদের সমাধান যারা বুর্জোয়া জগতের অবশিষ্টাংশগুলোর উপর নির্ভর করতে চায় এবং সেগুলোকে চরম অবক্ষয় ও বিধ্বংসী স্রোতের বিরুদ্ধে একটি দুর্গ হিসাবে ব্যবহার করতে চায়। এমনকি তারা সেই অবশিষ্টাংশকে আরও উচ্চতর ও ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ দিয়ে পুনরুজ্জীবিত বা শক্তিশালী করার চেষ্টাও করে।
প্রথমত, দুটি বিশ্বযুদ্ধ এবং তাদের প্রভাব-পরবর্তী দুনিয়ায় প্রতিনিয়ত স্পষ্ট হয়ে ওঠা সাধারণ পরিস্থিতি বিবেচনা করলে এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা মানে নিজের সাথে প্রতারণা করা। কারণ এতে বস্তুগত সম্ভাবনার অস্তিত্ব নিয়ে ভুল ধারণা তৈরি হয়। যে পরিবর্তনগুলো ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে, তা এতই গভীর যে সেগুলোকে পূর্বাবস্থায় ফেরানো আর সম্ভব নয়। যেসব শক্তি মুক্তি পেয়েছে বা মুক্ত হওয়ার পথে রয়েছে, সেগুলোকে পুরনো বিশ্বের কাঠামোর মধ্যে পুনরায় আবদ্ধ করা সম্ভব নয়। বর্তমানে পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রচেষ্টা শুধুমাত্র পুরনো কাঠামোর উপর নির্ভর করেছে, যেগুলোর উচ্চতর বৈধতা নেই। এই নির্ভরতা বিপ্লবী বা বিরোধী শক্তিগুলোকে আরও শক্তিশালী এবং আক্রমণাত্মক করে তুলেছে। দ্বিতীয়ত, এমন একটি পথ গ্রহণ করা বিচ্যুতির দিকে ঠেলে দিতে পারে যা আদর্শগতভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং কৌশলগতভাবে বিপজ্জনক। যেভাবে আগেই উল্লেখ করেছি, যে ঐতিহ্যগত মূল্যবোধের কথা আমি বলছি, সেগুলো বুর্জোয়া মূল্যবোধ নয়, বরং সেগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীত।
তাই, ঐ অবশিষ্টাংশগুলোর কোনো মূল্যকে স্বীকার করা, সেগুলোকে কোনভাবে ঐতিহ্যগত মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করা এবং পূর্বেই বর্ণিত উদ্দেশ্যে ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ দিয়ে সেগুলোকে বৈধতা দেওয়া মূলত দুটি সম্ভাব্য ভুল বোঝার পরিচায়ক। হয় এটি ঐতিহ্যগত মূল্যবোধের প্রকৃত ধারণাকে পুরোপুরি উপলব্ধি করতে না পারার লক্ষণ, নতুবা এটি ঐতিহ্যগত মূল্যবোধকে অবনমন করে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ বিচ্যুতির দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। আমি একে “ঝুঁকিপূর্ণ” বলছি, কারণ যতবার ঐতিহ্যবাহী ধারণাগুলোকে বুর্জোয়া সভ্যতার অবশিষ্ট কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা হবে, ততবার সেগুলো এমন আক্রমণের শিকার হতে পারে, যা বর্তমান সময়ে সেই সভ্যতার বিরুদ্ধে কিছু ক্ষেত্রে অপরিহার্য, যুক্তিসঙ্গত এবং প্রয়োজনীয়।
অতএব, আমাদের উচিত বিপরীত সমাধানকে গ্রহণ করা, যদিও তা আরও কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে এবং আমাদেরকে অন্যরকম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে। আজ বা কাল ধ্বংস হয়ে যাওয়াই যার নিয়তি, তার সঙ্গে সকল প্রকার সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করাই ভালো। এরপর আমাদেরকে যে সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে তা হলো, কোনো পূর্বপ্রদত্ত বা পরম্পরায় চলে আসা কাঠামোর উপর নির্ভর না করেই—যার মধ্যে ঐতিহ্যগত কাঠামোও অন্তর্ভুক্ত, যা এখন অতীত ইতিহাসের অংশ— নিজের মৌলিক দিকনির্দেশনা বজায় রাখা। এই ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা কেবল একটি মৌলিক স্তরে বজায় রাখা সম্ভব, যা সর্বাধিক বাহ্যিক মুক্তি (external liberty) নিশ্চিত করার পাশাপাশি সত্তার একটি অভ্যন্তরীণ নির্দেশিকা হিসাবে (an inner orientation οf being) কাজ করবে। যেটা আমরা শীঘ্রই আলোচনা করবো যে ঐতিহ্যের যে সমর্থন এখনও পাওয়া যেতে পারে, তা কোনো প্রতিষ্ঠিত/ইতিবাচক কাঠামো বা পূর্বেকার ঐতিহ্যের আলোকে গঠিত সভ্যতার স্বীকৃত কাঠামো থেকে আসে না। বরং এটি একটি তত্ত্ব থেকে আসে, যা তার নীতিগুলোকে উচ্চতর, বিমূর্ত অবস্থায় ধারণ করে, যা নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক রূপায়নের আগে থেকেই বিদ্যমান। এই অবস্থা অতীতে জনগণের জন্য প্রাসঙ্গিক ছিল না; বরং এটি একটি গোপনীয় তত্ত্ব (esoteric doctrine) হিসেবে বিবেচিত হতো।
যেহেতু প্রকৃত ও সাধারণ অর্থে একটি স্বাভাবিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নেই এবং আধুনিক সমাজ, সংস্কৃতি ও রীতিনীতির আবহাওয়ায় নিজের পুরো জীবনকে একটি সুসংগঠিত (organic) ও একীভূত আকারে গড়ে তোলাও অসম্ভব, তাই দেখতে হবে অভ্যন্তরীণভাবে প্রভাবিত না হয়েও কীভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতার পরিস্থিতিগুলোকে গ্রহণ করা যায়? বর্তমান পর্যায়ে, যা শেষ বিচারে একটি পরিবর্তনকালীন পর্যায়, কোন বিষয়গুলো বেছে নেওয়া যেতে পারে— যা অন্যদের থেকে আলাদা, যা মুক্ত ও অভিযোজনযোগ্য জীবনধারা হিসেবে গ্রহণযোগ্য এবং একসাথে বাহ্যিকভাবে সেকেলে নয়? কারো পক্ষে অভ্যন্তরীণভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও স্বতন্ত্র চেতনার দ্বারা পরিচালিত হয়েও সমকালীন চিন্তা ও জীবনধারার সবচেয়ে অগ্রসর দিকগুলোর মুখোমুখি হওয়া কি সম্ভব?
