আব্দুর রাজ্জাকের মিথ্যাচার ও মুসলিম বাংলায় নবাব সলিমুল্লাহর প্রভাব | ফিরমানুল ইসলাম
ঢাকার ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের সাথে জড়িয়ে আছে ঢাকার এলিট তথা অভিজাত শ্রেণির জীবনাচার। ঢাকার এলিটদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে ‘ওয়েল ডকুমেন্টেড সেলিব্রেটি’ বলা যেতে পারে ঢাকার নবাব পরিবারের নবাবদের।
যদিও বামপন্থী শিবিরে এ নিয়ে রয়েছে ব্যাপক ষড়যন্ত্র। নানাভাবে নানা ধাঁচে তারা নবাব পরিবারকে এবং তাদের প্রভাবকে খাটো করে দেখানোর যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন। এই সকল প্রচেষ্টাকারীদের অন্যতম দিকপাল অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষক ‘নবাব ফ্যামিলির কোনো ভূমিকাই ছিল না’ বলে বারবার বিভিন্ন জায়গায় হাঁকডাক ছেড়েছেন। তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন ঢাকার মানুষদের মধ্যে নবাব ফ্যামিলির কোনো ‘আছর’ বা প্রভাব ছিল না মর্মে ঐতিহাসিক ন্যারেটিভ তৈরি করতে। বাম শিবিরে এ নিয়ে রয়েছে ব্যাপক আস্ফালন, যদিও ঐতিহাসিক সূত্র হিসেবে তা খুবই দুর্বল এবং হঠকারীও বটে।
ঢাকার লোকের সঙ্গে ঢাকার নওয়াবদের সম্পর্ক কীরূপ ছিল? এমন প্রশ্নের প্রেক্ষিতে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক বলেন—
“ঢাকার মুসলমানদের সঙ্গে এদের (নবাব) কোন সম্পর্ক ছিল না। মুসলমানরা এদের পরিবারকে নিজেদের সমাজের কোন বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন বলে যে গ্রহণ করেছিল, এমনও নয়।” (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ : অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক-এর আলাপচারিতা, সরদার ফজলুল করিম, পৃষ্ঠা : ১৭)
আমাদের আলোচনা শুরুয়াত এই বক্তব্য থেকেই। ইতিহাস শাস্ত্রে কোনো ব্যক্তির বক্তব্য অন্তত আধুনিক যুগে একনিষ্ঠ সূত্র কিংবা ন্যারেটিভ হিসেবে দাঁড়াতে পারে না; এর জন্য প্রয়োজন তথ্য এবং উপাত্ত।
নবাব পরিবারের আছর ঢাকার মানুষদের ওপর কেমন ছিল— এটা নিয়ে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক জঘন্য মিথ্যাচার করেছেন। তার ব্যবহৃত ভাষা ও শব্দচয়ন থেকে সহজেই কথা বলার সময়ে তার মুখের অভিব্যক্তি কেমন ছিল—তা কল্পনার মানসপটে ভেসে ওঠে। হায় সেকি বিদ্বেষ! হিংসা তার চোখে মুখে। অথচ এমন হিংসা বিদ্বেষ তো মানায় হিন্দুত্ববাদী কংগ্রেসীদের চোখে মুখে। কিন্তু আব্দুর রাজ্জাক তো মুসলমান ছিলেন।
চিন্তার জগতে আব্দুর রাজ্জাক কি মুসলমান নাকি কংগ্রেসপন্থী সে আলাপ ভিন্ন। সে বিতর্ক ভিন্ন সময়ের। আপাতত ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আতশ কাঁচের নিচে আব্দুর রাজ্জাকের ন্যারেটিভকে ঝালাই করা যাক।
নবাব আহসানুল্লাহ হিন্দু-মুসলমান ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পূর্ব বাংলার সব মানুষের কতটা শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন, তা তাঁর মৃত্যুর পর কংগ্রেস-সমর্থক ঢাকা থেকে প্রকাশিত একমাত্র সাপ্তাহিক ‘ঢাকা প্রকাশ’ এর প্রতিবেদন থেকে বোঝা যায়। নবাব আহসানুল্লাহ বিষয়সম্পত্তি নিয়ে মানসিক চাপে ছিলেন। তিনি হৃদরোগেও ভুগছিলেন। তবে তাঁর শারীরিক অবস্থা অতটা খারাপ, তা বাইরে থেকে বোঝা যেত না। আহসানুল্লাহ হৃদরোগে আকস্মিকভাবে মারা যান। এমন মৃত্যুর জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না। তাঁর মৃত্যুতে পূর্ববঙ্গের জনজীবনে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। ‘ঢাকা প্রকাশ’ সে সময় যা লিখেছে, তা হুবহু নিচে তুলে ধরছি—
