হিন্দুত্ববাদ : ঘরে - বাইরে | আব্দুর রহমান বারি
বন্দে মাতরম্।
সুজলাং সুফলাং
মলয়জশীতলাম্
শস্যশ্যামলাং
মাতরম্ !
শুভ্র-জ্যোত্স্না-পুলকিত-যামিনীম্
ফুল্লকুসুমিত-দ্রুমদলশোভিনীম্
সুহাসিনীং সুমধুরভাষিণীম্
সুখদাং বরদাং মাতরম্।।
সপ্তকোটীকন্ঠ-কল-কল-নিনাদকরালে
দ্বিসপ্তকোটীভুজৈধৃতখরকরবালে
অবলা কেন মা এত বলে !
বহুবলধারিণীং
নমামি তরিণীং
রিপুদলবারিণীং
মাতরম্।
তুমি বিদ্যা তুমি ধর্ম্ম
তুমি হৃদি তুমি মর্ম্ম
ত্বং হি প্রাণাঃ শরীরে।
বাহুতে তুমি মা শক্তি
হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি
তোমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে।
ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী
কমলা কমল-দলবিহারিণী
বাণী বিদ্যাদায়িণী
নমামি ত্বাং
নমামি কমলাম্
অমলাং অতুলাম্
সুজলাং সুফলাং
মাতরম্
বন্দে মাতরম্
শ্যামলাং সরলাং
সুস্মিতাং ভূষিতাম্
ধরণীং ভরণীম্
মাতরম্।
— বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বন্দেমাতরম্
এক
এই নিবন্ধের শিরোনামে 'ঘরে-বাইরে' অংশটুকু নেওয়া হয়েছে স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস থেকে। অবিভক্ত বাংলা 'ভাগের' সাপেক্ষেই স্বদেশী আন্দোলনের সূত্রপাত। বাংলাদেশ নামক যে স্বাধীন রাষ্ট্র আজ যে ভূমির পাটাতনে দাঁড়িয়ে, তা বাংলা 'ভাগের' ফলে প্রস্তাবিত পূর্ববাংলার ঐতিহাসিক বিবর্তন। ফলে দেখা যাচ্ছে পূর্ববাংলার সঙ্গে বাংলা ভাগ, স্বদেশী আন্দোলন ও 'ঘরে-বাইরে' উপন্যাসের যোগাযোগ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক।
এই ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের নানা মাত্রা আছে। দশক থেকে দশকে তার চিহ্নব্যবস্থার অদল-বদল আছে। কিন্তু সংকট (Crisis) এখনো বহাল। এই চিহ্নসমূহ হলো রোগের লক্ষণ। রোগ শনাক্ত করে নিদান করতে হয়। রোগ শনাক্ত করতে নাকামিয়াব হলে নিদান অপেক্ষায় প্রশমণেই ছদ্ম সুস্থতা হয় বটে, তবে তাতে রোগ নাই হয়ে যায় না।
এই নিবন্ধের শানে নুযূল হচ্ছে হিন্দুত্ববাদ নামক যে মতাদর্শিক-রাজনৈতিক প্রকল্প তাকে পর্যালোচনা (Critique) করা। হিন্দুত্ববাদ কীভাবে আমাদের ঘর (Bangladesh) ও বাইরে (Global, specially South Asia) - মতাদর্শিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-বুদ্ধিবৃত্তিক ও নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত, তা চিহ্নিত করাই এখানে লক্ষ্য।
হিন্দুত্ববাদ নিয়ে আলোচনায় 'ইন্ডিয়া' নামক রাষ্ট্রকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। বিজেপির শাসন প্রতিষ্ঠার সাপেক্ষে নয় শুধু, যে ঐতিহাসিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ইন্ডিয়া রাষ্ট্র হিসেবে আজ দন্ডায়মান - তার ব্যবচ্ছেদ করলে দেখা যায় হিন্দুত্ববাদের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক। বিজেপি হলো 'ইন্ডিয়া তাহাই ভারত' রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী রূপের প্রকাশক চিহ্ন (Revealing Signifier)।
লিবারেল-লেফট অক্ষের প্রেম ও প্রতারণা থেকে সাবধানের নিমিত্তে বলা দরকার, হিন্দুত্ববাদ নিয়ে আলোচনার মাকাসিদ কোনো লিবারেল-লেফট অক্ষের দেশমাতার বেদীতে 'ঠেকাও মাথা' নীতিতে গমন নয়। অর্থাৎ বিজেপির স্থলে কংগ্রেসী কথিত সেক্যুলার-প্লুরালিস্ট ইথোস খরিদ করতে আজকে চাটগাঁর বাজারে আসিনি।
আমরা বুঝতে চেষ্টা করব 'ইন্ডিয়া তাহাই ভারত' রাষ্ট্রকে। ইন্ডিয়া হলো আধুনিক রাষ্ট্র। অপরদিকে ভারত হলো আর্যাবর্তের চিহ্ন। ইন্ডিয়ার সংবিধানে ইন্ডিয়ার পরিচয় দিতে গিয়ে উভয়ের স্থান দেখা যায়।