“প্রতিরক্ষার বদলে আক্রমণে যাও”—এই উপদেশটি ঐ বিশেষ মানুষের দল গ্রহণ করতে পারে, যারা ঐতিহ্যের শেষ সন্তান। অর্থাৎ এটি একটি সম্ভাব্য কৌশল এবং সহায়ক হতে পারে, যাতে চূড়ান্ত সংকট বিরোধীদের কাজ না হয়, যাদের উদ্যোগ তখন সহ্য করতে হবে। তবে এই ধরনের কর্মপন্থার ঝুঁকি অত্যন্ত স্পষ্ট: শেষ কথা কে বলবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু বর্তমান যুগে এমন কিছু নেই যা ঝুঁকিমুক্ত। এটি সম্ভবত তাদের জন্য একটি সুবিধা, যারা এখনও দৃঢ়ভাবে টিকে আছে।
“প্রতিরক্ষা নয়, আক্রমণে যাও”— এই উপদেশটি ঐ ব্যতিক্রম মানুষের দল গ্রহণ করতে পারে, যারা আলোচ্য ঐতিহ্যের শেষ সন্তান। এর মানে হচ্ছে, পুরনো বিশ্বের যেসব অবশিষ্টাংশগুলো ইতিমধ্যেই টলমল করছে সেগুলোকে সাহায্য করা বা কৃত্রিমভাবে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করার চেয়ে তাদের পতনে অবদান রাখাই সম্ভবত ভালো। এটি একটি সম্ভাব্য কৌশল, যা চূড়ান্ত সঙ্কটকে প্রতিপক্ষের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া থেকে আটকাতে পারে, যা অন্যথায় আরো সমস্যার কারণ হতে পারে। তবে এরকম একটি পথ অনুসরণের ঝুঁকি স্পষ্ট— এখানে শেষ কর্তৃত্ব কার হাতে থাকবে, তা কেউ বলতে পারে না। তবে বর্তমান যুগে এমন কিছু নেই যা ঝুঁকিমুক্ত। ফলে এটি সম্ভবত তাদের জন্য একমাত্র সুযোগ যারা এখনও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রাপ্ত মৌলিক ধারণাগুলোর সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ:
আজকাল অনেক মানুষ যেসব সংকট ও অবক্ষয় নিয়ে দুঃখবোধ করে, সেগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝা উচিত। এই ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়াগুলোর আসল লক্ষ্য হল বুর্জোয়া সভ্যতা ও সমাজ। তবে ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধের সঙ্গে তুলনা করলে, এগুলো ছিল এমন এক পৃথিবীকে প্রত্যাখ্যানের প্রথম পদক্ষেপ, যা তাদের চেয়ে পুরনো এবং শ্রেষ্ঠ ছিল। সুতরাং, আধুনিক বিশ্বের সংকটকে হেগেলের ভাষায় একটি “অস্বীকৃতির অস্বীকৃতি” (negation of a negation) হিসেবে চিহ্নিত করা পারে—যা নিজের অবস্থান থেকে একটি ইতিবাচক ঘটনার প্রতিই ইশারা করে। এই দ্বৈত অস্বীকৃতি একটি শূন্যতার (nothingness) দিকে ঠেলে দিতে পারে—এমন একটি শূন্যতা যা বিশৃঙ্খলা, বিক্ষোভ, বিদ্রোহ এবং প্রতিবাদে বিভিন্ন আকারে দেখা যায় এবং যা বর্তমান প্রজন্মের অনেক প্রবণতাতে চোখে পড়ে। অথবা এমন শূন্যতায়, যা বস্তুবাদী সভ্যতার সংগঠিত ব্যবস্থার পেছনে লুকিয়ে আছে। অন্যদিক থেকে এটি এখানকার আলোচ্য মানুষদের জন্য এটি একটি নতুন, মুক্ত স্থান তৈরি করে দিতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত ভবিষ্যতের গঠনমূলক কার্যক্রমের ভিত্তি হতে পারে।
(তরজমা করেছেন হাসান আব্দুল্লাহ।)