“ঢাকাবাসী দিগকে শোকসাগরে নিমগ্ন করিয়া পূর্ববঙ্গের গৌরব, স্বদেশের সুহৃদ, দরিদ্রের জীবন, সর্বসাধারণের একমাত্র আশ্রয় নবাব বাহাদুরের অমরাত্মা অনন্ত ধামে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে। ভাওলাধিপতির বিয়োগব্যথা ভুলিতে না ভুলিতেই অভাগিনী বঙ্গজননী তাঁহার সর্বশ্রেষ্ঠ রত্নে বঞ্চিত হইবেন এ কথা স্বপ্নেও কেহ ভাবিতে পারে নাই। কিন্তু নিয়তির অলঙ্ঘ্য শাসন অতিক্রম করিবে কাহার সাধ্য। নবাব বাহাদুরের অপার অনুকম্পায় যে ঢাকাবাসী নিত্য সুখ সমৃদ্ধি লাভ করিয়া আসিতেছেন, রোগে, শোকে, আপদে, বিপদে যাঁহার সুমধুর আশ্বাসবাণী শ্রবণ করিয়া দীন দরিদ্র পূর্ববঙ্গবাসী জ্বালা যন্ত্রণা ভুলিতে সক্ষম হইয়াছে, তাঁহার বিয়োগ বার্তা শ্রবণে পূর্ববঙ্গবাসী আজ আপনাদিগকে কিরূপ বিপন্ন মনে করিতেছে কেমন করিয়া তাহা বর্ণনা করিব। কোথায় আজ আমাদের সেই দেবোপম নবাব বাহাদুর, স্বদেশের কল্যাণ সাধনকল্পে যাঁহার পবিত্র করকমল নিয়ত নিযুক্ত ছিল। কোথায় সেই দরিদ্রের জীবন, নিরন্নের অন্ন সংস্থান কল্পে যাঁহার ভান্ডারদ্বার নিয়ত উন্মুক্ত ছিল। কোথায় সেই বিপন্নের বন্ধু, হৃতসর্বস্ব সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ একমাত্র যাঁহার কৃপায় জীবন ধারণ করিতে সমর্থ হইত। বিধাতার বক্রদৃষ্টি বশে সকলেই আজ সাধের রত্নে বঞ্চিত হইয়া হাহাকার করিতেছে।
সোমবার দিবস সন্ধ্যার পূর্ব পর্যন্তও নবাব বাহাদুরের কোন প্রকার বিশেষ অসুখের সংবাদ পাওয়া যায় নাই। তিনি হৃষ্টচিত্তে আহসান মঞ্জিল প্রাসাদের সম্মুখস্থ নদীর ঘাটে স্বকীয় সুরম্য জলযানে অবস্থান করিতেছিলেন। ঢাকায় ত্বরিতালোক ইলেকট্রিসিটি। উদ্বোধনের পর হইতেই তিনি তথায় বাস করিতেছিলেন। মৃত্যুর তিন চারি দিবস পূর্ব হইতেই নাকি তিনি সামান্য রকম অসুখ বোধ করেন। এই নিমিত্তই শিকারার্থ বেগুনবাড়ি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হইয়াও নবাব বাহাদুর সিভিল সার্জন সাহেবের অভিপ্রায়ানুসারে ঢাকা অবস্থান করিতেছিলেন। কিন্তু সে সামান্য অসুখ কেহই বড় একটা গ্রাহ্য করেনাই। নবাবের কমনীয় কলেবর গ্রাস করিবার নিমিত্ত রক্ষোরিপুর ন্যায় কাল যে করাল বদন ব্যাদান করিয়াছিল মুহূর্ত তরেও তাহা অনুমান করিতে পারে নাই। সোমবার সন্ধ্যার অব্যবহিত পরে নবাব সাহেব আহারাদি করিয়া বিশ্রাম করিতেছিলেন। হঠাৎ বক্ষস্থলে কেমন একপ্রকার বেদনা অনুভব করেন। বেগম সাহেবা এবং নবাবের অবিবাহিতা দুহিতাত্রয় ব্যতীত তথায় অপর কেহই ছিলেন না। প্রধান প্রধান কয়েকটা ওষুধ নবাব সর্বদাই সঙ্গে রাখিতেন, তাই বেদনা অনুভব মাত্রই তাঁহার আদেশানুসারে বেগম সাহেবা একমাত্রা ওষুধ সেবন করান। নিমেষের মধ্যেই বেদনা এইরূপ দুঃসহ হইয়া উঠিল যে ৫/৭ মিনিটের মধ্যে তিনি উপর্যুপরি তিনমাত্রা ওষুধ সেবন করেন। নবাবপুত্র প্রিন্স আতিকুল্লাহ সাহেব তৎক্ষণাৎ ডাক্তার সাহেবের নিকট দৌড়িলেন। কিন্তু দুর্দান্ত কৃতান্তের কালবিলম্ব সহ্য হইল না। দেখিতে দেখিতে দিব্যজ্যোতিসম্পন্ন নবাবের নয়নযুগল চিরতরে নিমিলিত হইল। ঢাকার গৌরব রবি চিরতরে অস্তমিত হইল।
কি ব্যারামে নবাব সাহেব অকালে কালকবলে নিপতিত হইলেন তদ্বিষয়ে আমরা পাঠকবর্গের কৌতূহল নিবৃত্তি করিতে পারিলাম না। কারণ ডাক্তার সাহেব পৌঁছিবার পূর্বেই নবাবের প্রাণপাখি উড়িয়া গিয়াছিল। কাজেই ব্যারাম নির্ণয় হয় নাই। তবে লক্ষণ দৃষ্টে হৃদরোগ বলিয়াই অনেকে অনুমান করিয়াছেন। ১৮৮৪ খিস্টাব্দে যখন নবাব বাহাদুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র খাজে হাফিজুল্লাহ সাহেবের মৃত্যু হয়, তখন তিনি অপত্যবিয়োগ দুঃখে বড়ই অভিভূত হইয়া পড়িয়াছিলেন। সেই সময় হইতেই নবাবের ঈদৃশ পীড়ার সূত্রপাত হয়, ইহাই অনেকের বিশ্বাস। তদানীন্তন সিভিল সার্জন মি. ক্রম্বি সাহেবের চিকিৎসাগুণে তিনি অচিরে রোগমুক্ত হইলেও ডাক্তার সাহেব নাকি তখনই বলিয়াছিলেন যে, অকস্মাৎ নবাব মৃত্যুমুখে পতিত হইবেন। গত বৎসর তাঁহার তৃতীয় বেগমের মৃত্যুর পর পুনরায় ঐ ভীষণ ব্যাধির আবির্ভাব হইয়াছিল। কিন্তু ভগবৎকৃপায়, সে যাত্রাও তিনি রক্ষা পান। তখন সিভিল সার্জন মি. মেকেল উহা ফ্যাটি ডিজেনারেশন অব দি হার্ট বলিয়া ব্যাখ্যা করেন। ব্যারাম যাই হোক উহাতেই অবশেষে তাহার জীবন প্রদীপ নির্বাপিত হইয়াছে সন্দেহ নাই।