হিন্দুত্ববাদ মনোলিথিক নয়। বাংলার হিন্দুত্ববাদ ও মহারাষ্ট্রের হিন্দুত্ববাদের গড়ন-গঠনে ভেদ আছে। আমাদের আলোচনায় হিন্দুত্ববাদের দুজন তাত্ত্বিককে বুঝতে চেষ্টা করব। একজন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, যার চিন্তার বিস্তার দেখা যায় উনিশ শতকে। অপরজন বিশ শতকের হিন্দুত্ববাদের প্রধান তাত্ত্বিক বিনায়ক দামোদর সাভারকার। এছাড়া রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের (RSS) শতবর্ষকে কেন্দ্র করে হিন্দুত্ববাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক বিকাশের খতিয়ান নেওয়ার চেষ্টা করব।
বর্তমান বহুমুখী দুনিয়ায় (Multipolar World) উগ্র জাত্যাভিমানী রাজনীতির সঙ্গে হিন্দুত্ববাদের সম্পর্ক তলিয়ে দেখাও জরুরি। হিন্দুত্ববাদের একদিকে লিবারেল গ্লোবালিজমের সঙ্গে আঁতাত, অপরদিকে জাত্যাভিমানী সভ্যতার গুণগানে গ্লোবাল উগ্র ডানপন্থার সঙ্গে পরকীয়া কেলেঙ্কারির তদন্ত খানিকটা রসভাবের সঞ্চার করবে। ৯/১১ উত্তর দুনিয়ায় দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের মোড়ল হওয়া ও নিরাপত্তা কারখানা (Security Apparatus), গ্লোবাল ওয়ার অন টেররের আঞ্চলিক রূপান্তর ও তার সঙ্গে বাংলাদেশের রিশতা বিচারেও মনোযোগী হওয়া দরকার।
উপরিউক্ত বিচার-বিশ্লেষণ শেষে আমাদের তথা বাংলাদেশের 'রাজনৈতিক' (Political) সুরুত কেমন হতে পারে, তার নানামাত্রিক স্বরূপ সন্ধান করব। অগ্রীম 'কী করিতে হইবে' (What is to be done) অথবা 'কী করিতে হইবে না' (What is not to be done) - এড়িয়ে আমাদের প্রধান কেন্দ্রীয় দিক হলো সংকট (Crisis) চিহ্নিত করা ও তদনুযায়ী এজতেহাদ ও আমল (Praxis) করা।
দুই
বিদ্যায়তন ও বিদ্যায়তনের বাইরে হিন্দুত্ববাদ নিয়ে আলোচনায় দুই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। প্রথম ধারায় হিন্দুত্ববাদের জাত্যাভিমানী রাজনীতির উদয়বিন্দু শনাক্ত করা হয় ১৯২০ সন ও বিনায়ক দামোদর সাভারকারের চিন্তা-তৎপরতাকে কেন্দ্র করে। ১৯২২, মতান্তরে ১৯২৩ নাগাদ সাভারকার আন্দামান থেকে লিখেন হিন্দুত্ববাদের তাত্ত্বিক বুনিয়াদ - 'Essentials of Hindutva' পুস্তিকা। এই ধারায় উনিশ শতকের জাতীয়তাবাদী চিন্তা ও তৎপরতার সঙ্গে হিন্দুত্ববাদের ফারাক করা হয়। উক্ত ধারার গবেষকদের মধ্যে ওয়াল্টার কে এন্ডারসন, শ্রীধর ডেমলী, ব্রুস গ্রাহাম, থমাস ব্লুম হানসেন, ক্রিস্টোফে জেফরিলট অন্যতম।
অপর ধারার দাবি, ধর্মীয় রাজনীতি উনিশ শতকের আধুনিক জাতীয়তাবাদী ডিস্কোর্সের উপজাত হিসেবেই হাজির ছিল। ঔপনিবেশিক আধুনিকতার হাত ধরে এটি বিকশিত সুরুত পায় বিংশ শতাব্দীর শুরুর দশকেই। এই ধারার অন্যতম গবেষক হলেন পার্থ চ্যাটার্জি, বিনয় লাল, আশিষ নন্দী, আন্ড্রু সার্টোরি, তপন রায় চৌধুরী সহ আরও অনেকে। আমরা প্রথম ধারার চিন্তার প্রতিপক্ষ হিসেবে দ্বিতীয় ধারাকে না দেখে, বরং চিন্তার ঐতিহ্য ও পরিপূরক হিসেবে দেখতে আগ্রহী।
পার্থ চ্যাটার্জি তার 'রামমোহন' প্রবন্ধে দেখান, উনিশ শতকের শুরুর দিকে লিবারেল আধুনিকতা, পরে তা হয়ে যায় জাতীয়তাবাদী বা কলোনিয়াল আধুনিকতা। আন্ড্রু সার্টোরি দেখান বিশ্ব-ইতিহাস ও পুঁজির মধ্যে কীভাবে বাংলায় লিবারেলবাদ ও হিন্দু জাতীয়তা তৈরি হচ্ছে। পার্থ চ্যাটার্জির পাঠ-পদ্ধতি জেনিওলজিক্যাল। অপরদিকে সার্টোরির পাঠ-পদ্ধতি হেগেলীয় মার্ক্সীয়ান ইউনিভার্সেলিজম।
উনিশ শতকে বাংলায় ইউটিলিটারিয়ান ফিলোসোফির বিমূর্ত ভোক্তা থেকে বিমূর্ত সাবজেক্ট হওয়ার ইউরোপীয় রূপান্তর দেখা যায় রামমোহন থেকে শুরু করে মাইকেল হয়ে লিবারেল সম্প্রদায়ের মধ্যে। এই ধারায় প্রথমে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অবধি সামিল ছিলেন। কিন্তু ইউরোপীয় দুনিয়ায় লিবারেল চিন্তার যে সমালোচনা-সংকট কোলরিজ, আর্নল্ডরা ইংল্যান্ডে করছিল, তাতে বঙ্কিমচন্দ্র শরিক ছিলেন। ফলে পুঁজিকেন্দ্রিক বস্তুবাদী চিন্তার আইডিয়ালিস্ট সমালোচনা করে হেগেলীয় হিন্দুত্বের নির্মাণ দেখা যায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাতে।