নবাবের জীবনী আলোচনা করিলে দেখা যায় একালে নবাবের ন্যায় মহাপুরুষ অতি অল্পই জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। নবাবের চরিত্র, নবাবের কার্যক্ষমতা, নবাবের দান, সকলই অপূর্ব এবং আদর্শস্থানীয়। অতুল ঐশ্বর্যের অধিপতি হইয়াও চরিত্র এরূপ পবিত্ররাখিতে আর কেহই পারিয়াছেন কি না বলিতে পারি না। তাঁহার পরিণীতা বেগম সাহেবা ব্যতীত তিনি অপর কোনও স্ত্রীলোকের প্রতি ফিরিয়াও তাকাইতেন না। জীবনে কখনো মদিরা স্পর্শও করেন নাই। সমৃদ্ধিশালী ব্যক্তিবর্গের পক্ষে ইহা কম প্রশংসার কথা নহে। স্বকীয় বিষয় কর্মাদির বিধি ব্যবস্থা করিবার জন্য তিনি যেরূপ অপরিমিত পরিশ্রম স্বীকার করিতেন, তাহাও অতুলনীয়। এত বড় সম্পত্তির সমস্ত ব্যবস্থাদি তিনি নিজে দেখিয়া শুনিয়া করিতেন। একটি পয়সা হইতে লক্ষ লক্ষ মুদ্রা পর্যন্ত নবাবের অনুমতি ব্যতীত খরচ হইতে পারে নাই। তিনি অনুচিত ব্যয়ের পক্ষপাতী ছিলেন না। অথচ প্রয়োজন হইলে লক্ষ লক্ষ মুদ্রা অকাতরে ব্যয় করিতেও কুণ্ঠিত হইতেন না। নবাবের দানশীলতার বিষয় আলোচনা করিলে এ কলিকালে সত্য সত্যই তাঁহাকে দাতা কর্ণ আখ্যা প্রদান করিতে ইচ্ছা হয়। জানি না ভারতে এরূপ কয়জন মহাত্মা জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। পরোপকারকল্পে যিনি ৫০ লক্ষ মুদ্রারও অধিক অকাতরে ব্যয় করিয়া গিয়াছেন। এতদ্ব্যতীত তাঁহারই ব্যবস্থানুসারে দরিদ্রদিগের সাহায্যার্থ এস্টেট হইতে প্রতি মাসে তিন সহস্র মুদ্রা বিতরিত হইয়া থাকে। এত যে নবাবের দান কিন্তু কয়টা লোকে তাহা জানিতে পারিয়াছেন। অধিকাংশ স্থলে আর্তের পরিত্রাণ কামনায় তিনি অতি সঙ্গোপনে সাহায্য প্রেরণ করিতেন। এমন কি কোন কোন দানপ্রাপ্ত ব্যক্তিও বুঝিতে পারিত না যে কাহার কৃপায় সে দুঃখ দুর্বিপাকের হস্ত হইতে অব্যাহতি লাভ করিল। যে কালে মুষ্টিমেয় দানও সংবাদপত্রে ভৈরবনাদে বিঘোষিত হইয়া থাকে, কলির সেই পূর্ণপ্রভাব সময়ে, ঈদৃশ অভিমানশূন্য দান কিরূপ মহত্ত্বজ্ঞাপক তাহা বোধ হয় আর কাহাকেও বুঝাইতে হইবে না। এজন্য বলিতেছিলাম চরিত্র, কার্যদক্ষতা এবং দানশীলতা এ তিনটি বিষয়ে নবাব বাহাদুর আদর্শ পুরুষ ছিলেন, তদ্বিষয়ে সন্দেহ নাই।”

চিন্তা করুন নবাব ফ্যামিলির প্রভাব কত সুদূরপ্রসারী হলে একজন মানুষের মৃত্যুতে ঢাকাবাসীর এই অবস্থা হতে পারে এবং সেটা আবার তুলে ধরেছে সেই সময় নবাবের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসের কঠিন সমর্থক ‘ঢাকা প্রকাশ’ পত্রিকা। সূত্র হিসেবে এটা অন্তত আব্দুর রাজ্জাকের মুখের কথার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। এতটুকু সূত্রের বরাতেই আব্দুর রাজ্জাকের যে মিথ্যাচার, সেটুকু উঠে আসে।
শুধু তাই নয়। নবাব আহসানুল্লাহর মৃত্যুর পর তার পুত্র নবাব সলিমুল্লাহ নবাব হন। এরপরে ঢাকা প্রকাশের আরেকটি প্রতিবেদনে ঢাকাবাসীর উপর নবাবের প্রভাব বিবৃত হচ্ছে এভাবে—