প্রথম জীবনে লেখা 'সাম্য' প্রবন্ধ বঙ্কিমচন্দ্র পরে ছাপাতে চাননি। 'ধর্মতত্ত্বে' বঙ্কিমচন্দ্র লিবারেল ব্যক্তিসুখকেন্দ্রিক লিবারেল সার্বিকতা প্রত্যাখ্যান করেন। সার্টোরি দাবি করেন, এতে বঙ্কিমচন্দ্র লিবারেল ইউনিভার্সেলিজমকে পূর্ণ নাকচ করেননি। তবে উপরি সমালোচনা করে জাতির কালেক্টিব চেতনা ও দায়বোধকে এথিক বলে চিহ্নিত করেন।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার অনুশীলন তত্ত্ব - যেখানে নিষ্কাম কর্মজীবন হলো নয়া হিন্দু তাত্ত্বিক কাঠামো, যা গীতার তফসীর হিসেবে চিন্তাউদ্দীপক। আহমদ ছফা তার 'শতবর্ষের ফেরারি'তে বঙ্কিমচন্দ্রের পরিচয়ের বহুত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়ার সময় তার রাষ্ট্রচিন্তক পরিচয়কে প্রধান বলেছেন। হিন্দুজাতির রাষ্ট্রকল্পের বুনিয়াদি কাঠামো তিনি দান করছিলেন।
বঙ্কিমচন্দ্র তার উপন্যাসে যে মতাদর্শিক-রাজনৈতিক ও ইতিহাস-নির্মাণ প্রকল্প তৈরি করেন, তার বহুবিধ ব্যবহার পরের শতকের শুরুতেই দেখা যায় - বিশেষত স্বদেশী আন্দোলনকে সামনে রেখে। স্বদেশী আন্দোলনের সময় দেশীয় পণ্য নিয়ে যে প্রস্তাব, তা অর্থনীতির প্রটেকশন থিওরি নয়। এটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে যে এথিক্যাল হিন্দুত্ব তৈরি, তার এথিক্যাল পলিটিক্যাল ইকোনমি।
স্বদেশী আন্দোলনের মূলসুরে দেখা যায় উপনিবেশ-বিরোধী জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম। উনিশ শতকের ব্রিটিশ রাণীর প্রতি ভক্তি স্বদেশী যুগে এসে রূপান্তর হয় দেশমাতা রক্ষার আবেগে। এটিই পরে হিন্দুত্ববাদী চিন্তার কাঠামো সুদৃঢ় করে। হিন্দু=বাঙালি=ভারতীয় - এই সমসত্ত্ব পরিচয় নির্মাণ হয় উনিশ শতকেই। পার্থ চ্যাটার্জি দেখান, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ বলতে যা বাজারে আছে তা উনিশ শতকের হিন্দু জাতীয়তার অংশ।
সম্প্রতি সিএএ-এনআরসি বিরোধী বিপ্লবী ছাত্রনেতা শারজিল ইমাম দেখান, কীভাবে ভারতীয় সাম্যভিত্তিক সেক্যুলার ইথোসের সাংবিধানিক মূলেই রয়েছে হিন্দুত্বের প্রাণভোমরা। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, বাংলাদেশের একাত্তরের এপ্রিল ঘোষণাপত্রে সাম্য মূলনীতি হিসেবে প্রবেশ করে ভারতীয় ব্যারিস্টার সুব্রত রায় চৌধুরীর হাত ধরেই। এই এপ্রিল ঘোষণার ভিত্তিতেই বাংলাদেশের ৭২ এর কামালবাদী সংবিধান - যা ৭৫ এর বাকশালের মতাদর্শিক-রাজনৈতিক-আইনি ভিত্তি দেয়।
উনিশ শতকের বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্বাধীনতা নিয়ে চিন্তাকে অনেক গবেষক গুরুত্ব দিয়ে হিন্দুত্ব থেকে আলাদা করেন। কিন্তু এখানেও স্ববিরোধ দেখা যায়। সুদীপ্ত কবিরাজ দেখান বঙ্কিমচন্দ্র কীভাবে তার উপন্যাস 'রাজসিংহ' নিয়ে শেষে দুঃখ করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র বলেন, ইউরোপীয় সকলে উইলিয়াম অব অরেঞ্জের কীর্তিকে প্রশংসা করে, অথচ ভারতবর্ষের কেউ রাজসিংহের নাম শোনেনি - রাজসিংহ যে মুঘল সম্রাট আওরঙজেবের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল তার কীর্তি কবুল না করায় বঙ্কিমবাবুর এই দুঃখ।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ইউরোপীয় ইতিহাসচর্চার সাপেক্ষে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। ইউরোপীয় জাতি, জাতীয়তাবাদ, জাতিরাষ্ট্র নিয়ে তার চিন্তার সংকট এখানে দেখা যায়। এমনকি ইংরেজ ঐতিহাসিক জেমস মিলের উপর নির্ভরতায় তিনি বলে বসলেন বাঙালির ইতিহাস নেই। এই 'ইতিহাস না থাকা'র সঙ্গে পৌরুষের সংকট জড়িত - পরে তার সাপেক্ষেই আসবে 'বাঙালির বাহুবল' প্রবন্ধের বিচার। মহাভারতের শ্রীকৃষ্ণকে ন্যায় ও ধর্মরাজ্য স্থাপনের সারথি করেন বঙ্কিমচন্দ্র। আহমদ ছফা দেখিয়েছেন কীভাবে শ্রীকৃষ্ণকে আইডিয়াল করে তিনি হিন্দু রাজ্যকল্প তৈরি করেন।
তিন
'Hindutva is not a word but a History.'
- Savarkar, Essentials of Hindutva (1923)
'The Event of 30 January 1948 was Wholly and exclusively Political.'
'He (Gandhi) has failed in his paternal duty.'