“নবাব শ্রীযুক্ত সলিমুল্লাহ সাহেব বাহাদুর স্বর্গীয় পিতৃদেবের স্মৃতিসংস্থাপনকল্পে এরূপ রাজোচিত অনুষ্ঠান করিয়া অনন্যসাধারণ মহানুভবতার পরিচয় দিয়াছেন তদ্বিষয়ে সন্দেহ করা যাইতে পারে না। কিন্তু এ সময়েও আমরা নবাব বাহাদুরের সমীপে দুই একটা প্রার্থনা না জানাইয়া পারিতেছি না। ঢাকাবাসী নবাব পরিবারেরই আশ্রিত; ঢাকার যাহা কিছু বিভব তৎসমস্তই নবাবের অনুকম্পা প্রস্তুত। নবাবের অনুগ্রহ দৃষ্টি না থাকিলে ঢাকায় অবস্থান ভদ্রলোকের পক্ষে অসম্ভব হইত। নবাব বাহাদুরের পূর্ব্বপুরুষদ্বয় সহর(শহর)- বাসীর উপকারার্থ জলের কল ও তাড়িতালোকের ব্যবস্থা করিয়া লোকানুরাগের যথেষ্ট পরিচয় দিয়া গিয়াছেন; স্বর্গগত নবাবদ্বয় ঢাকার প্রধান ২টা অভাব দূর করিবার ব্যবস্থা করিয়া গেলেও “সহর- বাসিগণ আর একটা গুরুতর অভাব অনুভব করিয়া দুঃসহকষ্টে কালযাপন করিতেছে। সেটা ঢাকার ড্রেণ। ঢাকাতে ড্রেণ সমুত্থিত দুর্গন্ধ প্রবাহ এবং তজ্জনিত নানাবিধ ব্যাধির বিষয় চিন্তা করিতে গেলে সত্য সত্যই মনে হয় সহরবাসী ব্যক্তিবৃন্দের স্বাস্থ্যের প্রতি দৃষ্টি করা কর্তৃপক্ষ আবশ্যক মনে করেন না। নবাবের অনুকম্পা ব্যতীত এ অভাব নিরাকরণের উপায়ান্তর নাই।”

এসব তথ্য প্রমাণের পরেও আমরা সত্যকে আরো সুন্দর করে তুলে ধরতে চাই। সত্যকে পরিপূর্ণ করতে চাই। তাই আমরা আরো বেশি বিশ্লেষণ এবং তদন্তের দিকে যাব। আমরা দেখার চেষ্টা করব, আব্দুর রাজ্জাকের কথা কোথাও গিয়ে সত্য হিসেবে ঠেকে কিনা।
খ্যাতিমান লেখক ও সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ তার “নবাব সলিমুল্লাহ ও তাঁর সময়” বইয়ে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন। নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যদি দেখা যায়, তাহলে সৈয়দ আবুল মকসুদ ও নবাব সলিমুল্লাহর মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনার মাঝে একটা শীতলতা অনুমান করা যেতে পারে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ পাকিস্তান সোশালিস্ট পার্টির মুখপাত্র “নবদূত” পত্রিকার মাধ্যমে নিজের সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেন। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় কাজ করার সময় প্রখ্যাত নাস্তিক এবং ইসলাম বিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদের পক্ষে লিখতে গিয়ে তিনি তার চাকরি হারান। অর্থাৎ সৈয়দ আবুল মকসুদ মুসলিম জাতীয়তাবাদী নবাব স্যার সলিমুল্লাহ বাহাদুরের প্রতি দুর্বল থাকবেন, তা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। বরং ইতিহাস লিখতে গিয়ে প্রথম এবং দ্বিতীয় সারির সূত্র ব্যবহার তাকে নবাব সলিমুল্লাহর প্রতি সর্বোচ্চ নিরপেক্ষ করে তুলেছে বলেই মনে হয়।
তিনি নবাব আহসানউল্লাহর মৃত্যু নিয়ে সেই সময়ের মানুষদের একটি চিত্রায়ন করেছেন তার বইটিতে। তিনি বলছেন—
“২৩ ডিসেম্বর ঢাকায় এক নাগরিক শোকসভার আয়োজন করা হয় নর্থব্রুক হল প্রাঙ্গণে। ঢাকার প্রবীণ নাগরিক রমাকান্ত নন্দী, যিনি উনিশ শতকের আশির দশকে পৌরসভার একজন কমিশনার ছিলেন, শোকসভায় সভাপতিত্ব করেন। হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান সব সম্প্রদায়ের নেতারা নবাব বাহাদুরের কর্মময় জীবন নিয়ে আলোচনা করেন। পূর্ববঙ্গের খ্যাতনামা আইনজীবী শরৎচন্দ্র ঘোষ এবং পণ্ডিত প্রসন্নচন্দ্র বিদ্যারত্ন এমন আবেগময় বক্তৃতা করেন যে, শ্রোতারা উচ্চস্বরে কান্না করতে থাকেন। সভার সিদ্ধান্তক্রমে শোকপ্রস্তাব নতুন নবাব সলিমুল্লাহকে হস্তান্তর করা হয় শোকসভায় নবাবের স্মরণে এক স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। কমিশনার এইচ স্যাভেজের বাসভবনে ঢাকার বিশিষ্ট নাগরিক ও পদস্থ কর্মকর্তাদের এক সভায় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের অর্থ সংগ্রহের জন্য চাঁদা তোলারও সিদ্ধান্ত হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে বহু শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়।” (নবাব সলিমুল্লাহ ও তাঁর সময়, সৈয়দ আবুল মকসুদ, পৃষ্ঠা : ৩৬)
এখন মনে হতে পারে এই প্রভাব প্রতিপত্তি বোধহয় কেবলই হিন্দু-মুসলিম এলিটদের একটা বিষয়। মধ্যবিত্ত ও সাবাল্টার্ন মানুষের সাথে সম্পর্ক বোধহয় তেমন মজবুত ছিল না। আসুন সেখানেও একটু আলোকপাত করি।
১৯০৫ এ বঙ্গভঙ্গ হয়। সাথে সাথেই কলকাতার “Babudom” ষোল আনা জেগে উঠে। এক পক্ষ নমনীয়তার সাথে সভা সেমিনার করে বুদ্ধিবৃত্তিক পাটাতনের উপর দাঁড়িয়ে মুসলিম পূর্ব বাঙলার উন্নতির পথ রোধ করতে তৎপর হয়। একই উদ্দেশ্যে আরেকদিকে উত্থান হয় সন্ত্রাসবাদের। হিন্দুত্ব বিধৌত বিপ্লবীদের দুইটি দল ‘যুগান্তর’ এবং ‘অনুশীলন’ এই সকল নোংরামিতে সক্রিয় থাকে৷ অবশ্য দুই পক্ষই একে অপরকে দুষতে থাকে। সমালোচনা করে নিজেদের ভিন্নতা প্রমাণ করতে থাকে। তবে এ দুটি যে একই বিষবৃক্ষের সফট ও হার্ড শাখা মাত্র, তা নির্মোহ ইতিহাস পাঠকের বুঝতে বাকি নাই।
যাই হোক, দুই বছর ধরে নোংরামির এক পর্যায়ে গর্দভের মত তারা নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহর নামে একটি মিথ্যা হ্যান্ডবিলের হাজার হাজার কপি প্রচার করে৷ হ্যান্ড বিলখানা লাল কাগজে প্রচারিত হওয়ায় এটিকে লাল ইশতেহার বলা হয়। তবে লাল নোংরামি কিংবা লাল বোকামি বললেও বিশেষ ভুল হবে না।
১৯০৭ সালে হ্যান্ডবিলটি প্রচারিত হয়েছিল । তাতে বলা হয়েছিল, নবাব বাংলার মোল্লা-মৌলভিদের ও মুসলমান যুবকদের নির্দেশ দিচ্ছেন—
“যেখানে হিন্দু যুবতী ও হিন্দু বিধবা পাবে তাদের বিয়ে করো, হিন্দুদের বাড়িঘর লুট করো, তাদের দেবমন্দির ধ্বংস করে দাও ইত্যাদি।”
তখন ছিল কঠোর ঔপনিবেশিক শাসনের সময়। সরকারের চর ও পুলিশের গোয়েন্দারা সব খোঁজ রাখতেন—কে কোথায় কী করে। ওই অপকর্ম যে সলিমুল্লাহর মতো মানুষ করতে পারেন, তা কোনো শিশুও বিশ্বাস করত না। বাংলায় রচিত ওই প্রচারপত্র সলিমুল্লাহর নজরে পড়েনি, কিন্তু তার ইংরেজি ভাষ্য ‘বেঙ্গলিতে’ প্রকাশের পর তিনি বিচলিত হন, মর্মাহত হন এবং ক্ষুব্ধ হন। এর আগে তাঁর বিরুদ্ধে আর কোনো অপবাদ প্রচারে তিনি এতটা কষ্ট পাননি। আগেও অশালীন ভাষা তাঁর সম্পর্কে প্রয়োগ হয়েছে। তাঁকে বলা হয়েছে ‘এক চোখ কানা নবাব’ বা ‘One-eyed Nawab’। তাঁর চোখে অপারেশন হওয়ায় এক চোখে ভালো দেখতে পেতেন না। কিন্তু এই নোংরা প্রচারপত্রটি তাঁকে মর্মাহত করে। তিনি বুঝতে পারেন, দেশের ভেতরে সাধারণ মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিয়ে হানাহানি ঘটানোর উদ্দেশ্যেই এই প্রচারপত্র।
এর প্রতিবাদে নবাব একটি বিবৃতি দেন। কলকাতান হেজিমনিতে আবৃত মিডিয়া তথা সেই সময়ের পত্র-পত্রিকা এসবের ফ্যাক্টচেক করারও প্রয়োজন বোধ করেনি। নবাব সলিমুল্লাহ যে প্রতিবাদ বিবৃতিটি দেন, সেটিও কেউ কোথাও প্রচার করার জরুরত বোধ করেননি। উপমহাদেশে সাংবাদিকতার এমন নগ্নতা ইতিহাসে বোধহয় এই কলকাতার দাদাবাবুরাই সবচেয়ে ভালো পারতেন।
যাই হোক এই ঘটনায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি, কারণ তখনো হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক এমন খারাপ পর্যায়ে পৌছেনি। উপরন্তু কেউ এমন করতে চাইলে তার কাছে যেন নবাবের সাক্ষর ও মোহর সম্বলিত ক্ষমতাপত্র চাওয়া হয়, সে বিষয়টিও নবাব তার বিবৃতিতে বলে দেন। ফলে বাংলায় সেইবারের মতো কোনো সাম্প্রদায়িক গোলযোগ দেখা যায়নি।
আব্দুর রাজ্জাক কেন্দ্রীক সুশীল সমাজের কাছে আমাদের সওয়াল হচ্ছে—
নবাব সলিমুল্লাহ ও তার পরিবারের প্রভাব জনমনে যদি দুর্বল হয়ে থাক, তাহলে তাদের প্রভাবে মানুষ হিন্দুদের উপর চড়াও হবে কেন?