- Nathuram Godse, Why I Assassinated Gandhi
বিনায়ক দামোদর সাভারকারের হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রীয় বাহক হলো ইতিহাস। হিন্দুত্ববাদের কাছে ইতিহাস অন্যসব কিছুর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সাভারকার তার প্রথম জীবনে ১৮৫৭ এর সেপাই মহাবিদ্রোহ নিয়ে লিখেন 'The Indian War of Independence'। হিন্দু-মুসলিমের জাতীয় সংগ্রামকে তিনি তখন গ্রহণ করেন। অনেক ইতিহাসবিদ সাভারকারের এই দশাকে বলেন র্যাডিক্যাল জাতীয়তাবাদী, কিন্তু এটি হিন্দুত্ববাদ নয় - সাভারকার তখন 'ভালো ছিলো, পরে খারাপ হয়ে গেছে' এই সুর।
তনিকা সরকার এই প্রসঙ্গে এক মূল্যবান নোক্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, সাভারকার যখন গোঁড়া সেপাইদের ইংরেজ নারী-শিশুদের হত্যার বর্ণনা দিচ্ছিলেন, তখন সেখানে তার চিন্তায় সহিংসতা যে কেন্দ্রীয় বিষয় তা ফুটে ওঠে। তনিকার সূত্রধরে আমরা হিন্দুত্ববাদের সঙ্গে সহিংসতার সম্পর্ক বিচার করব। আমরা দেখব কীভাবে হিন্দুত্ববাদ সাভারকারের চিন্তার মাধ্যমে যুদ্ধ-রাজনীতি ও সহিংসতাকে হাতিয়ার করছে।
সাভারকার শুরুতেই প্রশ্ন তোলেন 'নাম' নিয়ে। উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের 'রোমিও ও জুলিয়েট'-এর শৈলী ব্যবহার করে সাভারকার বলেন - নাম মানুষের আত্মার প্রতিনিধিত্ব করে (the soul of a man)। নামের সঙ্গে যুক্ত ইতিহাস, পরিচয়, অস্তিত্ব।
সাভারকার হিন্দুইজম ও হিন্দুত্ববাদের ফারাক করেন। সাভারকারের দাবি, হিন্দুইজম হিন্দুত্ববাদের আংশিক - 'A derivative, a part, a fraction of Hindutva'। সাভারকারের পরের প্রশ্ন: হিন্দু কে (Who is Hindu?)? হিন্দু সেই যে ইন্দুস বা সিন্ধুস সভ্যতার সঙ্গে যুক্ত। সাভারকারের হিন্দু ইউরোপীয় জাতি (Nation) হিসেবে হাজির হয়। হিন্দুত্ববাদ কোনো ধর্ম নয় - এটি হলো সংস্কৃতি। সাভারকার এই সংস্কৃতির সঙ্গে যোগ করেন সভ্যতার বয়ান।
কিন্তু মধ্যে বাধা হলো বৌদ্ধ ধর্ম। সাভারকার বলবেন, বৌদ্ধ ধর্ম হিন্দুইজমের একটা অংশ। সাভারকারের রাজনৈতিক প্রকল্পের জন্য অশোক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নেহেরু যখন ভারত রাষ্ট্র গঠন করবেন, তখন তার মডেল হবেন অশোক। কিন্তু সাভারকার এখানে এন্টি-অশোক অবস্থান নেবেন। কারণ অশোক সহিংসতা ছেড়ে বৌদ্ধ শান্তিবাদী নীতিতে চলে যান। ইতিহাসের নানা মাত্রায়, নানা বাঁকে সহিংসতার প্রস্তুতি সাভারকারের হিন্দুত্ববাদ বুঝতে কাজে দেবে।
সাভারকার বলবেন, এই ভূমি একমাত্র তাদের যাদের এটি পিতৃভূমি (Father Land) এবং পূণ্যভূমি (Religious Land)। ফলে মুসলিম ও নাসারাদের জন্য ভারতে আত্মীকৃত হওয়া সম্ভব নয়, কারণ মুসলিমদের পূণ্যভূমি আরবে। এখানেই দেশীয়-বহিরাগত নির্মাণ - যা হিন্দুত্ববাদ ও প্রাচ্যবাদের মিলনে তৈরি জ্ঞানকাণ্ড। ইরফান আহমেদ একে হিন্দু ওরিয়েন্টালিজমের জ্ঞান-ক্ষমতা ম্যাট্রিক্স হিসেবে তুলে ধরেন।
ফয়সাল দেবজির 'The Impossible Indian'-এর বরাতে আমরা উনিশ শতকের ভারতে রাজনৈতিক আধুনিকতায় (Political Modernity) উৎপাদিত সীমানা (Territory) ও জাতি (Nation) ধারণার মধ্যে কীভাবে মুসলিমরা ভারতীয় হওয়ার সংগ্রাম করছে তা দেখতে পাই। জ্ঞান পান্ডে তার 'Can Muslim Be Indian?' লেখায় দেখান - ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ইতিহাসতত্ত্বে ও রাষ্ট্রে মুসলিমরা কতটুকু ভারতীয় হতে পারে।
সাভারকারের রাজনৈতিক চিন্তার উপর সাম্প্রতিক গবেষণায় জানকি ভোখলে দেখান, খিলাফত-অসহযোগ আন্দোলনকালীন মুসলিমদের সঙ্গে কংগ্রেসের জোটের সময় সাভারকার ইংরেজদের সঙ্গে সহযোগিতার হাত বাড়ান। কারণ 'জবন সর্পন' বা মুসলমান সাপেরা মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। আবার আমরা দেখব গান্ধীর সঙ্গে মুসলিমদের জোটের ক্ষেত্রে কংগ্রেস গোহত্যা নিয়ে মুসলমানদের সঙ্গে সন্ধি করতে গিয়ে তাদের জনপরিসরে 'শিয়ার' (চিহ্ন) ত্যাগ করতে বলছে - যা জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের গরু কোরবানি ফতোয়া থেকে বোঝা যায়।