নবাব প্রভাবশালী যদি নাই-ই হবেন, তবে তারা কেন নির্দিষ্টভাবে তার নামে হ্যান্ডবিল প্রচার করলেন? অন্য মুসলিম নেতাদের নামে কেন প্রচারিত হলো না?
উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য নবাবের ইমেজকেই কেন সবচেয়ে যুতসই মনে হলো?
বস্তুত আব্দুর রাজ্জাকের মিথ্যাচার এখানে সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। সেই সময়ের কংগ্রেসপন্থী, সন্ত্রাসপন্থী, সুশীল, সবার কাছে জন মানুষের উপর নবাবের প্রভাব একটা তর্কাতীত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই তারা হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা লাগানোর জন্য নবাবের ইমেজকে যথেষ্ট শক্তিশালী মনে করেছে।
ধরুন পতিত স্বৈরাচার হাসিনা যদি বলে যে, আজ থেকে আওয়ামীলীগের কার্যক্রম অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ থাকবে, তা মিথ্যা হলেও তার অনুসারী অনুগামীরা এটিকে মানবে বেদবাক্যের মত। এটার একটাই কারণ—সে কাল্ট ফিগার তার দলের ভিতরে।
নবাব সলিমুল্লাহ ঢাকা তো বটেই পূর্ব বাংলার মুসলিম ও ভারতের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন। তার প্রভাব শুধু মধ্যবিত্ত নয়; সাব-অল্টার্ন জনতার ভিতরও ব্যাপক আকারে বিদ্যমান ছিল৷ তাই আব্দুর রাজ্জাকরা ইতিহাস শুধু লুকাতেই চান না; বিকৃত করে ছাড়েন।
নবাব সলিমুল্লাহর প্রভাব কতটা শক্তিশালী, তা বুঝতে আমাদের মুসলমানদের উৎসবের দিকে তাকাতে হবে। মুসলিমদের উৎসব ঈদে বর্তমানে আমরা নতুন জামা পড়ি। এই নতুন জামার কারণে ব্যাপক ক্রয়-বিক্রয় হয়। আমাদের অর্থনীতি চাঙ্গা হয়। সবমিলিয়ে একটা কালচারাল শোডাউন হয় ঈদের সময়। কিন্তু ২০০ বছরের তুমুল শোষণ-তোষনে কখনো এভাবে ঈদ উদযাপনের চিন্তাও বাঙালি মুসলিম করতে পারেনি। তাদেরকে সবসময় নির্জীব নিস্তেজ একটা জীবনাচারের মধ্য দিয়ে দিন পার করতে হতো৷ ওদিকে ইংরেজদের শাসনের ষোলআনা সুবিধা ভোগ করে কালচারাল মনস্টার হয়ে উঠে কলকাতা। ঢাকা তাই অনেকটা নিচু, অচ্ছুৎ কিছু একটা হয়ে উঠে।
শাসিত হলে যা হয় তাই-ই হলো৷ জাঁকালো দুর্গাপুজায় যোগ দিয়ে “আনন্দ’’ ভাগ করতে চাইতো তখনকার মুসলমানরা৷ ঈদের সময় স্রেফ নামাজ আদায় আর মিষ্টি খাওয়ার চল ছিল।
এমন পরিস্থিতিতে নবাব একটা নতুন দৃশ্যমান সাংস্কৃতিক আবহ সৃষ্টি করেন। সৈয়দ আবুল মকসুদ “নবাব সলিমুল্লাহ ও তাঁর সময়” বইয়ে বলছেন—
“মোগল আমলে রাজকর্মচারী ও বিত্তবান মুসলমানরা দুই ঈদ জাঁকজমকের সঙ্গে উদযাপন করতেন। ঈদুল আজহার চাঁদ দেখা গেলে কামান দাগিয়ে মানুষকে জানিয়ে দেওয়া হতো। অবস্থাপন্নরা ঈদের দিন নতুন কাপড়-জামা পরত এবং এ উপলক্ষে ভালো খানাপিনা হতো। তবে সেসব করতেন অতি অল্পসংখ্যক মুসলমান। অভাববশত ৯৫ ভাগ মুসলমান ঈদ বলতে বুঝত শুধু কোনোরকমে ঈদগাহতে জামাতে গিয়ে নামাজ আদায় করাকে।
হিন্দুদের বারোয়ারি দুর্গাপূজায় খুব ধুমধাম হতো, তাতে বিত্তবান হিন্দুরা প্রচুর ব্যয় করতেন। যাত্রা, নাটক, গানবাজনা হতো। তাতে মুসলমানগণও যোগ দিত। বাঙালি মুসলমানের ঈদ উৎসব ছিল প্রাণহীন। সেখানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বলে কিছু থাকত না। সলিমুল্লাহ নবাবি গ্রহণের পর ঢাকার ঈদ উদ্যাপনে পরিবর্তন আনেন।
কুড়ি শতকের প্রথম দিকেও ঈদের জামাত ঢাকার খুব বেশি জায়গায় হতো না। প্রধান দুটি জামাত হতো লালবাগ শাহি মসজিদে এবং ধানমন্ডি ঈদগাহে। একটি জামাত হতো চকবাজার মসজিদে। আর একটি জামাত হতো নবাববাড়ির মসজিদে, যেখানে সলিমুল্লাহ নামাজ আদায় করতেন।