মোদি যুগের হিন্দুত্ববাদে আমরা দেখব কীভাবে সেই গান্ধীয়ান গোরক্ষা আন্দোলন (Cow Protection Movement) এখন বিজেপির গো-রক্ষা আন্দোলন হচ্ছে, এবং গো-মাংস বা গোহত্যার জন্য রাষ্ট্রীয় ও অ-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মবলিঞ্চিং করে পিটিয়ে মুসলিম হত্যা করছে। নৃতাত্ত্বিক রাধিকা গোবিন্দ্রাজন দেখান কীভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা গরুকে মায়ের মেটাফোর দিয়ে তৈরি করে।
সাভারকার গান্ধীর চিন্তার বিরোধিতা করতেন। তার অহিংসাকে হিন্দুত্ববাদের পক্ষে বাধা মনে করতেন। কিন্তু তাই বলে গান্ধীর জন্য হরিবল বলার মওকা নেই। কারণ এখানেও রাজনৈতিক সংকট আছে, যার সবশেষ রাজনৈতিক প্রকাশ শাহীনবাগে সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলন। হিন্দুত্ববাদের গড়ন-গঠন এমন স্তরে এসে গেছে যে আমাদের ওয়াল্টার বেনিয়ামিনের থিসিস অনুযায়ী ইতিহাসের ইমারজেন্সিতে ব্রেক টানতে হবে।
সাভারকার হিন্দু আইডেন্টিটি ও হিন্দু চৈতন্য তৈরি করছেন ইতিহাসের মধ্য দিয়ে। আওরঙজেবের সাথে শিবাজির লড়াইকে সাভারকার বলছেন - 'Hindus Lost the Battle but Won the War'। কারণ এর আগে কেউ হিন্দু পরিচয় ও চৈতন্যের সাপেক্ষে এভাবে প্রতিরোধ করেনি। এই মুহূর্তটা তাই গুরুত্বপূর্ণ। একইরূপ আমরা দেখেছিলাম 'রাজসিংহ' উপন্যাসে। সাভারকার এখান থেকে দাবি করেন - 'Our Culture and our History, inherited our blood and has come to look upon our land not only as the land of his love but even of his worship।'
মুসলিমরা এই স্থানে আত্মীকৃত হয় না - সাভারকারের এই অবস্থানের বিরুদ্ধে মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানি ভিন্নভাবে বিরোধিতা করেন। মাদানি বলেন, মুসলিমদের পূণ্যভূমি অবশ্যই হিন্দুস্তান, কারণ আদমকে নামিয়ে দেওয়া হয় শ্রীলঙ্কায় - যা গ্রেটার ভারতের অংশ। মাদানি সাভারকারের বিপক্ষে উত্তর দিলেও এতে সাভারকারের চিন্তার ঐতিহ্য ও বুনিয়াদি কাঠামোর হেরফের হয় না, বরং শক্তিশালী হয়। উল্টো মাদানির হিন্দুস্তান যে ইসলামিক ইম্পেরিয়াল জিওগ্রাফি, তা সাভারকারের ভারত নয়। হিন্দুস্তান এবং ইন্ডিয়া এক নয়।¹
সাভারকারের রাজনৈতিক চিন্তার বৈশ্বিক মাত্রা বুঝতে বিশ শতকের ফ্যাসিস্ট ও সেমি-ফ্যাসিস্ট রাজনীতি ও আন্দোলনগুলোকে বোঝা দরকার। কলোনিয়াল ইন্ডিয়া থেকে আইরিশ জাতীয়তাবাদ থেকে ফিনিশ ন্যাশনালিজম হয়ে ইতালি ও জার্মান ফ্যাসিস্ট রাজনীতি তলিয়ে দেখতে হবে। দ্য হিটলার ইয়ুথ, ইতালিয়ান ইয়ুথ, হাঙ্গেরীয় ইয়ুথ সহ অনেক প্রতিষ্ঠানের 'Youth India' - যা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে পরে হবে RSS।
সাভারকার ইতালিয়ান ন্যাশনালিস্ট কাম ফ্যাসিস্ট চিন্তক জিউসেপে মাজ্জিনির কাজ দিয়ে ব্যাপক প্রভাবিত ছিলেন। তিনি মারাঠিতে তার লেখা অনুবাদ করে নাম দেন 'মাজ্জিনি চরিত্র'। Herbert Spencer, Johan Kaspar Bluntschli ও Mazzini-র মাধ্যমে সমাজ-রাষ্ট্র নিয়ে চিন্তা নেন। পাশাপাশি মহাভারত, রামায়ণ সহ ভারতীয় ঐতিহ্যের কিতাবাদী পড়ে ইউরোপীয় দুনিয়ার মতো Homogenization-এর রাজনৈতিক চিন্তা পুনঃউৎপাদন করেন। আশিষ নন্দী দেখান সাভারকার কীভাবে ভারতীয়দের অস্বীকৃত জাতির পিতা (Disowned Father of India)। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নন্দী এটাকে সংশোধন করে বলেন, 'সাভারকার বাপ। গান্ধী সৎ বাপ।'
বাবা, বাবার দায়িত্ব, জাতির কর্তব্য প্রসঙ্গে হিন্দুত্ববাদ খুব জোর দেয়। গান্ধীর রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে সাভারকারের বিরোধ হলো - গান্ধী তার পিতৃ দায়িত্ব পালন করছেন না।
হিন্দুত্ববাদ জন্মলগ্ন থেকেই যুদ্ধে লিপ্ত। এই যুদ্ধ প্রথমে ঘটে ইন্ডিয়ার ময়দানেই। মদনলাল ধিংরার হাতে বন্দুক তুলে দেয় সাভারকার - সে এসাসিন বা গুপ্তহত্যা করে ব্রিটিশ আর্মি অফিসার লর্ড কার্জন উইলিকে। ঠিক একইভাবে নাথুরাম গডসের হাতেও বন্দুক দেওয়া হয়।
গডসে দেশমাতার সঙ্গে পিতার (গান্ধীর) দায়িত্ব ও বিশ্বাসঘাতকতার কথা স্মরণ করান। গডসে তার জবানবন্দিমূলক লেখায় বলেন গান্ধী তার পিতার কর্তব্য পালনে ব্যর্থ ছিলেন। ফলে গান্ধীর হত্যা পুরো রাজনৈতিক। ধিংরার মতন গডসেও স্মরণ করায়, তার কাজ ছিল কর্তব্যপরায়ণ সন্তানের মতো - অবহেলিত মায়ের প্রতি তার কর্তব্য।
শ্রুতি কাপিলা গডসের এই কবুল করাকে বলেছেন 'কবুলিয়াতের হিন্দুত্ববাদ' (Confessing Hindutva)। গডসে বাবার সাপেক্ষে যে অবহেলা ও বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ করছে তার কবুলিয়াতে সাইকোঅ্যানালিটিক মাত্রা আছে। গডসের কবুলিয়াতে মাতা (দেশ), সন্তান (গডসে), পিতা (গান্ধী) - এই পারিবারিক জবানির মধ্যে ফ্রয়েডের 'Oedipal Parricide' চিহ্নিত করা যায়।
দেশমাতার জন্য গান্ধীকে হত্যা করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছিল - কবুলিয়াতটা হলো 'Parricidal Guilt'। উনিশ শতকের রানী ভিক্টোরিয়াকে মাতার সাথে তুলনা করা কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের পরের প্রজন্ম তা দেশমাতায় রূপ দেয় - নি-ধর্মীকরণ করে। তারই রূপান্তর দেখা যায় এখানে।
ফ্রয়েড সাইকিক স্ট্রাকচার অব পলিটিক্যাল লাইফ বুঝতে 'Mythic Parricide'-কে গুরুত্ব দেয়। গান্ধীর এসাসিনকে Mythic Structure of Parricide হিসেবেও বোঝা যেতে পারে। একই সাথে ঐতিহাসিক ঘটনাচক্র (Historical Event) হিসেবেও। ভারতীয় জাতির জন্য গান্ধী হলো টোটেমিক। গডসের মাধ্যমে হিন্দুত্ববাদের যুদ্ধ-রক্ত-সহিংসতার রাজনীতি প্রাতিষ্ঠানিকরণ ঘটল। জানকি ভোখলে দেখান, যখন গডসে গান্ধীকে গুলি করে, তখন গান্ধীর ভারতকে অস্বীকার করার কথা সকলে জানিয়ে দেয় হিন্দুত্ববাদ।
চার
'If discipline, organised centralization and organic collective consciousness mean Fascism, then the RSS is not ashamed to be called Fascist.'
রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের শতবর্ষ চলছে। আরএসএস নিয়ে তাত্ত্বিক কথার অপেক্ষায় ব্যবহারিক উদাহরণ শ্রেয় মনে করছি। আরএসএসের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিকগুলো বোঝা জরুরি।
আরএসএসের কেন্দ্রীয় দিক হলো ইতিহাস। অখিল বিদ্যার্থী পরিষদ হলো আরএসএসের ছাত্রদের প্ল্যাটফর্ম। আরএসএস শিক্ষায় জোর দেয়। পাঠ্যসূচি প্রণয়ন থেকে পাঠ্যসূচির বাইরে 'WhatsApp University'তেও তার শিক্ষা কার্যক্রম থেমে নেই।
আরএসএস প্রতিষ্ঠার সময় হিসেব করলে দেখা যায়, ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি পাশাপাশি সময়ে গঠিত। কিন্তু আরএসএসের মজদূর সংঘের যে পরিসর, সেখানে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি অবধি ব্যর্থ। ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে স্কুল তৈরি থেকে সারা দেশে ৩০ লাখ স্কুল আরএসএসের। পশ্চিমবঙ্গে তা এখন প্রায় ১২ হাজারের বেশি।
আরএসএসের স্কুলের বাচ্চাদের খেলার ছলে আওরঙজেব বনাম শিবাজির লড়াই হয়। আরএসএসের নারীদের সংঘ সবচেয়ে অধিক শক্তিশালী। নারীরা গল্পে গল্পে হিন্দুত্ববাদের ইতিহাসে Belonging করে।
ভারতীয় সমাজে যে বর্ণপ্রথা, তাতে আরএসএস - সেই প্রথা কৌশলগতভাবে হোক বা মর্মগতভাবে হোক - উভয় স্থান থেকে ভেঙে তাদের সঙ্গে সামাজিক সংহতি গড়ে। বর্ণপ্রথা নিয়ে সাভারকার গান্ধীর সমালোচনা করেন, কারণ গান্ধী হিন্দুধর্মের এই কাঠামো বহাল রাখতে চেয়েছিলেন - যদিও ছোঁয়া নিয়ে যে পবিত্রতা আরোপ তা দূর করতে চেয়েছিলেন, দলিতদের 'হরির সন্তান' বলেছিলেন। কাস্ট নিয়ে ভারতীয় রাজনৈতিক চিন্তায় আম্বেদকর, সাভারকার, গান্ধীর ঐতিহাসিক বাহাস এখানে বিস্তারিত আনছি না। কিন্তু উল্লেখ্য যে দলিত সম্প্রদায় হিন্দুত্ববাদের ভোক্তা হয়ে বিজেপিকে পাওয়ারে এনেছে। ফলে হিন্দুত্ববাদকে কলকাতার ব্রাহ্মণ্যবাদ দিয়ে বোঝার লিবারেল-লেফট ছক খণ্ডিত।
পশ্চিমবঙ্গের মতুয়া সম্প্রদায় বিজেপিকে ক্ষমতায় এনেছে। তাদের মন্ত্রী অবধি আছে। আদিবাসী, দলিত, মজদুরের সঙ্গে আরএসএসের দীর্ঘ কাজ আছে। নাগাল্যান্ডে খ্রিস্টানদের মনে মুসলিম বিদ্বেষ ছড়াতে দিনে আরএসএসের সদস্য গরুর মাংস খেলেও, রাতে বমি করে। এখানে এই প্রক্রিয়াকে শুধু ট্রটস্কির অনুপ্রবেশ তত্ত্ব দিয়ে বোঝা যাবে না।
সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার স্টাডিজের সদস্য ও সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার হেমায়েত তৈয়ব আরএসএস ও বাংলাদেশের ইসলামি নানা ধারা (জামাত-দেওবন্দি-বেরেলভি ও পীর-তরিকত অক্ষ) নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করেছিলেন। হেমায়েত দেখান বাংলাদেশের কোনো ইসলামি ধারার পক্ষেই আরএসএস হওয়ার সুযোগ নেই। হেমায়েত তৈয়বের এই পাঠে আরএসএসের নমুনা বা কিয়াসের দিক অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে।