নবাব আবদুল গণি ও নবাব আহসানুল্লাহ ঈদের সময় প্রচুর দান-খয়রাত করতেন। নবাব এস্টেটের সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে সলিমুল্লাহ যোগ করেন কিছু নতুন উপাদান। দরিদ্রদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ শুধু নয়, তাদের জন্য ঈদের দিন তিনি পোলাও, মাংস, জর্দা প্রভৃতি খাবারেরও ব্যবস্থা করেন। তখন ঢাকার জনসংখ্যা ছিল কম, তা সত্ত্বেও তুলনায় দরিদ্র হিন্দু- মুসলমানের সংখ্যা অল্প ছিল না। ঈদের দিন হাজার হাজার মানুষের জন্য উন্নত খাবারের ব্যবস্থা করতেন তিনি এবং তা ছিল ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার জন্য অবারিত।
নতুন জামা পরে ঈদগাহে যাওয়ার রেওয়াজ আহসানুল্লাহ ও সলিমুল্লাহর সময় থেকে চালু হয়। খানাপিনার বাইরে হতো আনন্দ উৎসব। চকবাজারে বসত মেলা। তখন চকবাজার চত্বরে বছরে তিনবার মেলা বসত। পয়লা বৈশাখ, মহররম ও ঈদুল ফিতরে। সেখানে হস্তশিল্প প্রদর্শন ও বেচাকেনা শুধু নয়, শিশুদের খেলাধুলার ব্যবস্থা থাকত। মেলা দিন তিনেক চলত। তার সঙ্গে যোগ করা হয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, যেমন যাত্রাগান, পালাগান,পুঁথিপাঠ।” (নবাব সলিমুল্লাহ ও তাঁর সময়, সৈয়দ আবুল মকসুদ, পৃষ্ঠা : ১৯৪-১৯৫)
আব্দুর রাজ্জাকরা আমাদেরকে বিশ্বাস করাতে চান যে, কোনো রকম প্রভাবহীন, জনমনে অনুপস্থিত একজন রয়েল এলিট এই রকম কালচারাল শোডাউন সৃষ্টি করেছেন। বিষয়টা যে অবাস্তব ও ঘৃণ্য মিথ্যাচার তা আর বুঝতে বাকি নেই। আজকের দিনে প্রভাবহীন কোনো নেতার ডাকে কি মানুষ কর্মসূচি পালন করতে আসে? তাহলে তখন প্রভাবহীন, জনবিচ্ছিন্ন এলিট কি করে এত বড় কালচারাল শোডাউন দিতে পারেন, তাও আবার উগ্র সাম্প্রদায়িক জঙ্গি অনুশীলন ও যুগান্তর গোষ্ঠীর সন্ত্রাসবাদ যখন তুঙ্গে ঠিক সেই সময়? একজন প্রভাবহীন(?) নবাবের প্রভাব কতটা কম থাকলে দুর্গাপুজায় যোগ দেয়া আব্দুল্লাহ নতুন পাঞ্জাবি টুপি পড়ে খানাপিনা ও মেলায় যেতে পারে?
মুসলিম ছাড়াও হিন্দুদের উপরও ব্যাপক প্রভাবশালী ছিলেন তিনি। আহসানুল্লাহর ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকে জানা যায়, ১৮৯৫ সালে সরকার ‘বিশেষ কারণে হাতি না দেওয়ায় জন্মাষ্টমীর মিছিল পরিচালনায় অনিশ্চয়তা’ দেখা দেয়। তখন আহসানুল্লাহ হিন্দু নেতাদের ডেকে আশ্বাস দেন, যতগুলো হাতির প্রয়োজন মিছিল বের করতে, তা তাঁর হাতিশালা থেকে দেওয়া হবে। তারপর থেকে প্রতিবছরই জন্মাষ্টমীর মিছিলে নবাবদের হাতি ব্যবহার করতে দেওয়া হতো।
সলিমুল্লাহও জন্মাষ্টমীর উৎসবে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতেন। নবাবের হাতি ও ঘোড়া মিছিলে সাজিয়ে শোভাযাত্রা করা হতো। তিনি বিভিন্ন মহল্লার মুসলমান সরদারদের ডেকে বলতেন, তাঁরা যেন জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে। ঢাকার হিন্দু নেতারা নবাবকে এতটাই সম্মান ও ভক্তি করতেন যে, জন্মাষ্টমীর মিছিলের আগে প্রথম হাতিটির পিঠে সুসজ্জিত হাওদায় উপবেশন করতেন সলিমুল্লাহ। পেছনে থাকতেন অনেকগুলো হাতি ও ঘোড়ার পিঠে থাকতেন হিন্দুধর্মীয় নেতারা।
জনগনের নৈতিকতার প্রশ্নেও নবাব সলিমুল্লাহ ছিলেন সোচ্চার। নবাবী পাওয়ার পর তিনি সমাজে অনাচার অনৈতিকতা কমাতে সচেষ্ট হন।
বৃটিশ আমলে লাইসেন্স প্রাপ্ত বেশ্যা ঢাকায় ছিল প্রায় ২১৬৪ জন। এই পরিমাণ পতিতাদের আবার আনাগোনা ছিল পাড়ায় পাড়ায়। বেশ্যাবাড়ি নামে পাড়ার কোনো এক স্থানে তারা দেহব্যবসা চালাত। লাইসেন্স প্রাপ্ত হওয়ায় তাদেরকে উৎখাত করতে পারতো একমাত্র সরকার।