অপরদিকে বেঙ্গল হিস্ট্রি কালেক্টিভের গবেষক তাহমিদাল জামি নমুনা বা কিয়াসের স্থান থেকে দূরত্ব রেখে জুলাই-উত্তর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সংঘ পরিবার বা সংঘ রাজনীতির দেশজ রূপ সন্ধান করেছেন। এই নোক্তাগুলো সামনে রাখলে আলাপের গতি সঞ্চার হবে।
পাঁচ
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর হেগেলীয় মার্কিন দরবারি গবেষক ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা দাবি করলেন ইতিহাসের অন্ত হয়ে গেছে। লিবারেলিজম এমন এক চূড়ান্ত দশায় উপনীত যে মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব, শ্রেণির দ্বন্দ্ব সহ সকল দ্বন্দ্বের ইতি হয়ে গেছে। পাশাপাশি সময়ে আরেক দিকপাল স্যামুয়েল হান্টিংটন দেখান সভ্যতার সংঘাত - সারা পৃথিবীকে কিছু সভ্যতায় ভাগ করেন হান্টিংটন।
৯/১১ উত্তর সময়ে War on Terror-এর যামানায়, গ্লোবাল অর্থনৈতিক ক্রাইসিসের সাপেক্ষে, সারা দুনিয়ায় - বিশেষত পশ্চিমে - জাত্যাভিমানী রাজনীতি দেখা গেল। লিবারেলিজমের মোনাফেকি (Contradiction) দরুণ কালেক্টিব কনশাসনেস, মিথো-পোয়েটিক বিলঙিং-এর এথনো-ন্যাশনালিস্ট রাজনীতি প্রতাপশালী হয়। ইউরোপীয় দুনিয়ায় নির্বাচনে জয় করেই তারা ক্ষমতায় আসে।
ফরাসি বিপ্লবের পর আধুনিক রাষ্ট্রের যে যাত্রা, তাকে ফরাসি ডানপন্থী তাত্ত্বিক আলাঁ দ্য বেনিস্ট বলেন 'Jacobinist State'। ঐতিহ্যনির্ভর রাজনীতির এই সূত্রকে আরও সুসংহত করেন চীনা তাত্ত্বিক ঝাং ওয়েইওয়েই ও রাশান তাত্ত্বিক আলেক্সান্ডার দুগিন। ঝাং ওয়েইওয়েই-এর 'The China Wave: Rise of Civilizational State' ও আলেক্সান্ডার দুগিনের 'Fourth Political Theory' অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রচনা।
ইউরোপীয় দুনিয়াজুড়ে জাত্যাভিমানী রাজনীতির বিজয় দেখা যাচ্ছে - বিশেষত কোভিডের পর। এই রাজনীতি ব্লাড, সয়েল, সিভিলাইজেশনাল হেরিটেজ ও কালেক্টিব আইডেন্টিটিকে কেন্দ্রীয় স্থান দেয়। হিন্দুত্ববাদের সভ্যতার ধারণা ও জাত-রাজনীতি এই সময়ে রাজনৈতিক বিকাশের চূড়ান্ত দশায় আছে।
৯০-এর দশকে অটলবিহারী বাজপেয়ী ও রামকৃষ্ণ আদভানির নীতি ও মতাদর্শের ভারসাম্য দেখা যায়। সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি অর্জন করে। বাজপেয়ী-আদভানি জোট ভারতের নিরাপত্তা প্রশ্নকে আরও সুসংহত করে। পরে কংগ্রেসের মনমোহন সিং বিশ্ব বাজারে ভারতকে অর্থনৈতিক জায়গায় স্থান দেয়। এরপর লিবারেল-লেফট অক্ষে ভারতীয় রাষ্ট্র খুব সহজেই শরিক হয়।
মোদি-অমিত শাহ জোটের শাসনকে নয়া হিন্দুত্ববাদ বলছেন অনেক গবেষক। কেউ কেউ মনে করেন গুজরাট ল্যাবরেটরিতে এই ভারতের পরীক্ষা করেছেন মোদি। সাভারকারের যে হিন্দু সভ্যতার প্রকল্প, তা এই গ্লোবাল রাইট উইং রাজনীতির অক্ষে অন্যতম প্রধান শরিক। আলেক্সান্ডার দুগিন ভারতকে সিভিলাইজেশন স্টেট বলেন। ভারতকে প্রথম সভ্যতারাষ্ট্র বলেছেন ঐতিহাসিক রবীন্দ্রকুমার।
গ্লোবাল লিবারেল-লেফট অক্ষের সঙ্গে রাষ্ট্রনৈতিক ও গ্লোবাল রাইট অক্ষের সঙ্গে মতাদর্শিক-সভ্যতা-রাজনৈতিকভাবে হিন্দুত্ববাদ হাত ধরে চলছে। মতাদর্শ কোনো বিষয়ই না - আইয়ুব বা নেহেরু থেকে হালের এরদোয়ান হয়ে মোদি তার উদাহরণ। এছাড়া জয়শংকরের বই 'Why Bharat Matters' এক অন্যতম পাঠ্য।
ছয়
এই সংকট মোকাবিলায় আমাদের রাজনৈতিক (Political) রূপ সন্ধান করা জরুরি। 'রাজনৈতিক' বা 'পলিটিক্যাল' ধারণাকে জার্মান রাজনৈতিক তাত্ত্বিক কার্ল শ্মিট ফ্রেন্ড-এনিমি ভেদ হিসেবে প্রস্তাব করেছেন। শ্মিট এই তাত্ত্বিক কাঠামোর পেছনে থমাস হবস ও কার্ল ভন ক্লজউইটজের চিন্তার পর্যালোচনা করে এজতেহাদ করেন।
হবস দেখান সকলের সঙ্গে এনিমিটি আছে - সংঘাত আছে। শ্মিট ধারণা নিলেন। কিন্তু ক্রিটিক হিসেবে দেখালেন এই সংঘাত-এনিমিটি এখন ব্যক্তিগত বিষয় নয়। অপরদিকে ক্লজউইটজ মনে করেন যুদ্ধই রাজনীতি (Politics as Continuation of War)। শ্মিট যুদ্ধকে গুরুত্ব দেবেন, কিন্তু তা পলিটিক্যালে আসতে গেলে ডিসিশন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকতে হবে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরের ভার্সাই চুক্তির পর জার্মানসহ ইউরোপকে কীভাবে নতুনভাবে গঠন করা যায়, শ্মিট সেই প্রকল্প নিলেন। লিবারেল ডেমোক্রেসির সংকট ধরবেন এই প্রকল্পের বিস্তারে। তবে শ্মিট এনিমিকে অপরিহার্য বা এসেনশিয়াল এনিমি হিসেবে দেখতে বলেননি।
ভারতে যখন মুসলিমদের বর্গীকরণ করা হয়, তা এসেনশিয়াল এনিমি হিসেবে। এছাড়া ২০০৮ থেকে এখন অবধি ভারত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ-রাজনীতি বেছে নিয়েছে। এমতাবস্থায় আমাদের রাজনৈতিক হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
কিন্তু লিবারেলিজমের বাইরে গিয়ে আমরাও কি ভারতীয় মুসলিমদের মতো এই ভূমির হিন্দুদের সঙ্গে একই কাজ করব? কখনোই না। আমরা লিবারেলিজমের বাইরে যাচ্ছি বলে জাত্যাভিমানী রাজনীতির ধারক হব - এমনটা ভাবা অনুচিত।
আমাদের রাজনৈতিক হতে গেলে আগে ঘর (সমাজ ও রাষ্ট্র) গোছাতে হবে। এই ঘরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শক্তি, আধুনিক ও ঐতিহ্যবাদী ইসলামপন্থী ও বামপন্থীদের এক সুতোয় গাঁথতে হবে। কিন্তু লিবারেলিজম ও উগ্র জাত্যাভিমানী রাজনীতির বাইরে গিয়ে কীভাবে এই অসাধ্য সাধন করা যায়?
সম্প্রতি রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ও মাইলস্টোন জার্নালের বাংলা বিভাগের সম্পাদক তরিকুল হুদা জুলাই-উত্তর বাংলাদেশের দশাকে পোস্ট-সেক্যুলার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তরিকুল হুদার পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গের শিক্ষক তানজিন দোহা ও সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার স্টাডিজের গবেষক আব্দুর রহমান বারি যৌথভাবে পোস্ট সেক্যুলার শরিকানার রাষ্ট্র প্রস্তাব করছেন।
লিবারেলিজম (সাম্য - যা সেন্ট পলের হাত ধরে খ্রিস্টানিটির আরেক রূপ) এর বাইরে গিয়ে, আবার এথনো-ন্যাশনালিস্ট জাত্যাভিমানী রাজনীতিতেও পরিণত না হয়ে - তৃতীয় পথ (Third Way) হিসেবে এই শরিকানার প্রস্তাবনা। শরিকানার সমাজ ও রাষ্ট্রে শরিকগণ একে অন্যের অস্তিত্বময়তার সামাজিক-রাজনৈতিক ও আইনি কবুলিয়াত (Recognition) দেবে।
শরিকানার বলে আমাদের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী গঠন হবে। তখন রাজনৈতিক হওয়ার যে সূত্র, তা আমলে কোনো সংকট থাকবে না। বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে শরিকানার নতুন রাজনীতির মাধ্যমে পথ দেখাবে, ইনশাআল্লাহ।
ফুটনোট
1. মানান আহমেদ আসিফ, The Loss of Hindustan and Invention of India - এই গ্রন্থে হিন্দুস্তান ও ইন্ডিয়ার ধারণাগত ও ঐতিহাসিক পার্থক্য বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে।
গ্রন্থপঞ্জি
Savarkar, Vinayak Damodar. Essentials of Hindutva. 1923.
Chatterjee, Partha. The Nation and Its Fragments: Colonial and Postcolonial Histories. Princeton University Press, 1993.
Nandy, Ashis. The Intimate Enemy: Loss and Recovery of Self Under Colonialism. Oxford University Press, 1983.
Devji, Faisal. The Impossible Indian: Gandhi and the Temptation of Violence. Harvard University Press, 2012.
Anderson, Walter K. and Shridhar D. Damle. The Brotherhood in Saffron: The Rashtriya Swayamsevak Sangh and Hindu Revivalism. Westview Press, 1987.
Hansen, Thomas Blom. The Saffron Wave: Democracy and Hindu Nationalism in Modern India. Princeton University Press, 1999.
Jaffrelot, Christophe. The Hindu Nationalist Movement in India. Columbia University Press, 1996.
Schmitt, Carl. The Concept of the Political. University of Chicago Press, 1996.
Dugin, Alexander. The Fourth Political Theory. Arktos Media, 2012.
Zhang, Weiwei. The China Wave: Rise of a Civilizational State. World Century Publishing, 2012.
Fukuyama, Francis. The End of History and the Last Man. Free Press, 1992.
Huntington, Samuel P. The Clash of Civilizations and the Remaking of World Order. Simon & Schuster, 1996.
ছফা, আহমদ. শতবর্ষের ফেরারি : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। খান ব্রাদার্স।