প্রথমবারের মত নবাব সলিমুল্লাহ এ উদ্যোগ নেন ১৯০৬ এর শেষদিকে। এই বছরের ১৮ তারিখ প্রস্টিটিউশন নিয়ে একটি বিল উত্থাপন করেন তিনি। পরের বছর ৬ ফেব্রুয়ারি এই বিলটি পাস হয়ে যায়।
কোনো এলাকার তিনজন ব্যক্তি এলাকার বেশ্যাবাড়ি সরিয়ে নিতে আবেদন করলে তাদের আবেদন যথাযথ অনুসন্ধান পূর্বক তা শহরের দূরবর্তী কোনো স্থানে স্থানান্তর করা হয়। এভাবে ঢাকা সহ অন্যান্য দূরবর্তী স্থানে সরিয়ে নেয়া হতে থাকে। ঢাকা প্রকাশে সেসময় এ নিয়ে বেশ কিছু লেখালেখি পাওয়া যায়।
নবাব স্যার সলিমুল্লাহ বৃটিশদের অনুগত ছিলেন, তাদের পক্ষে ছিলেন—এরকম অনেক কথা বাম পাড়ায় ভেসে বেড়ায়। পাতি বামরা সেটা নিয়ে মাথাও ঝাঁকায়। কিন্তু এই বামরাই আবার বৃটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত হাজী শরীয়তুল্লাহ, তিতুমীর, দুদু মিয়া এদের সংগ্রামকে খাটো করে দেখাতে চায়। কী হাস্যকর ডাবল স্ট্যান্ড! অথচ একই সময় কলকাতার দাদাবাবুরা ব্রিটিশদের পদলেহন করে ফুলে ফেঁপে একেকজন বিরাট জমিদার। অর্থবিত্ত বৈভবের সাগরে তারা নিমজ্জিত থাকতেন। বামপাড়ায় এটা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা নেই, থাকলেও সেটা এতটা প্রকট আকারে নয়।
নবাব সলিমুল্লার একমাত্র অপরাধ হলো—তিনি মুসলমানদের পক্ষে ছিলেন। তিনি নিজেও ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তিনি এমন একজন মুসলিম এলিট, যিনি মুসলমানদের জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে। তাই যত সম্ভাব্য দোষ আছে, তাকেই দিতে হবে এই পণ বাম পাড়ার।
বিংশ শতাব্দীর শুরুর সেই সময়ে যখন হাটে, বাজারে, ট্রেনে, মাঠে, ঘাটে মুসলমানিত্বের কারণে একজন সো কল্ড বাঙালি আরেকজন বাংলাভাষীকে লাঞ্ছিত করছে, রাজনৈতিক অধিকার হরণ করছে, অর্থনৈতিকভাবে দমন করে রাখছে; সেই সময় ব্রিটিশদের সাথে সুসম্পর্কের সুবাদে নবাব সলিমুল্লাহ মুসলমানদের জন্য যে চেষ্টা করেছেন তার বদৌলতেই আজ ঢাকা ইউনিভার্সিটি, আহসানুলাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল প্রতিষ্ঠাসহ অসংখ্য জনহিতকর কার্যক্রম আমাদের চোখে পড়ে। মুসলমানদের নেতা হওয়াটাই এখানে ভুল ছিল। ব্রিটিশদের সাথে সম্পর্ক সে সময় সকল নৃপতিই রাখতেন। আলাদা করে নবাব সলিমুল্লাহ রেখেছেন বিষয়টি কখনোই এমন না। বরং সলিমুল্লাহর দ্বারস্থ হতে হতো খোদ ব্রিটিশদেরকেই কিছু কিছু ক্ষেত্রে।
সুতরাং নবাব ফ্যামিলি এলিট ক্লাস হলেও যেভাবে জনমানুষের কাছে এসেছেন, কলকাতার ব্রাহ্মণ্যবাদীরা সেভাবে আসেনি; বরং তারাই ছিল সবচেয়ে বেশি প্রজা নিপীড়ক। আব্দুর রাজ্জাকরা এটা জানেন, তাই তারা এলিট বনাম সাবাল্টার্ন তত্ত্ব দাঁড় করাতে চান। এটা মানতেই চান না যে, এলিটদের মধ্যে নিতান্তই আল্লাহর ওয়াস্তে জনতার সেবায় ব্রতী হওয়ায় চিন্তা আসতে পারে।
যেমন সংঘাত ভিত্তিক তত্ত্ব কাঠামোর দরুন তারা ধরেই নেয় এলিট ক্লাস কেবলই সাপ্রেসিভ, জনবিচ্ছিন্ন, জনতার কাছাকাছি আসলেও তা কেবলই রাজনৈতিক উদ্দ্যেশ্যে। এই যে লজিকাল ফ্যালাসি এটাই তাদের উপস্থাপনা শক্তির কারণে অনেক অনেক বেশি শক্তিশালী হিসাবে আবর্তিত হতে থাকে, অথচ তা কতই-না ডাহা মিথ্যা কথা৷
বরাত
১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ, অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক-এর আলাপচারিতা, সরদার ফজলুল করিম।
২. নবাব সলিমুল্লাহ ও তাঁর সময়, সৈয়দ আবুল মকসুদ।
৩. ঢাকা প্রকাশ, ১৯০১, ২২ ডিসেম্বর সংখ্যা।
৪. ঢাকা প্রকাশ, ১৯০৭, ৭ জুলাই সংখ্যা।
৫. ঢাকা প্রকাশ, ১৯০২, ৬ এপ্রিল সংখ্যা।
৬. মুহাম্মদ আবদুল্লাহ, নওয়াব সলিমুল্লাহ, পৃষ্ঠা : (২৭৪-৭৫)।